চোরনিঅতিপ্রাকৃত

চোরনি — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম২৪ জুন ২০১৫৫ মিনিট পড়া

চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে শেষে মার খেয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু মানুষ। হাত-পা হারিয়ে পঙ্গু হয়েছে অনেকে। একবার ঢাকার এক নামকরা চোর চুরি করতে গিয়ে নিজেই হাইজ্যাক হয়ে যায়। পরে তার পরিবার নগদ দুই লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে। মেক্সিকোতে এক সন্ধ্যায় চুরি করতে গিয়ে মিথ্যে খুনের দায়ে ফেঁসে শেষমেশ ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছে বেচারা চোরকে। ফ্রান্সে আস্ত একটা জাহাজ চুরি করে পালানোর সময় জলদস্যুদের হাতে ধরা পড়ে মরতে মরতে বেঁচে ফিরে এক চোর। ইতালিতে সামান্য একটা পিতলের মূর্তি চুরি করতে গিয়ে কয়েকটি মহা মূল্যবান হিরের সন্ধান পেয়ে যায় এক চোর। পরে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাগ মাফিয়াদের সাথে জড়িয়ে পড়ে রাতারাতি গ্যাঙস্টার বনে যায়। এমন অনেক নজির আছে যেখানে চোর চুরি করতে যাওয়ার আগে জানতই না যে তার সাথে এমন অসম্ভব অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটতে চলেছে। যেমনটা আমার ক্ষেত্রে হচ্ছে। এসেছিলাম চুরি করতে। অথচ হয়ে যাচ্ছে বিয়ে! জন্মের পর থেকে চোর আর চুরি দেখতে দেখতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি একরকম ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমিও রক্তে মাংসে গড়া একটি মেয়ে, আমারও শরীর আছে, মন আছে, আমারও একদিন বিয়ে হতে পারে, আমিও একজন জীবনসঙ্গী পেতে পারি!

সন্ধ্যের আগেআগে বিয়েটা হয়ে গেল।

এই জায়গাটা বেশ অদ্ভুত, যেটা আমি আগেই বলেছি। শহর থেকে অনেক দূরে ছোট্ট নদীর তীর ঘেঁষে এই গ্রাম। চারপাশে ছাড়াছাড়া অসংখ্য বাড়িঘর। ছেলে-মেয়ে, জোয়ান-বুড়ো, নারী-পুরুষ সবাই এখানে আছে। তবে মেয়েরা খুব প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বেরোয় না। এখানকার অধিকাংশ পরিবার মুসলিম। কিছু হিন্দু পরিবারও আছে। মুসলিম পরিবারের অধিকাংশ মেয়েরা বোরখা পরে। তেমনি কয়েকটি মেয়ে দুপুরবেলা এল। সম্পূর্ণ কালো বোরখায় ঢাকা তাদের শরীর। তারা এল, আমাকে গোসল করিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো। ওরাই আমার জন্য শাড়ি, গয়না থেকে শুরু করে যাবতীয় দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে এসেছিল। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে ছিল অল্পবয়সি৷ তারও সারা দেহ বোরখায় ঢাকা। নেকাবের কারণে চেহারাও দেখা যায় না। কেবল তার স্বচ্ছ জলের মতো টলটলে কালো চোখ দেখে বারবার মনে হচ্ছিল মেয়েটি বেশ সুন্দরী। কী কারণে জানি না, মেয়েটিকে একটিবার দেখার জন্য আমার মন ছটফট করছিল। সে যখন আমাকে নিজ হাতে সাজিয়ে দিচ্ছিল, তখন একবার বলেছিলাম,

"তোমার নেকাবটা খুলবে? আমি তোমাকে একটু দেখব।"

মেয়েটি বিশেষ গা করল না। কেবল ছোটো করে শ্বাস ছেড়ে একেবারে ক্ষীণ অথচ কী বিশেষ কায়দায় বলল, "আমাকে দেখে কী করবেন? হতভাগিনির মুখ দেখলে আপনার অমঙ্গল হতে পারে।"

