দি অ্যানিমেলঅতিপ্রাকৃত

দি অ্যানিমেল — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম২ আগস্ট ২০১৪৩ মিনিট পড়া

দীর্ঘ একটি বছর জেলখানায় বন্দিদশায় জীবন কাটিয়েছি আমি। সেই এক বছরের মধ্যেই কিছু একটা হয়েছে। এবং সেই পরিবর্তনটুকু যে কিছুদিন আগে হয়েছে তা-ও আমি পরিষ্কারভাবে আন্দাজ করতে পারছি। কারণ আমাকে জেলে বন্দি করার পর প্রথম আট-ন' মাস সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। আজ থেকে প্রায় দু'মাস আগে এক রাতে আমার সাথের একজনকে রাতের অন্ধকারে ডেকে নেওয়া হলো। সেই লোকটাও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিল। অথচ সেই রাতের পর লোকটা আর ফিরে আসেনি। তিন-চারদিন পর আরো একটি লোককে ঠিক একইভাবে ডেকে নেওয়া হলো। তাকেও দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ হয়নি। মানুষগুলোকে কেন ডাকা হয়েছে, তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কেনই বা তাদের ডাক পড়েছে সেসব কেউই জানে না।

তৃতীয়বার যখন কাউকে ডাকতে দেখলাম তা-ও রাত বারোটায় তখন আমার একটু সন্দেহ হলো। ততক্ষণে আমি অনুধাবন করতে পারছি যে, এত রাতে ডেকে নিয়ে আসামি গায়েব হয়ে যাওয়াটা মোটেও স্বাভাবিক কিছু নয়। বরং এর পেছনে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো রহস্য আছে। বলা বাহুল্য, আমাদের মধ্যে থেকে কাউকে যখন ডেকে নেওয়া হত তখন কারোর নাম ধরে ডাকা হত না। জেলখানার পাহারাদার আসত। অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর যে-কাউকে উদ্দেশ্য করে বলত, "এই, এদিকে এসো।"

সেই মানুষটাকে নিয়ে যাওয়া হত ঠিকই। তবে সে আর ফেরত আসত না। এটা হচ্ছে প্রথম রহস্য। সেইসঙ্গে আরো একটি রহস্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমরা যা খাবার পেতাম, তা বাংলাদেশের জেলখানার স্বাভাবিক খাবারের সাথে হুবহু মিল। কিন্তু মানুষ গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে শুরু করার পর থেকে খাবারে বিশেষ পরিবর্তন আসলো। শক্ত রুটি আর পাতলা ডালের বদলে শুকনো খাবার দেওয়া শুরো হলো। কোনোদিন বনরুটি আর কলা, কোনোদিন ড্রাইকেক, বিস্কিট, কোনোদিন চিঁড়া-মুড়ি-গুড়, কোনোদিন ফল। গত কয়েকটা দিনে রান্না করা খাবার খুব কম দিনই খেয়েছি। সবচে' বড়ো কথা হলো, আমরা সকালের খাবার পেতাম দুপুর দুইটায় কিংবা তারও পরে। কোনোদিন আসর নামাজের পরেও খাবার পেয়েছি। তবে যখনই পাই, প্রতিদিন সেই একবেলা খাবার দেওয়া হত। সেই খাবার কেউ একবেলায় খেয়ে ফেলুক কিংবা জমিয়ে রেখে তিনবারে খাক সেটা যার যার নিজস্ব ব্যাপার।

একদিন আমার সাথের একজন খুব কাতর হয়ে সেন্ট্রিকে বলল, "ভাই, আমার বউটা প্রেগনেন্ট ছিল। আন্দাজে এই মাসের কোনো একটা সময়ে বাচ্চা হওয়ার কথা। কিন্তু গত দুইমাস ধরে আমার বাড়ির কেউ দেখা করতে আসছে না। বাড়ির কোনো খবর আমি পাচ্ছি না। বউটা বেঁচে আছে কি না তাও জানি না। শুনেছি, কারোর পরিবারের লোকজনই নাকি দেখা করতে আসছে না। এমনটা কেন হচ্ছে ভাই?"

"উপরতলার নির্দেশে জেলখানায় দেখাদেখি বন্ধ।"

"কেন ভাই? বন্ধ কেন?"

"নতুন নিয়ম।" সেন্ট্রি গম্ভীর। লোকটা কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, "আমার বউটার কেউ নাই। সে একা। এতদিনে বেঁচে আছে না মরে গেছে সেই খবরটাও আমি পাচ্ছি না। আমার মতো হতভাগা স্বামী মনে হয় দুনিয়ায় একটাও নাই।"

আমি বুঝলাম "নতুন নিয়ম"-এর আড়ালে কিছু একটা অনিয়ম হচ্ছে। কিছু একটা ঘটছে যা আমাদের বুঝতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের অজান্তে বিশেষ কিছু ঘটানো হচ্ছে যা আমরা জেলখানার চার দেয়ালে বন্দী অবস্থায় জানতে পারছি না এবং আমাদেরকে জানানোও হচ্ছে না।

এক রাতে হাঁপাতে হাঁপাতে এক পুলিশের লোক এল। তার পুরো শরীর ঘামে ভেজা। চোখদু'টো আতঙ্কে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা। গলায় জোর নেই তা-ও চেঁচিয়ে বলল, "একজন আসো। তাড়াতাড়ি আসো।" বলে আমাদের মাঝ থেকে একজনকে নিয়ে গেল। সেই মানুষটাও আর কোনোদিন ফিরল না। পরদিন যখন কাউকে ডেকে নিতে একজন সেন্ট্রি এল তখন আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম। সাফ জানিয়ে দিলাম, আগে বলতে হবে কীজন্য এবং কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর কেউ যাবে। সেকথা শুনে সেন্ট্রি রেগে আগুন। তাৎক্ষণিক ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল,

"আজ তুই যাবি। আয় আমার সাথে।"

আমি রাজি হয়ে গেলাম। হাসিমুখে সেন্ট্রির সাথে চলতে লাগলাম। দেখা যাক কোথায় নিয়ে যায়? কেনই বা এত রাতে ডেকে নেয় আমাদের? কী করণে জেলখানায় এত পরিবর্তন? কেন বাইরের মানুষ ভেতরের কারোর সাথে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না?

চলবে

মো. ইয়াছিন

[প্রিয় পাঠক, আমার দু'টো বই এখন রকমারিতে এভেইলেবল৷ আপনারা চাইলে সেখান থেকে আমার বই সংগ্রহ করতে পারেন। কিংবা আদর্শ প্রকাশনীর পেজ থেকেও বইদু'টো সংগ্রহ করা যেতে পারে। সবার জন্য শুভকামনা।]

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/496046875562889/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া