দি অ্যানিমেল — পর্ব ৬
ইয়াছিন নাইম১৫ নভেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়ামেজর জোবায়েদ যা বলেছিলেন তা সম্পূর্ণ ভুল।
তিনি বলেছিলেন, আমি তাঁর কাছ থেকে কিছু একটা আড়াল করছি। কোনো এক রহস্যময় কথা গোপন করছি। হয়তো ওই আজব প্রাণীগুলোর সাথে আমার কোনো এক ভাবে যোগসূত্র আছে যার জন্য প্রাণীগুলো আমাকে খুঁজতে এসেছিল৷ মেজর সাহেব হয়তো ধারণা করেছেন যে, আমি কোনোভাবে প্রাণীগুলোর কোনোরূপ ক্ষতি করেছি। যার বদলা নেওয়ার জন্যই সেগুলো পাগল কুকুরের মতো আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আসলে মূল ঘটনা তা নয়। প্রাণীগুলো কিছু একটা খোঁজছিল ঠিকই, তবে সেটা আমাকে নয়। খোঁজছিল তাদেরই এক সঙ্গীর ছোটো বাচ্চাকে। একটা বাচ্চা প্রাণী আজ সকাল থেকে নিখোঁজ। সেটাকেই খোঁজছিল ওরা। ব্যাপারটা আমিও জানতে পারতাম না যদি না ওই বাচ্চা প্রাণীটা আমার চোখের সামনে না পড়ত।
আজ ভর দুপুরে যখন ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাবার এবং আত্মরক্ষার জন্য কিছু অস্ত্র জোগাড় করতে বেরিয়েছি তখনই বাচ্চাটাকে চোখে পড়ল। আমরা মূল রাস্তা ধরেই হাঁটছিলাম। আমার হাতে একটা লোহার পাইপ। আর মেজরের হাতে রিভলবার। তিনি আগে আগে হাঁটছিলেন। আমি পিছু পিছু। হঠাৎ কী মনে করে যেন রাস্তার ঠিক বাঁ দিকে যে সরু গলিটা চলে গেছে সেটার এক অংশে চোখ পড়ল আমার। দেখি অদ্ভুত প্রজাতির প্রাণীগুলোর মতোই দেখতে তবে আকারে ছোটো জন্তুটা ছোট্ট জলাশয়ের সামান্য পানিতে দাপাদাপি করছে। কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে আবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। গড়াগড়ি খাচ্ছে। এগিয়ে এসে আবার পানির দিকে যাচ্ছে।
ততক্ষণে মেজর একটা বিশাল দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছেন। আমি অতি সাবধানে এগিয়ে গেলাম। তবে মেজরের দিকে নয়, সেই ছোটো প্রাণীটার দিকে। প্রাণীগুলো দিনের আলোয় ঠিক করে চোখে দেখে না। ঝাপসা ঘোলাটে সাদামতো চিত্র টের পায় শুধু। আমি কাছে গিয়ে গা ছুঁয়ে দিতেই সেটা খরগোশের মতো নাক নাড়াতে নাড়াতে আমাকে শুঁকতে লাগল। আমি তার কান ছুঁয়ে দিলাম। তকতকে খসখসে কানটা আমার হাতের চেয়েও বড়ো। অন্য হাত দিয়ে ঘন লোমশ ঘাড় স্পর্শ করতেই প্রাণীটা আরামে আমার গায়ের উপর গা এলিয়ে দিলো। একটু সরে যেতেই গোঁত গোঁত শব্দ করে ঘাড়টা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো যাতে আরো আদর করি। ভাবতেই অবাক লাগছে যে, আজকের এই আদুরে বাচ্চা প্রাণীটাই ক'দিন পর হিংস্র হয়ে উঠবে। শহরে তান্ডব চালাবে। নির্দয়ের মতো মানুষ খুন করে বেড়াবে।
এই বাচ্চাটার কথা মেজরকে বলতে যাচ্ছিলাম। তখনই সেটা দুই লাফে এগিয়ে এসে আমার পিঠের উপর থুতনি ঘষতে লাগল। এর অর্থ সে আরো আদর চাইছে। কিন্তু এমন হিংস্র প্রাণীকে আদর দেওয়া কি ঠিক? এটার স্বজাতির চোখে পড়লে প্রাণে বাঁচা সম্ভব হবে না। এরচে' কোনো প্রকার অঘটন ঘটে যাওয়ার আগেই মেজরকে বলে দেওয়াই ভালো হবে। কিন্তু শেষমেশ আমি তা করতে পারলাম না। মেজরের সাথে রিভলবার আছে। তিনি এই প্রাণীটার কথা শুনলেই ছুটে এসে গুলি করে দেবেন। এটা আমি মানতে পারছি না। হঠাৎ কী কারণে যেন এই বাচ্চা প্রাণীটার প্রতি খুব মায়া হচ্ছে আমার।