কথাটা শুনে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম মেয়েটির দিকে। তার চোখের দিকে চেয়ে মনে হলো সে কাঁদছে। পুরো মুখ যদিও কালো নেকাবে ঢাকা তবুও বারবার মনে হলো যেন তার ঠোঁট থরথর করে কাঁপছে। সে যখন আমার হাতে চুড়ি পরিয়ে দিচ্ছিল, তখন দেখলাম আমার ধারণাই ঠিক। তার হাতদু'টোও থরথর করে কাঁপছে। আমার চোখে কাজলের রেখা ছড়িয়ে দিতে দিতে সে বলল,

"কেউ দিনের পর দিন সাধনা করে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে চেয়েও যা পায়নি তা আপনি না চাইতেই পেয়ে যাচ্ছেন। আপনি খুব ভাগ্যবতী।"

কথাটা শুনে আমি একটু চমকে উঠলাম। আমি কী এমন পেয়েছি যেটা পাওয়ার জন্য কেউ দিনের পর দিন সাধনা করেছে? এসব কী বলছে এই মেয়ে? আর তার চোখে জল কেন? তার ঠোঁট এভাবে কাঁপছে কেন? কেন এরকম অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলছে মেয়েটি?

শেষবার, আমাকে সাজানো যখন শেষ, যখন আমাকে কাজী সাহেবের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন সেই মেয়েটি সকলের অগোচরে একেবারে ক্ষীণ আওয়াজে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "মেয়েরা প্রয়োজনে সব দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু নিজের প্রিয়মানুষের ভাগ কখনোই দিতে পারে না।"

আমি অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে কিছু একটা বলতে যাব কিন্তু তার আগেই খুব সম্ভবত আমাকে অবাক করে দেওয়ার জন্যই মেয়েটি তার মুখের ওপর থেকে নেকাব সরিয়ে দিলো। আর তখন আমি যা দেখলাম, আমি জানি না পৃথিবীর কোনো মানুষ তা হঠাৎ দেখলে অবাক না হয়ে পারবে কি না। শুধু জানি, আমি অবাক না হয়ে পারিনি। কেবল অবাক বললে ভুল হবে, আমি রীতিমতো বরফের মতো জমে গেছি। আমার ছোটোছোটো চঞ্চল দু'টি চোখ আটকে গেছে মেয়েটির উদাম চেহারায়। তার চোখ, নাক, ঠোঁট, ভ্রু, চামড়া... সবকিছু এত নিখুঁত, এত সুন্দরভাবে সাজানো, এত সুশ্রী তার চেহারা, পৃথিবীতে এরকম সুন্দরী নারী আর কেউ আছে বলে মনে হয় না। মেয়েটির চেহারায় মৃদু হাসি, চোখের কোলে সামান্য জল, তার ঘন কালো ভ্রু সামান্য বেঁকে আছে, তার ঠোঁটের উপরে গোঁফের মতো অতি ছোটোছোটো লোমগুলো ভিজে আছে, আর তার ঠোঁট, এত সুন্দর গঠন আমি জীবনে দেখিনি, মেয়েমানুষ হয়েও আমি তাকে দেখে বারংবার অভিভূত হয়ে যাচ্ছি।

আর কেউ দেখে ফেলার আগেই মেয়েটি নিজের মুখ ঢেকে নিল। তারপর যেন ইচ্ছেকৃতভাবেই ভীড় ঠেলে কোথায় যেন পালিয়ে গেল।

গতকাল গভীর রাতে বৃষ্টির জলে কাকভেজা হয়ে যে ছোট্ট ঘরটিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেখানেই বাসরঘর সাজানো হয়েছে। কেন জানি না এখানকার মানুষ সন্ধ্যের পর ঘর থেকে বেরোয় না। সন্ধ্যের আগে আগেই সব আয়োজন শেষ করে যে যার বাড়ি-ঘরে ফিরে গেল। যে ছোট্ট পালঙ্ক ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, সেখানেই কুঁজো হয়ে বসে ছিলাম আমি। সন্ধ্যের খানিক পর সে ঘরে প্রবেশ করল। সে মানে সেই কাফনের দোকানের ছেলেটি, যে গতকাল আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল। আজ সে আমার বর!

