চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১৩

ইয়াছিন নাইম৬ অক্টোবর ২০২৬৬ মিনিট পড়া

টিউশানি শেষে মেসে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়েছি সবে। মাহিদ ভাই দরজায় নক করলেন,

"আজান, আসব?"

তারপর জবাবের অপেক্ষা না করেই ঢুকে পড়লেন।

মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি তার চেহারায় স্পষ্ট বিরক্ত। দপ করে সামনে বসে বললেন,

"তুমি কী শুরু করছো বলো তো? এতবার বুঝাইলাম মেয়েটার সাথে চলাফেরা করার দরকার নাই, তারপরও... আরে আজান তুমি বুঝবা কবে? ওই মেয়ে তোমার সাথে মজা নিতেছে। আর কিছুই না।"

"ভাই, আমার খুব ঘুম পাইছে। জরুরি কিছু বলার থাকলে বলেন।"

"জরুরি?" বলে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন।

"জরুরি কথা হইলো, মেসের সামনে গাড়িটা দাঁড়ায় আছে।"

"আয়রা?"

"জানি না। আমি শুধু গাড়ি দেখছি।"

ছুটে বেরিয়ে এসে দেখি রাস্তার ওপাশে গাড়িটা দাঁড়ানো। আমাকে দেখেই ড্রাইভার নেমে আসলো।

"ম্যাডাম আপনাকে যেতে বলেছেন।"

"ম্যাডামকে গিয়ে বলবেন, আমি তার চাকর নই।"

ড্রাইভার বোধহয় এমন জবাব শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। অন্তত তার চেহারা দেখে সেটাই মনে হলো।

"কিন্তু ম্যাডাম বলেছেন আপনাকে নিয়ে যেতে।"

"আমি যাব না।"

এরপর ড্রাইভার যা করল, তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সে তার কোমর থেকে একটা পিস্তল বের করে আমার কপালে তাক করল।

"এসব কী হচ্ছে?"

"আমারে মাফ করে দিয়েন। আপনাকে না নিয়ে গেলে আমার চাকরি থাকবে না।"

একরকম বাধ্য হয়েই গাড়িতে উঠতে হলো। গাড়িটা যেখানে থামলো, সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অনেকটা দূরে ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলছে। সেই অল্প আলোয় লেখাটা পড়তে পারলাম।

"পারিবারিক কবরস্থান"

ড্রাইভার আমাকে পেছন থেকে একরকম ধাক্কা দিয়েদিয়ে কবরস্থানের ভেতরে নিয়ে গেল। একটা অনেক পুরাতন কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আয়রা। তার পেছনে আমি। রাগে আমার মাথা ভনভন করছিল। বললাম,

"এসবের মানে কী? নিজের টাকা আছে বলে যা খুশি তাই করবেন? পিস্তল ঠেকিয়ে তুলে আনা, এটা কী ধরণের আচরণ? যদি গুলি বের হয়ে যেত? আমি গরিব বলে কি আমার জীবনের মূল্য নেই?"

"ওটা নকল পিস্তল।" না ফিরেই বলল আয়রা। কবরস্থানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে দেখি সে মিটিমিটি হাসছে।

আয়রা ফিরে তাকাতেই তার ভেজা চোখে নজর পড়ল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে গত এক সপ্তাহে দু-তিন বছর বুড়িয়ে গেছে। তাকে এতটা মলিন হতে আগে কখনো দেখিনি।

"আজ মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী ছিল।" বলল আয়রা।

জবাবে কী বলব, ভেবেই পাচ্ছিলাম না। আয়রা নিজেই বলল,

"প্রতিবছর এখানে আসি মায়ের সাথে সুখ-দুঃখের কথা বলতে। তার কবরের পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকতে। কিন্তু আজ অন্য কারণে এসেছি।"

আমি কৌতূহলী ভঙ্গিতে তাকালাম।

"আজ এসেছি তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে।"

"আমাকে? আমার ব্যাপারে কী বলবেন উনাকে? বলার মতো বিশেষ কিছুই যে আমার নেই!"

"নিজেকে সবসময় এত ছোটো মনে করো কেন আজান?"

"যা সত্য, তা স্বীকার করতে দোষ কী?"

"তোমার কি মনে হয়, শুধু টাকাই মানুষকে বড়ো করে?"

"এটাই তো শুনেছি সবসময়।"

"ভুল শুনেছ। টাকাই জীবনের সবকিছু না।"

"আপনার অনেক আছে তাই এটা বলছেন। একবার রাস্তায় নেমে দেখুন, বাস্তবতা কতটা কঠিন।"

"আজান আমি এসব কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাই না। আজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে।"

"এখানে?"

"হ্যাঁ, এখানেই। তোমার ভয় করছে নাকি?"

"এত রাতে অন্ধকার কবরস্থানে যে কারোরই ভয় করার কথা।"

আয়রা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। ড্রাইভারকে ইশারা করতেই গাড়ি নিয়ে চলে গেল। এখন এই নিঃস্তব্ধ কবরস্থানে কেবল দুটি জীজীবিত মানুষ। আয়রা আর আমি।

"আজান, তুমি কি বোকা?"

