দি অ্যানিমেল — পর্ব ৭
ইয়াছিন নাইম১১ আগস্ট ২০১৪৫ মিনিট পড়াহঠাৎ একটা ভীত পেঁচা ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেছে সেটা আমি খেয়াল করিনি। ঘুমন্ত মেজরের হাতের কাছ থেকে সন্তর্পণে চাবিটা তুলে এনে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে যেতে যখন ভাবছি যে, এই মাঝরাতে বেরোবার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমি এখন নতুন কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছি, ঠিক তখনই একটা টিকটিকি দূর থেকে টিক টিক টিক করে আওয়াজ দিয়েছে সেটাও আমি খেয়াল করিনি। এমনকি একজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমাকে সারাক্ষণ দেখে দেখে রাখছে সেটাও আমার নজরে পড়েনি।
রাতের বেলা কাক ডাকতে শুনিনি কোনোদিন। আজ হঠাৎই একটা কাক উচ্চশব্দে ডেকে উঠল। সেই আওয়াজটা শুনে মনে হলো যেন, কাকটা খুব কষ্টে আছে। কিংবা কাউকে কষ্ট পেতে দেখেছে সে। তাই বিলাপ করছে। কিন্তু এদিক ওদিক তাকিয়ে কোথাও কাকের দেখা মিলল না। ভেবেছিলাম মনের ভুল। ভয়ে বুক ধড়ফড় করছে বলেই ভুলভাল জিনিস মাথায় আসছে। কিন্তু পরক্ষণেই দেখি দোতলার বেলকনি থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে একটা কাক। এমনভাবে পড়ছে যেন সেটাকে কেউ মেরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কৌতূহল মেটাতে দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখি সত্যি সত্যি একটা কাক মরে পড়ে আছে! না, তখনও মরেনি। মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমি দু'হাতে সেটাকে তুলে নিতেই আমার হাতের উপর কাকটা শেষবার "কা" উচ্চারণ করে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করল। কাকটার ডান পাখনার কিছু পালক ছেঁড়া এবং তার গায়ে ভারী আঁচড়ের দাগ। দেখেই মনে হচ্ছে ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলোর থাবা খেয়েছে কাকটা। হয়তো একটু লেগেছে। ভালো করে থাবা বসিয়ে দিতে পারলে কাকটাকে আর খুঁজেই পাওয়া যেত না।
মৃত কাকের দেহটা মাটিতে নামিয়ে রেখে মাথা উঁচু করে উপরের বেলকনির দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছে, কাকটা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ডাকছিল। তখনই ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলোর একটি ছুটে এসে থাবা বসিয়ে দিয়েছে। যার ফলে কাকটা উপর থেকে নিচে পড়ে গেছে। কিন্তু উপরতলায় ওসব প্রাণী যাবে কীভাবে? গেটে, দরজায় এতগুলো তালা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এত বড়ো প্রাণী বাসায় ঢুকলে টের পাওয়া যাবে না? সবচে' বড়ো কথা হলো, সত্যি সত্যি প্রাণীগুলোর একটিও যদি ঘরে ঢুকত তাহলে মেজর সাহেব এতক্ষণে শ'খানেক গুলি ছুড়ে দিতেন।
কাকের মৃত্যুর ব্যাপারটা কাকতালীয় ভেবে মূল গেটের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু পেছন থেকে অর্থাৎ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দু'টো চোখ আমাকেই দেখছে সেটা আমি তখনও জানি না। আমি তখনও জানি না যে, এই বাড়িতে সত্যি সত্যি অদ্ভুত প্রাণী লুকিয়ে আছে। তা-ও একটা না, অনেকগুলো। সবগুলো চোখে হিংস্রতা, পেটে ক্ষুধা, আর মস্তিষ্কে রক্তের নেশা, মানুষ খুন করার নেশা।
