চোরনিঅতিপ্রাকৃত

চোরনি — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম২৮ জুন ২০১৫৫ মিনিট পড়া

উত্তেজনায় আমার সারা দেহ থরথর করে কাঁপছিল। আমি ভাবতেই পারছিলাম না যে, মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে যাকে কবুল বলে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছি, সে যদি মানুষ না হয় তাহলে কী? জিন? ভূত? ভ্যাম্পায়ার? না কি অন্যকিছু? বিপদে পড়ে এ কাকে বিয়ে করে ফেললাম আমি!

সে কিন্তু একটুও ঘাবড়ে যায়নি। ঠান্ডা মাথায় আলতো হাত রেখেছে আমার কাঁধে। তার চোখদু'টো থেকে সবুজাভ ধোঁয়া বের হচ্ছে। চোয়াল শক্ত। কিছুক্ষণ গভীর দম নিয়ে নিজেকে তৈরি করে নিল সে। যেন অসম্ভব সত্যিটা এইবার আমার সামনে তুলে ধরবে। আমি তখনও উত্তেজনায় কাঁপছি। আমাকে আলতো করে বিছানায় বসিয়ে আমার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল সে। তারপর বলল, "এত ঘাবড়াচ্ছো কেন? শান্ত হও। আমি সব পরিষ্কার করে বলছি।"

তার এই কথায় আমার উত্তেজনা দ্বিগুণ হয়ে গেল। এক ঝটকায় তার হাত আমার গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বললাম, "শান্ত হব মানে! কীভাবে শান্ত হব? আপনি জেনেশুনে আমাকে ফাঁসিয়েছেন। একে তো এখানে এনে তোপের মুখে আমাকে বিয়ে করেছেন। এখন আবার বলছেন আপনি মানুষ না! মানুষ নয়তো কী শুনি? জিন আপনি? না কি ভ্যাম্পায়ার?"

সে আমার হাতদু'টো চেপে ধরল। ফিসফিস করে বলল, "আমি একজন চোর।"

সঙ্গে সঙ্গে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। এইবার আমার উত্তেজনা তিনগুণ হয়ে গেল। এতক্ষণ আজেবাজে কতকিছুই না ভাবছিলাম৷ জিন, ভূত, ভ্যাম্পায়ার আরো কত কী! বজ্জাত ব্যাটা কিনা চোর! আমার কপালে শেষমেশ চোর জুটল! চোরনির কপালে চোর! হায় খোদা! এই ছিল তোমার মনে?

মুখ টিপে হেসে ওর দিকে তাকালাম। দেখি পাপবোধে তার মাথা নিচু হয়ে গেছে। আলতো হাতে তার চোয়াল ধরে মুখটা আমার দিকে ফিরিয়ে বললাম, "চোর হয়েছেন তো কী? আপনাকে স্বামী হিসেবে পেতে আমার কোনো আপত্তি নেই।"

সে না না করে উঠল, "আপত্তি নেই বললে তো হবে না। ব্যাপারটা যত সহজ ভাবছো ততটা সহজ নয়। আমি এসেছি একটি বিখ্যাত পাথর খণ্ড চুরি করে নিয়ে যেতে, যেটা প্রায় পাঁচশো বছর আগে আমার পূর্বপুরুষ ভুল করে পৃথিবীতে রেখে গিয়েছিলেন।"

আমি কিঞ্চিত বিস্মিত হলাম। আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুকের ভেতর অদম্য কৌতূহল চেপে রেখে বললাম, "পৃথিবীতে রেখে গিয়েছিলেন মানে?"

তারপর সে যা বলল সেটা শুনে আচমকা আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।

আমি ধপাস করে বিছানায় বসে পড়লাম। দুর্বল দৃষ্টিতে তাকালাম তার দিকে, যাকে মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে স্বামী হিসেবে কবুল করেছি। সে আমার সামনে বসে বলল, "এবার বুঝলে তো কেন আমি এতবার বলছিলাম যে তোমার আমার মিলন সম্ভব নয়?"

আমার খুব দুর্বল লাগছিল। মনে হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। এই অসম্ভব সত্যিটা জানার পর আমার জায়গায় যে কেউ থাকলে অজ্ঞান হয়ে যেত। কেননা, ছেলেটাকে অবিশ্বাস করার মতো অবস্থা এখন আর নেই। কারণ এতক্ষণে তার চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। তার স্বাভাবিক চোখদু'টো এখন পুরোপুরি সবুজ, মাথার চুল অনেকটা সিংহের মতো, চেহারা বাদামি। বাকি শরীর অনেকটা মানুষের মতোই।

এখন তার সারা দেহ থেকে সেই সবুজাভ আলো বের হচ্ছে। সে আগের মতোই আমার কাঁধে আলতো হাত রেখে বলল, "আমি অন্য গ্রহ থেকে এসেছি শুধুমাত্র ওই পাথরের টুকরোর জন্য।"

আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, "আ-আপনি, আপনি এলিয়েন!"

সে আবার স্বাভাবিক মানুষের চেহারায় ফিরে বলল, "হ্যাঁ।"

"তার মানে আমি এলিয়েনকে বিয়ে করে ফেলেছি!"

সে মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ।"

আমি সঙ্গে সঙ্গে তার কলার চেপে ধরে বললাম, "এই কথা আপনি আগে বলতে পারলেন না?"