আয়রা কিছু একটা বলতে চলেছে এটা আমি বুঝেছিলাম। কিন্তু এটা বলবে কল্পনাও করিনি। বললাম,

"মানে?"

"মানে তুমি কিছু বুঝো না?"

"কী বুঝব?"

"থাক, তোমাকে কিছু বুঝতে হবে না।"

বলে কিছুটা দূরে সরে গেল আয়রা।

"আমি কি চলে যাব তাহলে?"

আয়রা ফিরে তাকালো। স্বল্প আলোয় যতটুকু আন্দাজ করতে পারলাম, তার ফরসা গাল লালবর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। যেমনটা সে অনেক বেশি রাগলে হয়।

"তিনবছর আগে হাইওয়ের রোডে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল। বাইক এক্সিডেন্ট। যে মেয়েটা বাইক চালাচ্ছিল তার পা ভেঙে গিয়েছিল। মনে আছে তোমার?"

"মনে আছে। কিন্তু এটা আপনি জানলেন কীভাবে?"

"যাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলে তাকে চেন?"

"না। তার মাথায় হেলমেট ছিল।"

"যদি বলি সেই মেয়েটা আমি?"

বলে আয়রা আরো কিছুটা এগিয়ে এল। তার চোখদুটো টলমল করছে।

"আপনি?"

"সেদিন আমাকে হাসপাতালে রেখে চলে গিয়েছিলে। ঠিকানা, ফোন নাম্বার কিচ্ছু দিয়ে যাওনি৷ আমি তোমাকে চিনতাম না। শুধু অজ্ঞান হওয়ার আগে চেহারা দেখেছিলাম৷ চাপা পড়া মাইক্রোবাসের নিচ থেকে টেনে বের করছিলে আমাকে।"

"এত দামিদামি গাড়ি থাকতে বাইক নিয়ে বের হয়েছিলেন কেন আপনি?"

"তুমি আসলেই বোকা।" বলে ধাক্কা দিয়ে কিছুটা পেছনে ঠেলে দিলো আয়রা। আমি পড়েই যাচ্ছিলাম। আয়রা হাত ধরে সামলে নিলো।

"সেই ঘটনার পর আমি অনেক খুঁজেছি তোমাকে। পাইনি কোথাও। তারপর একদিন মাতাল অবস্থায় রাস্তায় বেরোলাম। আমার ক্ষতি হতে পারত। সেদিনও তুমিই আমাকে বাঁচালে।"

"যার বিনিময়ে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমাকে অপমান করেছিলেন। সবার সামনে আমাকে দিয়ে জুতা ঠিক করিয়েছিলেন।"

"মেয়েমানুষ তার ব্যক্তিগত সবকিছুতে তার প্রিয়মানুষকে চায়। হোক সেটা জুতা ঠিক করে দেওয়া।"

আয়রার সাথে পরিচয় হওয়ার পর এতবার সে আমাকে বিস্মিত করেছে যে, এখন বিস্ময় ভুলে গেছি। শুধু গলা দিয়ে অস্ফুট স্বর বের হলো,

"প্রিয়মানুষ?"

"আজান, মাঝেমাঝে আমার মনে হয় তুমি যতটা নীরিহ সাজো, আসলে ততটা নও।"

"তবে আমি কী?"

"আমার কাছে তুমি একজন ভরসা।"

"ভরসা? আমি? আপনি আবার নেশা করেছেন?"

আয়রা হাসলো।

"আজ নেশা করিনি। বিশ্বাস না হলে শুঁকে দ্যাখো।"

বলে আমার মুখের সামনে ঠোঁট এনে শ্বাস ছাড়লো।

"কী মনে হয়? নেশা করেছি?"

"না।"

"তোমার কি কিছুই বলার নেই?"

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আয়রা। তাকে দেখে খুব মায়া হচ্ছে আমার। দুনিয়ার চোখে যে অনেক ক্ষমতার মালিক, অর্থবিত্তের তুলনায় যে অসীম, সেই আয়রা কিনা আমার মতো সামান্য একজনের সামনে নিজেকে সমর্পণ করছে!

একটা গাড়ি এসে থামার শব্দ হলো। হেডলাইটের আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে। তবে আয়রার চেহারায় নেমেছে অন্ধকার। রায়ান এখানে চলে আসবে, এটা হয়তো সে ভাবেনি।

রায়ান আমাদের সামনে এসে বলল,

"আমি জানতাম তুমি এখানে আসবে। আন্টির জন্য ফ্লাওয়ার।"

বলে পুরনো কবরটার উপরে একটা ফুল রাখলো। তারপর ফের আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো।

"আরে! তোমার বিশেষ বন্ধুটিও আছে দেখছি! তুমি বলেছ, না কি আমি বলব?"

"তুমি এখানে কেন এসেছ?"

