ফেরাঅতিপ্রাকৃত

ফেরা — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম৫ মার্চ ২০১৫৪ মিনিট পড়া

উনিশ বছর আগে পৃথিবীর নতুন মেহমান হয়ে যে দেশে জন্মেছিলাম, আজ আমি সেই দেশ ছেড়ে কোথায় গা ভাসিয়েছি তা আর জানা হলো না। আমাকে নিতে আসা বৃদ্ধ গাড়োয়ান তার পশুর গাড়ি ছুটিয়ে এগিয়ে চলেছে বিস্তর খোলা প্রান্তরের দিকে। গাড়োয়ানের বয়স হয়েছে। পাক ধরা চুল আর কুঁজো হয়ে বসার ভঙ্গিতে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট।

গাড়োয়ান যেমন বুড়ো ওঁর পশুটা তেমনি বয়স্ক। স্লথ গতিতে টেনে টেনে চলছে সেটা। বোঝাই যাচ্ছে পশুটির গায়ে বল নেই। এরচে' পায়ে হাঁটলে আরো দ্রুত এগোনো যায়।

মাঝরাতে চলা থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পালা। বৃদ্ধ গাড়োয়ান আমাকে বলল, "রাতে আর সামনে এগোব না। তুমি ঘুমোও। আমি পাহারা দিচ্ছি।"

বলে লণ্ঠন আর লাঠি হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সে। আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই ধু ধু ফাঁকা প্রান্তরে পাহারা দিতে হবে কেন? এখানে তো এমন কোনো পশু নেই যা রাতের অন্ধকারে আমাদের ওপর হামলা করতে পারে। তাহলে কার ভয়ে রাত জেগে পাহারা দেবে বুড়ো? শুধু শুধু নিশাচর হয়ে ঘুরে বেড়ানোর মানে হয়?

আমার এইসব প্রশ্নের জবাব যখন আমি পেলাম, তখন আর বুড়োর প্রতি ভুল বোঝাবুঝি রইল না। বরং বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া এই বৃদ্ধ গাড়োয়ানের প্রতি বুকভরা শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এল।

ভোরবেলা থেকে আবার গাড়ি চলছে। দুপুর গড়িয়ে যখন সূর্যটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়তে শুরু করেছে তখন আমরা সেই জলের ফোয়ারার কাছাকাছি জায়গায় উপস্থিত হলাম। গাড়োয়ানকে ফোয়ারার কথা বললে সে-কথা বিশ্বাসই করতে চাইল না। বরং সহাস্যে বলে উঠল, "এই মরা ভূমিতে জলের ফোয়ারা? জেগে জেগে খোয়াব দ্যাখছো নাকি মেয়ে?"

ওঁর বিদ্রুপমাখা হাসি টপকে শান্ত গলায় আমি সব খুলে বললাম। মাসে দু'বার জল নিয়ে সেই জল দিয়ে কীভাবে সারা মাস কাটাতাম সেই কথাও বললাম তাঁকে। আমাদের আহার্য এখন শুকনো খাদ্যশস্য, ফসলি দানা ইত্যাদি। তাই হাঁড়িতে জল দিতে হয় না, বাসন ধোয়ার ঝামেলাও নেই এবং আমরা যেহেতু এতই গরিব যে, আমাদের বাড়তি কাপড়ও নেই সুতরাং সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করার জন্যও জলের প্রয়োজন হয় না। মাসে দু'বার এসে কাপড় সমেত গা ভেজালেই হয়ে যায়। তাই মাসে দু'বার এখানে এসে জল নিতাম আমরা। অনেক দূর হওয়ায় এখানে যেদিন আসতাম সেদিন আর ফিরে যেতে পারতাম না। এখানে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে রওনা হতাম।

আমরা দুই বোন এখানে রাত কাটাতাম শুনে বৃদ্ধ গাড়োয়ান আতঁকে উঠল। ওঁর আতঙ্কিত চেহারা দেখে আমি খুব অবাক হলাম। এখানে এতটা ভয় পাবার কী আছে? সেটা আমি এখনই বুঝতে পারলাম না।

আমার সব কথা শুনে গাড়োয়ান শেষমেশ বিশ্বাস করল যে, এখানে সত্যিই জলের ফোয়ারা আছে। একটি ছোট্ট পাত্র নিয়ে সে গরম বালির উপর দিয়ে ফোয়ারার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।

খোলা মাঠের মাঝখানে গাড়ি থেমে আছে দেখে কোত্থেকে যেন একটি পুঁচকে মেয়ে সামনে এগিয়ে এল। সে-ও হয়তো তার মা কিংবা বোনের সাথে জল নিতে এসেছে। গাড়ি দেখে পালিয়ে এসেছে সেখান থেকে। ওর পরনে ছোট্ট ঢিলেঢালা পুরনো ময়লা হাফপ্যান্ট। গায়ে কাপড় নেই। মাথায় অযত্নে বেড়ে ওঠা এক খাবলা জট পাকানো লালটে চুল। চোখের মণি তামাটে। গায়ের রং ফরসা তবে সূর্যের তেজি আলোয় চামড়া ঝলসে লালটে হয়ে গেছে।

