ফেরাঅতিপ্রাকৃত

ফেরা — পর্ব ৭

ইয়াছিন নাইম২৭ জুলাই ২০২৬১০ মিনিট পড়া

রাত গভীর।

বৃহৎ সেনানিবাসে অন্তত আড়াইশো সৈন্যবাহিনী বুঁদ হয়ে ঘুমুচ্ছে। একটু আগেও পুরো সেনানিবাস অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু এখন জ্বলন্ত আগুনের ফুলকি দাউদাউ করে আকাশের বুকে উঁকি দিচ্ছে। চারিদিক থেকে সমানে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান শিখা লকলকিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রচন্ড উত্তাপে আর পোড়া গন্ধে কয়েকজন সৈন্যের ঘুম ভেঙে গেলে অকস্মাৎ এই অবস্থা দেখে হাত পা ছুড়ে চিৎকার করতে করতে এখান থেকে বের হবার রাস্তা খুঁজতে শুরু করল ওরা।

কিন্তু কোথা দিয়ে পালাবে? যেদিকেই যায় শুধু আগুন আর আগুন। উত্তাপ, ধোঁয়া আর চিৎকারে সব সৈন্যের ঘুম ভেঙে গেলে ঝামেলা আরো বাড়ল। সবাই একত্রে হট্টগোল শুরু করে দিলো। কে কাকে ফেলে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে যাবে এই ভেবে সকলে দিশাহীন হয়ে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু কোথাও এইটুকু ফাঁক নেই। এদিকে আরো কয়েক মিনিট এখানে থাকলে সবাইকে মারা পড়তে হবে।

দূর থেকে আগুন আর ধোঁয়া দেখতে পেয়ে আমরা সকলে থমকে দাঁড়ালাম। তার মানে, যে চারজন সেনানিবাসে আগুন দিতে গিয়েছিল ওরা সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছে। আমরা অস্ত্রাগারের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকছি এমন সময় একটা বিকট শব্দে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল। এটা সতর্ক শব্দ। এইবার সবাই জাগ্রত হয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসবে।

আমরা অস্ত্রাগার থেকে যে যা পারি তুলে নিলাম। ততক্ষণে একঝাঁক পদাতিক বাহিনী শত্রু মোকাবিলা করতে বেরিয়ে পড়েছে।

আমাদের জন্য সুখবর হলো, এই পদাতিক বাহিনীর দল আমাদের অবস্থান জানে না। এই গভীর কালো রাতে ওদের শত্রু অর্থাৎ আমরা ঠিক কোন দিকে আছি এবং কতজন আছি তা ওদের ধারণার বাইরে।

গুম গুম শব্দটা এখনও চারপাশের সবাইকে সতর্ক করে দিচ্ছে। সেই আওয়াজে মূল প্রবেশদ্বারের রক্ষীরাও সচেতন হয়ে পড়েছে। আমরা অস্ত্রাগারকেই নিজেদের ঘাঁটি করেছি। লুট করে নেওয়া সব অস্ত্রশস্ত্র হাতে রেখে সেই চারটি মেয়ের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা ভেবেছিলাম, সেনানিবাসে মজুদ সৈন্যগুলো প্রাণ বাঁচাতে আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত থাকবে। আর সেই সুযোগে সরাসরি রাজমহলে হামলা করব। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে তখন ভিন্ন কিছু লেখা হয়ে গিয়েছিল, তা কি কেউ জানত?

সতর্ক শব্দ থেমে গেছে। দূরের সেনানিবাস এখনও দাউদাউ করে পুড়ছে। ইতোমধ্যে অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামী কয়েক মিনিটের মধ্যে যদি সেই চারটি মেয়ে ফিরে না আসে তবে তারা মারা পড়েছে ধরে নিয়ে আমরা রাজমহলের দিকে এগোব।

কিন্তু কিছু সময় পরেই সেই চারটি মেয়েকে দেখা গেল। আলোর মশাল হাতে করে এগিয়ে আসছে ওরা। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ওরা চারজনেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। ব্যাপারটা ভালোমতো লক্ষ করার আগেই ওদের একজন ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে বলে উঠল, "পালিয়ে যাও। ওরা তোমাদেরকে মেরে ফেলবে।"

ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে কে যেন মেয়েটির পিঠে চাবুক মেরে বসল। অনেক দূর থেকে মশালের সামান্য আলোয় দেখলাম, কতগুলো সৈন্য সেই মেয়েদের পিছু পিছু আসছে। মেয়েগুলো থেমে গেলে পিঠে চাবুক মারছে। এটা দেখে নেতাগোছের সেই মেয়েটি মাথার উপর তরোয়াল বাগিয়ে ধরে সবার আগে অগ্রসর হতে লাগলো। তাকে অনুসরণ করলাম আমরা। ঢাল, তরোয়াল, বল্লম তুলে নিয়ে মোটমাট বিশটি মেয়ে ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করলাম।

সেই মেয়েগুলোর পেছনে সাত-আটজন সৈন্য ছিল। নেতাগোছের মেয়েটি একাই সবগুলোকে সাবাড় করে দিলো। কোনো মেয়ে এত দ্রুতগতির হতে পারে তা আমি এই প্রথমবার দেখলাম। মোটমাট সাত-আটজন সৈন্য ভীষণ রেগে তেড়ে আসছিল। কিন্তু মেয়েটি কীভাবে যেন উড়ে গিয়ে পড়ল ওদের সামনে। সৈন্যের তরোয়ালের ঘায়ে মাথা কাটা যাবে তার আগেই একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে উল্টো সৈন্যের মাথা ফেলে দিলো সে। দ্বিতীয় সৈন্যটি তরোয়াল চালালো ঠিকই কিন্তু দেহে আঘাত করতে পারলো না। মেয়েটি মুখের সামনে ঢাল ছুড়ে দিয়ে পরক্ষণেই তরোয়াল সোজা সৈন্যের বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। তারপর ছোট্ট চাকু বের করে তৃতীয় সৈন্যের চোখ বরাবর বসিয়ে দিয়ে এক লাফে চতুর্থজনের ঘাড়ে চেপে বসল।

আমি স্বপ্নের মতো দেখলাম। সামান্য সময়ের ব্যবধানে সাতজন সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। নেতাগোছের মেয়েটি আগুন লাগিয়ে আসা চারটি মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল, "ভয় নেই। কেউ তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।"

মেয়েগুলোর মুখ রক্তবর্ণ। প্রচন্ড ভয় পেয়ে থরথর করে কাঁপছে ওরা। ওদের একজন কান্না থামিয়ে শক্ত হয়ে বলল, "ওরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। আমরা কেউ এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারব না।"

মেয়েটির এমন কথা প্রথমে ধরতে পারিনি। তবে একটু পরেই তার কথার অর্থ বুঝতে পারলাম।

প্রথমে সামান্য কিছু সৈন্যের দল এগিয়ে আসতে দেখা গেল। কিন্তু পরে বুঝলাম ওরা সামান্য নয়। শত শত সৈন্য পিঁপড়ের দলের মতো মতো ধেয়ে আসছে। নেতাগোছের মেয়েটি ভীষণ রাগে ফোঁসফোঁস শব্দ করে বলল, "মরব। তবে লড়াই করে মরব।" বলেই উল্টো রাস্তা ধরে অস্ত্রাগারের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। আমরাও দিলাম ছুট। কিন্তু অস্ত্রাগারে ঢুকে পড়ার আগে আরো একবার অবাক হয়ে গেলাম। কারণ আমরা পৌঁছার আগে সেখানে অনেকগুলো সৈন্য ঢুকে পড়েছে। ওরা সংখ্যায় নেহাত কম নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে লড়াই করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

মৌমাছির মতো ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা। জীবনে কোনোদিন তরোয়াল ছুঁয়ে না দেখা মেয়েগুলোর আনাড়ি এলোপাথাড়ি কোপ খেয়ে সৈন্যগুলো যেন নিমেশেই ধরাশায়ি হয়ে পড়ল। ওদের লাশের উপর দাঁড়িয়ে আমরা অস্ত্রাগার দখল করলাম।

এইবার আসল বিপদ শুরু হলো। এতক্ষণ দলে দলে সৈন্য এসেছে। কিন্তু এইবার আমরা দেখলাম, শত শত সৈন্যের দল অস্ত্রাগারের চারিদিক ঘিরে ফেলেছে। চোখের সামনে নিশ্চিত মৃত্যু দেখতে পেয়ে সকলে অস্থির হয়ে পড়লাম। অস্থির হলো না শুধু সেই মেয়েটি। সেই নেতাগোছের মেয়েটি। তার চোখেমুখে অপার দৃঢ়তা। কণ্ঠে সেই আগের মতোই ঝাঁজ। মেয়েটি ভাঙে তবু মচকায় না; তেমন ভঙ্গিতে বলল,

"ন্যায় ও অন্যায়ের এই লড়াইয়ে অন্যায়কারীরা যদি জিতে যায়, তবে তা-ই হোক৷ আমি ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করে জীবন দিতে প্রস্তুত।"

বড়ো অদ্ভুত সেই মেয়েটি। ভীষণ আজব তার আত্মবিশ্বাস। সে একটু পাগলও বটে। নাহয় শত শত সশস্ত্র সৈন্যের সামনে যেচে মরতে যায় কেউ?

