অচিনপুরের রাজকন্যা — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম২৯ আগস্ট ২০১৪৫ মিনিট পড়া

দেখতে হুবহু মানুষের মতোই কিন্তু মানুষ নয়, এমন একজনের সামনে বসে আছে সাদাফ। টানা একঘন্টা ঘুমিয়ে এইমাত্র জেগে উঠেছে সে। এখনও ঘোরলাগা অবস্থায় ফোলা ফোলা চোখে চারপাশ আন্দাজ করার চেষ্টা করছে।

ঝিকঝিক-ঝিকঝিক করে ছুটে চলেছে যাত্রীবিহীন একলা ট্রেন।

বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। থমথমে আকাশের বুকে খন্ড খন্ড কালো মেঘ এবং মেঘের আড়াল থেকে কখনো সখনো বিদ্যুৎ চমকে তেড়ে আসা বিকট আওয়াজের বাজ যেন বারবার মহা বিপদের আগমনী বার্তা বহন করছে। দ্রুতগতির ট্রেনটা ইতোমধ্যে বিপদসীমা পেরিয়ে গেছে। এজন্যই বোধহয় আশপাশ এলাকায় যত ট্রান্সমিটার আছে সবগুলো একের পর এক ব্লাস্ট হয়ে যাচ্ছে। ভেজা কাকগুলো দূর দূর থেকে একসুরে কু-ডাক ডাকছে। যেন তারাও জেনে গেছে, আজ ভীষণ বিপদের দিন!

সাদাফের মুখোমুখি বসে থাকা সুট-বুট পরা লোকটা মানুষ না। তাহলে কী? জিন? এলিয়েন? রোবট? লেজার লাইটের তৈরি থ্রিডি ইমেজ?

না কি এই সবকিছুই সাদাফের কল্পনা? স্বপ্নও কি হতে পারে না? কিম্বা এমনও তো হতে পারে যে, সাদাফের হ্যালুসিনেশান হচ্ছে! অথবা এটা এক ধরণের সাইকোলজিক্যাল ডিসওর্ডার!

সাদাফ গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল।

ট্রেনের জানালার উপর মাথা কাত করে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে মিলি।

মেয়েটা এখনও জানে না যে, সে আর অল্প কিছুটা সময়ের মেহমান। আর মাত্র এক ঘন্টা পর সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে।

"আপনি চাইলেই আপনার স্ত্রী'কে বাঁচাতে পারেন।" বলে দ্বিতীয়বার ব্রিফকেস খুলে একগাদা টাকা দেখায় লোকটা। তারপর ব্রিফকেসটা পায়ের কাছে রেখে বুকপকেট থেকে একটা ছোট্ট কাচের শিশি বের করে বলে, "এটাতে একটা বিশেষ মেডিসিন আছে। এটা আপনার স্ত্রী'র শরীরে পুশ করতে পারলে কফিতে মেশানো যেটুকু বিষ উনি খেয়েছেন, সেটার কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে। সোজা বাংলায় বললে, এই মেডিসিনের মাধ্যমে উনাকে বাঁচানো সম্ভব।"

সাদাফ হাত বাড়িয়ে কাচের শিশিটা নিতে যাচ্ছিল, ওই লোক শিশিটা দূরে সরিয়ে নিয়ে বলে, "আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। এতে দু'টো লাভ হবে। প্রথমত আপনি নগদ এক কোটি টাকার মালিক হয়ে যেতে পারবেন। আর দ্বিতীয়ত, আপনার স্ত্রী প্রাণে বেঁচে যাবেন। যদিও উনাকে আপনি আর পাবেন না। তাকে আমি ধরে নিয়ে যাব এখনই।"

'ধরে নিয়ে যাব।' কথাটা সাদাফকে খানিকটা বিমর্ষ করে তুলল।

কেউ তার বউকে 'ধরে' নিয়ে যাবে, ব্যাপারটা ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে। নিজেকে বড়ো অসহায় মনে হচ্ছে তার। সেইসাথে কৌতূহল বাড়ছে সমানতালে। প্রশ্ন জাগছে মনে, তার বউ কী এমন করেছে যার জন্য কেউ এক কোটি টাকার বিনিময়ে তাকে ধরে নিয়ে যেতে চাচ্ছে? তা-ও আবার যে নিতে এসেছে, সে মানুষ না, অন্য কিছু!

"উনার হাতে কিন্তু সময় খুব কম।" বলে ঘড়ি দেখে লোকটা। সাদাফ সভয়ে বলে, "কতক্ষণ বেঁচে আছে ও?"

"পঁয়তাল্লিশ মিনিট। আরো এক মিনিট মাইনাস। চুয়াল্লিশ মিনিট আছে উনার হাতে।"

ভাবতে ভাবতে মিনিট বিশেক চলে যায়।

আর মাত্র চব্বিশ মিনিট বাকি আছে।

ইতোমধ্যে সুট-বুট পরা লোকটার বিছানো জালে আটকা পড়ে গেছে সাদাফ। সাথে তার বউ মিলি।

ওদের সামনে দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই।

পথ একটাই, পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করে বসে থাকা লোকটার পাতা ফাঁদে পা দেওয়া।

