মিষ্টির দোকানঅতিপ্রাকৃত

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে।

এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে।

আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আসত মিষ্টি কিনতে। এখন কেউ আসে না।

আব্বা বিরক্ত হয়ে দিনে দোকান খোলা বাদ দিয়েছেন। এখন ব্যবসা হয় শুধু রাতের বেলা। নিশুতির নির্জনতা ভেদ করে কয়েকটি পা এসে থামে দরজার সামনে। তখন আব্বা দোকান খুলতে যান।


নূর ইসলাম ভাইকে বলেছিলাম ঘৌলের কথা। শুনেছি ঘৌলের পা নাকি গাধার মতো হয়। নূর ইসলাম ভাইর পা-ও তো গভীর রাতে গাধার মতো হয়ে যায়। তাহলে কি আমার নূর ইসলাম ভাইও ঘৌল জিন?

নূর ইসলাম ভাই উজ্জ্বল দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিলেন। বলেছিলেন,

"তুই সব কথা তোর বাবা-মাকেও বলিস না। তাহলে আমাকে বলছিস কেন?"

"ওমা! তুমি তো আমার নিজের মানুষ। তোমাকে না বললে হয়?"

"উনারাও তোর নিজের। তোর আপন বাবা-মা।"

"তাতে কী? উনারা আমার এতটাও নিজের না। নিজের হলে কি রাতে আমার হাত খাটের সাথে বেঁধে রাখতে পারতেন? নিজের তো তুমি। তাইতো রাতে যখন আম্মা আমার হাত খাটের সাথে বেঁধে দিয়ে যান, তুমি চুপিচুপি আমার বাঁধন খুলে দাও। এভাবে বাঁধা অবস্থায় ঘুমাতে আমার খুব কষ্ট হত, জানো?"

নূর ইসলাম ভাই কোনো কথা বলেন না। গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন আমার দিকে। তার চেহারায় ঠুনকো হাসির রেখা ফুটে ওঠে।


বড়ো হুজুর আসার কথা ছিল সকালে।

কিন্তু মাদ্রাসার জরুরি কাজ শেষ করে আসতে বিকেল হয়ে গেল। তাঁকে দেখে আব্বা উঠানে চেয়ার পেতে দিলেন। কিন্তু হুজুর বসলেন না। বললেন,

"বসার সময় নেই। মাদ্রাসায় ফিরে মাগরিবের নামাজ পড়তে হবে।"

এই কয়দিনে আব্বার শরীর অনেকটা শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। গলার স্বরটাও হয়েছে কেমন। মিনমিন করে বললেন,

"হুজুর, আমাদের পুকুরে কী যেন আছে। আপনি দয়া করে আমাদেরকে বাঁচান।"

বাড়ির পেছন দিকটায় পুকুর। তার চারপাশে অসংখ্য পেয়ারা, নারিকেলের গাছ। পানিতে পাতা পড়ে নোংরা হয়ে আছে। হুজুর একটা বালতিতে করে পানি তুললেন। কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন সেই পানিতে।

পড়া পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে পুকুরের চারপাশে এবং পুকুরের পানিতে ছিটিয়ে দিলেন। আমি আর আব্বা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। নূর ইসলাম ভাইকে কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। অথচ কিছুক্ষণ আগেও সে ঘরে ছিল। আমার সাথেই ছিল। হুজুরের আওয়াজ শুনে বাইরে এসেছি। ঘরে ফিরে দেখি নূর ইসলাম ভাই উধাও।

পুকুরের এক কোণে দাঁড়ালেন বড়ো হুজুর। আব্বা এগিয়ে গিয়ে বিমর্ষ গলায় বললেন,

"হুজুর, কিছু বুঝলেন?"

বড়ো হুজুর কিন্তু কিছু বললেন না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উচ্চশব্দে আজান দিতে শুরু করলেন। এভাবে পুকুরের চার কোণে আজান দেওয়া শেষে দেখলাম হুজুরের কপাল ঘামছে। চেহারাও কেমন বিধ্বস্ত।

একটা জিনিস বারবার আমার চোখে পড়ছিল। আমাদের বাড়িতে আসার পর থেকেই হুজুর মাঝেমাঝেই বিস্মিত ভঙ্গিতে দুপাশে তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু কিছু বলছিলেন না। ওদিকে নূর ইসলাম ভাইকেও কোথাও দেখা যাচ্ছিল না।

