ফেরাঅতিপ্রাকৃত

ফেরা — পর্ব ৫

ইয়াছিন নাইম২০ জুলাই ২০২৬৪ মিনিট পড়া

মানুষের কত রকমের পরিচয় হয়। কেউ রাজা, কেউ বণিক, কেউ প্রজা, কেউ গাড়োয়ান, কেউ মা, কেউ বাবা, কেউ আবার বোন। আমি একসময় এক বৃদ্ধের মেয়ে ছিলাম, তিনটি ছোটো ছোটো মেয়ের বোন ছিলাম। কিন্তু এখন আমার একমাত্র পরিচয় আমি একজন দাসী। এর বাইরে আর কোনো পরিচয় নেই। এতদিন আমি রক্তে মাংসে গড়া মানুষ ছিলাম। কিন্তু এখন আমি আর মানুষ নই। বিক্রি হবার পর আমি বস্তু হয়ে গেছি।

আজ আমার দাসী জীবনের সাইত্রিশতম দিন। বিগত সাইত্রিশটি দিন আমি কেবল একটি কথাই ভাবতাম। আমাকে কিনে আনা হয়েছে কেন? শুধু আমি নই, আমার মতো প্রায় তিনশো মেয়েকে এখানে ফেলে রাখা হয়েছে। সবার মুখে ওই একটাই প্রশ্ন। কেন আনা হয়েছে আমাদের?

আজ এতদিন পর সেই প্রশ্নের জবাব পেলাম আমরা। আমাদেরকে এখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ফেলে রাখা হয়নি। বরং আমাদের সবাইকে কিনে এনে এখানে ফেলে রাখার পেছনে ছিল সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য৷

আজ থেকে নয়, গত দু'বছরে বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনশো মেয়েকে কিনে আনা হয়েছে। এবং একদল নিয়োগপ্রাপ্ত লোক সবগুলো মেয়েকে নজরে রেখেছে। দুপুরবেলা খাবার দেওয়ার সময় যখন সবগুলো মেয়েকে এক করা হত তখন সেই বিশেষ লোকগুলো আমাদেরকে দেখত। এমনকি প্রতি সপ্তাহে যখন সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হত তখনও তারা আমাদেরকে লক্ষ করত। ওদের মূল কাজ ছিল তিনশো মেয়ের মধ্য থেকে কুড়িজন সুন্দর, স্বচ্ছন্দ, বুদ্ধিমতী মেয়েকে খুঁজে বের করা যাদেরকে বাছাই করে মূল মহলে পাঠানো হবে। বাকি দুইশো আশিজন মেয়েকে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হবে।

আজ সকাল থেকে তোড়জোড় চলছে। আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে এক এক করে বাছাই করা হচ্ছে। লাইনের একদম শুরুতে কয়েকজন পুরুষ লোক দাঁড়িয়ে, যারা সবগুলো মেয়ের আকার, আকৃতি, ওজন, উচ্চতা পরখ করে বাছাই করছে। আমার সামনে আর মাত্র তিনটি মেয়ে। তারপর আমার পালা।

গর্ভবতী মেয়েটিকে দেখে ওরা কোনোরকম মাপজোখ না করেই ওকে আলাদা করে ফেলল। দু'জন লোক এসে মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যাবে ঠিক তখনই মেয়েটি মাটিতে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিলো। ওই লোকগুলোর পা জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো নিস্তার চাইলো। কিন্তু সেটা তার কপালে ছিল না। নির্দয় লোকগুলো তাকে টানতে টানতে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। ওদিকে একটা বিশাল ঘর আছে। কেউ অপরাধ করলে সেই ঘরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। লোকগুলো গর্ভবতী মেয়েটিকে ওইদিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দেখে ওর কান্না আরো বেড়ে গেল। ওর বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ বাতাস কেঁপে কেঁপে উঠল বহুবার। কিন্তু শেষ নিস্তার আর হলো না। ওই ঘরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। মেয়েটি শেষবার মরন যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল৷ তারপর গভীর নিঃস্তব্ধতা।

আর মাত্র কয়েকটা দিন পর বাচ্চাটা জন্ম নিত। কিন্তু তাকে আর সেই সুযোগ দেওয়া হলো না৷ এই পৃথিবীর বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তা আর দেখা হলো না তার।

