চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১৪
ইয়াছিন নাইম৭ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়াদুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। নিস্তেজ হয়ে আসা সূর্যের আলো হেলে পড়েছে একপাশে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। ভেজা রাস্তার ওপাশে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে। আয়রার প্রিয় ব্র্যান্ডের গাড়ি; মার্সিডিজ।
আজ সাদা ড্রেস পরেছে আয়রা। কালো গাড়ির সামনে সাদা ড্রেসটাই চোখে পড়ে সবার আগে। তারপর চোখ যায় দূরের টং দোকানে বসা লোকগুলোর ওপর, যারা তীব্র উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আয়রার দিকে। হয়তো গাড়িটাকেও দেখছে। এরকম গাড়ি দেখার সৌভাগ্য হয় না সবার।
মেসের মালিক আনোয়ার মির্জা ছুটে গেছেন আয়রার সামনে। গদোগদো ভঙ্গিতে বলছেন,
"ম্যাডাম আপনি এখানে আসছেন আমি খুব খুশি হইছি। আ... আমি এই মেসের মালিক। মাইসেলফ আনোয়ার। আজান আমার মেসেই থাকে। আসেন না ম্যাডাম। আমার গরিবখানায় পায়ের ধুলা দিলে খুশি হতাম।"
আয়রা সংক্ষেপে জবাব দিলো, "আরেকদিন।"
আনোয়ার মির্জা আর কথা বাড়ানোর সাহস করলেন না। যেভাবে দৌড়ে এসেছিলেন, সেভাবেই চলে গেলেন। আমি রাস্তার এপাশ থেকে সবটা দেখছিলাম। আর আয়রা দেখছিল আমাকে। সে মাঝেমাঝে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, ভয়ে আমার বুকে কাঁপন ধরে যায়। ভয়টা কীসের, তা জানি না। তবে বুক কাঁপে। নিঃশ্বাস ভারী হয়। ঝাপসা লাগে সবকিছু। যেমন এখন লাগছে।
ঝপ করে বৃষ্টি নামলো।
ভেবেছিলাম আয়রা চট করে গাড়িতে আশ্রয় নেবে। কিন্তু আয়রা তো আয়রাই। সবার চেয়ে আলাদা। সে দাঁড়িয়েই রইল, কাঁদামাখা রাস্তায়। একটা লোক দৌড়ে এগিয়ে এল ছাতা নিয়ে। আয়রা ফিরিয়ে দিলো।
আয়রার মুখোমুখি যখন দাঁড়ালাম, ততক্ষণে আয়রা অনেকটা ভিজে গেছে। তখনও সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। একদৃষ্টে, নিষ্পলক।
একটা কী এগিয়ে দিলো আয়রা।
ছোটো শপিং ব্যাগের মতো কিছু একটা। ব্যাগটা দিতে গিয়ে কাঁপছিল তার হাত।
বললাম, "কী এটা?"
"দ্যাখো।"
ব্যাগটা খুললাম। একটা ইনভাইটেশন কার্ড। কনে আয়রা। বর রায়ান।
বুকটা আগে থেকেই কাঁপছিল। এখন সেটার গতি কতগুণ বাড়লো তা আমি জানি না। কিন্তু এখন যদি বৃষ্টি না হত, আর যদি আমি ভেজা না থাকতাম, তবে আয়রা আমার চোখে দুফোঁটা জল দেখতে পেত নিশ্চিত।
বললাম, "বিয়ে করছেন?"
আয়রা মাথা নিচু করল।
"কংগ্রেচুলেশান ম্যাডাম।"
আয়রা ফের আমার দিকে তাকালো। সে এক অদ্ভুত চাহনি। কলিজা ভেদ করে দেয়। বলল,
"এটাই বলার ছিল?"
"আর কী বলব?"
"আরকিছু বলার নেই তোমার?"
"নাহ।"
"ওকে।"
বলে গাড়িতে উঠে বসল আয়রা। আজ সিটবেল্ট লাগালো না। তার আগেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এস্কেলেটরে পা রাখল।
চলে গেল গাড়িটা। একা হয়ে গেলাম আমি। মনে হলো যেন, আমার মতো নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে বুঝি দ্বিতীয়টা নেই। পায়ের তলার মাটি যেন আচমকা বিলীন হয়ে গেছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি শূন্যে। আমার আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
মাহিদ ভাই দৌড়ে এসে আমার মাথার ওপর ছাতা ধরলেন। বললেন,
"আরে ভিজতাছো ক্যান মিয়া? পাগল হইছো নাকি?"
