মিষ্টির দোকান — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম১৫ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়াআমাদের বাড়ি নিয়ে একটা কথা প্রচলিত আছে। লোকে বলে এই বাড়িতে জিনেরা আসা যাওয়া করে। তাই আশেপাশে কোনো ঘরবাড়ি নেই। আছে কিছুটা দূরে।
বাড়ির দক্ষিণ দিকে বাঁশঝাড়। উত্তরে কিছু কদম, কদবেল গাছ। রাতের অন্ধকারে অসংখ্য ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যায়।
কিন্তু উনারা যখন মিষ্টি নিতে আসেন, তখন কীভাবে যেন সেই শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। থাকে কেবল শূন্য খাঁখাঁ করা নিঃস্তব্ধতা। অনেক রাতে হঠাৎ চাঁদের আলোয় কয়েকটা ছায়া এসে দাঁড়ায় ঘরের দরজায়। দরজার নিচ দিয়ে সেই ছায়ার কিছুটা এসে পড়ে ঘরের ভেতরে। ঠকঠক করে আওয়াজ হয় তিনবার।
"উনারা চলে আসছেন।" বলে আব্বা দোকান খুলতে যান।
আজ রাতে আব্বা বেরিয়ে যাওয়ার পর আম্মা এক মুহূর্তের জন্যও নামাজের স্থান থেকে ওঠেননি। বারবার একই কথা বলছিলেন,
"না জেনে কী ভুল করে ফেললাম আল্লাহ? কীভাবে এত বড়ো অন্যায় করে ফেললাম আমি!"
ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল চারদিক থেকে। তখন এলেন আব্বা। ঘরে ঢুকতেই আম্মা তাড়াহুড়ো করে হাত-মুখ সব দেখতে লাগলেন।
"তুমি ঠিক আছো তো? কিছু হয়নি তো তোমার?"
আব্বার চেহারা গম্ভীর। ধপ করে বসে পড়েন বিছানায়।
"বাচ্চাটা আমাদের ছেলের বয়সি ছিল। কোন পাষাণের মন এত শক্ত কে জানে! অমন একটা বাচ্চাকে পিটিয়ে মেরেই ফেলল! এভাবে কেউ কাউকে খুন করতে পারে?"
আম্মা কিছুটা থমকে গেলেন। জড়োসড়ো ভঙ্গিতে বসলেন আব্বার পাশে। ঢোক গিলে বললেন,
"চলো না আমরা অন্য কোথাও চলে যাই।"
আব্বা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আম্মার চেহারায় কেমন একটা ভয় কাজ করছিল তখনও। আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। আব্বা তো জানাজা পড়ে ফিরে এসেছেন। তারপরও আম্মা ভয় পাচ্ছেন কেন?
তবে কি কোনো নতুন বিপদ আসতে চলেছে?
পরদিন সকালে মাদ্রাসার পুকুরে ওযু করছিলাম।
তখন ঘটল ব্যাপারটা।
আমাদের মাদ্রাসায় অনেক ছাত্র পড়ে। কেউকেউ তো বলে এখানে নাকি জিনেরাও পড়তে আসে। আমি কোনোদিন জিন দেখিনি।
লোকমুখে শুনেছি হিফজ বিভাগে কড়া শাসন হয়। পড়া না পারলে বেতের বাড়ি। আমাদের মাদ্রাসায় এমন হয় না। কোথাও আটকে গেলে হুজুর খুব শান্তভাবে বোঝান।
"যে কোরআন মুখস্ত করে হাফেজ হবে, তার পিতা-মাতাকে হাশরের ময়দানে নূরের মুকুট পরিয়ে সম্মানিত করা হবে। সেই মুকুট সূর্যের আলোর চেয়েও দীপ্তিময় হবে।"
সেদিন পুকুরে ওযু করছিলাম। দেখি একটা ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে লম্বা সাদা পাঞ্জাবি। মাথায় সাদা টুপি। ছেলেটাকে এর আগে কোনোদিন মাদ্রাসায় দেখিনি। এমনকী তাকে এই গ্রামের বলেও মনে হলো না।
ছেলেটা টলতে টলতে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দৌড়ে বড়ো হুজুরকে ডেকে আনলাম। ততক্ষণে পুরো মাঠে ছাত্ররা ভীড় করে ফেলেছে। হুজুর এসে উঁবু হয়ে বসলেন ছেলেটার পাশে। বললেন,
"ইয়া আল্লাহ, ছেলেটার তো জ্ঞান নেই।"
দেখা গেল আমার ধারণাই ঠিক৷ ছেলেটা এই মাদ্রাসার ছাত্র না। এমনকি এই গ্রামেরও না। হুজুররা কয়েক দফায় তার নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। কোনো জবাব দেয় না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু এই তাকিয়ে থাকার মাঝেও একটা ব্যাপার আছে।
কত ছাত্র আসে যায়। হুজুররা আসেন। ছেলেটা তাকায় শুধু আমার দিকে।
যেন আমাকেই দেখতে এসেছে।
এতে আমার খুব অস্বস্তি লাগে। তাই কয়েকদিন যাইনি ওর সামনে।
এদিকে বড়ো হুজুর অনেক চেষ্টা করেও ছেলেটার নাম-ঠিকানার কোনো হদিস পেলেন না। ছেলেটা এখন আমাদের মাদ্রাসায় থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। চুপচাপ বসে বসে কী যেন ভাবে।
সেদিন গেলাম ওর কাছে।
ছেলেটা প্রতিদিনের মতোই চুপচাপ বসে ছিল। পাশে গিয়ে বসলাম। বললাম,
"তুমি সবসময় মন খারাপ করে বসে থাকো কেন?"