দুপুরের সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার আগেই বাছাই কাজ শেষ হলো। বাছাইকৃত উনিশজন মেয়েদের মাঝে আমি একজন। আমাদেরকে আলাদা একটি সারিতে দাঁড় করানো হয়েছে। কথা ছিল বিশজন মেয়েকে আলাদা করবে। কিন্তু এখন একজন কম কেন, সেটা বুঝে উঠতে পারলাম না।

বাদ পড়া মেয়েগুলোকে আলাদা আলাদা সারিতে দাঁড় করে রাখা হয়েছে। আমরা ভিন্ন সারিতে৷ এতদিন আমরা যারা একসাথে ছিলাম, আজ একটু পরে আমাদের সবার গন্তব্য ভিন্ন হয়ে যাবে। ওরা কে কোথায় যাবে সেটা কারোরই জানা নেই। তবে আমাদেরকে ভেতরের মহলে প্রেরণ করা হবে।

অত্যাচার করার ঘরটা থেকে একটি মেয়ে পা টেনে টেনে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। সেই গর্ভবতী মেয়েটি। ওর দু' পায়ে চিটচিটে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে। চেহারায় দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। শরীর থরথর করে কাঁপছে। কাছে এসে আমার হাতের উপর ওর দুর্বল কাঁপা হাতগুলো রেখে বলল, "ওরা আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলল বোন। আমি আকাশের মালিকের কাছে বিচার দিলাম, তিনি যেন এদের সবাইকে ততটাই শাস্তি দেন যতটা এরা আমার বাচ্চাকে দিয়েছে।"

এইটুকু বলেই মেয়েটি ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। ওর মুখের ওপর ঝুঁকে বসে দেখলাম জ্ঞান হারিয়েছে। মেয়েটির শরীর থেকে প্রবল রক্তক্ষণ হয়েছে। ওর কোমড় থেকে পা অবধি জমাট বাঁধা রক্ত লেগে আছে। শরীরটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। হাত-পা ভীষণ রকম ঠান্ডা। তবে সে এখনও মারা যায়নি। দুঃখী মানুষ সহজে মরে না। সারাটা জীবন কেবল দুঃখ বয়ে বেড়ায়। এই মেয়েটিও বোধহয় মরবে না। দুঃখ বয়ে বেড়াবে।

আমরা এতদিন যেখানে ছিলাম সেখান থেকে প্রায় পাঁচশো গজ দূরে আরো একটি মহল আছে। সেই মহলে আমাদেরকে আনা হয়েছে। সেই গর্ভবতী মেয়েটি সহ আমরা মোট বিশজন এখানে এসেছি। যদিও মেয়েটি এখন আর গর্ভবতী নেই। ওর পেটের সন্তানকে মেরে ফেলা হয়েছে। মেয়েটি তাই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান ফিরলে, "আমার বাচ্চা কই? আমার পেটে বাচ্চা নেই কেন?" বলতে বলতে ফের অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। ওর বৃদ্ধা মা এখানে নেই। উনাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেচারি অভাগী মেয়েটি আজ নিজের মা এবং নিজের পেটের সন্তান দু'জনকে একসাথে হারালো। তাকে ঘিরে বসে আছি আমরা উনিশজন। কেউ কেউ ওর হাত-পায়ের তালু গরম করার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ জ্ঞান ফেরার পর কীভাবে সান্ত্বনা দেবে সেই অনুশীলন করছে। কেউ আবার হতবুদ্ধি হয়ে হাঁ করে চেয়ে আছে।

উত্তরের খাঁজকাটা জানালার কাছে দাঁড়িয়েছি আমি। বাইরে অমাবস্যার অন্ধকার নেমেছে। তবুও অনেক দূর থেকে চারজন লোক এগিয়ে আসছে সেটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। চারটা কালোকালো অবয়ব ধীরে ধীরে আমাদের মহলের দিকে আসছে। লোকগুলো মহলের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করে নিল। তারপর একসাথে মহলের সদর দরজার সামনে এসে উপস্থিত হলো।

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=733890418445199&id=100054727422264&mibextid=Nif5oz

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া