তাকে অনুসরণ করা ছাড়া উপায় ছিল না। তাই আমরাও অস্ত্রাগারের উলটো দিক দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে পড়লাম। সৈন্যগুলোও আমাদেরকে দেখে ক্ষুধার্ত সিংহের মতো ছুটে আসতে লাগল। তরোয়াল চালানোর নিয়ম আমরা জানি না। তাই আনাড়ির মতো ডানে বাঁয়ে সাঁইসাঁই করে চালাতে চালাতে কখন যে কতগুলো সৈন্যকে ধরাশায়ি করে ফেলেছি সে ব্যাপারে কোনো খেয়ালই ছিল না। আমাদের অনেকে ঘায়েল হয়েছে। বাকিরা প্রাণপণে লড়াই করছি। সামনে অগণিত শত্রুর দল। আর আমরা হাতে গুণা কয়েকজন। তবু যে কী এক উদ্যমে লড়াই করে টিকে আছি!

আমরা কখন কোনদিক থেকে কোপ বসাব তা আন্দাজ করতে না পেরে আনাড়ি আঘাতের কাছে হার মেনে নিচ্ছে ওরা। ততক্ষণে আমরা অদমনীয় হয়ে উঠেছি। কিন্তু আচমকা এক তরোয়ালের আঘাত সবকিছু যেন নিমেশেই নিঃশেষ করে দিলো। সেই নেতাগোছের মেয়েটি আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

সে-ই ছিল আমাদের আশা। আমাদের প্রবল শক্তির মূল, আমাদের অনুপ্রেরণা। তাকে লুটিয়ে পড়তে দেখে আমরা মুহূর্তেই কেমন দমে গেলাম। পার্থিব চেতনা বিসর্জন দিয়ে যে যুদ্ধে আমরা মেতে উঠেছিলাম সেটা যেন আচমকা থেমে গেল৷ আমরা আবার সেই ভীত সন্ত্রস্ত মেয়েমানুষে পরিণত হলাম।

এখন প্রায় শেষরাত।

আমাদের হাত পা বেঁধে লাইন ধরিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সামনে তরোয়াল হাতে সৈন্যের দল। আজ ভোর হবার আগেই বিদ্রোহের দায়ে আমাদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।

সৈন্যদের অনেকে অনেক কথা বলছে। তার মধ্যে একটি কথা আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। কথাটা এরকম,

"কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করে দাও। এদেরকে মেরে রাতের মধ্যেই মাটিচাপা দিতে হবে।"

"কয়টা কবর খুঁড়তে বলব?"

"এরা কয়জন আছে?"

"মৃত আর জীবিত মিলে তেইশজন।"

"তাহলে তেইশটা খুঁড়তে বলো।"

তেইশজনের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমরা ছিলাম বিশজন। মহল থেকে পালিয়ে এসেছে আরো চারজন। মোটমাট চব্বিশজন মেয়ে ছিলাম। আর এরা বলছে তেইশজন!

আমার পাশেই নেতাগোছের মেয়েটি আহত অবস্থায় বসে আছে। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটি এখনও নিজেকে সামলে রেখেছে। আমি বিস্মিত হয়ে ওর দিকে তাকাতেই সে এই কঠিন অবস্থায়ও নিঃশব্দে হেসে উঠল। অতি আত্মবিশ্বাসী এক হাসি!

তাহলে কি তার অন্য কোনো মতলব আছে? সে কি তবে ইচ্ছে করেই একটি মেয়েকে সরিয়ে দিয়েছে?

তরোয়ালের কোপে আমাদের মাথা আলাদা করা হবে। তাই সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে। আমাদের তেইশজনের সামনে আরো তেইশজন সৈন্য তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই একসঙ্গে অস্ত্র চালাবে ওরা। কিন্তু তার আগেই কারা যেন আগুন আগুন বলে চেঁচিয়ে উঠল।

অস্ত্রাগারে আগুন লেগেছে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি, সেনানিবাসেও আবার আগুন লেগেছে। আমাদের মহলেও। রাজমহলেও! যেদিকেই তাকাই আগুন আর ধোঁয়া! একসাথে এতগুলো জায়গায় আগুন লাগতে পারে কীভাবে!

