চোরনি — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম২১ জুন ২০১৫৬ মিনিট পড়াগভীর কালো রাত।
গাঢ় অন্ধকার পায়ে চলা পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি দু'জন।
আমি আর সেই অদ্ভুত ছেলেটা। প্রায় মিনিট বিশেক ধরে হাঁটছি তবু পথ ফুরোচ্ছে না। আমার একটু একটু সন্দেহ হচ্ছে। আশ্রয় দেবার নাম করে ছেলেটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে? তার মনে সত্যিই কোনো কুমতলব নেই তো? আমার কি তবে ফিরে যাওয়াই উচিত হবে? কিন্তু যাবো কোথায়? এই অচেনা অজানা জায়গায় রাতের অন্ধকারে কোথায় আশ্রয় নেব আমি?
একবার মনে হলো, পালাই। ছেলেটা কিছু বুঝে উঠার আগেই দৌড়ে পালিয়ে যাই। আবার মনে হলো, ধুর! যা হবে দেখা যাবে। ছেলেটা যদি কোনোরূপ জোর-জবরদস্তি করে তাহলে কোমরের সাথে লুকিয়ে রাখা ছুরিটা বের করে এলোপাথাড়ি কয়েক কোপ বসিয়ে পালিয়ে যাব।
ইতোমধ্যে মেঘ ডাকতে শুরু করেছে। বাতাস বইছে শোঁ-শোঁ করে। বারদুয়েক বিদ্যুৎ চমকালো। আর সেই বিদ্যুতের আলোয় আমি এই প্রথমবার ছেলেটাকে স্পষ্ট করে দেখলাম। নাহ্, দেখতে মন্দ নয় সে। উজ্জ্বল শ্যামলা তার গায়ের রং, উচ্চতা অন্তত পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি মানে আমার থেকে চার ইঞ্চি বেশি। গলায় অ্যাডামস্ অ্যাপল স্পষ্ট ভেসে আছে। চোখদু'টো নীলচে। মাথায় কুচকুচে কালো এলোমেলো চুল। মুখে দাড়ি নেই। আর সবচে' গুরুত্বপূর্ণ হলো তার মুখভঙ্গি। ছেলেটা বেশ গম্ভীর। আর এই গম্ভীরতাই তার ব্যক্তিত্ব দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আমি যদি কখনো কারো প্রেমে পড়তাম, তবে নিঃসন্দেহে আমি এই ছেলের প্রেমেই পড়তাম। তার চেহারায় কী যেন একটা আছে, যা আমাকে সম্মোহন করে ফেলছে। নাহ্, আর যা-ই হোক, এই ছেলে কোনো খারাপ কাজ করতে পারে না।
ছেলেটা হাঁটছে তো হাঁটছেই। কথাও বলছে না আমার দিকে তাকাচ্ছেও না। তার পাশাপাশি যে আমার মতো একটি যু্বতী হেঁটে যাচ্ছে তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই! না কি এসব আমার দেখার ভুল? সেও কি আঁড়চোখে আমাকে দেখছে? যেভাবে আমি দেখছি তাকে! কে জানে!
