দি অ্যানিমেলঅতিপ্রাকৃত

দি অ্যানিমেল — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম১২ নভেম্বর ২০২৫৫ মিনিট পড়া

মানুষ বিহীন আস্ত একটা শহর।

একটা নিস্তেজ, থেমে যাওয়া অসুস্থ শহর। সেই শহরের বুকে নেমেছে গাঢ় অন্ধকার রাত। কালো আকাশের বুকের ভেতর থেকে চাঁদটা খুব করে উঁকি দিতে চাইছে। সেই চাঁদের ছোপ ছোপ আলো এসে পড়েছে শহরের গায়ে। সোলার প্যানেলের শক্তিতে রাস্তার পাশের দু'-একটা বাতি দুর্বল আলো দিচ্ছে বা দিচ্ছে না। এমনই এক পার্থির চিত্র এঁকে নিয়েছে আমার মানব মস্তিষ্ক। সংগত কারণেই কিছু "কোশ্চেন মার্ক" সামনে চলে আসছে। কিছু এলোমেলো প্রশ্ন বারবার ভাবিয়ে তুলছে। বিটিভির শিরোনামের মতো পুনঃপুন ঘুরে ঘুরে চোখের সামনে আসছে। টেলিভিশনের অ্যাডের মতো করে বলছে, "আপনি কি জানেন..."

অথচ আমি কিছুই জানি না। এত মানুষের উপেক্ষিত শহরের ব্যাকস্টোরি আমি একটুও জানি না। এজন্যই হয়তো শহরের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি ঘর, প্রতিটি ঘরের দরজা দাঁত খিঁচিয়ে বলছে, "কী রে হাঁদা? এখনও কিছু বুঝতে পারিসনি?"

আমার বাঁ পায়ের নিচে নরম কিছু একটা পড়ে আছে। সামনে দেয়াল হওয়ায় এবং পেছনে অজানা বিপদ ফাঁদ পেতে দাঁড়িয়ে আছে বলেই এতক্ষণ খেয়াল করিনি। এখন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই চোখ নিচে নামিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল আমার। অকস্মাৎ পুরো দেহ ঝাঁকানি দিয়ে উঠল। কারণ আমার বাঁ পায়ের নিচে একটা পচা গলা লাশ! সেটায় অসংখ্য পোকা কিলবিল করছে। এতক্ষণ টের পাইনি কিন্তু এখন নাকে একটা বিকট গন্ধ আসছে। মরা মানুষের বিভৎস গলা লাশ এবং সেটার অসম্ভব বাজে গন্ধে মুখ ভরে বমি এল। ইয়াক! অতঃপর লাশটার উপরেই একদলা বমি ছেড়ে দিলাম। বুকটা ধড়ফড় করছে আমার। কারণ পেছনের প্রাণীটা নড়ছে। অতি সন্তর্পণে নড়ছে সেটা। বাঘ যেমন শিকার করার আগে ঝিম ধরে, যেমন অতি সাবধানে গা নাড়ায় ঠিক তেমনিভাবে নড়ছে।

এক মিনিট পার হওয়ার আগে দ্বিতীয়বার বমি করলাম। তারপর হঠাৎই মাথাটা ঘুরে এল। ঝাপসা চোখে একবার পাক খেয়ে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলাম। ঠিক তখন একটা ইয়া বড়ো প্রাণী আমার মুখের কাছে নাক ঘষতে লাগল। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে ঠিক করে দেখতে পারিনি। তবে এতটুকু বুঝতে পেরেছি যে, প্রাণীটা আকারে হাতির চেয়ে কোনো অংশে কম হবে না।

এরপর আমার জীবনে আরো একবার সকাল হবে, আমি আবারো ভোরের আলো দেখতে পাব এমনটা কল্পনাও করিনি। তবে কল্পনাকে হার মানিয়ে দিয়ে পরদিন সকালে আমি চোখ খুললাম। তাকিয়ে দেখি একটা বুড়ো তবে তাগড়া লোক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি নড়ছি দেখেই বুড়ো বিস্মিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, "জীবিত মানুষ! আজব কান্ড! জীবিত মানুষ পেয়ে গেছি! জ্যান্ত মানুষ পেয়ে গেছি!"

তাঁর এক হাতে রিভলবার। অন্য হাতে বাইনোকুলার। মুখে মাস্ক এবং গলায় ঝুলছে একটা বুলেট রাখার ব্যাগ। তিনি আমার মুখের উপর ঝুঁকে বললেন, "মেজর জোবায়েদ হোসেন হিয়ার। গেড আপ।" বলে পিস্তলটা মুখে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে বললেন, "পচা লাশের গন্ধে টিকে আছো কীভাবে? আমি আর দু'মিনিট এখানে থাকলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করব।"

বলতে বলতে তিনি দ্রুত পায়ে মূল সড়কে উঠে গেলেন। আমি আলভোলার মতো চারপাশ দেখে নিলাম। সামনে পেছনে ডানে বাঁয়ে অসংখ্য বাড়িঘর খালি পড়ে আছে। মাঠ-ঘাট, রাস্তা সব ফাঁকা। দোকানপাট বন্ধ। বাড়িতে বাড়িতে তালা। রাস্তার পাশে ফেলে রাখা গাড়িগুলোতে ধুলো জমে অবস্থা খারাপ। পিচঢালা রাস্তায় কচি কচি ঘাস উঠেছে। অল্প অল্প চেনা অচেনা নানান জাতের গাছও আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই পথ দিয়ে বহুদিন কোনো গাড়ি চলে না। বহুদিন কোনো মানুষ হাঁটাচলা করে না। নিজেকে মেজর বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া তাগড়া বৃদ্ধ পেছন ফিরে তাকিয়ে ভরাট গলায় বললেন, "জলদি এসো।"

