দি অ্যানিমেলঅতিপ্রাকৃত

দি অ্যানিমেল — পর্ব ৮

ইয়াছিন নাইম২০ নভেম্বর ২০২৫৫ মিনিট পড়া

একেবারে সাধারণ ভঙ্গিতে হেঁটে আসছেন মেজর জোবায়েদ। তাঁর হাতে কোনো অস্ত্র নেই। ছোট্ট রিভলবার কিংবা উজি, সাবমেশিন কিছুই নেই। খালি হাতে এগিয়ে আসছেন তিনি। তাঁর পেছনে অসংখ্য মানুষখেকো প্রাণী। অথচ তাঁর চেহারায় বিন্দুমাত্র ভয়ের ছাপ নেই!

খুব কাছাকাছি এসে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাত দিয়ে ইশারা করতেই সবগুলো প্রাণী একসঙ্গে থেমে গেল। ওরা মেজরের কথা শুনছে! আশ্চর্য!

মেজরের মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি আমার উপর খুব বেশি বিরক্ত। গলা টান করে কড়া স্বরে তিনি বললেন, "ভেবেছিলাম তুই প্রমাণ-টমান জোগাড় করেছিস। এজন্য এতক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছি। প্রথম যেদিন তোকে দেখি, সেদিনই সন্দেহ হয়েছিল। সেদিন প্রথমবার কেউ নিয়ম ভেঙে এই শহরে উপস্থিতি দিয়েছিল। আর সেটা হচ্ছিস তুই। তোর আগে বহু মানুষকে জেল থেকে ছাড়া হয়েছিল শুধুমাত্র আমার এই প্রাণীগুলোর খোরাক হওয়ার জন্য। প্রতি রাতেই একটা করে মানুষ ছাড়া হত আর এরা মানুষটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। কিন্তু তুই এসে সেই নিয়ম ভেঙে দিলি। তুই প্রথম মানুষ যে কিনা রাতের অন্ধকারে এই শহরের বুকে পা রেখে এখনও বেঁচে আছে। তাই তোর উপর আমার প্রাণীগুলো ভীষণ রেগে আছে। ভীষণ।"

বলতে বলতে তিনি হাত বাড়িয়ে দিতেই একটা প্রাণী মেজরের হাতের নিজে মাথা পেতে দিলো। মেজর প্রাণীটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, "আমার বাচ্চারা (প্রাণীরা) এখন তোকে ইচ্ছেমতো আঘাত করতে করতে মেরে ফেলবে। তোর রক্ত মাংসের স্বাদ নেবে।"

"তার মানে আপনিই এই প্রাণীগুলোর আবিষ্কারক?"

তিনি তাচ্ছিল্য করে বললেন, "না রে! আমি কেন ওসব করতে যাব? যা করার ওই পাগল বিজ্ঞানীটাই করেছিল। আমি তো শুধু এদেরকে ট্রেইন করেছি। এমন ট্রেইন করেছি যে ওরা নিজেদের মুনিবকেই খুন করে ফেলেছে, হা হা হা!"

"কেন এমন করলেন?" প্রশ্ন শুনে মেজর হাসি থামিয়ে বললেন, "কেন এমন করেছি? কারণটা বুঝতে পারছো না? এটাও বলে দিতে হবে?"

"আপনি এতটা জঘন্য লোক তা আমি ভাবতেও পারিনি।"

তিনি বিদ্রুপ করে হেসে বললেন, "রাজনৈতিক নেতারা যখন হাজারো মানুষকে মিথ্যে আশ্বাস দেয়, লোক ঠকায়, এমনকি মানুষ খুন করাতেও দ্বিধাবোধ করে না সেখানে আমি কেন পারব না? আফটারঅল সবার লক্ষ্য তো ওই এতটাই। পাওয়ার। এই পাওয়ারের জন্য সবাই কত কী করে। আমি নাহয় কিছু মানুষকে কোরবান করে দিলাম। আমি নাহয় কিছু স্বাভাবিক প্রাণীকে অস্বাভাবিক করে তুললাম। নাহয় দিলাম একটু আতঙ্ক ছড়িয়ে। এতে যদি সামান্য কিছুদিনের মধ্যে পুরো শহরটা দখল করে ফেলতে পারি তাতে ক্ষতি কী?"

