অচিনপুরের রাজকন্যা — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম৮ ডিসেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

ধীরে ধীরে চোখ খুলে যায় সাদাফের।

অদ্ভুত রকমের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে।

সামনে, অন্তত হাত দশেক দূরে সামান্য উঁচু জায়গা; দেখে মনে হচ্ছে উঁচু জায়গাটা বিশেষ কোনো পাথর কিংবা খাঁটি হিরে দিয়ে তৈরি। হুবহু হিরের মতোই দেখতে ইয়া বড়ো সাইজের পাথরটা ঝলমলে আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে। সেই পাথরের উপর একজন বয়স্ক লোক বুক টান করে দাঁড়িয়ে আছেন; তিনি বিচারক। তাঁর দু'পাশে অসংখ্য লোক দাঁড়িয়ে। সবাই দেখতে মানুষের মতোই। তবুও প্রথম দেখায় সাদাফের একটু অদ্ভুত লাগল। কেন জানি ওদেরকে মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। কী যেন একটা ব্যাপার আছে আলাদা...

একটু আগেও সাদাফের মাথায় চিটচিটে রক্ত লেগে ছিল।

সেটা পরিষ্কার করা হয়েছে। সাথে নতুন কাপড় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরনো জুতোগুলোও পরিবর্তন করা হয়েছে। এমনকি সাদাফের আন্ডারওয়্যারটাও...

সাদাফ অসহায়ভাবে তাকায়। কে খুলল তার কাপড়! কে পরিয়ে দিলো এসব! অজ্ঞান থাকা অবস্থায় তার সাথে আর কী কী করা হয়েছে কে জানে!

আরো একটুক্ষণ ঘোরলাগা অবস্থায় থাকার পর পরিষ্কার হয়ে আসে সব। এবেলা এক কাপ গরম চা হলে মন্দ হত না। যাকগে, সাদাফ ওই মানুষগুলোর ওপর দৃষ্টি রাখে। নাহ্, কেন জানি ওদেরকে স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। কিংবা এ-ও হতে পারে যে, ওরা আসলে মানুষই না, অন্য কিছু!

আরো মিনিট দুই কেটে যাবার পর অদ্ভুত ব্যাপারটা নজরে পড়ে। সাদাফ তীব্র আগ্রহ নিয়ে দেখে, ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলে ফের তাকায়। সাথে সাথে গভীর চিন্তায় পড়ে যায় সে...

আশ্চর্য! এদের চোখ তিনটা কেন!

সামনে দু'টা, পেছনে আরো একটা!

ওদের কথা শুনতে পেয়ে আরো অবাক হয়ে যায় সাদাফ।

ওরা একটা ভিন্ন ভাষায় কথা বলছে। ঠোঁট নড়ছে না তবুও গলা দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে। এভাবেই কথা বলছে ওরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাদাফ ওই অদ্ভুত ভাষা বুঝতে পারছে! ওরা বলছে,

"আসামির জ্ঞান ফিরেছে, এবার বিচারকাজ শুরু করা হোক।"

হিরের মতো পাথরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি অর্থাৎ বিচারক মহোদয় অদ্ভুত স্বরে বলেন, "আসামি সাদাফ রহমানের জ্ঞান ফিরেছে। বাদী এবং বিবাদী উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে বিচারকাজ শুরু করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী অনল, আপনার অভিযোগ?"

সুট-বুট পরা লোকটা, যে এক কোটি টাকার বিনিময়ে মিলিকে কিনে নিতে চেয়েছিল, সে একপাশে দাঁড়িয়ে। বিচারকের প্রশ্ন শুনে সে বলতে শুরু করে,

"মহোদয়, চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক আমাকে খুন করতে চেয়েছিলেন। এজন্য এই লোহার পাত দিয়ে তিনি দু'বার আমার পেটে আঘাত করেন। আমি এর বিচার চাই।"

"কীরকম বিচার করলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন?"

"মহোদয়, আমি চাই, উনি যে হাত দিয়ে আমাকে খুন করার উদ্দেশ্যে আঘাত করেছেন, সেই হাত কেটে ফেলা হোক। এবং পঙ্গু অবস্থায় তাঁকে পৃথিবীতে রেখে আসা হোক।"

'পৃথিবীতে রেখে আসা হোক।' কথাটা শুনেই সাদাফ বিচলিত হয়ে পড়ল। প্রচন্ড কৌতূহলে তার বুক, গলা সব শুকিয়ে গেল। অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে চারপাশ দেখে সবকিছু এলোমেলো লাগলো হলো তার। এরকম জায়গা সাদাফ আগে কখনো দেখেনি, টিভি-সিনেমাতেও না। তাহলে কি তাকে পৃথিবীর বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে!

"সম্মানিত অতিথি, আপনার বিরুদ্ধে আমাদের একজন অভিযোগ করেছেন। আপনি নাকি তাকে খুন করার উদ্দেশ্যে দু'বার আঘাত করেছেন। এখন উনি চাচ্ছে শাস্তি হিসেবে আপনার হাত যেন কেটে ফেলা হয়। এক্ষেত্রে আপনার কিছু বলার আছে?"

