চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১১
ইয়াছিন নাইম৫ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়ারায়ানের কল দেখে বিচলিত হয়ে পড়ে আয়রা।
তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পুরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কলটা যখন আপনাআপনি কেটে যায় তখনও কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর আচমকা বোতল উলটে মুখের সাথে লাগিয়ে নেয়।
"আরেআরে কী করছেন! এত খাবেন না।"
"সরো! তুমি আমাকে বাধা দেওয়ার কে?" বলে কিছুটা পেছনে সরে যায় আয়রা। ঠিকই তো, সে নিজের টাকায় মদ খাচ্ছে। তাকে বাধা দেওয়ার আমি কে? দমে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি।
আয়রা বোতলের বাকি অংশটুকু একটানে শেষ করে। তারপর বড়ো নিঃশ্বাস ছেড়ে তাকায় আমার দিকে। ইতোমধ্যে তার চোখ অনেকটা লাল হয়ে গেছে। কিছুটা ঢুলতেও শুরু করেছে।
টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলে একটা মেসেজ এসে ঢুকে। আয়রা অবহেলার ভঙ্গিতে তাকায় সেটার দিকে৷ তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সে পড়ে যাবে। কিন্তু আমি কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আয়রা একেবারে ক্ষীণ আওয়াজে বলে,
"ধরো আমাকে প্লিজ।"
আয়রাকে হাঁটিয়ে আনার মতো অবস্থা ছিল না। বারবার পড়ে যাচ্ছিল। তাই কোলে তুলতেই হলো। সে আমার গলা জড়িয়ে বলল,
"উমম, থ্যাঙ্কিউ।"
"থ্যাঙ্কিউ কেন?"
আয়রা কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তবুও কতকটা চেয়ে, কতকটা চোখ বন্ধ করে ঘোরলাগা কণ্ঠে বলে, "আবারো আমাকে সামলে নেবার জন্য।"
আস্ত একটা মেয়েমানুষকে শূন্যে তুলে একঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়া সহজ কথা নয়। আমার বেশ কষ্টই হচ্ছিল বলতে হয়। অন্যদিকে আয়রাকে দেখে মনে হলো সে খুব মজা নিচ্ছে। হাসছে মিটিমিটি। আর বারবার আমার মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে বিড়বিড় করে বলছে,
"আজান... অ্যাইইইইই! কিডন্যাপ করো না আমাকে। আমি এমনি তোমার কাছে যাবো তো..."
"চুপ! একদম চুপ!" বিরক্ত গলায় ধমক দেই। আয়রা কেঁপে উঠে নিজের ঠোঁটে আঙুল দেয়। অতি কষ্টে আয়রাকে নিয়ে এ-ঘর ও-ঘর করতে থাকি। কিন্তু কোন ঘরে যে তাকে রাখব সেটা বুঝে উঠতে পারি না।
"আপনার ঘর কোনটা?"
আয়রা প্রশ্ন শুনে তাকানোর চেষ্টা করে। তারপর বিড়বিড় করে,
"উমমমমম... আমার ঘর... তুমি আমাকে কিডন্যাপ করো না প্লিজ..."
"আরে মাতলামি না করে ঘর কোনটা বলুন।"
আয়রা পাত্তা না দিয়ে আমার বুকের সাথে ঠোঁট লাগিয়ে ফুঁ দিতে থাকে। বুঝলাম এই মেয়েকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। সুতরাং মাস্টার বেডরুম দেখে সেটার বিছানায় তাকে শুইয়ে দেই। আয়রা তখনও আমার গলা দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। আস্তে করে ছাড়িয়ে নিতে যাব কিন্তু আয়রা ছাড়ে না। বিড়বিড় করে বলে,
"শুনো না!"
"কী?"
"তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাই না?"
আমি জবাব না দিয়ে চলে আসার চেষ্টা করি। মাতালের সাথে মাতলামি করার ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু আয়রা ফের বিড়বিড় করে,
"বাসো কিনা বলো?"
চাদর দিয়ে তার বুক পর্যন্ত ঢেকে দেই।
যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলাম তখনও আয়রা কীসব যেন বিড়বিড় করছে। আমি বসার ঘরে আসতেই ফজরের আজান শোনা যায়।
ঘুম ভাঙতেই নিজেকে সোফার উপর আবিষ্কার করি। আমার শরীর পাতলা চাদর দিয়ে ঢাকা। আমি তো ঘুমানোর সময় চাদর গায়ে দেইনি। তবে কি আয়রা...
উঠে বসতেই দেয়াল ঘড়িতে চোখ পড়ে। পৌনে দশটা বাজে। টেবিলের উপর একটা সাদা কাগজে লেখা,
"তোমাকে তালা মেরে যাচ্ছি এজন্য দুঃখিত।"
লেখাটুকু পড়েই দৌড়ে মূল দরজার দিকে যাই। আর তখনি আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। দরজা সত্যিসত্যি বাইরে থেকে লক করা। অনেক ধাক্কাধাক্কি আর চেঁচামেচির পর যখন আমার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে এল, তখন হাল ছেড়ে মেঝেতে বসে পড়লাম। মেয়েটা কত খারাপ ভাবুন। সারারাত আমাকে আটকে রেখেই ক্ষান্ত হয়নি, এখন আবার তালা মেরে রেখে গেছে। এই মেয়ে আমাকে আর কত শাস্তি দিবে কে জানে!