"তার মানে এই প্রাণীগুলো মাংসাশী নয়। আপনি এদেরকে তাজা মাংস খাওয়া শিখিয়েছেন!"

"ভুল বললে। আমার পেছনে যাদেরকে দেখছো, তারা কেউই মাংস খায় না। তাদের প্রধান খাদ্য কলার খোসা, ঘাস, লতাপাতা, ফলমূল। এরা তো মানুষ খুন করে আমার জন্য। আমাকে খুশি করার জন্য। যাতে আমি পুরো শহরে রাজত্ব করতে পারি। দেখছো না কীভাবে অল্প সময়ে পুরো শহরটা খালি হয়ে গেছে? এখন এই পুরো শহর আমার। শহরের সবগুলো বাড়ি, সবগুলো গাড়ি, সব দোকানপাট, গাছপালা, রাস্তা, খোলা মাঠ, শহরের প্রতিটি ইট, প্রতিটি... সব আমার, সব। শীঘ্রই এমন একটা দিন আসবে যখন পুরো দেশটাই আমার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আমিই হব এদেশের একমাত্র নাগরিক।" বলতে বলতে মেজরের চোখদু'টো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"কিন্তু এটা কি ঠিক?"

"ঠিক বেঠিকের ধার আমি ধারি না। পাওয়ারের জন্য আমি সব করতে পারি। শীঘ্রই এই দেশটা ফাঁকা হয়ে যাবে। এদেশের সব মানুষ ভয়ে আতঙ্কে দেশ ছেড়ে পালাবে। আমার ভয়ে পালাবে। আমিই হব এখানকার একমাত্র জীবিত মানুষ!"

"তার আগে আমি আপনাকে খুন করে ফেলব।" ভীষণ রাগে কথাটা বলে ফেলার পর দেখি মেজর বিশাল প্রাণীটার মাথার উপর থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সাত ফুট উঁচু প্রাণীটা সোজা হয়ে দাঁড়াল। মেজর ধীর গলায় বললেন, "শেষ ইচ্ছে?"

"আপনার মতো অমানুষকে খুন করা।"

"হা হা হা! অল দ্য বেস্ট। কাম, কাম হিট মি। কিল মি। কিল মি বাডি। জাস্ট ডু ইট। হা হা হা হা হা!" অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন তিনি। বড়ো প্রাণীটাকে ইশারা করতেই সেটা আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। এমন সময় হঠাৎ মনে হলো চারপাশে ঝড় বইতে শুরু করছে। গাছপালাগুলো অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে। দূর থেকে কীরকম একটা শব্দ আসছে। লম্বা প্রাণীটা মাথা উঁচু করে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে বাকি প্রাণীরাও আকাশের দিকে তাকাল। মেজর জোবায়েদও চোখ তুললেন। আমিও। দেখি আকাশের কালো অন্ধকার থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে মস্ত একটা হেলিকপ্টার!

হেলিকপ্টার নিয়ে তিনজন এক্স মিলিটারি রওনা দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে ভারী অস্ত্র। ভারী মানে খুবই ভারী। অদ্ভুত কিছু দেখলেই গুলি ছোঁড়া হবে।

এখন রাত হওয়ায় নিচের সবকিছু ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। তাই সামান্য উঁচু দিয়ে উড়ে চলেছে হেলিকপ্টারটা। একজন একটা ভারী অস্ত্র নিচের দিকে তাক করে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অপরজন বসে বসে চারদিকটা ভালো করে দেখে নিচ্ছেন। তার হাতে নাইট ভিশন বাইনোকুলার। তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ ক্যাপ্টেন মারুফ হেলিকপ্টার উড়াচ্ছেন। তিনি তাঁর দুই সহযোগী ক্যাপ্টেন আসিফ এবং ক্যাপ্টেন শাওনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমাদের কী মনে হয়? এই অন্ধকারে বিশেষ কোনো ক্লু পাওয়া যাবে?"