সাদাফও ওদের মতো অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতে পারল!

এলোমেলো ভঙ্গিতে সে বলল, "মহোদয়, উনি আমার বউকে কিনে নিতে চেয়েছিলেন, তাই আমি এমন করেছি।"

"কোনোকিছু কিনতে চাওয়া কি অপরাধ?"

বিচরকের প্রশ্নে ভাষা হারিয়ে ফেলে সাদাফ। বিব্রত গলায় বলে, "কিন্তু উনি একরকম জোরাজোরি করছিলেন। তাই আমি বাধ্য হয়ে..."

"তাহলে আপনি আপনার অপরাধ স্বীকার করছেন?"

সাদাফ কী বলবে ভেবে পায় না। অদ্ভুত রকমের আদালতের মুখোমুখি হয়েছে সে। এখানকার কোনো নিয়মকানুন তার জানা নেই। তবে এই অল্প সময়ের অভিজ্ঞতায় সে এতটুকু অনুধাবন করতে পারছে যে, এখানে উকিল বলতে কিছু নেই। বাদী, বিবাদী সবাই নিজেরা নিজেদের পক্ষে কথা বলে, লড়াই করে, আর্জি জানায়। আরো একটি বিষয় হচ্ছে, বিচারক বিচার করতে গিয়ে আসামি ও ভুক্তভোগী দুই পক্ষের মতামত নেন এবং সে-অনুযায়ী বিচার করেন।

বিচারক এবার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আপনাদের মতামত কী? অপরাধীর হাত কেটে ফেলাই উচিৎ হবে?"

সবাই জোড়ালো কণ্ঠে সম্মতি জানাল। বিচারক এবার সাদাফকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "কোন হাত দিয়ে আঘাত করেছেন আপনি?"

"বাঁ হাত।"

"উনার বাঁ হাত কেটে ফেলা হোক।"

বিচারকের নির্দেশ পেয়ে দু'জন এগিয়ে আসে। সাদাফ দুর্বল, বিমর্ষ চোখদু'টো মেলে অসহায় ভঙ্গিতে তাকায়। এগিয়ে আসা লোকদু'টো আস্তে করে সাদাফকে তুলে নিয়ে যায়।

ওরা যখন জেলখানার মতো একটা জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল, দু'পাশে অসংখ্য ঘরের মধ্যে একটি ঘরে চোখ আটকে যায় সাদাফের। লোহার গ্রিলের ভেতরে ছোট্ট ঘরটা। সেই ঘরের এক কোণে সামান্য উঁচু ছোট্ট খাটের উপর কাঁচুমাচু হয়ে শুয়ে আছে একটি মেয়ে। তাকে দেখে সংগত কারণেই আঁতকে উঠে সাদাফ। দু'পাশের লোকগুলো তাকে টেনে টেনে নিয়ে গেলেও সাদাফের দৃষ্টি আটকে থাকে ওই ঘরের ভেতরে শুয়ে থাকা ওই মেয়েটির ওপর।

আরো দু'পা এগিয়ে যাওয়ার আগেই সাদাফ ধস্তাধস্তি শুরু করে দেয়। "আমার বউ, আমার বউ।" বলতে বলতে সে পেছনে আসতে চায়। তাকে ধরে রাখা দু'জনে সমস্বরে বলে উঠে, "আপনার বউ? কোথায়?"

সাদাফ পেছনে গিয়ে বন্দি অবস্থায় ঘুমন্ত মিলিকে দেখিয়ে বলে, "আমার বউ।"

সাদাফকের ধরে আনা দু'জনে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। একজন আরেকজনকে বলে, "এই লোকটা তো পাগল!"

আরেকজন বলে, "পৃথিবীর সকল মানুষই পাগল।"

প্রথমজন অদ্ভুত সুরে বলে, "আমিও তা-ই শুনেছি। পৃথিবীর মানুষেরা নাকি সবকিছুকেই আমার আমার করে। যেমনটা এই লোকটা বলছে।"

ওদের কথা মাঝখাখানে বাধা দেয় সাদাফ। বলে, "আমি সত্যি বলছি। ও আমার বউ, আমার ওয়াইফ।"

ধরে আনা দু'জনের একজন মিলিকে দেখিয়ে বলে, "ওই কুমারী মেয়েটি আপনার বউ?" দ্বিতীয়জন ফিকফিক করে হেসে বলল, "স্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন। আজ আমাদের দলের একজনের সাথে এই মেয়েটির বিয়ে। আপনি কখনোই তাকে পাবেন না।"

প্রথমজন সায় দিয়ে বলল, "আজ আপনার হাত কেটে আপনাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সুতরাং এই মেয়েকে বিয়ে করার কথা ভুলে যান।" বলে হেঁচকা টান দেয়। সাদাফ প্রতিবাদ করে বলে, "কুমারী হবে কেন? সে আমার বউ। আর ওর বিয়ে হবে মানে? সে অলরেডি বিবাহিত। আমি ওর স্বামী।"

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/509897384177838/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া