ফেরাঅতিপ্রাকৃত

ফেরা — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম২৯ মার্চ ২০১৫৫ মিনিট পড়া

অমাবস্যার অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে সিপাহির পোশাক পরা চারটি ছায়ামূর্তি মহলের সামনে এসে দাঁড়ালো। ওদের চারজনই চঞ্চল চোখে বারবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে একজন অতি সন্তর্পণে মহলের দরজায় করাঘাত করেছে। আরো একবার দরজায় টুকা দিতে যাবে তার আগেই চতুষ্কোণ দরজা দু'টি আস্তে আস্তে খুলে যেতে লাগলো।

আমি একটু আগে মহলের ছোট্ট জানালা দিয়ে ওদের চারজনকে আসতে দেখেছি। অন্ধকারে কারোর চেহারা দেখতে না পারলেও ওদের পোশাক দেখে ধরেই নিয়েছিলাম যে ওরা চারজনই সিপাহি। কিন্তু দরজা খুলে দিয়ে আমি তীব্র বিস্ময়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়লাম। কারণ আমার সামনে যে চারজন দাঁড়িয়ে আছে ওরা সবাই মেয়ে!

মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলব তার আগেই ওদের একজন চাদরের আড়াল থেকে রক্তমাখা তরবারি বের করে সেটা মাথার ওপর বাগিয়ে ধরে হুংকার দিয়ে বলল, "কেউ আওয়াজ করবে না। চিৎকার দিলে মুণ্ডু কাটা যাবে।"

পেছন থেকে একজন এগিয়ে এসে মহলের ভেতরে ঢুকে তক্তপোশে পা ছড়িয়ে বসল। মাথার পাগড়িটা সরিয়ে নিতেই একগাদা এলোমেলো চুল বাঁধভাঙা জলের মতো ওর পিঠের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। শান্ত চোখে এদিক ওদিক পরখ করে নিলো এক পলক। তারপর কতকটা গম্ভীর এবং রুষ্ট গলায় বলল, "এগারোজন সিপাহিকে মেরে আমরা এখানে এসেছি। আমাদের পরনে মৃত সিপাহিদের পোশাক দেখে তোমরা আমাদেরকে সিপাহি ভেবে ভুল করো না। আমরা বিদ্রোহী।"

মহলের ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। আমাদের বিশজন একসাথে জড়ো হয়ে বসলাম। পাগড়ি খোলা মেয়েটি ফের বলতে শুরু করল, "আমরা খুব বেশি সময় এখানে নিরাপদ নই। যেকোনো সময় সিপাহি খুনের খবর জানাজানি হয়ে যেতে পারে। তখন বাকি সিপাহিরা আমাদেরকে খুঁজতে বের হয়ে যাবে। ওরা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমরা ওদের সাথে লড়াই করে পারব না। তাই যা করার খুব দ্রুত করতে হবে।"

"কী করব আমরা?" আমাদের একজন উৎসুক ভঙ্গিতে বলে উঠল। পাগড়ি খোলা মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "যুদ্ধ।" একটু থেমে বলল, "যুদ্ধ করব আমরা।"

আমি বললাম, "আমি কোনোদিন তরবারি হাতে তুলিনি। যুদ্ধ করব কীভাবে?"

সঙ্গে সঙ্গে পাগড়ি খোলা মেয়েটি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি আজকের আগে কোনোদিন মানুষ খুন করিনি। কিন্তু আজ এক হাতে সাতজন সিপাহিকে হত্যা করেছি। আমি পারলে তুমি পারবে না কেন? নিশ্চয়ই পারবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তোমার হাতে কোনো তরবারি নেই। তুমি খালি হাতে যুদ্ধ করবে। কিন্তু তোমার শত্রুদের হাতে ঢাল তলোয়ার সবই আছে। একটু পর শত শত সশস্ত্র সৈন্য এই মহলের দিকে মৌমাছির মতো ধেয়ে আসবে। তখন তুমি লড়াই করবে না কি মৃত্যুর কাছে মাথা নুইয়ে দেবে সেই সিদ্ধান্ত তোমার নিজের।"

অন্য একজন বলে উঠল, "কিন্তু আমরা বিদ্রোহ করব কেন?"

