মিষ্টির দোকান — পর্ব ৪
ইয়াছিন নাইম৬ আগস্ট ২০১৫৪ মিনিট পড়ামৃত মানুষকে স্বপ্নে দেখলে কী হয়?
আমি দেখিনি কোনোদিন। কিন্তু এক রাতে...
ঘুমের মাঝে দেখি দাদা আমাকে ডাকছেন। তাঁর অস্পষ্ট মুখটা দেখে মনে হলো খুব চিন্তায় আছেন। আমাকে বললেন,
"দাদাভাই, তুমি একটু সাবধানে থাইকো। আল্লাহ তোমারে রক্ষা করবেন।"
ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখি দাদা নেই। আমার পাশে শুয়ে আছে নূর ইসলাম।
এখন আমি আব্বা-আম্মার সাথে ঘুমাই না।
উনারা থাকেন দোকানের পাশের ঘরে। আমি আর নূর ইসলাম থাকি অন্য ঘরে। আম্মা বলেছেন আমরা এখন দুই ভাই।
নূর ইসলামও আমাকে ছোটোভাই হিসেবে মেনে নিয়েছে। একটা মিষ্টি পেলে দুই ভাগ করে। একটি অংশ দেয় আমাকে। বাকি অর্ধেকটা পাঞ্জাবির পকেটে ভরে রাখে। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে,
"দিনে মিষ্টি খেয়ে অভ্যেস নেই।"
রাত যখন হয়, পকেট থেকে বের করে মুখে দেয়। তখন তার চেহারায় অদ্ভুত প্রশান্তি দেখা যায়।
এখন আমরা এক বিছানায় ঘুমাই। মাঝেমাঝে ঘুম ভেঙে গেলে একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে পাই।
এমনিতে নূর ইসলাম ভাই আমার থেকে সামান্য কিছুটা লম্বা। কিন্তু মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি তার শরীর অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গেছে। এতটাই লম্বা, পা দুটো মশারির বাইরে চলে যায়। এবং তার শরীর থেকে সামান্য হলদেটে আলো বেরোতে থাকে।
একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, "ভাই, তুমি রাতে লম্বা হয়ে যাও কীভাবে?"
কোনো জবাব পাইনি। শুধু বলেছিল এসব কথা যেন আর কাউকে না বলি। এমনকী আম্মাকেও না। যদি বলি, তাহলে সে রাগ করে বাড়ি থেকে চলে যাবে।
ইদানীং আবার মিষ্টির ব্যবসা ভালো চলছে। প্রায় প্রতি রাতেই উনারা দল বেঁধে আসেন। ঘুমের মধ্যে অসংখ্য পায়ে চলার শব্দ ভেসে আসে। মিষ্টি গন্ধটা এই ঘর থেকেও পাওয়া যায়। মাঝেমাঝে আব্বা জিজ্ঞেস করেন,
"আপনার ছেলেকে পেয়েছেন?"
"না ভাইজান। আমরা খুব চিন্তায় আছি। যদি সে কোনো ভুল পথে পা বাড়ায়, তাহলে আল্লাহর কাছে কী জবাব দেব?"
"চিন্তা করবেন না। আমার বিশ্বাস আপনার সন্তানও আপনার মতোই মুমেন।"
"আপনি হয়তো জানেন না, আমাদেরকেও শয়তান ধোঁকা দিতে চেষ্টা করে।"
আমি শুয়েশুয়ে সব কথা শুনি। নূর ইসলাম ভাইর দিকে চোখ পড়তেই দেখি তার পাগুলো লম্বা হয়ে বিছানার বাইরে চলে গেছে।
কিছুদিন ধরে নতুন একটা ব্যাপার ঘটছে।
আমাদের কয়েকটি গোরু আছে। প্রতিদিন সকালে আব্বা ঘুম থেকে উঠে গোয়ালঘরে যান। হাতে থাকে বেলচা, বালতি, শলার ঝাড়ু।
প্রথমে গোবর পরিষ্কার করেন। তারপর গোরুর দুধ নেন বালতিতে। সেই দুধের ছানা দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু রসগোল্লা, সন্দেশ, মালাই চপ। তবে আজকাল গোবর তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও অল্প। টানা তিন চারদিন যখন গোবর কম পাওয়া যেতে লাগলো, তখন আব্বা বিচলিত হয়ে পড়লেন।
পাশের গ্রাম থেকে পশুর ডাক্তার এলেন সাইকেলে করে।
পরীক্ষা নীরিক্ষা করে জানালেন কোনোরকম সমস্যা তিনি ধরতে পারছেন না। সব স্বাভাবিকই আছে।
তাহলে গোবর যাচ্ছে কোথায়?
ডাক্তার বললেন হয়তো কেউ নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আব্বা মানতে নারাজ।
এত জিনিস থাকতে কেউ গোবর চুরি করবে! তাও সন্ধ্যার পর যে বাড়ির আশেপাশে কেউ ভয়ে আসতে চায় না, সেই বাড়িতে রাতের অন্ধকারে গোবর চুরি করতে আসবে?
