মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫
ইয়াছিন নাইম১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়াআমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো।
কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিলাম। ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে দৃশ্যটা।
নূর ইসলাম ভাইর মুখে তৃপ্তির হাসি। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আর কয়েক পা এগোলেই আমাকে দেখে ফেলবে। তারপর?
নূর ইসলাম ভাই যখন একেবারে আমার কাছে চলে এসেছে, তখন ভেসে আসে শব্দটা। অসংখ্য পায়ের একসঙ্গে এগিয়ে আসার শব্দ। মনে হলো পাগুলো ঘূর্ণিঝড়ের মতো পাক খাচ্ছে ঘরের চারপাশে। খেয়াল করলাম নূর ইসলাম ভাই থেমে গেছে।
আব্বা দোকান খোলার পর প্রথমেই বললেন,
"আজ এত দেরি করলেন যে?"
"একটা দুঃসংবাদ আছে।"
"ইয়া আল্লাহ। আবার কী হলো?"
ফ্যাচফ্যাচ করে কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। কিছুক্ষণ সবকিছু নীবর। হৃদপিণ্ডের শব্দ অবধি শোনা যায়। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে কান খাড়া করে রইলাম। বেড়ার ওপাশে লোহার মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছে নূর ইসলাম ভাই।
দোকান থেকে উনাদের একজন বলে উঠলেন,
"আমার বড়ো ছেলেকে পাওয়া গেছে ভাইজান।"
"এটা তো খুশির খবর। আপনি কাঁদছেন কেন?"
"খুশি না ভাইজান। খুশির খবর না।"
"কী বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।"
"আমার ছেলের লাশ পাওয়া গেছে ভাইজান। তাকে খুন করা হয়েছে।"
"ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।"
"আপনি আমাদের সাথে চলুন ভাইজান। ছেলেটাকে দাফন করতে হবে।"
আমি আর আব্বা যখন উনাদের সাথে পৌঁছেছি, তখন প্রায় শেষরাত। একদিকে লাশের পাশে অসংখ্য পুরুষ। সবার পরনে সাদা পোশাক। সবাই তুলনামূলক অনেক লম্বা। আর সবার শরীরে সেই মিষ্টি গন্ধ।
অন্য পাশে বসা সাদা পোশাক পরিহিত মুখ ঢাকা নারীরা। তাঁদের মাঝখানে যিনি বসে আছেন, তাঁকে হাউমাউ করে বলতে শোনা গেল,
"আমার নূর... আমার নূরকে মেরে ফেলল! হায় আল্লাহ, আপনি আমার দুটো সন্তানকেই কেড়ে নিলেন! নূর... আমার বাচ্চা..."
জানাজা শেষে নূরের বাবা অদ্ভুত একটা কথা বললেন। তখন আমি আব্বার পাশে দাঁড়িয়ে। আব্বাকে বললেন,
"আমার ছেলেকে কে মেরেছে ভাইজান?"
দেখলাম আব্বার চোখদুটো কৌতূহলে সরু হয়ে গিয়েছে। আস্তে করে আমার হাতটা ধরলেন। টের পেলাম আব্বার গলা কাঁপছে। কথা বলতে চেয়েও পারছেন না।
উনি আবার বললেন,
"চুপ করে আছেন কেন? বলুন!"
আব্বা আমাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। দুই পা পিছিয়ে বললেন,
"আমি কীভাবে জানব?"
"আপনি তো জানার কথা।"
"আল্লাহর কসম আমি কিচ্ছু জানি না। আমি তো আপনার ছেলেকে কখনো দেখিইনি।"
তারপর নূরের বাবা এত জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, এমন মেঘের গর্জনের মতো আওয়াজ আমি জীবনে শুনিনি। বললেন,
"তাহলে আপনার পুকুরে আমার ছেলের লাশ কীভাবে গেল?"
"আমার পুকুরে?"