সে শান্ত গলায় বলল, "আগে বললে তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে না। কিন্তু এখন তো না বলে উপায় নেই। তাই বললাম।"

"স্বামী চোর-ডাকাত হলেও আমি মেনে নিতাম। কিন্তু এলিয়েন! এখন আমার কী হবে?"

আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছি। সে দু' কাপ চা করে আনল। একটি পেয়ালা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে আমার সামনে বসল। আমি মৃদু স্বরে বললাম, "এলিয়েনরাও চা খায়?"

সে কিঞ্চিত হেসে জবাব দিলো, "আমরা চা খাই না। কিন্তু এখন তো আমি মানুষের মতো। মানুষ যা যা করে আমিও তাই তাই করি। এতে আমার কোনো সমস্যা হয় না।"

একবার মনেমনে ভাবলাম, তাকে বলি, তাহলে মানুষের মতোই চিরকাল কাটিয়ে দিলে কী হয়? আজীবন পৃথিবীতে থেকে গেলে কী হয়? বিয়ে যেহেতু করেছেন, আমাকে গ্রহণ করলেই বা কী ক্ষতি? কিন্তু মনেমনে বললেও মুখ দিয়ে টু শব্দও করতে পারলাম না। সে নিজেই আনমনে বলে চলল,

"মাত্র কয়েক মাস আগে পৃথিবীতে এসেছিলাম। এখান থেকে কিছুটা দূরে এক গুপ্ত জায়গায় রাখা আছে সেই পাথরের টুকরোটা। সেটা হাতে পাওয়ার জন্যই এখানে পড়ে আছি।"

"তাহলে যান না। সেই পাথর নিয়ে চলে যান আপনার গ্রহে। এখানে পড়ে আছেন কেন?"

সে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ক্লান্ত স্বরে বলল, "সেটা হাতে পাওয়ার জন্য একটি চাবির দরকার যেটা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আমি দিনভর কাফনের দোকানে বেচাবিক্রি করি, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। আর রাতে সেই চাবি খুঁজে বেড়াই। আপনি একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন না, এখানকার মানুষ সন্ধ্যা হতেই যারযার ঘরে চলে যায় কেন? ওটাও আমার জন্য। আমি যেদিন আসি, সেদিন আমার সাথে একদল এলিয়েন এসেছিল। ওরা এখানে ছিল কিছুদিন। দিনে সবাই লুকিয়ে থাকত, সন্ধ্যের পর চাবির খুঁজে বের হত। যদিও ওরা সবার চোখের আড়ালে থাকত, তাও কয়েকজন ওদেরকে দেখে ফেলেছিল। সেই থেকে ওদের মনে ভয় জেগেছে যে এখানে সন্ধ্যার পর এদিকে ভূতেরা ঘুরে বেড়ায়। এজন্যই সন্ধ্যের আগেআগে সবাই নিজনিজ ঘরে চলে যায়। এতে অবশ্য আমার ভালোই হয়, আমি নির্বিঘ্নে চাবি খুঁজতে পারি।"

"পেয়েছেন খুঁজে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"কী?" সে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল।

"সেই দুর্লভ চাবি, যেটা দিয়ে আপনি আপনার পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া পাথর খণ্ড নিয়ে যাবেন।"

সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "এখনও পাইনি। তবে আমাকে যতদূর বলা হয়েছে, এখানেই কোথাও পাওয়া যাবে সেই চাবি।"

বলে সে থামলো। আমি নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা সেই ঘোড়ার মতো চাবিটা তার চোখের সামনে তুলে ধরতেই সে একরকম লাফিয়ে উঠল। বলল, "আরেহ! এই তো সেই চাবি! এটাই আমি এতদিন ধরে খুঁজছি!"

তারপর সেটা আমার হাত থেকে একরকম কেড়ে নিলো। এবং এমন এক কাণ্ড ঘটালো তাতে আমি রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেলাম।

চাবি পাওয়ার আনন্দে সে উল্লাস করতে করতে একসময় আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "তুমি জানো না এটা হাতে পেয়ে আমি কত খুশি হয়েছি!"

আমি মনেমনে বললাম, "আপনি জানেন না আমাকে এভাবে আগলে নেওয়ায় আমি কতখানি খুশি হয়েছি।"

আমি জানি সে মানুষ নয়, জানি সে এই পৃথিবীতে মাত্র কিছুদিনের বাসিন্দা। তবুও তার প্রতি কী ভীষণ টান পড়েছে তা কেবল আমি জানি। হোক সে এলিয়েন, তবু আমি তার বিয়ে করা বউ। তার অর্ধাঙ্গিনী।

পরদিন ঘটল আরেক ঘটনা। এক চোর আরেক চোরনির হাত ধরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেল। ওরা দু'জনে কোথা থেকে এসেছিল? কোথায় হারিয়ে গেল? কেউ জানে না।

এদিকে অন্য একটি গ্রামের মানুষ দেখল, নতুন বিয়ে করা দু'জন স্বামী স্ত্রী হাতে হাত ধরে গাঁয়ে প্রবেশ করেছে। ওরা মুখে বলছে এখানে হানিমুনে এসেছে। অথচ ওদের আসল মতলব কী? তা কেউ জানে না।

চলবে

মো. ইয়াছিন

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া