অনেকটা দূর চলে আসার পর মনে পড়ল, আমি অস্ত্র না নিয়েই চলে এসেছি। রিভলবার তো দূর, আত্মরক্ষার জন্য এক টুকরো কাঠ পর্যন্ত নেই আমার কাছে। তবে বাঁ হাতে একটা কমলা আছে। খাবার টেবিল থেকে তুলে নিয়ে আসা কমলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। মাঝে মাঝে মনে হলো যেন কে বা কারা আমার পিছু করছে। কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। পেছনে শূন্য ফাঁকা রাস্তা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। যদিও রাস্তাটা আর রাস্তা নেই। সেটা পতিত জমি হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন গাড়ি কিংবা মানুষ এদিকে না আসায় পিচঢালা রাস্তায় বড়ো বড়ো ঘাস উঠেছে। গাছের পাতা, ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিদিকে। সাইকেল, রিকশা, মোটরবাইক সহ নানান জানবাহন পড়ে আছে এখানে সেখানে। ধুলো পড়তে পড়তে সেগুলো হনুমানের রূপ নিয়েছে। একসময় মানুষ নিজের সাইকেলটাও তালা দিয়ে রাখত যাতে চুরি না হয়। আর এখন ত্রিশ-চল্লিশ লাখ টাকার গাড়িটাও অযত্নে পড়ে আছে। দেখার কেউ নেই। নেওয়ার কেউ নেই। প্রাণ হাতে নিয়ে গাড়ি চুরি করতে আসে এমন সাধ্য কার?
পাবলিক টয়লেটের দরজাটা খুলে দিতেই বাচ্চা প্রাণীটা গোঁত গোঁত শব্দ করে আমার গা ঘেঁষে চারিদিকে চক্কর দিতে লাগল। তার গলার স্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, সে অভিমান করে আছে। যদিও অভিমান করাটাই স্বাভাবিক। আমি তাকে সেই দুপুর থেকে এখানে আটকে রেখেছি। বেচারা এতটা সময় ধরে দুর্গন্ধযু্ক্ত ময়লা টয়লেটে আটকা পড়ে আছে। এজন্য তার রাগ লাগবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা অভিমান করা সত্ত্বেও আমাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে, থুঁতনি দিয়ে আলতো ধাক্কা দিচ্ছে দেখে আনন্দ লাগল এই ভেবে যে, মানুষ হোক বা অন্য কোনো প্রাণী, শিশু মানেই আদুরে। শিশুরা সাধারণত যার কাছে আদর পায় তার কাছেই সবসময় থাকতে চায়। তাকেই সব সময় ধরে রাখতে চায়। এই প্রাণীটার ক্ষেত্রেও তা-ই দেখছি। আমি একবার শুধু তার গায়ে হাত বুলিয়েছিলাম। এতেই সে আমাকে চিনে রেখেছে! সত্যিই ভারী অদ্ভুৎ সৃষ্টিকর্তার সকল সৃষ্টি।
প্রাণীটা আমার হাতের আধখাওয়া কমলা খাচ্ছে দেখে অবাক লাগল আমার। এরা তো মাংসাশী প্রাণী। তাহলে কমলার প্রতি এ'র এত আগ্রহ কেন?
আমার কৌতূহল আরো ঘনীভূত হয়ে এল, যখন দেখলাম প্রাণীটা কমলার ফেলে দেওয়া খোসাগুলোও হাতে নিয়ে খুব উপভোগ করে খাচ্ছে। এত বড়ো প্রাণী, এত বড়ো তার পেট। সারাদিন কিছু না খেয়ে এখন অর্ধেক কমলায় কিছু হয়নি। তাই খাওয়া শেষ করে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে প্রাণীটা। যাতে আমি আরো খাবার দেই। সব মিলিয়ে খুব বাজেভাবে সন্দেহ হতে লাগল আমার। মনে হলো যেন, কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে। কোথাও কোনো একটা বিষয় লুকিয়ে আছে যা আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক আপাতত ধরতে পারছে না। তবে এই সবকিছুর আড়ালে বিশেষ এক রহস্যের গন্ধ পেতে শুরু করেছি আমি। প্রাণীটা নাছোরবান্দার মতো আমার পিঠে গাল ঘষছে। মানে তার আরো কমলা বা কমলার খোসা চাই। মাংসাশী প্রাণীর কমলার প্রতি এতটা আগ্রহ আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। বিশেষ করে যেসব প্রাণী জীবিত মানুষকে চোখের পলকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। যেসব প্রাণীর ভয়ে পুরো শহর খালি হয়ে গেছে, সব মানুষ বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে সেই অতি ভয়ঙ্কর জাতের প্রাণীর আগ্রহ কিনা মামুলি কমলায়! যে একবার তাজা রক্ত আর কাচা মাংসের স্বাদ পেয়েছে তাকে কি এসব সামান্য জিনিস আকৃষ্ট করবে?