"হ্যাঁ, আপনার পুকুরে। পুকুরের তলায় আমার ছেলেকে পুঁতে রাখা হয়েছিল।"
আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। এর আগে কোনোদিন আব্বাকে এত ভয় পেতে দেখিনি।
পেছন থেকে একজন বলে ওঠেন,
"এটা ঘৌলের কাজ।"
সবাই তাঁর দিতে তাকালো৷ তারপর তিনি যা বললেন, এরকম কথা হয়তো আব্বাও কোনোদিন শুনেননি। তার কথাগুলো এমন,
ঘৌল জিন জাতির মধ্যে অন্যতম ভয়ঙ্কর একটি প্রজাতি। ঘৌল চেনার উপায় হলো এদের পা অনেকটা গাধার মতো হয়। এরা কবরস্থান অথবা পরিত্যক্ত জায়গায় থাকে। এবং এরা মানুষের রক্ত, মাংস খায়। ধারণা করলেন নূর যেখানে গিয়েছিল সেখানকার কোনো মানুষের ওপর নজর দিয়েছিল সেই ঘৌল। আর সম্ভবত নূর বাধা দিতে গেলে ঘৌল তাকে খতম করে পুকুরের নিজে পুঁতে দিয়েছিল।
নূরের বাবা বলে ওঠেন,
"কিন্তু এটা যে ঘৌলের কাজ..."
হাত তুলে থামতে ইশারা করে বললেন,
"এর আগেও ঘৌলের হাতে মারা পড়া একজনকে দেখেছিলাম। তাকেও ঠিক এই ভাবেই পানির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল।"
আব্বা আর আমি যখন বাড়িতে পৌঁছেছি, তখন চারপাশে ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। আম্মা অপেক্ষা করছিলেন। আমাদেরকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
"কী হলো?"
আব্বা ধপ করে বিছানায় বসে পড়লেন। মাথা নিচু করে বললেন,
"আমাদের পুকুরে কিছু একটা আছে।"
বড়ো হুজুর আমার কথা শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। আমি তাকে জানালাম নূর ইসলাম ভাই শুধু গোবর খায় না। আরো কিছু ব্যাপার খেয়াল করেছি।
হুজুরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমাকে কাছে টেন বললেন,
"কী ব্যাপার? আমাকে খুলে বলো।"
বললাম সবটা। শুনতে শুনতে হুজুরের মুখ শুকিয়ে গেল। তাঁকে জানালাম প্রথম প্রথম নূর ইসলাম ভাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। এবং তার শরীর থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ আসত। কিন্তু যেদিন থেকে গোরুর গোবর চুরি যেতে শুরু করেছে, সেদিন থেকে নূর ইসলাম ভাই নামাজ পড়ে না।
নামাজের সময় হলেই নানান বাহানা করতে থাকে। এখন আর তার শরীর থেকে মিষ্টি গন্ধটাও পাওয়া যায় না। এটাও বললাম যে, অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেলে তার শরীর লম্বা হতে দেখি।
হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
"তুমি আউযুবিল্লার অর্থ জানো?"
"বললাম হ্যাঁ, আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম অর্থ আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।"
শিখিয়ে দিলেন যেন অস্বাভাবিক কিছু মনে হলেই সেটা পড়ি। সন্ধ্যায় এবং রাতে ঘুমানোর আগে চার কুল পড়ি। হুজুরকে জানালাম এগুলো আমি আগে থেকেই পড়ি। ছোটোবেলায় আম্মা শিখিয়েছিলেন।
সেই রাতে ঘুম আসছিল না।
নূর ইসলাম ভাইর পাশে শুয়ে আছি। দেখি তার চোখও খোলা। একটা কথা ভেবে হাসি পেয়ে গেল। বললাম,
"ভাই তুমি জানো, সেদিন যখন উনারা আমাকে আর আব্বাকে নিয়ে গেল তখন কত মজার মজার কথা বলেছে। মনে হয় কোনো গল্পের বই থেকে পড়েছে। কী বলেছে শুনবে?"
নূর ইসলাম ভাই কৌতূহলী ভঙ্গিতে তাকালো। বললাম,
"বলেছে ঘৌল না কী একটা জানি আছে। ওইটার পা নাকি গাধার পায়ের মতো থাকে। আরে তোমার পা-ও তো মাঝেমাঝে গাধার পায়ের মতো হয়ে যায়। তাহলে কি তুমি ঘৌল? হাহাহাহা!"
তখনও নূর ইসলাম ভাইর পা দুটো লম্বা হয়ে মশারির বাইরে বেরিয়ে আছে। এবং সেগুলো দেখতে হুবহু গাধার পায়ের মতো দেখাচ্ছে।
চলবে।