পাগড়ি খোলা মেয়েটি ফের তক্তপোশে পা ছড়িয়ে বসল। শান্ত গলায় বলতে শুরু করল, "অন্যায় করা যেমন পাপ, অন্যায় দেখে সেটা চুপচাপ সহ্য করাও সমান পাপ। আমরা চুপচাপ অন্যায় সহ্য করে পাপের অংশীদার হতে চাই না। তাই বিদ্রোহ করব। এটা আমাদের দেশ, দীর্ঘদিন না খেতে পাওয়া দুঃখী নাগরিকদের দেশ, তেমনি এখানকার রাজা আর রাজ কর্মচারীদের দেশ। এদেশের সবকিছুর ওপর আমাদের সকলের সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের অধিকার কতটুকু পেয়েছি? এদেশের রাজা তার রাজ কর্মচারীদের কথায় শুধুমাত্র নিজেদের ফায়দার জন্য দেশের সব সম্পদ বাইরের বণিকদের নিকট বিক্রি করে করে আজ দেশের এই হাল করেছে। এই দেশ আগে এমন ছিল না। আমাদের এই দেশ একদিন উর্বর ছিল। এই দেশে একসময় বৃষ্টি হত, ফসল ফলত, এই দেশের মানুষের মুখে একদিন হাসি ছিল, এই দেশেও একদিন পাখি ডাকত, এই দেশেও একদিন সুখ শান্তি ছিল। কিন্তু এই রাজা তার কর্মচারীদের কথা শুনে নিজেদের লাভের জন্য দেশের সব মূল্যবান সম্পদ বাইরের বণিকদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। পাহাড় বনের যত বড়ো বড়ো বৃক্ষ সব কেটে উজাড় করে ফেলেছে। এদেশে পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য রাজপাই পাখি ছিল অর্থের বিনিময়ে সেইসব পাখি ধরবার অনুমতি দিয়েছে। শিকারিরা এক বছরের মধ্যে সব পাখি ধরে এ-দেশটাকে পাখিশূন্য করে ফেলেছে। এভাবে যত পশু, পাখি, জলের উৎস সবকিছু একে একে বাইরের বণিকদের হস্তগত করেছে। বণিকেরা যে যার মতো ব্যবহার করে অল্প সময়ের মধ্যে প্রকৃতি পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রকৃতি এবার বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। তাই বছরের পর বছর ধরে বৃষ্টি হয় না, ফসল ফলে না, ফুল ফোটে না, পাখি ডাকে না। সব শেষ হতে হতে এখন যা বাকি আছে তা হলো এদেশের অসহায় মানুষ। এখন সেই মানুষেরা বাধ্য হয়ে বণিকদের কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। অথচ এদেশে একজন রাজা থাকা সত্ত্বেও সে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কারণ বণিকেরা মানুষ কেনাবেচা করে অর্থ কামিয়ে তার সামান্য অংশ ভেট হিসেবে রাজবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তাতেই আমাদের রাজা সন্তুষ্ট। প্রজাদের সুখ দুঃখে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। এইসব বেচাবিক্রির ফলে রাজ কর্মচারীরাও সামান্য ভেট পায়। তাই তারা বণিকের পক্ষে কথা বলে। দেশের মানুষেরা জলের অভাবে হাহাকার করলেও এরা কিন্তু ঠিকই বিক্রি করা জলের উৎস থেকে জল আনার সুযোগ পায়। কিছুদিন পরপর অসংখ্য লোক পাঠিয়ে সেখান থেকে জল আনিয়ে আরামে দিনপাত করে। সাধারণ প্রজাদের কথা এরা চিন্তাও করে না। তাই আমরা বিদ্রোহী। যে রাজা তার সাধারণ গরিব প্রজাদের কথা ভাবে না তাকে আমরা রাজা মানি না। আমরা লড়াই করব, মরব। তবুও দুঃখী প্রজাদের রক্ত বিক্রি করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার জবাব দেব।"

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো মেয়েটি। আমি বললাম, "কিন্তু আমাদেরকে এখানে আনা হয়েছে কেন?"

