দি অ্যানিমেল — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম৩ আগস্ট ২০১৪৩ মিনিট পড়াসেন্ট্রির দুর্ব্যবহারে আমি ভেবেছিলাম অবস্থা খুব গরম হবে। হয়তো আমাকে খুব বাজেভাবে হেনস্তা করা হবে। মারধরও হতে পারত। কিন্তু আসল ঘটনা তা নয়। বরঞ্চ পরিবেশ খুব ঠান্ডা এবং থমথমে। জেলার আসলাম আমাকে দেখেই চেয়ার এগিয়ে দিলেন। আমার কাঁধে হাত দিয়ে চেয়ারে বসিয়ে নিচু আওয়াজে বললেন, "নাম কী তোর?"
যদিও তিনি আমার নাম জানেন তার পরও কী কারণে আবার জিজ্ঞেস করেছেন তা আমি আর জানতে চাইনি। এমনিতেই তাঁর আচরণে আমি হতবাক হয়ে আছি। সুতরাং সহজ ভাষায় নিজের নাম বললাম। তিনি মিয়নো গলায় জানালেন, "রাফিন? সুন্দর নাম। তুই দেখতেও খুব ভালো। আচরণও অন্যদের থেকে আলাদা। গুড বয়।" তারপর অন্যমনস্ক হয়ে প্রশ্ন করলেন, "খিদে আছে? কিছু খাবি?"
আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে, আমাকে এতটা অবাক করে দিয়ে কী বোঝাতে চাচ্ছে ওঁরা? জেলার কখনো এমন হয়? নিজের চেয়ারে আসামিকে বসায়? এভাবে নিজের সন্তানের মতো করে খাবার খাবে কি না জিজ্ঞেস করে? অবশ্যই না। তাহলে এখন হচ্ছেটা কী? কেন এরা এতটা অন্যরকম আরচণ করছে?
যাকগে, একটু আগে বনরুটি আর কলা খেয়েছি বলেই ডানে বাঁয়ে মাথা নেড়ে জানালাম কিছু খাব না। কিন্তু জেলার মানতে নারাজ। বললেন, "তোর ইচ্ছেমতো খাবার খাওয়ানোর সাধ্য আমাদের নেই। তবুও ইচ্ছে পূরণ করার সাধ্যমতো চেষ্টা করব। বল কী খাবি? আপেল খাবি? আমার এখানে অনেকগুলো আপেল আছে। আজই এখানে এসেছে। একদম তাজা। খাবি তুই?"
আপেলের প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। তবুও "কী খাবি?" প্রশ্ন শুনেই চোখের সামনে একথালা ভাত ভাসছে। বহুদিন ভাত খাই না। সামান্য ভাত, আলুভর্তা, ডাল আর কাঁচা মরিচ পেলে একেবারে কনুই ডুবিয়ে খেতাম। সত্যিই আমার খুব ভাতের লোভ হতে লাগল। আমি বলেও ফেললাম, "ভাত পাওয়া যাবে?"
জেলার সহ সকলেই ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন আমার দিকে। সেন্ট্রি বলল, "ভাই রে, আমরাও অনেকদিন ভাত খেতে পাই না। তোমাদের মতো বেঁচে যাওয়া বনরুটি আর ফলমুল খেয়ে বেঁচে আছি।"
কথার মানেটা ধরতে পারি তার আগেই জেলার আমার হাতে দু'টো আপেল ধরিয়ে দিলেন৷ সেগুলো খেয়ে ফেললে আমাকে এগিয়ে দিলেন। আমাদের সঙ্গে সেন্ট্রিরাও এসেছে। ওদের কারো চোখে-মুখে আতঙ্ক, কারো চেহারায় ভয়। কেউ আবার দু'পা এগোয় তো এক পা পিছিয়ে যায় এমন।
মূল সড়কে উঠে এসে জেলার আমার হাত ধরলেন। কিছু বুঝে উঠার আগেই ব্লেড দিয়ে আমার হাতে টান দিতেই আমি আর্তনাদ করে কাটা অংশ চেপে ধরতে যাব তখন বললেন, "সামান্য কেটেছে। সেরে যাবে। তুই যা। আজ থেকে তোর ছুটি।"
আমি বললাম, "কিন্তু স্যার, আমি যাবজ্জীবন জেল খাটার কথা।"
"ব্যাপার না। তুই যা।" শ্বাস ছেড়ে বললেন, "তোর কপালটা খুব খারাপ। এক বছর আগে মিথ্যা মামলায় জেলে ঢুকেছিলি। অকারণে এতদিন শাস্তি ভোগ করেছিস। এখন আবার... তোর কপালটা সত্যিই খুব খারাপ। যাহ্, চলে যা। সোজা হাঁটা দিবি। পেছনে কোনো শব্দ পেলে ফিরে তাকাবি না। সোজা হেঁটে চলে যাবি।"
এই মুহূর্তে প্রায় ছ' ফুট উঁচু দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি জেলার কেন আমার হাত কেটেছিলেন। যাতে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা চতুষ্পদ প্রাণীটা রক্তের গন্ধ শুঁকে সহজেই আমাকে খুঁজে বের করে নিতে পারে। তাহলে এটা কি কোনো মাংসাশী প্রাণী? এই প্রাণীর ভয়েই কি সবাই শহর ছেড়েছে? এটার ভয়েই কি সবাই বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে? তাহলে কি এতদিন জেলখানার আসামিরা এই প্রাণীর খাদ্য হচ্ছিল? না কি অন্য কোনো রহস্য? কিন্তু আমি যে স্পষ্ট টের পাচ্ছি, আমার পেছনে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। সেটার গলা দিয়ে গড়গড় গড়গড় শব্দ হচ্ছে। শব্দটা এতই তীক্ষ্ণ যে আমার কানে হাত দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু নড়লেই যদি প্রাণীটা হামলা করে বসে, এই ভেবে নড়ছি না। শক্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছি। পেছনের প্রাণীটা স্লথ গতিতে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। একটা বিশাল ছায়া পড়েছে দেয়ালের উপর। সেই ছায়াটা একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে। একটু একটু করে বাড়ছে। তাহলে কি এখানেই আমার জীবনের ইতি ঘটবে? কে জানে!
চলবে
মো. ইয়াছিন
[প্রিয় পাঠক, আমার দু'টো বই এখন রকমারিতে এভেইলেবল৷ আপনারা চাইলে সেখান থেকে আমার বই সংগ্রহ করতে পারেন। কিংবা আদর্শ প্রকাশনীর পেজ থেকেও বইদু'টো সংগ্রহ করা যেতে পারে। সবার জন্য শুভকামনা।]
গত পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/100054727422264/posts/496867635480813/?app=fbl