সৈন্যগুলো আমাদেরকে হত্যা করার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে যে যেদিকে পারে ছুটতে শুরু করল। বেশিরভাগ গেল রাজমহলের দিকে। আগে সেখানকার আগুন নিভাতে হবে। কেউ গেল সেনানিবাসের দিকে। কেউ অস্ত্রাগারের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে জমিন কাঁপিয়ে একটি ঘোড়া ছুটে আসতে লাগলো।

আমাদের দেশে একসময় প্রচুর ঘোড়া ছিল। কিন্তু এখন সারা দেশে কেবলমাত্র একটি ঘোড়াই আছে। এদেশের রাজার সেই একমাত্র ঘোড়া অশ্বী।

তবে কি অশ্বীর পিঠে চড়ে স্বয়ং রাজা এদিকে আসছেন?

একটু পরেই আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল। আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোড়ার পিঠে করে উপস্থিত হলো সেই নির্যাতিত গর্ভবতী মেয়টি! নির্যাতনের একটা দিনও পার হয়নি। এখন সে অসুস্থ থাকার কথা। পেটের সন্তান হারিয়ে শারীরিক সমস্যা নিয়ে ঘরের কোণে বসে থাকার কথা। অথচ মেয়েটি দিব্যি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেড়াচ্ছে! মনের শক্তি বোধহয় একেই বলে!

এই মেয়েটিই যে ঘোড়ায় চড়ে সবখানে আগুন দিয়েছে তা বুঝতে বাকি রইল না। আমরা তাকে ঘোড়ার উপর দেখে যতটা বিস্মিত হলাম তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হলাম এই ভেবে যে, সর্বদা কড়া পাহারায় থাকা অশ্বীকে সে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলো কী করে?

ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আমাদের সকলের বাঁধন খুলে দিলো মেয়েটি। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সঙ্গী তিনটি মেয়ে মারা গেছে। আটজন গুরুতর আহত। নেতাগোছের মেয়েটিও আহত। আমরা এখানে আর বেশি সময় নিরাপদ নই। যেকোনো সময় সৈন্যের দল ফের চলে আসবে। এদিকে পালিয়ে যাবার রাস্তাও বন্ধ। এখন কি তবে মৃত্যুর কাছে মাথা নত করে ফেলব?

এই প্রশ্ন শুনে নেতাগোছের মেয়েটি ফের নিঃশব্দে একগাল হাসলো। তার আত্মবিশ্বাসী হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে আমি আরো একবার অবাক হয়ে গেলাম। তবে কি তার নতুন কোনো চাল এখনও বাকি?

দূর থেকে হৈচৈ শোনা যাচ্ছিল। ভোর হতে চলেছে। এখন চারপাশ আবছা দেখা যাচ্ছে। হৈচৈ শুনে দূরে তাকিয়ে দেখি অনেকগুলো মানুষ বাইরের দিক থেকে দৌড়ে ছুটে আসছে। তবে এইবার আমার বিস্ময়ের বাঁধ ভেঙে গেল।

বাইরের মূল প্রবেশদ্বার ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ! এরা সবাই এদেশেরই লোক। এদেশের অসহায় দরিদ্র না খেতে পাওয়া লোক। কিন্তু এরা অসময়ে এমন মৌমাছির দলের মতো এখানে আসছে কেন?

নেতাগোছের মেয়েটি এবার বিদ্রুপ করে হেসে জানালো, সে-ই এক চাকরকে দিয়ে বাইরের মানুষদের কাছে খবর দিয়েছিল, তারা যদি এখানে আসে তবে পয়সা ছাড়াই খাবার পাবে। খাবারের লোভে এরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। প্রবেশদ্বারের দিকে পঞ্চাশ ষাটজন রক্ষী ছিল। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের ঢল দেখে এরা প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে।

নেতাগোছের মেয়েটি সাধারণ মানুষগুলোকে রাজমহল দেখিয়ে বলল, "ওখানে প্রচুর খাবার আছে। যে যত পারো সব লুট করে নাও।"

খাদ্যলোভী মানুষগুলো এক মুহূর্ত দেরি করল না। খাবারের আশায় সমানে মহলের দিকে ছুটতে লাগলো।

সেদিন এত বিপুল সংখ্যক মানুষ দেখে রাজা ও তার দলবল প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। বহু সৈন্য সাধারণ মানুষের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মরেছে। এমনকি রাজার কিছু খাস লোক, যারা সব সময় নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে রাজার কান পচাতো এরকম অসংখ্য লোক সাধারণ ক্ষুধার্ত সহজ সরল মানুষের পায়ের তলায় পড়ে প্রাণ খুইয়েছে।