এখন এই বদ্ধ ঘরে কী করি আমি?
খিদার জ্বালায় পেট জ্বলছিল। আগে ফ্রিজ থেকে কিছু ফল বের করে খাওয়া হলো। তারপর খেয়াল হলো আমার কাপড় থেকে দুর্গন্ধ আসছে। শুধু কাপড় নয়, শরীর থেকেও মদের বিশ্রী গন্ধ আসছে। গোসল করে নিতে হবে।
এখানে কাপড়ের অভাব নেই। বেশ কয়েকটা ওয়ারড্রোব খোলাই পাওয়া গেল। সেখানে বাহারি পোশাকের স্তুপ। কিন্তু সমস্যা হলো সবগুলো মেয়েমানুষের পোশাক। আমি পরার মতো একটাও নেই। শেষে একটা ভালো দেখে গোল গলার ফ্রক তুলে নিয়ে গোসলখানায় গেলাম।
বিকেল তিনটার দিকে দরজায় আওয়াজ পেলাম। সঙ্গেসঙ্গে গিয়ে আইহোলে চোখ রেখে দেখি আয়রা দাঁড়িয়ে। মুক্তি পেতে যাচ্ছি এই আনন্দে আমি ভুলেই গেলাম যে, আমার পরনে আয়রার ফ্রক।
আয়রা দরজা খুলতেই ইচ্ছেমতো বকে দিলাম,
"কী ভেবেছেন আপনি? টাকা আর ক্ষমতা আছে বলে যা খুশি তাই করবেন? একটা মানুষকে এভাবে বন্দি করে রেখে যাওয়ার কোনো মানে হয়? যদি দমবন্ধ হয়ে মারা যেতাম?"
আয়রা কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না। উল্টো আমাকে দেখে মুখে হাত দিয়ে হো হো করে হাসতে শুরু করল। বললাম, "হাসছেন কেন? আমি হাসির কথা বলেছি?"
"তা বলোনি তবে এই ফ্রকে তোমাকে সেই লাগছে।"
লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করল। দুইহাতে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করলাম। আয়রা আরো জোরে হাসতে শুরু করল। আমি দৌড় দিতেই যাব তখন বলল,
"থাক থাক, এটাতেই ভালো লাগছে।"
"আমার কী দোষ? আপনার এখানে তো কোনো পুরুষের কাপড় নেই।"
"তাই বলে ফ্রক পরে নিবে?"
বলে অনেক্ষণ হাসলো আয়রা। দরজা বন্ধ করে ভেতরে এসে বলল,
"ভালোই করেছ। আমরা মেয়েরা জিন্স, শার্ট পরতে পারলে তোমরা কেন ফ্রক পরতে পারবে না?"
বলে আবারো ফিক করে হেসে ফেলল।
"কারোর দুরবস্থা দেখে হাসতে নেই।"
"না হেসেও তো পারছি না। এই অবস্থায় তোমাকে যা লাগছে না... একটু মেকাপ করে মেয়ে বলে চালিয়ে দিতে পারব।"
বলতে বলতে দুটো খাবারের প্যাকেট এগিয়ে দিলো।
"ধরো, ভালো খাবার এনেছি তোমার জন্য।"
"ভাত এনেছেন?"
"ভাত?" বলে কপাল কুঁচকে তাকালো আমার দিকে।
"হ্যাঁ, কাল রাত থেকে ভাত খেতে পাইনি। আমি ভাত ছাড়া থাকতে পারি না।"
"ভাত তো আনিনি।"
"তাহলে এসব খাব না। আমি ভাত খাব। চলে যাচ্ছি।"
"আরে দাঁড়াও বাইরে যেও না।"
"অবশ্যই যাব।"
"না তুমি যাবে না।"
"আমি যাব।"
বলে এক পা এগোতেই আয়রা চট করে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। শক্ত করে আমার কলার চেপে ধরল। তার দৃষ্টি আমার চোখ বরাবর। রাগে ফর্সা গাল লালবর্ণ হতে শুরু করেছে। আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলাম। আয়রা আরো জোরে চেপে ধরে বলল,
"আমার কথার অবাধ্য হলে তোমার কপালে দুঃখ আছে।"
"আপনি কী চান বলুন তো?"
"আমি চাই তুমি একটা কোথাও লুকিয়ে পড়ো।"
"কোথায়?"
"এখানে..."
বলতে বলতে আয়রা আমাকে টেনে নিয়ে সোফার পেছনে আড়াল করে দিলো। তার এই কাণ্ডকারখানার কারণ আমি বুঝে উঠতে পারছি না। শুধু অবাক হয়ে সোফার আড়ালে বসে আছি। আয়রা আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল,
"যেভাবে আছো সেভাবেই বসে থাকবে। নড়চড় যেন না হয়।"
তারপর মূল দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আর ঠিক তখনি দরজার ওপাশ থেকে একটা ছায়া এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ছায়াটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসতে থাকে। আর আমি সোফার আড়াল থেকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে চেয়ে থাকি।
চলবে...