ফেরা — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম২৩ মার্চ ২০১৫৬ মিনিট পড়াপেছনে বিস্তর খোলা প্রান্তর, তারও পরে জলহীন, শস্যহীন মরা গাঁ, সেখানে একটি ছোট্ট কুটির, কুটিরে আমার এতিম তিন বোন, আমার অসহায় গরিব বাবা, মোটা সুতার বুননে কাপড় সবকিছু ফেলে সর্পিল গতিতে আমি যে কোথায় চলেছি, তা এই দু'দিনের সফরে বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারিনি।
বৃদ্ধ গাড়োয়ান গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। আজ দুপুরবেলা ছোট্ট মেয়েকে আমার খাবারটুকু দিয়ে দেওয়ার পর ভেবেছিলাম বাকিটুকু পথ বোধহয় জল পান করেই কাটিয়ে দিতে হবে। কিন্তু না, বৃদ্ধ গাড়োয়ান তাঁর খাবারের থলে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল। আজ রাতেও সে বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে।
আমি গাড়ির ভেতর থেকে অল্প মাথা বের করে বললাম, "পাহারা দেওয়ার কী দরকার? এদেশে হিংস্র পশু তো নেই।"
গাড়োয়ান ছোট্ট লণ্ঠন নিয়ে একটু দূরে চলে গিয়েছিল। আমার কথা শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল, "মানুষ থাকতে পশুর কী দরকার? এদেশের মানুষেরা পশুর চেয়েও হিংস্র। বুঝলে মেয়ে?"
মাঝরাতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেষরাতের দিকে গোঙ্গানির শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেল। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে চারদিকে চেয়ে দেখি এখনও অন্ধকার রয়ে গেছে। বয়সের ভাড়ে নুইয়ে পড়া গাড়োয়ান গাড়ির সামনের দিকটায় পা দুলিয়ে বসে হেঁচকি তুলে কাঁদছে। ওঁর পিঠে আলতো হাত রাখতেই ধড়মড়িয়ে উঠল।
"আপনি কি কাঁদছেন?" বলে প্রশ্ন করতেই বৃদ্ধ গাড়োয়ান মাথা ঘুরিয়ে ফোলা ফোলা চোখে আমার দিকে তাকালো। এই বৃদ্ধ লোক রাতের আঁধারে এমন আচমকা ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেন? সেটা আমি আকাশ পাতাল ভেবেও আবিষ্কার করতে পারলাম না।
বাবা আর বোনদের আহার জোগাতে বিক্রি হয়েছি আমি, ভাগ্যের নির্মমতায় নিজের দেশ ছেড়ে অজানা উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি আমি। অথচ কাঁদছে এই লোক! ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ গোলমেলেই লাগছিল, কিন্তু সে যখন আমাকে সব খুলে বলল, তখন আর কোনো সংশয় রইল না। বরং তীব্র আর্তনাদ আর চাপা দীর্ঘশ্বাসে আমার বুক ভারী হয়ে এল। সহসা টের পেলাম আমার চোখ বেয়ে জলের ধারা বইতে শুরু করেছে।
গাড়োয়ান কেন কাঁদছে? সেটা ওঁকেই জিজ্ঞেস করলাম। বৃদ্ধ গাড়োয়ান কাঁপা হাতে চোখের জল মুছতে মুছতে আমায় বলল,
"তুমি আজ দুপুরে যে মেয়েটির হাতে তোমার নিজের খাবার তুলে দিয়ে এসেছ ঠিক সেই বয়সি এক নাতনি ছিল আমার। বছরখানেক আগে একবার একদল বণিক ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে আমাদের গাঁয়ে এসেছিল। ওরা বিভিন্ন পণ্য, টাকাকড়ির বিনিময়ে খাবার বিলিয়ে দিচ্ছিল৷ আমাদের কাছে দেবার মতো কিছু নেই তাই আমরা খাবারও পেলাম না৷ কিন্তু আমার ছোট্ট নাতনি অবুঝ মেয়ে। খালি হাতে গেলে বণিকেরা খাবার দেবে না এটা ওকে কিছুতেই বোঝানো গেল না। সে একরকম অবাধ্য হয়েই বণিকদের তাঁবুর কাছে ছুটে গেল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে খালি হাতে যাওয়া সত্ত্বেও বণিকেরা বিনিময় ছাড়াই ওকে দু'হাত ভরতি খাবার দিয়ে দিলো। বাড়িতে ফিরে ওর কী আনন্দ! বণিকেরা খাবার দিয়েছে সেটা সবাইকে বলে বেড়াল। এবং সবার সামনে সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে সেই খাবারটুকু খেতে লাগলো।"
এইটুকু বলেই বৃদ্ধ গাড়োয়ান কী কারণে যেন বুকে হাত দিয়ে আহাজারি শুরু করে দিলো। ওর কান্না দেখে আমি বললাম, "বিনিময় ছাড়াই বণিক খাবার দিয়েছে সেটা তো ভালো কথা। আপনার নাতনি খুব খুশি হয়েই খাবারটুকু খেল। এখানে কান্না করার কী আছে?"
