অচিনপুরের রাজকন্যা — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম৩ ডিসেম্বর ২০২৫৩ মিনিট পড়াঅকস্মাৎ ঘুম ভেঙে গেল মিলির।
এখনও সাদাফের কাঁধের উপর মাথাটা কাত করে রেখেছে সে। চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে এক চিলতে ভোরের রৌদ্র এসে পড়েছে মিলির কোলের উপর। অথচ সূর্যটা এখনও ভালো করে উঁকি দেয়নি। জানালা পেরিয়ে ট্রেনের ভেতরে রোদ পড়তে ঢের বাকি। তাহলে আলোটা কীসের? মিলির কোলের উপর যেটুকু রোদ পড়েছে, সেটা কোত্থেকে আসছে?
কিঞ্চিত চিন্তিত হয়ে পড়লেও নিজেকে সামলে নেয় মিলি। ঘুমঘুম চোখে জানালার বাইরে তাকায় সে। বেশ তীব্র গতিতেই ছুটে চলেছে ট্রেনটা। এত গতি দেখেও মিলির অস্বাভাবিক লাগেনি। বাইরের দৃশ্যটা দেখে তার এখনও মনে হয়নি যে, তারা ভুল পথে এগিয়ে যাচ্ছে। একবারও তার চোখে পড়েনি যে, তার আশপাশে সাদাফ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই, পুরো ট্রেনটাই ফাঁকা! একবারও সে খেয়াল করেনি যে, ট্রেনটা মাটির উপর দিয়ে চলছে না, বরং শূন্যে ভাসছে!
সাদাফের হাতের উপর আলতো করে হাত রাখে মিলি। সঙ্গে সঙ্গে অজানা আতঙ্কে আঁতকে উঠে সাদাফ। তার এমন আঁতকে উঠা দেখে মিলি মিয়নো গলায় প্রশ্ন করে,
"কী হলো? ঠিক আছেন আপনি?"
"হুম।" মিলি যাতে বুঝতে না পারে তাই কোনোমতে হাসিমুখে জবাব দেয় সাদাফ। আতঙ্কে সাদাফের পুরো শরীর ঘেমে আছে। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। মিলি আলগোছে ওড়না দিয়ে সাদাফের কপাল, গলা মুছে দিতে গিয়ে আবিষ্কার করে, সাদাফের হার্টবিট অস্বাভাবিকরকম বেড়ে গেছে। সাদাফ স্বাভাবিক নেই। মিলির চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে মানুষটা।
ধীরে ধীরে চিন্তায় ডুবে যায় মিলি।
সে আসলে স্বাভাবিক না।
তার একটা বিশেষ সিক্রেট আছে, যা এখনও সাদাফকে বলা হয়নি। মিলি খুব করে চায়, তার সিক্রেট কেউ না জানুক, কেউ না শুনুক, না বুঝুক ওসব। তাইতো সাদাফকে বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে সে। অতি সাধারণ মানুষের মতোই চলাফেরা করছে। আরসব নতুন বউদের মতোই আচরণ করছে। যাতে সাদাফ ঘুনাক্ষরেও টের না পায়, তার বউ সাধারণ কেউ না। সে আসলে...
কালো সুট-বুট পরা একটা লোক এগিয়ে এসেছে।
লোকটার দু'হাতে দু'টো কফির মগ। সেগুলো হাসিমুখে সাদাফ এবং মিলির দিকে এগিয়ে দেয় লোকটা। ভেজা গলায় বলে, "সকাল সকাল ফার্স্টক্লাস কফি নিয়ে এলাম। ধন্যবাদ দিতে হবে না কিন্তু।"
বিগলিত হেসে কফির মগটা একরকম জোর করেই সাদাফের হাতে ধরিয়ে দেয় সে। সাদাফের একটু একটু সন্দেহ হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, কালো সুট-বুট পরা লোকটা কফি খাইয়ে খাতির জমিয়ে কিছু করতে চাচ্ছে। সে ভেবেছিল, কফির আড়ালে হয়তো বিশেষ কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, কোনো বিশেষ ফাঁদ পেতেছে লোকটা। কিন্তু রহস্যটা যে আসলে মগে রাখা গরম কফিতেই, তা সে চিন্তাও করেনি।
মিলি সাতপাঁচ না ভেবে কফির মগে চুমুক দেয়। সে যাতে সন্দেহ না করে তাই সাদাফও কফি উপভোগ করতে থাকে। এর ঠিক কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মিলি আস্তে করে সাদাফের কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে চোখ লেগে আসে তার। এইবার সেই রহস্যময় লোকটা সাদাফের মুখোমুখি বসে। পায়ের উপর পা তুলে গম্ভীর গলায় বলে,
"কফিতে বিষ ছিল।"
"হুয়াট!" সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠে সাদাফ। অবিশ্বাসী ভঙ্গিতে মিলির দিকে তাকায়। মিলি চোখ বুজে আছে। চেতনা নেই। সাদাফের হাত থরথর করে কাঁপতে থাকে। মিলিকে নাম ধরে ডাকতে গিয়ে গলা কেঁপে উঠে তার। দু'হাতে মিলির গাল চেপে ধরে মিলিকে আন্দোলিত করে আর্তনাদ করে ডাকে সাদাফ, "মিলি! এই! এই মিলি!"
ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে চুপ থাকার নির্দেশ দেয় লোকটা। নিচু আওয়াজে বলে, "আপনার বউ ঘুমাচ্ছে। তাকে ঘুমাতে দিন।"
সাদাফ ভীষণ রাগে ফোঁস করে উঠে, "কে আপনি? কেন এমন করছেন আমাদের সাথে? কী দোষ করেছি আমরা?"
লোকটা লাজুক হেসে বলে, "কুল ডাউন। আপনার বউ এখনও মরেনি। তার কফিতে বিষের সাথে ঘুমের ট্যাবলেটও দিয়েছিলাম। আপাতত সে ঘুমাচ্ছে। তার শরীরে বিষক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। বিষ কাজ করতে শুরু করবে আরো দু'ঘন্টা পর। তার ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে উনি মারা যাবে।"
"কিন্তু কেন আপনি এমন করলেন? কেন বিষ দিলেন ওর কফিতে?" বলতে বলতে সাদাফ একটু ঝিমিয়ে পড়ল। হুট করে তার ঘুম পাচ্ছে খুব। চোখদু'টো লেগে আসছে। অদ্ভুত লোকটা অভিজ্ঞ গলায় বলল, "আপনার কফিতেও ঘুমের ওষুধ ছিল। আগামী এক ঘন্টা আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন। এক ঘন্টা পর দেখা হচ্ছে।"
বলে উঠে যাচ্ছিল লোকটা। সাদাফ রাগে, ক্ষোভে কোনোমতে দাঁত চিবিয়ে বলল, "আপনি খুব জঘন্য একটা মানুষ।"
লোকটা চলে যাবার আগে সাদাফের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, "আমি মানুষ নই।"
চলবে
মো. ইয়াছিন
[প্রিয় পাঠক, আমার দু'টো বই এখন রকমারিতে এভেইলেবল৷ আপনারা চাইলে সেখান থেকে আমার বই সংগ্রহ করতে পারেন। সবার জন্য শুভকামনা।]
গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/506487024518874/?app=fbl