আমি আরো একবার বিদ্যুৎ চমকানোর অপেক্ষা করছিলাম। আবার বিদ্যুৎ চমকালে ফের তার চেহারা ভালো করে দেখে নেব। কিন্তু তার আগেই ঘটল বিপত্তি। হঠাৎ আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঝপ করে বৃষ্টি নামলো। টুপটাপ ঝিরঝিরে বৃষ্টি নয়, একেবারে ঝুম বৃষ্টি! আশপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। কোথাও দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জল থেকে নিজেকে রক্ষা করব এমন কোনো জায়গাও নেই। রাস্তার পাশের একটি বড়ো গাছের নিচে দাঁড়ালাম। তাও ফোঁটা ফোঁটা জলে শরীর ভিজে যাচ্ছে।
এতক্ষণ পর ছেলেটা কথা বলল।
"এখানে দাঁড়ালে বৃষ্টির জল থেকে রক্ষা পাবেন না। তারচে' চলুন এগিয়ে যাই। আর কয়েক মিনিট হাঁটলেই আমার বাড়ি।"
"মাথা খারাপ? ভিজতে ভিজতে যাব নাকি?" বলে ছেলেটার কথা উড়িয়ে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, যে উদ্দেশ্যে এসেছি সেটা হাসিল করে যত দ্রুত সম্ভব ফিরে যেতে পারলেই বাঁচি। এই গভীর রাতে বৃষ্টিতে ভিজে যদি সর্দিজ্বর হয়ে যায় তাহলে নিশ্চিত তিন-চারদিন জ্বরে পুড়ব। এমন অচেনা জায়গায় এতদিন পড়ে থাকার কোনো মানেই হয় না। যদি পারি তো কালই চুরি করে পালিয়ে যাব। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যে আমার ভাগ্যে কী ভীষণ গোলমাল লিখে রেখেছেন, তা আমি এখনও জানি না।
ছেলেটা বলল, "এখানে ভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে থাকলে ঠান্ডা হাওয়ায় নিশ্চিত অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তারচে' চলুন আমরা আগাই। ঘরে গিয়ে কাপড় বদলে নিলেই হবে।"
আমি তার কথা মেনে নিলাম। বৃষ্টিতে ভিজেও রওনা হলাম৷ সত্যিই আর মাত্র মিনিট পাঁচেক লাগলো। তারপর আমরা একটি গ্রামের ভেতর প্রবেশ করলাম। এখানে অনেক বাড়িঘর আছে। তবে রাত গভীর হওয়ায় কোনো মানুষ জেগে নেই। আলোও জ্বলছে না কোথাও। গ্রামের ভেতরের একটি বাড়ির তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল ছেলেটা। আমার দিকে চেয়ে বলল, "আসুন।"
সত্যিই একটিমাত্র ঘর। আর কোনো ঘর নেই। ছেলেটা একটি প্যান্ট আর একটি ফুলহাতা শার্ট আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, "ভেজা কাপড় বদলে নিন। আমি বাইরে আছি।" বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলো। আমি বললাম, "এসব পরব আমি! মেয়েরা এসব পরে নাকি! শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ নেই?"
ছেলেটা বোধহয় একটু বিরক্ত হলো। আমার মুখের সামনে এসে বলল, "আমাকে দেখে কী মেয়ে মনে হয়? আমি কি সালোয়ার কামিজ পরি যে আমার কাছে এসব থাকবে? আপনার ইচ্ছে হলে পরুন নাহলে আমার জিনিস আমাকে দিয়ে দিন।"
"না না, আমি পরছি।"
ছেলেটা আর কোনো কথা বলল না। চুপচাপ বাইরে বের হয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল। আমি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে কাপড় বদলে নিলাম। তারপর দরজা খুলে দিতেই ছেলেটা ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরেই লাগোয়া ছোট্ট রান্নাঘর। চুলায় জ্বালানোর জন্য যেসব কাঠ রাখা সেখান থেকে কয়েক টুকরো কাঠ এনে ঘরের মাঝখানে রেখে সেগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। বলল, "আগুনের তাপে নিজেকে একটু গরম করুন। ততক্ষণে আমি চা করছি।"
আমার কাছে সবকিছু স্বপ্ন মনে হচ্ছে। গতকাল রাতেও এই সময় আমি আমার ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম। গতকালও আমার জীবন স্বাভাবিক ছিল। ছোটোখাটো চুরি করে জীবন চলছিল আমার। অথচ আজ বাবার দেওয়া চিঠি থেকে প্রাপ্ত মহা মূল্যবান কিছু একটার সন্ধান পেয়ে সেটা চুরি করতে এসে কতকিছুই না হলে গেল! কী অদ্ভুত এই জায়গা! কী অদ্ভুত এখানকার মানুষ! সন্ধ্যার আগেই এখানকার দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। অনেক রাত অবধি খোলা থাকে শুধু কাফনের দোকান! আর এই ছেলে! এরকম সুদর্শন পুরুষ কাফন বিক্রেতা! সবকিছু কেমন যেন গোলমেলে লাগছে। ইতোমধ্যে আমি নিজের গায়ে চিমটি কেটে নিশ্চিত হয়েছি যে, আমি স্বপ্ন দেখছি না, এসব সত্যিই হচ্ছে।
আমি আনমনে আগুনের সামনে বসে ছিলাম। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির ঝংকার আমাকে আরো অন্যমনস্ক করে দিয়েছে। ছেলেটা এক পেয়ালা চা এগিয়ে দিলো আমার দিকে। আমি চুমুক দিয়ে বললাম, "আপনি ভেজা কাপড় পাল্টাবেন না?"