একটুক্ষণ পর মিলিকে কেউ একজন ধরে নিয়ে যাবে এটা ভাবতেই সাদাফের আপাদমস্তক ঝাঁকানি দিয়ে ওঠে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসে তীব্র আক্ষেপ মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। অতঃপর বউ বিক্রির মতো অসম্ভব বাজে চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। কিন্তু সবকিছুর আড়ালে সে যে মনে মনে ভিন্ন কিছু ভেবে রেখেছে, সেটা ওই লোকটা ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি।

মিলিকে ইনজেকশন দেওয়ার পরেই শুরু হয় মূল ঘটনা।

সাদাফ আস্তে করে ব্রিফকেস তুলে নিচ্ছে দেখে লোকটা মৃদু হাসে। তার ধারণা সাদাফ টাকাগুলো আগলে রাখছে। আসলে তা নয়। সে ব্রিফকেস হাতে নিচ্ছে ওই লোকটাকে আঘাত করার জন্য। লোকটাকে মেরে অজ্ঞান করে মিলিকে নিয়ে পালিয়ে যাবে সাদাফ।

ব্রিফকেসের ওজন নেহাত কম নয়। টাকার ভারেই হয়তো এতটা ভারী লাগছে। ভেতরে এক কোটি টাকা। ব্রিফকেস ভারী হওয়াই স্বাভাবিক। ব্রিফকেসটা দু'হাতে শক্ত করে ধরে চোখের পলকে মাথার উপর তুলে নেয় সাদাফ। তারপর লোকটার মাথায় এত জোরে আঘাত করে যে ব্রিফকেসটাই ভেঙে যায়। লোকটা অজ্ঞান হওয়া তো দূর, উঁহ পর্যন্ত করেনি। বরঞ্চ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, "কী করছেন আপনি?"

সাদাফ ব্রিফকেস হাত থেকে ছেড়ে দেয়। এটা দিয়ে সম্ভব না। অন্য কিছু লাগবে। সাদাফ মাথার উপরের খোপের মতো অংশে হাত দেয়। খুঁজতে থাকে। তার হাতে উঠে আসে আনুমানিক দেড় বাই আট ইঞ্চি সাইজের লোহার পাত! সেটা দিয়ে সাদাফ এত জোরে আঘাত করল যে, লেহার পাতের অন্তত তিন ইঞ্চি ওই লোকটার পেটের ভেতরে ঢুকে গেল! আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এবারও লোকটার মাঝে পরিবর্তন নেই! তার পেটের ভেতরে লোহার পাত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে অথচ তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি! লোকটা শক্ত গলায় বলল, "কী করছেন আপনি?"

সাদাফ বুঝতে পারে না কী জবাব দেবে। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস নিতে নিতে সে দ্রুত হাতে লোকটার পেটের ভেতর থেকে একটানে লোহার অংশটুকু বের করে নেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে দিগুণ জোরে আরো একবার লোকটার পেটে লোহার অংশটা ঢুকিয়ে দেয়। লোকটা কপাল কুঁচকে বলে, "হচ্ছেটা কী?"

তৃতীয়বার যখন আঘাত করবে, তখন লোকটা শক্ত হাতে প্রতিহত করে বলে, "আমাকে খুন করে বউ নিয়ে পালাবেন ভেবেছেন? সামান্য বিপদ টের পেয়ে আপনার মতো একটি সাধারণ মানুষ যদি এতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, এতটা ভয়ানক আক্রমণ করতে পারে তাহলে আমি একজন নিজের বিপদ টের পেলে কতটা ভয়ানক হতে পারি ভেবেছেন একবার? চুপচাপ আছি বলে দুর্বল ভেবেছেন তাই না?"

বলতে বলতে সাদাফের হাত থেকে রক্তমাখা লোহার পাত কেড়ে নেয় লোকটা। কিছু বুঝে উঠার আগেই সেটা দিয়ে সাদাফের মাথা বরাবর আঘাত করে। সাদাফ চোখ উলটে পড়ে যায়। মাথা থেকে রক্ত পড়ছে তার। ঝিমিয়ে পড়া দৃষ্টিতে তাকায় সে। সুট-বুট পরা লোকটা উঁবু হয়ে সাদাফের মুখের সামনে বসেছে। একহাতে সাদাফকে ধাক্কা দিয়ে লোকটা বলে,

"আমাকে আঘাত করার অপরাধের শাস্তি ভোগ করার জন্য প্রস্তুত হোন মিস্টার সাদাফ রহমান। এই ভুলের মাশুল এবার আপনার রক্তমাংস থেকে নেওয়া হবে। আদালতে দেখা হচ্ছে তাহলে। টা-টা!"

আস্তে আস্তে চোখ লেগে আসে সাদাফের। পুরোপুরি চোখ বুজার আগে সে দেখে, সুট-বুট পরা লোকটা উঠে গিয়ে মিলিকে কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রচন্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সাদাফ বাধা দিতে পারছিল না। কিন্তু যখন লোকটা মিলিকে কাঁধে নিয়ে সাদাফের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন সাদাফ হাত বাড়িয়ে লোকটার পা ধরে ফেলে। তখনই কে যেন ভারী কিছু একটা দিয়ে খুব জোরে সাদাফের মাথায় আঘাত করে। অতঃপর সাদাফের চোখের কোলে নেমে আসে গাঢ় গভীর অন্ধকার। নতুন আগন্তুক সাদাফের নিশ্চল দেহটা টেনে টেনে নিয়ে যায় দূরে। তারপর...

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/507180601116183/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া