সেবার রাজমহলে মজুদ খাদ্যদ্রব্য ও মূল্যবান জিনিসপত্র যে যত পারে লুট করেছে। এরপর রাজা কিংবা তার স্বার্থান্বেষী লোকগুলোকে আর দেখা যায়নি। সেদিন যদিও সবাই যে যা পারে লুট করেছিল, তবে এরপর আর কোনোদিন কেউ না খেতে পেয়ে প্রাণ দেয়নি। কারোর ঘরে খাবার নেই তো অন্যরা নিজেদের মজুদ করা খাবার দিয়ে পুষিয়েছে। রাজার যেসব দাস দূর থেকে জল বয়ে আনার কাজ করত, তারা এখনও জল টানার কাজ করে। তবে এখন আর রাজার জন্য নয়, এখন টানে সবার জন্য। এখন বড়োবড়ো অঞ্চল মিলে একসাথে চাষবাস করা হয়। আমাদের অঞ্চলে যে ছোট্ট ফোয়ারা ছিল সেটা থেকে যেটুকু জল হয় তা বয়ে এনে একটি বিশাল জমিতে ফেললে নিমেশেই মিলিয়ে যায়, ফসল তা পায় না। তাই অল্প করে চাষাবাদ শুরু হয়েছিল। পশুর গাড়িতে করে দূর দেশ থেকে জল এনে আরো কিছুটা সামাল দেওয়া গেল।

গতবছর প্রায় আড়াইশো পশু নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জল আনার জন্য। সেই জল এনে একটি গর্তে ফেলা হয়েছে। সেখান থেকে প্রয়োজনমতো জমিতে দিয়ে যা হয়। কিন্তু এভাবে আর চলে না। ফসল ফলাতে হলে দরকার বৃষ্টি। তবে বৃষ্টি তো আমরা চাইলেই পেয়ে যাব না। বৃষ্টির জন্য দরকার নির্দিষ্ট পরিবেশ, দরকার নির্দিষ্ট আবহাওয়া। আমাদের অঞ্চলের গাছ কেটে বিরান করে ফেলা হয়েছিল। রাজার উৎখাতের পর তার চাকরদের দিয়ে দূর থেকে জল আর চারাগাছ এনে অনেকগুলো গাছ লাগানো হয়েছে। কিছু গাছ টিকেছে। কিছু বড়ো হয়েছে। কিছু গাছে ফল ধরেছে।

আমি এখন বাবা আর বোনদের সাথে থাকি। বিক্রি হবার পর আবার এদের কাছে ফিরে আসতে পারব এ-কথা ভাবতেও অবাক লাগত। কিন্তু আমি আমার মা হারা বোনদের কাছে ফিরতে পেরেছি, আমি আমার অসহায় বাবা, যে বাবা আমার মৃত মায়ের গয়না আগলে রেখে আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন, সেই সরল বাবার কাছে ফিরতে পেরেছি। এটাই সত্যি।

আজ সকাল থেকে আকাশটা কেমন হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে আকাশের খুব মন খারাপ। আচ্ছা, আকাশের কি সত্যিই মন খারাপ হয়? হলে কি সে কাঁদে? আজ যে আচমকা হুহু করে কেঁদে উঠল?

সকাল থেকেই আকাশের অবস্থা দেখে আমার সন্দেহ হচ্ছিল। কিন্তু বৃষ্টি হবে সেটা আমি কল্পনাও করিনি। বিকেলবেলা, সন্ধ্যে নামার ঠিক আগ মুহূর্তে এই মুলুকের সবাইকে অবাক করে দিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বৃষ্টি নামল। অঝোর ধারায় বৃষ্টি। প্রায় দেড় যুগ পর আবার বৃষ্টি!

এদেশের প্রতিটি মানুষ প্রবল বিস্ময়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জলে গা ভেজাতে লাগলো।

আমাদের আর কাপড়ের অভাব নেই। রাজা উৎখাতের সময় রাজমহল থেকে কয়েকটি কাপড় সংগ্রহ করেছিলাম। তাই এখন আর পালাবদল করে গর্তে থাকতে হয় না। আমরা চারটি বোন একসাথে বাইরে বের হয়ে এলাম। সাথে আমাদের বাবা। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে অনবরত। আমি ভিজতে ভিজতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম,

"হে আকাশের মালিক, তোমার প্রতি আমরা কী পরিমাণ কৃতজ্ঞ তা কি তুমি জানো?"

সমাপ্ত

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/745125250655049/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া