এত বড়ো জন্তুকে লুকিয়ে রাখতে পারা কঠিন। এটা বয়সে বাচ্চা হলেও আকারে অনেক বড়ো। সোজা হয়ে দাঁড়ালে এর উচ্চতা আমার থেকে অল্প একটু কম। সুতরাং এটাকে লুকিয়ে রাখতে গিয়ে হাঁফ ধরে গেল। তবে পাবলিক টয়লেটে আটকে রাখতে পেরে শেষমেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কেন জানি না প্রাণীটাকে মেজরের হাত থেকে বাঁচাতে পেরে খুব আনন্দ লাগছিল আমার। আমি জানি কিছুদিন পর এই প্রাণীটাই আমার বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। হয়তো এই প্রাণীটা আমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে এটার হিংস্রতা আমার চোখে পড়ল না। এ'র মাঝে একটা কোমল শিশুকেই দেখেছি আমি। তাইতো এটা যাতে মেজরের সামনে না পড়ে সেজন্য পাবলিক টয়লেটের ভেতরে লুকিয়ে রেখে এলাম। কিন্তু এই একটা সিদ্ধান্ত যে আমি জীবনের গতিপথ এতটা ঘুরিয়ে দেবে তা আমার জানা ছিল না।
মেজর একটা গ্যাসের চুলার দোকানে ঢুকেছেন। এই অসময়ে গ্যাসের চুলার কী দরকার তা বুঝে উঠতে পারিনি। ইতস্তত করে কিছু জিজ্ঞেস করব তার আগেই তিনি একটা গোপন দরজা আবিষ্কার করে ফেললেন! তাঁর হাতের ইশারায় দরজাটা ঢকঢক শব্দ করে খুলে গেল।
ঘুটঘুটে অন্ধকার একটা ঘর। আকারে বিশাল ফাঁকা অন্ধকার ঘরটায় প্রবেশ করে টর্চ লাইটের আলোয় সুইচবোর্ড খুঁজে বের করলেন তিনি। আলো জ্বালিয়ে দিতেই ভেতরের দৃশ্য দেখে আমার চোখ ছানাবড়া! শহরের এই ছোট্ট গ্যাসের চুলার দোকানের আড়ালে এত বড়ো অস্ত্রাগার রয়েছে সেটা কে বিশ্বাস করবে!
বিশাল বড়ো ঘর। মাঝখানটা পুরোপুরি ফাঁকা। শুধু চারপাশের দেয়ালে নানান অস্ত্র সাজিয়ে রাখা। মামুলি রিভলবার থেকে শুরু করে স্নাইপার রাইফের, এ কে ফোরটি সেভেন, উজি, সাবমেশিন কোনোকিছুই বাদ নেই। সব আছে এখানে! মেজর একটা এ কে ফোরটি সেভেন, একটা উজি আর কিছু ম্যাগাজিন নিয়ে আমাকে সুযোগ দিলেন। আমি একটা মডেল না জানা পিস্তল নিলাম শুধু।
চলে আসার সময় যখন রাস্তার পাশের পাবলিক টয়লেটের কাছ দিয়ে আসছিলাম, তখন ছোটো প্রাণীটার গোঁত গোঁত শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সেটা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, মেজর যদি টের পেয়ে যান তাহলে আর প্রাণীটাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। এতদিনের একাকী আতঙ্কিত জীবনের পুরো ঝাল তিনি এই বাচ্চা প্রাণীটার উপর মেটাবেন।
রাত তখন কত আমি জানি না। বাসার গেটটা সারিয়ে নেওয়া যায়নি। ঘরের দরজাগুলোও না৷ তাই মেজর সাহেব আমাকে নিয়ে অন্য একটা বাড়িতে উঠেছেন। প্রতিবেশিরা এ-বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় একটা ডুপলিকেট চাবি মেজর সাহেবের কাছে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই চাবির সঠিক ব্যবহার করা হলো আজ। ভারী লোহার গেটে দু'টো তালা দিয়ে ঘরের মূল দরজায় আরো একটি তালা ঝুলানো হলো। সব ঘরের দরজা লাগিয়ে আমরা ডায়নিং রুমে বসে আছি। টেবিলের উপর ভারী অস্ত্র। আক্রমণ হলেই এলোপাথারি ফায়ারিং হবে।
অনেক্ষণ পরিবেশ ঠান্ডা থাকায় আমাদের দু'জনেরই একটু তন্দ্রার ভাব এসেছিল। তবে আমি সম্পূর্ণ সজাগ আছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, দিনের বেলায় একটা বাচ্চা প্রাণীকে পাবলিক টয়লেটে আটকে রেখেছিলাম। ভাবছি মেজর ঘুমিয়ে পড়লে আস্তে করে বেরিয়ে যাব। যে করেই হোক বাচ্চাটাকে মুক্তি দিতে হবে। না হলে তো সেটা না খেতে পেয়ে সেখানেই মরে পড়ে থাকবে! আমি কারোর প্রাণনাশের কারণ হতে চাই না। তাই ঘুমের ভান ধরে টেবিলের উপর মাথা রেখে স্থির হয়ে আছি। মেজর ঘুমিয়ে পড়লেই...
কিছুক্ষণ পর মেজর যখন সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়লেন তখন আমি এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার জীবনের সবচে' ভয়ঙ্কর এক সিদ্ধান্ত।
চলবে
মো. ইয়াছিন
[প্রিয় পাঠক, আমার দু'টো বই এখন রকমারিতে এভেইলেবল৷ আপনারা চাইলে সেখান থেকে আমার বই সংগ্রহ করতে পারেন। কিংবা আদর্শ প্রকাশনীর পেজ থেকেও বইদু'টো সংগ্রহ করা যেতে পারে। সবার জন্য শুভকামনা।]
গত পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/100054727422264/posts/498747311959512/?app=fbl