চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১২
ইয়াছিন নাইম২৫ জুলাই ২০১৫৫ মিনিট পড়াআমাকে সোফার পেছনে লুকিয়ে থাকতে নির্দেশ করল আয়রা।
তাকে আমি কখনো অস্থির হতে দেখিনি। সবসময় গম্ভীর অথবা রাগী ভাব নিয়ে থাকা মেয়ে সে। কিন্তু আজ তার চোখে অস্থিরতা দেখে অবাক লাগলো।
আমি কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই আয়রা নিজের ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকতে ইশারা করল। আমি মুখ বন্ধ করে সোফার পেছনে নিজেকে লুকিয়ে ফেললাম। আর তখনি মূল দরজার দিকে একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে যেতে দেখা গেল।
আয়রা দ্রুততার সাথে নিজের ওড়নাটা ভালোভাবে মাথায় এবং বুকের উপর ছড়িয়ে দেয়। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এদিকে আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। পরনের ফ্রকটাও খুব জ্বালাচ্ছে। এতক্ষণ ফ্রক পরে থাকতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু আয়রা দেখে ফেলার পর থেকে আর এটা পরে থাকতে পারছি না। ইচ্ছে করছে টেনেটুনে গা থেকে খুলে ফেলে দেই। কিন্তু আমি অপারগ। আপাতত সোফার পেছনে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এতক্ষণে লোকটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। এবং আড়াল থেকে তার আবছা অবয়ব আমার চোখে পড়ল। একটা মাঝবয়সি লোক। মুখে ছোপ ছোপ দাড়ি। পরনে পাতলা শার্ট আর লুঙ্গি। তাকে দেখেই আয়রা বলল,
"উনাকে ভেতরে এসে বসতে বলুন।"
লোকটা পেছন ফিরে তাকালো। আর তখনি তার পেছনে আরো একজন এসে দাঁড়ালেন। তার বয়স অনুমান করা কঠিন। সুঠাম দেহ, পেটানো চেহারা, চোখে কালো সানগ্লাস। পরনে ধবধবে সাদা ফুলহাতা শার্ট, নীল জিন্স আর কালো বুট। উচ্চতা কমসেকম ছয় ফুট তিন ইঞ্চি হবে। বয়স আগেই বলেছি অনুমান করা কঠিন। তবে পঞ্চাশের কাছাকাছি কিছু একটা হবে। তিনি ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। আর তখনি মাঝবয়সি লোকটা বিনীত ভঙ্গিতে বলল,
"স্যার, বসেন।"
আয়রা নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। আগন্তুক চোখের সানগ্লাস খুলে গম্ভীর গলায় বললেন, "আমি বসতে আসিনি জাবের। যে কারণে এসেছি সেটা বলো।"
"জি স্যার, বলতেছি।"
বলে জাবের নামের মাঝবয়সি লোকটা আয়রার দিকে তাকালো। বলল,
"ম্যাডাম, স্যারের ইচ্ছা আপনে এই সপ্তাহের মধ্যে বিয়েটা করেন। এইজন্যই স্যার এতদূর থেকে বাংলাদেশে এসেছে।"
আয়রা মাথা নিচু করে দম নিলো। তারপর ধীর গলায় বলল, "আমার বিয়ে নিয়ে উনার এত চিন্তা কেন?"
"এটা কী বলেন ম্যাডাম, মেয়ের বিয়ে নিয়ে বাপ টেনশন করবে না তো কে করবে?"
"বাবা? কেমন বাবার কথা বলছেন আপনি? যেই বাবা তার বারো বছর বয়সি মেয়েকে রেখে বিদেশে চলে যায় সেই বাবা? না কি যেই বাবা সামান্য একটা ভুলের কারণে তার মেয়ের সাথে কথা বলে না সেই বাবা?"
জাবেরের চেহারা দেখে মনে হলো তিনি কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি করুণ দৃষ্টিতে পাশের ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। কিন্তু কোনো জবাব পেলেন না। শেষে নিজেই বললেন,
"ম্যাডাম আমার মনেহয় স্যারের কথা মেনে নিলেই ভালো হবে। তাছাড়া রায়ান স্যার তো মানুষ খারাপ না..."
"খারাপ তো আপনার স্যারও ছিলেন না। কিন্তু তিনি আমার সাথে যা করেছেন সেটা কোন পর্যায়ে পড়ে বলতে পারেন? শুধু টাকা আর সহায় সম্পত্তি দিয়ে দিলেই যদি সন্তানের প্রতি কর্তব্য শেষ হয়ে যেত তাহলে তো..."
আয়রা বাকি কথা শেষ করে না। অভিমানে তার মুখ অন্যদিকে ঘুরে যায়। কেন যেন মনে হয় সে কাঁদছে। তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে মেঝেতে। সে একবার হাতের পিঠ দিয়ে নিজের চোখ মুছে নেয়। তারপর কাঁপাকাঁপা গলায় বলে,
"একটা বারো বছরের মেয়ে একা বড়ো হওয়া কতটা কষ্টের তা কি আপনি জানেন? কতটা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে, কত কষ্ট কত মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে জানেন?"