হুজুর যখন চলে গেলেন, তখন চারপাশে মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছে। ঘরে ফিরে দেখি নূর ইসলাম ভাই বিছানায় বসা। অথচ একটু আগেও ঘরে এসেছিলাম। তখন তাকে পাইনি।


রাতে স্বপ্নে দেখলাম নূর ইসলাম ভাই আমাকে ডাকছে।

তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। বুকে গোরুর শিঙের মতো কী একটা বিঁধে আছে। আমাকে দেখে কাঁদোকাঁদো গলায় বলছে,

"সাবধানে থাকিস ভাই আমার। তুই যাকে আমি ভাবছিস সেটা আমি নই। আমি তো পুকুরের নিচে ছিলাম এতদিন। তুই সাবধানে থাকিস ভাই। সাবধানে থাকিস।"

ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখি নূর ইসলাম ভাই আমার পাশে ঘুমিয়ে। পূর্ণিমার আলো ঘরের বেড়া ভেদ করে কিছুটা এসে পড়েছে ঘরের ভেতরে। সেই টিমটিমে আলোয় নূর ইসলাম ভাইর খোলা চোখদুটো দেখা গেল।

বললাম, "আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। এখন দেখি স্বপ্ন।"

নূর ইসলাম ভাই কোনো সাড়া দিলো না। একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে আছে। যেন কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। বললাম,

"স্বপ্নে কী দেখেছি শুনবে? দেখেছি তুমি আমাকে বলছো তুমি আসলে তুমি নও। তুমি অন্য কেউ। আসলে সবার মুখে এত আজেবাজে কথা শুনেছি, স্বপ্নেও আজেবাজে দেখছি।"

"কী শুনেছিস?" জিজ্ঞেস করল নূর ইসলাম ভাই।

"কতকিছু শুনেছি। জিনের কথা শুনেছি। ঘৌলের কথাও শুনেছি। আচ্ছা ভাই, ঘৌল বলতে কি আসলেই কিছু হয়?"

নূর ইসলাম ভাই ধীরে ধীরে উঠে বসল। বলল,

"হয়।"

"সত্যি?"

"হ্যাঁ, সত্যি। এরা মানুষের রক্ত আর মাংস পছন্দ করে। মানুষের ক্ষতি করতে চায়।"

"কিন্তু আমার ক্ষতি করতে পারবে না।"

দেখলাম নূর ইসলাম ভাই কপাল কুঁচকে গেল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। বললাম,

"আমি ঘুমানোর আগে চার কুল পড়ে ঘুমাই। তাই আমার কোনো চিন্তা নেই। ঘৌল আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।"

"আর যদি কোনোদিন পড়তে ভুলে যাস?"

"আরে না। আমি কোনোদিন ভুলব না।"

জানি না কেন নূর ইসলাম ভাইর মুখে অদ্ভুত হাসির রেখা ফুটে উঠল। জানতে চাইলাম,

"হাসছো কেন?"

"কিছু না। ঘুমা।"


সেদিনের পর থেকে বড়ো হুজুর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

খাওয়াদাওয়া একরকম বন্ধ। শরীর এতটাই দুর্বল, বিছানা থেকে উঠতেও কষ্ট হয়।

হিফজ খানার পড়া শেষ করে মাঝেমাঝে বড়ো হুজুরকে দেখতে যাই। তিনি আমার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দেন। তাঁর চোখের পাশ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। মৃদুমন্দ স্বরে বলেন,

"আমার মনে হয় সময় ফুরিয়ে আসছে। তুই একটু সাবধানে থাকিস বাবা। ইমান ঠিক রাখিস। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বি। কোনোদিন কারো ক্ষতি করবি না। মা-বাবার কথামতো চলবি।"

"হুজুর, আপনি কি মারা যাবেন?"

প্রচণ্ড কষ্টের মাঝেও তাঁর চেহারায় হাসির ঝিলিক দেখা যায়।

"আল্লাহ যা যা চান তা-ই হবে। হুজুরের কোনো কথায় বা কাজে যদি কোনো কষ্ট পেয়ে থাকিস, আমাকে মাপ করে দিস। আর দোয়া করিস। আল্লাহ যেন আমার কবরের জীবন সহজ করে দেন।"

"হুজুর, মরার পরেও কি আপনি এমন থাকবেন?"

"কেমন?"