গাড়োয়ান আমাকে অবাক করে দিয়ে হাউমাউ করে বলল, "বণিকেরা খাবার দিয়েছে সেটা দেখে আমরাও খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু অমানুষ বণিকগুলো খাবারের সাথে ভাঙা কাচ মিশিয়ে দিয়েছে সেটা যদি জানতাম তাহলে কিছুতেই সেটা খেতে দিতাম না।"
কথা শুনেই আমি আঁতকে উঠলাম। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, "ভাঙা কাচ মিশিয়ে দিয়েছে মানে!"
"মানে আমার অবুঝ নাতনি খালি হাতে খাবার চাইতে গিয়েছিল বলে বণিকেরা খাবারের সাথে ভাঙা কাচ মিশিয়ে দিয়েছিল। আমার ছোট্ট নাতনি সেটা টের পায়নি। তাড়াহুড়ো করে অনেকটা খাবার গিলে ফেলার পর শুরু হলো অশান্তি। মেয়েটা কী যে কষ্ট পেয়েছে সেদিন! সারাটা রাত মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়েছে। সে কী যন্ত্রণা, কী আর্তনাদ! আ-হা-হা! সারাটা রাত গলাকাটা পশুর মতো ছটফট করেছে। ভোরবেলা ওর মৃত্যু হয়েছে।"
এটুকু বলে গাড়োয়ান হাঁটু ভাঁজ করে বসে হাঁটুর ভেতরে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো৷ আমি টের পেলাম, আমার চোখ বেয়ে জলের ধারা বইতে শুরু করেছে। বিষাক্ত দীর্ঘশ্বাসে ভরে উঠেছে বুক। মানুষ কতটা হিংস্র হতে পারে! ওরা কীভাবে পারল একটা ক্ষুধার্ত বাচ্চা মেয়েকে এমন নৃশংস মৃত্যু দিতে? কী নির্মম ছিল সেই মৃত্যু! কী নির্দয় ছিল সেই বণিকের দল!
এরপর টানা সাতদিন সর্পিল গতিতে চলার পর আমরা গন্তব্যে পৌঁছলাম। বিশাল বড়ো পাথুরে প্রবেশদ্বারের সামনে গাড়ি থামলে চারজন লোক পালকি সমেত এসে আমাকে নতুন বধুর মতো গ্রহণ করল। জলের অভাবে ফেটে চৌচির যে দেশ, যেখানে একবেলা খাবার পাবার লোভে লোকেরা নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিতে রাজি, যে মুলুকে সামান্য খেতে পেলে নিজের স্ত্রী-কন্যা বিক্রি করে দেয় সেই দেশে এমন বিশাল অট্টালিকা দেখে বিস্মিত হলাম। তার থেকেও বেশি বিস্মিত হলাম মাটির টবে সজ্জিত বাহারি ফুলের গাছ দেখে। যে দেশে একফোঁটা জলের অভাবে বৃক্ষ, লতা, ঘাস মরে সাফ হয়ে গেছে, যে দেশের কোথাও কোনো সবুজ পাতা খুঁজে পাওয়া যায় না সেই দেশে এমন সুন্দর ফুল ফুটল কীভাবে?