"কোথায় গিয়ে পাল্টাবো? আপনার সামনে? আমি মেয়েমানুষের সামনে কাপড় বদলে অভ্যস্ত নই।"
"আমি বাইরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি আপনি বদলে নিন।"
ছেলেটা হাসলো, "বাইরে গেলে আবার ভিজবেন। থাক, আমি ভেজা কাপড়েই বেশ আছি।"
আমার খুব মায়া লাগলো। আমি চোর তা ঠিক, কিন্তু মেয়ে তো! মেয়েমানুষের মন অল্পতেই গলে যায়। যেমন আমার গলছে। আহ্, বেচারা! আমার জন্য ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছে! এখন পর্যন্ত ছেলেটাকে ভালোই মনে হচ্ছে। রাত শেষ হতে এখনও ঢের বাকি। দেখা যাক শেষ অবধি সে তার ভালোমানুষি ধরে রাখতে পারে কি না!
শেষরাতে আমার ঘুমঘুম ভাব চলে এসেছিল। আমাকে বিছানায় শুতে বলে ছেলেটা আগুনের সামনে বসে রইল। আমি ঘুমাবো না ঠিক করেছিলাম কিন্তু তবু ঘুমে চোখজোড়া লেগে এল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে ছেলেটা আমাকে বলল, "সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার অনুমতি ব্যতীত বাইরে বের হবেন না।"
এই কথাটা আমি খুব একটা কানে তুলিনি। সে এমন কে যার অনুমতি নিয়ে বাইরে যেতে হবে! আমি এসেছি চুরি করতে। বিপদে পড়ে রাতটা এখানে কাটিয়েছি। সকাল হলে কে আর আমাকে খুুঁজে পাবে! দরজা খুলে আমি যে কোথায় ভ্যানিশ হয়ে যাব... হি-হি-হি!
কিন্তু সকালেই ঘটল আসল ঘটনা।
এরকম কিছু যে হতে পারে তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।
রাতে অন্ধকার থাকায় খুব একটা দেখতে পাইনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ছেলেটা দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। টিনের চালের ফাঁক দিয়ে বাইরে থেকে আলো এসেছে অনেক। আমি আস্তে করে দরজা খুললাম। তারপর বাইরে এক পা রাখতেই দু'টো লোক আমাকে দেখে এগিয়ে এল। তাদের মধ্যে একজন মাঝবয়সি আর একজন বৃদ্ধ। বৃদ্ধ আমাকে বললেন, "এই মেয়ে, কে তুমি? আজ সারারাত কি তুমি এই ঘরেই ছিলে?"
আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ। সঙ্গে সঙ্গে মাঝবয়সি লোকটা আরো লোকজন ডেকে আনলো। মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে জোয়ান, বুড়ো মিলে অন্তত অর্ধশত মানুষ জড়ো হয়ে গেল। সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে আমাকে চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে! ততক্ষণে যে ছেলেটা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল সে চোখ কচলাতে কচলাতে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। অমনি তাকে উদ্দেশ্য করে একজন বয়স্ক লোক বলে উঠলেন,
"এই মেয়ে কি তোমার বউ?"
ছেলেটা ইতস্তত করে বলল, "আপনারা ভুল বুঝবেন না। সে আমার কেউ নয়। তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।"
আরেকজন বয়স্ক লোক বলে উঠলেন, "বিয়ে ছাড়াই মেয়েমানুষের সাথে একঘরে রাত কাটিয়েছ! তুমি কি জানো না এর শাস্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?"
ছেলেটা কিছু বলতে যাবে তার আগেই অন্য একজন মাঝবয়সি লোক বলে উঠল, "এদেরকে এই মুহূর্তে বিয়ে দেওয়া হোক। তারপর শাস্তি।"
আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। বিয়ে মানে! আমি এসেছি চুরি করতে। এর মাঝে বিয়ে আসলো কোত্থেকে!
ছেলেটা বলল, "আপনারা আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি কোনো খারাপ কাজ করিনি। আমি শুধু তাকে আশ্রয় দিয়েছি..."
অন্য একজন ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, "তুমি এই মেয়ের সাথে একঘরে রাত্রিযাপন করেছ কি না?"
ছেলেটা মাথা নত করে বলল, "করেছি।"
চলবে
মো. ইয়াছিন