ব্যাপারটা কিছুতেই হজম হচ্ছিল না। আম্মা বললেন ভালোই হয়েছে। পরিষ্কার করার ঝামেলা কিছু কম হলো। সুতরাং আব্বাও আর মাথা ঘামালেন না।
এখন আর মাদ্রাসায় একা যেতে হয় না।
নূর ইসলাম ভাইও আমাদের মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগে পড়ে। এখন সে সবার সাথে মিশে। হুজুররাও তাকে বাকি ছাত্রদের মতোই পড়ান। শুধু বড়ো হুজুর কেমন যেন অস্থির হয়ে যান তাকে দেখলে।
খেয়াল করেছি নূর ইসলাম ভাইও বড়ো হুজুরের সামনে পড়তে চায় না। ভুলে মুখোমুখি হয়ে গেলে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। বড়ো হুজুর তখন বিড়বিড় করে কীসব দোয়া পড়তে থাকেন। একবার আমাকে একা ডেকে অনেক্ষণ দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন। বললেন,
"ইয়া আল্লাহ, তুমি ভালো মন্দের পার্থক্য বুঝো। আমাদের সবাইকে শয়তান, বদ জিনের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজতে রেখ।"
তারপর হুজুর আমাকে একটা প্রশ্ন করলেন। এমন প্রশ্ন হয়তো কেউ কোনোদিন শুনেনি।
হুজুর বললেন,
"তোমাকে একটা প্রশ্ন করি। ঠাণ্ড মাথায় উত্তর দিবে। আর আমি যে তোমাকে এটা জিজ্ঞেস করেছি সেটা কাউকে বলবে না। ঠিক আছে?"
আমি মাথা নাড়লাম। হুজুর ঘরের দরজার দিকে উঁকি দিয়ে তাকালেন। বললেন,
"আগে দরজাটা বন্ধ করে এসো।"
আমি তা-ই করলাম। আমাকে কাছে বসিয়ে বললেন,
"নূর ইসলাম সারাদিন তোমার সাথে থাকে?"
বললাম, "জি হুজুর।"
"আমি এখন যে প্রশ্ন করব সেটা আমার জানা দরকার। যদি জানো তাহলে বলবে। না জানলে বলতে হবে না। ঠিক আছে?"
"জি হুজুর।"
"তুমি কি কখনো নূর ইসলামকে পশুর গোবর খেতে দেখেছ?"
প্রশ্ন শুনে আমার খুব হাসি পেল। বললাম,
"কী বলেন হুজুর! মানুষ আবার গোবর খায় নাকি? হাহাহাহাহা!"
হুজুর চুপ করে বসে রইলেন। বাড়িতে ফেরার পথে একা ডেকে বললেন,
"যদি কখনো নূর ইসলামকে গোবর খেতে দেখ তাহলে সঙ্গেসঙ্গে আমাকে জানাবে। আর এই কথা যেন আর কেউ না জানে।"
বাসায় ফেরার পথে ব্যাপারটা মাথায় আসলো।
আমাদের গোয়ালঘর থেকে গোবর চুরি হচ্ছে এটা হয়তো বড়ো হুজুর শুনেছেন। তাই নূর ইসলাম ভাইকে সন্দেহ করছেন।
এতদিন বড়ো হুজুরকে কত বুদ্ধিমান ভাবতাম। এখন বুঝতে পারছি তিনি কত বোকা। মানুষ কখনো গোবর খায়? এমন বোকার মতো কথা হুজুর ভাবলেন কী করে?
রাত তখন কয়টা বাজে খেয়াল নেই।
হঠাৎ কী একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখি নূর ইসলাম ভাই নেই। পাশের গোয়াল ঘর থেকে কেমন যেন চপচপ শব্দ হচ্ছে।
গোয়াল ঘরটা আমার ঘরের সাথেই লাগানো। ভেতরের দরজা দিয়ে যাওয়া যায়। আমি ধীর পায়ে বিছানা থেকে নামলাম।
এত রাতে নূর ইসলাম ভাই কোথায় গেল? ভেবে পাচ্ছিলাম না। সে কি টয়লেটে গেছে? টয়লেট তো ঘর থেকে অনেকটা দূরে। একা এত রাতে টয়লেটে যেতে তার কি ভয় করে না?
গোয়াল ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার চোখ স্থির হয়ে গেল।
উল্টো দিকে মুখ করে একজন বসা। চেহারা দেখা না গেলেও পিঠ দেখে মানুষটাকে চিনতে ভুল হলো না। অল্প আলোয় যতদূর বুঝলাম, সে আমার নূর ইসলাম ভাই। তার সামনে একগাদা গোবর।
উঁবু হয়ে বসে কাঁচা গোবর দুই হাত দিয়ে তুলছে আর মুখে দিচ্ছে। নরম গোবর মুখে লেগে শব্দ হচ্ছে চপচপ করে। আমি নিজের অজান্তেই চোখের পাতা বন্ধ করে ফেললাম। মনে হলো আমার হাত-পা শক্ত হয়ে মাটির সাথে আটকে আছে।
তবে কি বড়ো হুজুর ঠিক বলেছিলেন?
চলবে।