দরজা বন্ধ করে সে আমার থেকে খানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলল, "আমাদের বিয়েটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে। গ্রামের লোক ভুল বুঝে আপনাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছে। আমি জানি আপনি বিপদে পড়ে কবুল বলেছেন। সুতরাং স্বামীর অধিকার আমি খাটাবো না। আপনি চাইলে কালই এখান থেকে চলে যেতে পারেন। আমি আপনাকে স্বচ্ছন্দে তালাক দেব।"

কথাটা শোনামাত্রই আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। তার দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জর্জরিত চোখের ওপর চোখ রেখে বললাম, "মেয়েরা একবারই কবুল বলে। আর যখন বলে, তখন সারাজীবনের কথা চিন্তা করেই বলে। আমি আপনার বউ হতে রাজি আছি।"

"কিন্তু আমি রাজি নই।" বলে কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

"কেন নন? কী সমস্যা আপনার?" জিজ্ঞেস করলাম। এখন আমি তার বিয়ে করা বউ। সুতরাং এইটুকু অধিকার খাটাতেই পারি। তবে সে যেন আমার প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি নয় এমন ভান করে কিঞ্চিত দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালো। আমি ফের তার কাছে গেলাম। খুব কাছে। যতটুকু কাছে গেলে দু'জনের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না ঠিক ততটুকু। বললাম, "কেন আমাকে বউ হিসেবে মেনে নিতে পারবেন না?"

"কারণ আমি মানুষ নই।" বলে অনেকটা দূরে সরে গিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি যেন চার হাজার বোল্টের বৈদ্যুতিক শক খেলাম। ফের তার সামনে গিয়ে বললাম, "মানুষ নন মানে? এটা কেমন কথা?"

সে বলল, "তুমি যা ভাবছো আমি তা নই। এই গ্রাম আমার না। এখানে আমি এসেছি মাত্র কয়েক মাস আগে। আমি এখানকার কেউ নই।"

"তাতে কী হয়েছে? আপনি যেখানকারই হন তাতে আমার আপত্তি নেই। কবুল যেহেতু বলেছি সেহেতু আপনি আমার স্বামী।"

"না না, এটা হতে পারে না।"

"কেন হতে পারে না?"

"কারণ আমি মানুষ নই। বিয়ে হয় মানুষে মানুষে। আর আমি..." বলতে বলতে থেমে গেল সে। আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, "আপনি কী? অমানুষ? আপনি দু'চারটে খুন করেছেন নাকি? এজন্য নিজেকে অমানুষ বলছেন?"

"মানুষ খুন তো দূর, আমি একটি পিঁপড়েও মারিনি।"

"তাহলে?"

সে আমার কাঁধের দু' পাশে দু'টো হাত আলতো করে রেখে আমার দিকে চেয়ে বলল, "শুনো, এখন আমি তোমাকে যা বলতে যাচ্ছি, সেটা হয়তো কেউ কোনোদিন কল্পনাও করেনি। তবে এটাই সত্যি। আমি আসলে..."

বলতে বলতে থেমে গেল সে। আমি কৌতূহলে অস্থির হয়ে বললাম, "থেমে গেলেন কেন? আপনি আসলে কী?"

চলবে

মো. ইয়াছিন

[প্রিয় পাঠক, গল্পের প্রতিটি পর্ব পড়া শেষ হলে নিজের ভালোলাগা, মন্দলাগা, আবেগ, অনুভূতি কমেন্টে জানাবেন। এতে আমি আপনাদের অনুভূতি জানতে পারব, গল্পের মাধ্যমে আপনাদের কৌতূহল দূর করতে পারব এবং আমার পোস্টের রিচ বাড়বে; যা লেখালিখিতে অনুপ্রেরণা যোগায়। সবার জন্য শুভকামনা]

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া