একটু পরে মহলের ভেতর থেকে অনেকগুলো অল্পবয়সি সুন্দরী মেয়ের দল বেরিয়ে এসে হাস্যোজ্জ্বল মুখে আমাকে বরণ করতে লাগলো। সামান্য মিষ্টি খাবার মুখে তুলে দিয়ে ওরা আমাকে সাধুবাদ জানাতে শুরু করল। আমাকে টেনে প্রাসাদের ভেতরে এক গুপ্ত গোসলখানায় গিয়ে গেল। সেখানে বড়ো মাটির পাত্রে টলটলে জল রাখা। মেয়েগুলো আমাকে বিন্দুমাত্র সময় না দিয়ে পাত্র থেকে জল নিয়ে আমার মাথায় ঢেলে দিলো। তারপর চারকোণা অথচ ছোটো সুগন্ধিযুক্ত কী একটা যেন আমার গায়ে ডলতে লাগলো।
এ কোথায় এসে পড়লাম আমি? এমন জগৎ যে হয় তা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। আমি কার কাছে বিক্রি হয়েছি? এই অট্টালিকায় আমাকে কেন নিয়ে আসা হলো? আর এই মেয়েগুলোই বা কে? এসব আকাশ পাতাল ভাবছি এরই মধ্যে মেয়েগুলো পাতলা শুকনো এবং পরিষ্কার কাপড় দিয়ে আমার মাথা মুছে দিলো। পরনের কাপড় পালটে দিয়ে একটি একলা ঘরে এনে ছেড়ে দিলো। যাবার সময় বলে গেল, এটা আমার বিশ্রাম করার ঘর। কাল সকালে ওরা আবার আসবে, তখন কথা হবে।
গভীর রাতে এক মেয়েলি কণ্ঠস্বর কানে বাজতেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। কে যেন খু্ব মিহি গলায় গুনগুন করে গান গাইছে। ঘর থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই আমার অবাক লাগলো। এত সুন্দর করে কেউ গান গাইতে আমি কোনোদিন শুনিনি। আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো অবশ হয়ে সেই মিহি কণ্ঠস্বরের টানে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
আরো একটু এগিয়ে যেতেই আসল ব্যাপার বুঝতে পারলাম।
ওটা গান নয়, গান কখনো এত সুমধুর হয় না। এই মাঝ রাত্তিরে গুনগুন করে কে যেন কোরআন পড়ছে। এমন বিমোহিত করতে পারা গলা কার? ভেবে আরো কয়েক কদম এগোতেই কণ্ঠস্বর আরো জোড়ালো হয়ে আমার কানে বিঁধতে থাকে। মেয়েলি কণ্ঠে পড়া কোরআনের বাণী আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খুব মিহি এবং কোমল গলার স্বর।
যে ঘর থেকে আওয়াজ আসছে সেই ঘরের সামনে এসে দেখি ভেতরে টিমটিমে আলো জ্বলছে। সেই আলোয় কুরআন পড়ছে একটি আঠারো-বিশ বছরের মেয়ে। মাথার উপর লম্বা ঘোমটা টেনে বসে বসে একনাগাড়ে পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটি কোরআন পড়ায় এতটাই ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েছে যে, আমি আলগোছে ওর কাছে গিয়ে বসেছি সেটা বিন্দুমাত্র টের পায়নি।
এ-ঘরের নিভুনিভু মৃদু আলোয় ঘোমটার আড়াল থেকে মেয়েটির ফরসা চেহারা উঁকি দিচ্ছে। মেয়েটির খুব কাছে বসে যখন বিমোহিত চোখে মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখে যাচ্ছি তখন ওর চোখের ওপর স্থির হয়ে থাকা ভীষণ ঘন ভ্রু যেন আচমকা কেঁপে উঠল। ভীত হরিণীর মতো চঞ্চল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠল,
"কে আপনি!"
আমি ওর হাতের উপর হাত রেখে চোখের ইশারায় শান্ত হতে বললাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি তবে একটু জানতে পারলাম এই মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শুনে খুশিই হয়েছিলাম কিন্তু মেয়েটি যখন বলল সে অবিবাহিত তখন সেটা শুনে আমি একরকম আঁতকে উঠলাম। চাপা গর্জন করে বললাম, "তাহলে এ বাচ্চা কার?"
প্রশ্ন শুনেই মেয়েটির চোখের কোলে জল জমে গেল। সে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে মোলায়েম অথচ বিষণ্ন গলায় বলল, "আমিও একদিন তোমার মতো বিক্রি হয়ে এখানে এসেছিলাম, বোন।"
এইটুকু বলে থেমে যেতেই আমি প্রবল উত্তেজনায় বলে উঠলাম, "তারপর? আমার মতো বিক্রি হয়ে এখানে এসেছিলে তারপর কী হলো?"
মেয়েটি জবাব দেবে তার আগেই একজন বয়স্ক মহিলা এগিয়ে এসে কড়া গলায় আমাকে শাসিয়ে বললেন, "এই মেয়ে, তুমি নিজের ঘর ছেড়ে এখানে এসেছ কেন?"
অতঃপর আমি মাথা নিচু করে নিজের ঘরে চলে যাচ্ছি। যেতে যেতে আকাশ পাতাল ভাবছি। অনেকগুলো প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্নগুলো পোকা হয়ে মাথার ভেতর কিলবিল করছে। আমি একবার পেছন ফিরেছি ঠিক তখনই বয়স্ক মহিলা ফের ধমক দিয়ে বললেন, "যাও এখান থেকে!"
চলবে
মো. ইয়াছিন