কার্ডটা বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে। সেটা একনজর দেখে নিয়ে হতবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। এমনিতে উনি অনেক কথা বলা লোক। আজ তিনিও বলার মতো কিছু পেলেন না। শুধু একটা হাত রাখলেন আমার কাঁধে।
আলো, ফুল, বেলুন সহ নামিদামি জিনিসে সাজানো কনভেনশন সেন্টার। শয়েশয়ে মানুষ এসেছে। সবার পরনে চোখ ধাধানো পোশাক। বাতাসে বাহারি খাবারের ঘ্রাণ। ক্যামেরা, হুল্লোড়, নাচ। এক ফ্লোরে খাওয়াদাওয়া চলছে। আরেক ফ্লোরে ছবি তোলার হিড়িক পড়েছে।
এক হলঘরে নতুন কনের পোশাকে বসা আয়রা। তার আশেপাশে জনা বিশেক মেয়েরা। সবাই হাসিঠাট্টায় ব্যস্ত। আয়রা পরেছে কালো ড্রেস। সেটাতে বসানো পাথরগুলো হিরার মতো চকচক করছে।
এত হৈ-হুল্লোড় এত আনন্দ উল্লাসের মাঝখানে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে আয়রা। একটিবার মাথা তুলে তাকাচ্ছেও না। তাকালে হয়তো দেখত, তার থেকে ফুট ত্রিশেক দূরে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তাকেই দেখছে একটি অতি সাধারণ ছেলে।
আমার পরনে আজও পাতলা নীল শার্ট। পায়ে সেই পুরনো স্যান্ডেল। বুকের ভেতর কালবৈশাখী ঝড়। কেন জানি হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। মাহিদ ভাই বারবার মানা করেছিলেন এখানে আসতে। কিন্তু আমি না এসে পারিনি। আজকের পর আর কখনো আয়রার সাথে দেখা হবে কি না জানি না। শেষ দেখা দেখে যাই।
গেট দিয়ে যখন বেরিয়ে যাচ্ছি, তখন বরের গাড়ি এসে থেমেছে। ছেলেমেয়েরা লাইন ধরে গেট আটকে দাঁড়িয়েছে। হয়তো গাড়ি থেকে নেমেছে রায়ান। সবাই এমনভাবে তাকে ঘিরে ধরেছে, বরকে একজনর দেখার উপায় নেই। অবশ্য দেখা গেলেও পরিষ্কার দেখতে পেতাম না। কেন জানি না চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বারবার। যতবারই চোখ মুছছি কাজ হচ্ছে না। ফের ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
গেটে পাস নিয়ে দর কষাকষি হচ্ছে। কত টাকা দিলে বরকে ভেতরে যেতে দেওয়া হবে।
আমি এসে নেমেছি রাস্তায়। সন্ধ্যা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। আকাশে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি হবে হয়তো। এখান থেকে মেস অনেকটা দূরে। পায়ে হাঁটলে মাঝরাত হয়ে যাবে পৌঁছাতে। হেঁটেই যাব। আজ ঘরে ফেরার তাড়া নেই। কাল এক স্টুডেন্টের পরীক্ষা। বলেছি আজ পড়ানো সম্ভব না। ছাত্রের বাবা মেসেজ করেছেন, "কাল থেকে আর পড়াতে আসবেন না।"
ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। একটা গাড়ি পিষে গেছে সেটাকে। একজন রিকশাওয়ালা চেঁচামেচি করে গেলেন,
"রাস্তার মাঝখান দিয়া হাঁটতাছেন ক্যান? মরতে হইলে গলায় ফাঁস দিয়া মরেন। রাস্তায় মরলে তো নিজের সাথে আমাগোরেও মারবেন।"
কথাগুলো কানে গেল ঠিকই, কোনো জবাব দিলাম না। মুখে সামান্য হাসি ফুটলো শুধু। রিকশাওয়ালা যেতেযেতে গালি দিয়ে গেলেন,
"শালা পাগল মনেহয়।"
হাঁটতে হাঁটতে কোথায় এসেছি জানি না। একটা বড়ো রাস্তা। গাড়িগুলো সাঁইসাঁই করে ছুটে যাচ্ছে। হেডলাইটের আলোর ঝাপটা এসে পড়ছে চোখে। আবার মিলিয়েও যাচ্ছে।
গাড়ির আসাযাওয়ার শব্দের মাঝেও একজোড়া পায়ের শব্দ কানে আসছে। দুটি পা পেছন থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে এদিকে। শব্দটা ধীরেধীরে বাড়ছে, পা দুটো এগিয়ে আসছে ক্রমশ। একসময় যখন শব্দটা খুব কাছে চলে এল, একটা হাত টের পেলাম আমার কাঁধে।
দাঁড়িয়ে গেলাম।
ঘন নিঃশ্বাস তখনও পড়ছে আমার পিঠে। আর একটা আওয়াজ,
"আজান.."