বলার ভঙ্গিতে মনে হলো তিনি কোনো আর্মি সৈন্যকে অর্ডার করছেন। আমি অতোটা না ভেবে তাঁকে ফলো করছিলাম। ঘোর কাটেনি বলে সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। তাই কিছু জিজ্ঞেসও করিনি।

তিনি হঠাৎ একটা দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। রিভলবারটা সাটারে লাগানো তালার দিকে তাক করেই ঠাস করে গুলি ছুঁড়লেন। তালা খুলে গেল। তিনি ভেতরে ঢুকলেন। একটা মস্ত দোকান। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিস এখানে মজুদ আছে। চাইলে পুরো দোকানটাই লুট করা যায় কিন্তু ভদ্রলোক শুধু কিছু খাবার ব্যাগে ভরে বেরিয়ে এলেন।

বাসায় ঢোকার পর ভেতর থেকে মূল গেটে দু'টো তালা দিলেন তিনি। নিচতলা পুরোটা তালাবদ্ধ করে দোতলা পেরিয়ে তিনতলায় গেলেন। খাবারের ব্যাগ নামিয়ে রেখে বললেন, "কাল সারারাত তুমি বাইরে ছিলে?"

"হুম।" সংক্ষেপে সায় দিলাম।

"তারপরও বেঁচে আছো কীভাবে?" কৌতূহলে তিনি আমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়লেন। আমি পুরো ঘটনা খুলে বললে তিনি লম্বা শ্বাস ছেড়ে বললেন, "সামান্য কয়েক দিনের মধ্যে পুরো শহর মানব শূন হয়ে গেছে। সবাই বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। যারা পালায়নি তারা জীবন দিয়েছে। দেশটা এখন মহা সঙ্কটে।" বলতে বলতে তাঁর চোখে-মুখে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে এল। তিনি শ্বাস ছেড়ে বললেন, "আমার বউ-বাচ্চারাও আমাকে একা ফেলে চলে গেছে। বিশ্বস্ত চাকর আকমল আলী একমাত্র সঙ্গী হিসেবে আমার সাথে ছিল, সে-ও কিছুদিন আগে আতঙ্কে পালিয়ে গিয়েছিল। গত পরশু তার পচা লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি।"

তিনি কথা বলছিলেন এমন সময় বাড়ির গেটে ধুম করে শব্দ হলো। এক মুহূর্তের জন্য বাড়িটা কেঁপে উঠেছিল। তিনি আতঙ্কিত চোখে বললেন, "মাই গড! এরা তো দিনের আলোয় রাস্তায় বেরোয় না। তাহলে আজ পাগলামো করছে কেন?"

আরো একবার কেঁপে উঠল বাড়িটা। তিনি দ্রুত রিভলবারে বুলেট ভরতে ভরতে বললেন, "এটা অসম্ভব। এরা দিনের আলোয় রাস্তায় বেরোয় না। আজ কী হলো?" জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে ফের আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "যা ভেবেছিলাম তাই। তিনটা একসাথে। এতগুলো বুলেট আমার কাছে নেই। কী হবে এখন? এরা রক্ত না দেখে শান্ত হবে না। কিছুতেই না।"

আমি হতবাক হয়ে আছি। এই এখন কী ঘটছে? কেন ঘটছে? এই ভদ্রলোক "এরা" বলতে কাদেরকে বুঝিয়েছেন? সেসবের কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু হা করে তাকিয়ে আছি।

বাড়িটা আরো একবার কেঁপে উঠল। যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। তিনি আমাকে বললেন, "এই, তুমি মুসলিম?"

"হুম।"

"কালেমা পড়ে নাও। যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।" তারপর জানালার বাইরে উঁকি দিয়ে বললেন, "গেট ভেঙে ফেলেছে। ভেতরে আসছে। তিনতলা থেকে লাফ দিতে হবে। আসো আমার সাথে। তাড়াতাড়ি আসো।"

বলে তিনি অন্য দিকের একটা ঘরে গিয়ে জানালা খুলেই আবার দুম করে বন্ধ করে দিলেন। আতঙ্কিত গলায় বললেন, "এদিকে আরো দুইটা! আজ এতগুলো একসাথে! ব্যাপার কী?"

ততক্ষণে আমার ঠোঁট-মুখ কাঁপতে শুরু করেছে। আতঙ্কে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। দিনের আলোয় কেউ এতটা ভয় পেতে পারে সেটা এই প্রথমবার অনুভব করছি আমি। কাঁপা কণ্ঠে জানতে চাইলাম, "কী হচ্ছে এসব?"

তিনি দ্রুত আমার মুখ চেপে ধরে বললেন, "শি-শ-শ-শ্!"

চলবে

মো. ইয়াছিন

[প্রিয় পাঠক, আমার দু'টো বই এখন রকমারিতে এভেইলেবল৷ আপনারা চাইলে সেখান থেকে আমার বই সংগ্রহ করতে পারেন। কিংবা আদর্শ প্রকাশনীর পেজ থেকেও বইদু'টো সংগ্রহ করা যেতে পারে। সবার জন্য শুভকামনা।]

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/497382875429289/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া