বাইনোকুলার দিয়ে যিনি দেখছিলেন, অর্থাৎ ক্যাপ্টেন আসিফ বিড়বিড়িয়ে জবাব দিলেন, "ক্লু'র জন্যই আমরা বেরিয়েছি। আমার মনে হয় এই সময়টাই ইনভেস্টিগেশন করার জন্য বেস্ট।"

তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ ক্যাপ্টেন শাওন তাঁর পুুরু ঠোঁটে ঢাউস সাইজের জ্বলন্ত সিগারেটটা রাখতে রাখতে বললেন, "ইনভেস্টিগেশন করার টাইম আছে নাকি? অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই ধাম ধাম ধাম ফায়ারিং করব। ব্যাস, কিচ্ছা খতম।"

"কিন্তু নিচে জীবন্ত মানুষও থাকতে পারে। তোমার এই বেখেয়ালির জন্য একটা নির্দোশ মানুষের প্রাণ যেতে পারে সেটা কি তুমি জানো?" তীব্র বিরক্তি নিয়ে ক্যাপ্টেন শাওনের দিকে তাকালেন ক্যাপ্টেন আসিফ। শাওন সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, "অত ভাবার টাইম নেই। নিচে কিছু দেখলেই ফায়ারিং করব। ফাইন্যাল।"

"না, তুমি এটা কখনোই করবে না।" প্রতিবাদ করে বলে উঠলেন আসিফ। ক্যাপ্টেন মারুফ পেছনে তাকিয়ে বললেন, "তোমরা আবার শুরু করলে? এভাবে ঝগড়া করলে মিশন সাকসেসফুলি কমপ্লিট করা সম্ভব?"

"স্যরি।" আসিফ ও শাওন দু'জনেই চুপ মেরে গেলেন। আসিফ আবারো বাইনোকুলার দিকে চারপাশ দেখছেন। শাওন ভারী অস্ত্রটা একদিকে তার করে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু আগে ওয়ার্কআউট করায় তার হাতের বিশাল মাংসপেশি ফুলে শক্ত হয়ে আছে। হাতের শিরাগুলো চামরার উপরে উঠে এসেছে। কপালে ঘাম। গায়ের পাতলা টি-শার্ট ঘেমে জবজবা হয়ে আছে তাঁর। রাতের প্রায় একটা। তবুও এই তিনজনের কারোর চোখে ঘুম নেই। একটুও ক্লান্তি নেই। তিনজনেই সজাগ, সতর্ক। যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে তাঁরা সদা প্রস্তুত।

হঠাৎ ক্যাপ্টেন আসিফ চিৎকার দিয়ে উঠলেন, "মাই গড!" তারপর বাইনোকুলার দিয়ে ভালো করে দেখতে লাগলেন। মারুফ বললেন, "কী হয়েছে?"

আসিফ বিস্মিত গলায় জানালেন, "ওই যে দু'টো জীবিত মানুষকে দেখা যাচ্ছে! একটা মানুষ একা দাঁড়িয়ে আছে। অপর পাশে দ্বিতীয় মানুষটা। তার পেছনে অদ্ভুত রকমের অসংখ্য প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণীগুলোর মধ্যে কোনো অস্থিরতা নেই। যেন তাদেরকে কেউ একজন নিয়ন্ত্রণ করছে!"

হেলিকপ্টারটা যখন প্রাণীগুলোর মাথার উপর চলে এসেছে তখন সুযোগ পেয়ে ক্যাপ্টেন শাওন গুলি করতেই যাচ্ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেন আসিফ ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন, "ডোন্ট শুট। আই সেইড ডোন্ট শুট।"

ক্যাপ্টেন মারুফ বললেন, "গায়েজ, এটা আমি কী দেখছি?"

আসিফ এবং শাওন দু'জনেই কৌতূহলী হয়ে বললেন, "কী?"

মারুফ বললেন, "এদিকে এসো। হারি!"

ওঁরা দু'জনে এগিয়ে এসে দেখেন। তারপর দু'জনেই একসঙ্গে বলে উঠেন, "ও মাই গড!"

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/501535641680679/?app=ffbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া