চমকে ফিরে তাকিয়ে আমার সর্বাঙ্গ কাটা দিয়ে উঠল।
একবার মনে হলো আমি যেন গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গেছি। মরে গিয়ে স্বপ্ন দেখছি।
আবার মনে হলো সবকিছু আমার মনের ভুল।
তা না হলে এটা কীভাবে সম্ভব? আমার সামনে যে স্বয়ং বিয়ের কনে দাঁড়িয়ে!
"আজান তাড়াতাড়ি চলো।"
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল আয়রা।
"আপনি এখানে? এখানে কী করছেন?"
"এত কথা বলার সময় নেই। ওরা আমাকে খুঁজছে। তাড়াতাড়ি চলো।"
"কোথায়?"
আয়রা দম নিলো। গভীরভাবে তাকালো আমার দিকে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
"কাজি অফিসে।"
আর তখনি কয়েকটা গাড়ি ছুটে এল এদিকে। গাড়িগুলো ফুল দিয়ে সাজানো। সামনের গাড়িটা ঠিক সেই জায়গায় থামলো, যেখানে আমি আর আয়রা দাঁড়িয়ে ছিলাম।
গাড়ি থেকে নেমে আসে রায়ান। পরনে বরের পোশাক। চোখে মুখে রাগ-ঘৃণা দলা পাকিয়ে উঠছে। তার এক হাতে পিস্তল।
আমি আর আয়রা লুকিয়ে আছি দূরে ডাস্টবিনের আড়ালে। রায়ান রাস্তা থেকে একটা ঝুমকা তুলে নিলো। আয়রা খেয়াল করল তার এক কানের ঝুমকা নেই।
রায়ান ঝুমকাটা ভালোভাবে দেখছে। গাড়ির আলো পড়ে সেটার হিরাগুলো চকচক করছে। রায়ান বর্জ্রকণ্ঠে বলে,
"আয়রা এদিকেই গেছে। তোমরা ওই রাস্তায় যাও। আমি এদিকে যাচ্ছি। ওর সাথে নিশ্চিত ওই ফকিন্নির বাচ্চা থাকবে। ওদেরকে পেলে ছেলেটাকে মেরে আয়রাকে তুলে আনবে।"
কয়েকজন লোক দুটো গাড়ি নিয়ে একদিকে গেল। রায়ান আরেক দিকে।
আমরা এখনও ডাস্টবিনের আড়ালে বসা। আয়রা পিটপিট করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। তার একটি হাত আমার হাতে ধরা। আর তার চোখ, তার দুটি চোখে বিন্দুমাত্র ভয় নেই। যা আছে, তাকে কী বলে আমি জানি না।
আয়রা আবারো ফিসফিস করে বলল, "চলো।"
"কোথায়?"
আয়রা লাজুক হাসলো। আমার হাতটা আরো শক্ত করে ধরল। দম নিয়ে বলল,
"কাজি অফিসে।"
"কিন্তু তাতে আপনার কলঙ্ক হবে। আপনি আকাশের চাঁদ। আর আমি..."
"কলঙ্ক আছে বলেই চাঁদ এত সুন্দর।"
"তা হয় না ম্যাডাম।"
"কেন হবে না? চাঁদ যদি স্বেচ্ছায় কলঙ্কিত হতে চায়, তাতে তোমার আপত্তি কেন?"
"কিন্তু..."
"চলো।"
বলে আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো আয়রা। আমরা হাতে হাত ধরে মূল সড়কে এসেছি।
আর তখনি সামনে এসে দাঁড়ালো রায়ান।
তার হাতে একটা কালো রঙের পিস্তল।
(সমাপ্ত)