"এইযে, এত ভালো। আপনার কাছে আসলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। আপনি তো আমার ওস্তাদ।"

"তোকে দেখলেও আমার মন ভালো হয়ে যায়। আমার খুব দুঃখ লাগছে। সমস্যার সমাধান দেখে যেতে পারলাম না। কিন্তু মনে রাখিস, সমস্যা যত বড়োই হোক, একদিন না একদিন সমাধান হয়ই।"

ফিরে আসার সময় হুজুর একটা অদ্ভুত কথা বললেন। যেটা শুনে আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে পড়লাম। বললাম,

"আমার ভাই? আমার তো কোনো ভাই নেই। আমি একাই।"

হুজুর ফের মৃদু হাসলেন। বললেন,

"ছিল। তোর একটা ভাই ছিল। তুই জানিস না। তোর মা জানেন। তাকেও ও-ই মেরেছে। কিন্তু তোকে এখনও কিছু করতে পারছে না কেন সেটা বুঝতে পারছি না। হয়তো আল্লাহ তোকে বাঁচাচ্ছেন। তিনি যাকে বাঁচান, তাকে মারার ক্ষমতা কারো নেই।"


বাড়ি ফেরার পর কথাটা বলব বলব করছিলাম। কিন্তু কিছুতেই মুখে আসছিল না। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন,

"কীরে, কিছু বলবি নাকি?"

জানতে চাইলাম, "আমার কোনো বড়ো ভাই ছিল?"

এক লহমায় আম্মার মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেল। আব্বা মিষ্টির পাতিল দোকানে নিয়ে যাচ্ছিলেন৷ সেটা হাত ফসকে পড়ে গেল মাটিতে। মিষ্টির রস আমার পায়ের কাছ দিয়ে গড়িয়ে যেতে লাগলো। আম্মা-আব্বা নিজেদের দিকে তাকাচ্ছেন।

আমার মাথায় তখন অসংখ্য এলোমেলো প্রশ্ন। আম্মা বলেন আমি নাকি কিছুই বুঝি না। কিন্তু আমি তো সব বুঝি। তবে আমার যে একটা ভাই ছিল সেটা বুঝতে পারলাম না কেন?

আম্মা তাড়াহুড়ো করে আমার কাছে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। তার শাড়িতে মিষ্টির রস মেখে যাচ্ছে। সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,

"এই কথা তোকে কে বলেছে?"

বললাম, "বড়ো হুজুর বলেছেন।"

আব্বা জিজ্ঞেস করলেন, "কবে?"

"আজ। মাদ্রাসা থেকে ফেরার সময় বড়ো হুজুর বলেছেন।"

আম্মা-আব্বা আবারো মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। আম্মা বললেন,

"বড়ো হুজুর তোকে বলেছেন? আজকে?"

"হ্যাঁ।"

"কিন্তু বড়ো হুজুরকে তো কাল বিকেলেই শহরের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।"

"কী যে বলো না আম্মা! আমি আজকে হুজুরকে দেখেছি।"

আব্বা আমার কাছে এসে বললেন,

"তুই কি বড়ো হুজুরকে নিজের চোখে দেখছিস?"

"দেখেছি তো। হুজুর নিজের ঘরে ছিলেন।"

তারপর আব্বা যা বললেন, তার জন্য আমি বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলাম না। বললেন,

"তুই কি জানিস না আজ দুপুরে বড়ো হুজুর মারা গেছেন?"

চলবে।

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

লেখকের ফেসবুক পেজ

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক

চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১৪

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। নিস্তেজ হয়ে আসা সূর্যের আলো হেলে পড়েছে একপাশে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। ভেজা রাস্তার ওপাশে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে। আয়রার প্রিয় ব্র্যান্ডের গাড়ি; মার্সিডিজ। আজ সাদা ড্রেস পরেছে আয়রা। কালো গাড়ির সামনে সাদা ড্রেসটাই…

৭ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক

চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১৩

টিউশানি শেষে মেসে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়েছি সবে। মাহিদ ভাই দরজায় নক করলেন, "আজান, আসব?" তারপর জবাবের অপেক্ষা না করেই ঢুকে পড়লেন। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি তার চেহারায় স্পষ্ট বিরক্ত। দপ করে সামনে বসে বললেন,…

৬ অক্টোবর ২০২৬৬ মিনিট পড়া
চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক

চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১১

রায়ানের কল দেখে বিচলিত হয়ে পড়ে আয়রা। তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পুরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কলটা যখন আপনাআপনি কেটে যায় তখনও কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর আচমকা বোতল উলটে মুখের সাথে লাগিয়ে নেয়। "আরেআরে কী করছেন! এত খাবেন…

৫ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া