এতক্ষণে সেই ভদ্রলোক মুখ খুললেন। কড়া গলায় বললেন, "তোমাকে কথা বলার জন্য এনেছি জাবের। মুখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য নয়।"
"বলতাছি স্যার। ম্যাডাম শুনেন, স্যার চান আপনে এই সপ্তাহেই বিয়েটা করেন। এখন আপনার সাথে কথা বলতে আসছি। এরপর রায়ান স্যারের কাছে যাব।"
"আপনার স্যার উনার ইচ্ছের কথা জানাতে এসেছেন। কিন্তু আমার মতামত কি উনি শুনবেন না?"
"উনি আপনার মতামত জানতে আসেননাই ম্যাডাম। উনি উনার সিদ্ধান্ত আপনাকে জানাতে আসছেন।"
এতটুকু বলার পর ভদ্রলোক দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। পেছনে ছুটে গেলেন জাবের। আয়রা হতবাক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কয়েক পা এসে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল।
সোফার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আয়রার সামনে দাঁড়ালাম। রাগে তার গাল লালবর্ণ হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস পড়ছে বড়োবড়ো। আমি কী বলব বা কী করব বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু কৌতূহল দমাতে না পেরে বলেই ফেললাম,
"উনি কি আপনার বাবা?"
সঙ্গেসঙ্গে ভীষণ রেগে টেবিলের উপর থেকে কাচের ফুলদানি তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো আয়রা।
"কীসের বাবা? শুধু জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না।"
বলে রাগে ফুঁসতে শুরু করল আয়রা। সে হয়তো খেয়াল করেনি, ফুলদানিটা দেয়ালে আছাড় খেয়ে উড়ে এসে আমার মাথার পেছনে আঘাত করেছে। সেটা এখন টুকরো টুকরো হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার মাথার পেছন দিকটা কেমন যেন ভেজাভেজা লাগছে। সেখানে হাত দিতেই আমার হাত লাল হয়ে গেল। টের পেলাম মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে ফ্রকের পেছন দিকে লাগছে। তার কিছুটা পিঠ বেয়ে নেমে যাচ্ছে। কেমন যেন ঝাপসা লাগছে সবকিছু। কানে কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যেতে শুরু করল। শরীর দুর্বল লাগতে শুরু করল। টের পেলাম হাত-পা কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে। এবং একসময় চেতনা হারিয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে। ঝাপসা চোখে শেষবার দেখলাম, আয়রা এক লাফে আমার দিকে ছুটে আসছে। তারপর সব অন্ধকার।
চোখ খুলতেই দেখি বিছানায় শুয়ে আছি।
আমার মাথায় ব্যান্ডেজ। পাশে আয়রা বসা।
"উঠতে হবে না। শুয়ে থাকো।" বলে আমার বুকে আলতো হাত রাখলো আয়রা।
"আমি... আ-আমি এখানে এলাম কীভাবে?"
"আমি এনেছি।"
"আপনি... আপনি আমাকে এখানে এনেছেন?"
"তুমি আমাকে সামলে রাখতে পারলে আমি পারব না কেন?"
বলে আয়রা আমার চোখের দিকে তাকালো। তার স্বচ্ছ কালো চোখদুটো আগুনের মতো লাল হয়ে আছে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক কেঁদেছে মেয়েটা। তার গলার আওয়াজও সেরকম ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
"আজান আমি ইচ্ছে করে তোমাকে আঘাত করিনি। আমি তো..."
"আমি জানি আপনি স্বেচ্ছায় করেননি।"
"তুমি আমাকে অনেক সহ্য করেছ আজান। আর কেউ কখনো আমাকে এতটা সহ্য করেনি। তোমাকে আর জ্বালাতন করব না। তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।"
রাতে যখন রওনা দিলাম, তখন আয়রা চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল। আমি বসলাম তার পাশে। সে নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে মেস পর্যন্ত পৌঁছে দিলো।
আমি যখন গাড়ি থেকে নেমে মেসের দিকে রওনা দিয়েছি তখন সে নিজেও গাড়ি থেকে নেমে এল। তার চোখদুটো তখনও টলমল করছে। গলাটা তখনও ধরা। জানি না কেন আয়রাকে খুব অসহায় লাগছিল। এই প্রথম তাকে দেখে এত মায়া হলো। কিন্তু তাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমার জানা নেই।
আয়রা নিজে থেকেই বলল, "তোমার কি কিছুই বলার নেই আজান।"
আমি সংক্ষেপে জবাব দিলাম, "নাহ।"
আয়রা আর কোনো কথা বাড়ালো না। সোজা গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। আর সঙ্গেসঙ্গেই ধুলো উড়িয়ে চলে গেল গাড়িটা।
চলবে...