ওর শুকনো ঠোঁটদু'টো বহুদিন পেট ভরে খেতে না পাওয়ার নির্মমতার সাক্ষী। সজ্জিত গাড়ি দেখে সে হয়তো ভেবেছে, এই গাড়িতে করে হয়তো কোনো এক সাহেবের বউ যাচ্ছে। এবং সম্ভবত সামান্য খেতে পাওয়ার লোভেই সে গাড়ির সামনে হাত পেতে দাঁড়িয়েছে।

আমার কাছে দু'টা মুদ্রা আছে। সেগুলো ওর হাতে তুলে দিলাম। ছোটো মেয়েটি মুদ্রাগুলো হাতে তুলে নিয়ে সেগুলোর এপিট ওপিট দেখে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালো। সে এই মুদ্রার ব্যবহার জানে না।

এই ছোট্ট মেয়েটির জন্মের আগে একসময় এদেশে মুদ্রার বিনিময়ে জিনিসপত্র ক্রয় করা যেত। কিন্তু দুর্ভিক্ষের পর যখন এদেশে তুমুল খাদ্যাভাব দেখা দিলো তখন মুদ্রার ব্যবহার ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে লাগলো। যে দেশে খাবার মতো কিছু নেই সেখানে মুদ্রা দিয়ে কী হবে? একসময় যার অনেক টাকা ছিল সে-ও তার সমস্ত উপার্জন দিয়ে একমুঠো খাবার পায়নি। সেই সুযোগে অন্য মুলুক থেকে আসা বণিকের দল এদেশের অসহায় মানুষদের ঠকিয়ে সামান্য খাদ্যের বিনিময়ে তাদের সমস্ত অর্জিত সম্পদ বস্তায় ভরে নিয়ে যেতে লাগলো। এখন আর মুদ্রার চল নেই। চলে শুকনো খাবার। একমুঠো আহার্য পেলে এরা নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিতে রাজি। একসময় যার অঢেল সম্পদ ছিল, অর্থ বিত্তের দাপটে মাটিতে পা পড়ত না, ফসলি সৌসুমে যার ফসল ঘরে তুলতে অন্তত অর্ধশত মজুর দিনরাত পরিশ্রম করত সে-ও সামান্য খাবারের বিনিময়ে সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে আজ নিঃস্ব।

এমনই এক আকাল পড়া দেশে জন্ম নেওয়া এই ছোট্ট মেয়েটি কী করবে এই দু'টা মুদ্রা নিয়ে? সে হয়ত জানেই না এটা দিয়ে কী করতে হয়। তাইতো মুদ্রাগুলো হাতে পাওয়া সত্ত্বেও হাত বাড়ালো ফিরিয়ে দেবার জন্য। ওর অসহায় চাহনি দেখে আমার খুব মায়া হলো। গাড়িতে ছোট্ট থলের মধ্যে সামান্য শুকনো খাবার রাখা আছে। সেগুলো বের করে মেয়েটির হাতে দিলাম।

গাড়োয়ান ততক্ষণে জল নিয়ে চলে এসেছে৷ আমি আমার খাবার এই মেয়েটির হাতে তুলে দিচ্ছি দেখে অনেক বড়ো সর্বনাশ হয়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠে গাড়োয়ান বলল, "এটা কী হচ্ছে! সব খাবার একে দিয়ে দিলে বাকিটা পথ খাবে কী?"

আমি ওঁর কথায় পাত্তা না দিয়ে এদেশের দুঃখী ছোট্ট মেয়েটির মলিন মুখের দিকে তাকালাম। মেয়েটির চোখে জল! খাবারের থলে হাত থেকে নামিয়ে রেখে আচমকা সে আমার ওপর লাফিয়ে পড়ল। ছোটো দু'হাতে শক্ত করে আমায় জড়িয়ে ধরে সে কী ভয়ানক কান্না! যে দেশে এক চিমটি খাবার পেলে সবাই কাড়াকাড়ি শুরু করে দেয় সেখানে আমি নিজের খাবার ওর হাতে তুলে দেব তা হয়তো সে কল্পনাও করতে পারেনি। নিরীহ মেয়েটির কান্না দেখে আমার চোখগুলোও কেমন ঝাঁপসা হয়ে গেল। আমি মমতাময়ী মায়ের মতন ওকে শক্ত করে বুকের সাথে মিশিয়ে রাখলাম। ফুঁপাতে ফুঁপাতে একসময় শান্ত হলো সে। শীর্ণ হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছেতে মুছতে মুচকি হাসলো সে। আমি ওর মাথায় আলতো হাত রেখে বললাম, "খুশি?"

সে দ্বিগুণ হেসে আরো একবার দুম করে আমাকে আলিঙ্গন করল। তারপর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খাবারের থলে হাতে চলে গেল। গাড়োয়ান গাড়ি ছুটিয়ে দিলে অনেক্ষণ কোনো কথা হলো না। তবে আমি আচমকা টের পেলাম, বৃদ্ধ গাড়োয়ান নিঃশব্দে হু হু করে কাঁদছে!

চলবে

[কমেন্ট বক্সে অনেক অনেক প্রশ্ন পেয়েছি। সেগুলো জবাব আমি লেখার মাধ্যমেই দেব। সবার জন্য শুভকামনা।]

মো. ইয়াছিন

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া