"তোমাদেরকে আনা হয়েছে ব্যবহার করার জন্য। রাজা এবং তার কর্মচারীরা যে যখন যেভাবে পারে তোমাদেরকে ব্যবহার করবে। আজই তোমাদের জীবনের শেষ সুখের দিন ছিল। কাল সকালবেলা তোমাদেরকে রাজ মহলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কাল রাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কারা রাজার বিছানায় যাবে আর কারা তার কর্মচারীর। কিন্তু আমরা তা হতে দিচ্ছি না। আমরা লড়াই করব। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তোমরা কি আমাদের সাথে লড়াইয়ে যোগ দেবে?"

প্রশ্নটা সবার কানে গেলেও কেউ এর জবাব দিলাম না৷ মেয়েটি এবার জোরে বলল, "তোমরা কি আমাদের সাথে বিদ্রোহ করবে?"

এবারও কেউ কোনো কথা বললাম না। সবাই চুপচাপ বসে আছি। মাঝেমাঝে আঁড়চোখে এর ওর দিকে তাকাচ্ছি। তবে কেউ টু শব্দও করছি না। এভাবে মিনিট দু'-এক কেটে গেছে। হঠাৎ গর্ভাবস্থায় নির্যাতিত হওয়া সেই মেয়েটি নিবিড় কণ্ঠে বলে উঠল, "আমি আমার সন্তান হত্যার বদলা নেব। আমি বিদ্রোহ করব।"

একটু পর আরো একজন বলে উঠল, "আমিও আছি।"

তারপর আরো একজন হাত তুলল। তারপর আরেকজন। এভাবে একে একে আমরা সবাই রাজি হয়ে গেলাম। সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, "আমরা বিদ্রোহী।"

পাগড়ি খোলা মেয়েটি এবার বলল, "সবার আগে অস্ত্রাগার লুট করতে হবে। আমরা মোট চব্বিশজন মানুষ আছি। বিশজন যাব অস্ত্রাগার লুট করতে। বাকি চারজন সেনানিবাসে আগুন দিতে যাবে। সেনানিবাসের চারদিক থেকে যখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকবে তখন আমরা অস্ত্রাগার লুট করে ফেলব। ততক্ষণে সৈন্যদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে যাবে। আগুনে পুড়ে মরতে মরতে যে ক'জন বাকি থাকবে তাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করব আমরা।"

পিপিলিকার মতো সারিবদ্ধ হয়ে পিলপিল পায়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি। কেউ যেন টের না পায়। আর মাত্র একশো গজ দূরে অস্ত্রাগার। সেখানে গিয়ে লুটপাট করব আমরা।

এতক্ষণে চারজন মেয়ে সেনানিবাসের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। একটু পরে সেনানিবাসের চারদিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠবে। কালো ধোঁয়ায় ভরে উঠবে চারপাশ। আগুনের তাপে সৈন্যরা দিশেহারা হয়ে ছুটতে থাকবে। একসময় সেখান থেকে বেরিয়েও আসবে। তারপর শুরু হবে আসল বিপদ। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠবে সেনা সদস্যরা। ঢাল তলোয়ার হাতে তুলে নিয়ে শত শত সৈন্য বাহিনী মৌমাছির দলের মতো ছুটে আসবে আমাদের দিকে। তারপর? তারপর কী যে হবে, কে তা জানে!

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=743314497502791&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া