"অন্যকেউ আসার কথা নাকি? কয়দিন পর থেকে তো আমরা একসাথেই থাকব। তাই আগে থেকেই প্র্যাকটিস করি।"

"একসাথে থাকবেন?" জিজ্ঞেস করলাম আমি। এই প্রথমবার রায়ান আমাকে অপমান না করে সুন্দরভাবে জবাব দিলো,

"তুমি জানো না? আমরা বিয়ে করছি আগামী সপ্তাহে। আয়রা, তুমি তোমার বন্ধুকে বলোনি? যাইহোক, আমি বলে দিচ্ছি। তুমি কিন্তু বিয়েতে আসতেই হবে। ভালোভালো খবারের আয়োজন হবে। যত খুশি খেতে পাবে। বেঁচে যাওয়া খাবার যা থাকবে, চাইলে তোমার বস্তিবাসীর জন্য নিয়েও যেতে পারবে।"

আয়রা দ্রুত পায়ে চলে যেতে শুরু করল। পেছনে ছুটল রায়ান।

"আয়রা দাঁড়াও। আমি আসছি।"

রায়ান গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছে। আয়রা বসতেই সেও ড্রাইভিং সিটে বসে। তারপর সাঁই করে চলে যায় গাড়িটা। একা থেকে যাই আমি। এই নীরব, নিঃস্তব্ধ করবে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে কতক্ষণ কেটে যায় জানি না। বারবার মনে হতে থাকে আয়রা আসবে। আয়রা নিশ্চয়ই আসবে আমাকে নিতে।

কিন্তু না। ভোরের আলো ফুটবার পর এক পথচারী ফজরের নামাজ শেষে ফিরছিলেন। আমাকে দেখে বললেন,

"কবর খুঁড়বেন নাকি? কে মারা গেছে?"

আমি কিছু বললাম না। তবে আমার গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল,

"আমি।"

দুপুরে মেসে ফিরে দেখি মাহিদ ভাই আমার ঘরে বসা। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

"কই ছিলা মিয়া? কতক্ষণ ধইরা বইসা আছি।"

কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা আমার ছিল না৷ মাথা নিচু করে মেঝেতে বসে পড়ি। মাহিদ ভাই বসেন আমার মুখোমুখি। ফিসফিস করে বলেন,

"তোমারে অনেক ধন্যবাদ আজান। তোমার জন্য এতকিছু সম্ভব হইলো। আমার যে খুশি লাগতেছে বলে বুঝাইতে পারব না। আনন্দে তোমারে মাথায় তুলে নাচতে ইচ্ছে করতেছে।"

মাহিদ ভাই এত খুশি হওয়ার মতো কিছু করেছি মনে মনে পড়ছে না। কপাল কুঁচকে তাকালাম তার দিকে।

মাহিদ ভাই বললেন,

"তুমি তো জানো আমার বর্তমান অবস্থা। তিনমাসের ভাড়া বাকি। মালিক বলছিল আজকে সব টাকা দিতে না পারলে জিনিসপত্র রেখে আমারে বাইর করে দিবে। আমি তো ধরেই নিছিলাম আজকে আমার শেষ দিন। শেষ মুহূর্তে তুমি চমক দেখায় দিলা।"

"আমি কী করেছি ভাই?"

"এমন ভান করতেছ যেন কিছুই জানো না। আমি জানি এসব তুমি করাইছো। মালিক যখন আমারে বাইর করতে আসছে ঠিক তখনি তুমি আয়রা ম্যাডামরে পাঠাইছো। উনি আগেও একবার টাকা দিয়ে আমারে সাহায্য করছে। তার টাকা দিয়াই আব্বার অপারেশন হইছে৷ আর এইবার বাড়িছাড়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাইছে।"

"আয়রা ভাড়ার টাকা দিয়েছে।"

"আরে না মিয়া। মালিক তো আয়রা ম্যাডামরে দেইখাই সব ভাড়া মাফ করে দিছে। আমারে বলছে, উনার সাথে খাতির আছে আগে জানাইনাই ক্যান। আরো বলছে আমাদের রুমে এসি লাগায় দিবে। আয়রা ম্যাডামের ক্ষমতা আছে এইটা আমি জানতাম। কিন্তু এত ক্ষমতা বুঝিনাই। ম্যাডামরে আমার তরফ থেইকা ধন্যবাদ দিও।"

বলতে বলতে চলে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ থেমে বললেন,

"ম্যাডাম অনেক ভালোমানুষ। খেয়াল রাইখো তোমার কোনো কথায় বা কাজে উনি যেন কষ্ট না পান।"

অনেক্ষণ বসে রইলাম মেঝেতে। মাথাটা ভনভন করছিল। কিছুক্ষণ পর এক ছোটোভাই দৌড়ে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

"ভাই, তাড়াতাড়ি নিচে যান।"

"কেন?"

"সেই ম্যাডাম আসছে। আপনাকে যেতে বলছে।"

চলবে...

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া