নাহ্! কোথাও একটা কিন্তু আছে। কিন্তুটা কোথাও তা আপাতত বের করতে পারছি না। এই মুহূর্তে প্রাণীটাকে বাগিয়ে দেখার জন্য দূরে ফেলে আসা এক টুকরো কমলার খোসা তুলে এনে সাথে একটি গাছের কচি পাতা এনে দিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রাণীটা সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে! কমলার খোসার সাথে গাছের পাতা! ওয়াক করে ফেলে দেওয়ার বদলে চিবিয়ে চিবিয়ে গিলে খাচ্ছে!
শুকনো পাতার উপর দিয়ে একসঙ্গে অনেকে হেঁটে আসার শব্দ পেয়ে সতর্ক হয়ে গেলাম আমি। সামনে দৃষ্টি ফেলে দেখি অনেক দূরে অন্ধকার থেকে অনেকগুলো প্রাণী আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে। সবগুলোর দৃষ্টি আমার উপর। মৃত্যু নির্ঘাত জেনে নিজেকে প্রাণীগুলোর হাতে সমর্পণ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। আমি এত রাতে বেরিয়ে এসেছি। এটা জানতে পেরে ওরা ছুটে এসেছে। এতে আমার একটুও কৌতূহল নেই। কিন্তু যখন দেখি অদ্ভুত প্রাণীর দলের মাঝখান থেকে একটা মানুষ বেরিয়ে আসছে তখন কৌতূহলে আমার মুখ হা হয়ে এল। মানুষটা আগে আগে হাঁটছে। প্রাণীগুলো তাকে অনুসরণ করছে! আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সামনের মানুষটা আর কেউ না, স্বয়ং মেজর জোবায়েদ!
চলবে
মো. ইয়াছিন
[পাঠকবৃন্দ, কেমন এগোচ্ছে গল্পটি? একেবারে স্লথ গতিতে, না? আপনাদের ব্যাপারটা জানি না তবে আমি খুব এনজয় করছি। যত সময় যাচ্ছে, একটু একটু করে রহস্যের জট খুলছে ঠিকই সাথে সাথে নতুন নতুন জটিল রহস্য যোগ হচ্ছে। এই গল্পের সবকিছু লজিক্যাল হোক বা না তার পরও পুরো গল্পটাই আমার কাছে কী কারণে যেন রিয়েলিস্টিক মনে হচ্ছে। যাহোক, আসল কথা তো পাঠকরাই বলতে পারবেন। অাফটারঅল, লেখক হিসেবে আমি নিজেই নিজের গল্পে মন্তব্য করতে পারি না।
আরো একটি বিশেষ কথা। আমার বইগুলো অর্ডার করতে হলে এতদিন অন্য পেজে নক করতে হত বলে অনেকেই আসলসেমি করে অর্ডার করেননি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন থেকে আমি নিজেই সেসব করব। অর্থাৎ কেউ আমার বই নিতে চাইলে সরাসরি আমাকে নক করতে পারবেন। আমি ক্যাশ অন ডেলিভারিতে বই পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
সবার জন্য শুভকামনা।]
গত পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/100054727422264/posts/500667851767458/?app=fbl