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। এবং এই প্রথম সে কথা বলল। যা শুনে কষ্টে আমার কান্না পেতে লাগলো। বললাম,
"তোমার ভাই মারা গেছে? তাহলে তো তোমার খুব কষ্ট।"
ছেলেটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
"তোমার ভাই মনে হয় অনেক বয়স্ক ছিলেন?"
মাথা নাড়তে লাগলো ছেলেটা। ক্ষীণ আওয়াজে বলল,
"আমার ছোটো ভাই ছিল। তোমার বয়সি।"
অনেক দিন ধরে উনারা আসেন না।
মিষ্টিও বিক্রি হয় না তেমন একটা। রাতে খেতে বসে আব্বা সেই কথাই বলছিলেন।
"কতদিন হলো উনারা মিষ্টি নিতে আসেন না। আগে তো কখনো এমন হয়নি।"
আম্মা ভাত দিচ্ছিলেন। থেমে গিয়ে বললেন,
"আসে না ভালো হয়েছে। আমিও চাই না আসুক।"
"এটা কী বলছো আয়েশা? উনারা আমাদের মেহমান। আমি মিষ্টি বানাই উনাদের জন্যই।"
"এসব বাদ দিয়ে নতুন কিছু করো।"
জবাবে আব্বা কিছু বললেন না। অনেক্ষণ কী একটা চিন্তায় গুম হয়ে রইলেন। তারপর বিড়বিড় করতে লাগলেন।
"আমার মনে হয়... হয়তো কিছু একটা ভুল হয়েছে। উনারা কি কোনো কারণে আমার উপর নারাজ হয়েছেন? তা না হলে এতদিনে একবারও দেখা নেই কেন?"
খেয়াল করলাম প্রশ্নগুলো শুনে আম্মার চোখদুটো কেমন চঞ্চল হতে শুরু করেছে। তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করছেন আব্বার কাছে দৃষ্টি আড়াল করার। ব্যাপারটা হয়তো আব্বাও খেয়াল করেছেন। বললেন,
"তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছো আয়েশা?"
"কী বলো! আ... আমি, আমি কেন কিছু লুকাব?"
"জানি না। কয়দিন ধরে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চাচ্ছো। কিন্তু বলতে পারছো না। তোমাকে অনেক পেরেশান লাগে ইদানীং।"
"কী যে ভাবো না তুমি! তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমাও। সকালে উঠে ফজরের নামাজ পড়তে হবে।"
পরদিন ছেলেটাকে নিয়ে এলাম আমাদের বাড়িতে। আম্মাকে আগেই বলেছিলাম ওর কথা। আম্মা ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
"আহারে, কী ফুটফুটে চেহারা ছেলেটা। কী নাম তোমার, বাবা?"
"নূর ইসলাম।"
"মাশাল্লাহ। তোমার মা-বাবার কথা মনে পড়ে না?"
মাথা নাড়ে ছেলেটা। আম্মা বলেন, "কী খাবে বলো তো? কী খেতে পছন্দ করো?"
"আপনি জানেন আমি কী পছন্দ করি।" বলল ছেলেটা। আর তাতেই আম্মার চেহারার রং যেন উবে গেল মুহূর্তেই। আমি অবাক হচ্ছিলাম এটা ভেবে যে, ছেলেটা এত কথা বলে না। আজ হঠাৎ বলছে কেন?
আম্মা এলোমেলো কণ্ঠে বললেন, "আমি কীভাবে জানব তুমি কী পছন্দ করো?"
ছেলেটা আর কোনো কথা বলল না। আমরা যখন মাদ্রাসায় ফিরে যাচ্ছি তখন আম্মা জিজ্ঞেস করলেন,
"মাদ্রাসায় থাকতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?"
"ছাড়পোকা অনেক। রাতে ঘুমাতে পারি না।"
সেই রাতে আবার দরজায় টুকা পড়ল। পরপর তিনবার।
"উনারা এসেছেন।" বলে আব্বা দোকান খুলতে গেলেন। অনেক দিন পর সেই মিষ্টি গন্ধটা আবারো আমার নাকে আসলো। এতদিন ঝিঁঝি পোকার ডাক থামেনি। আজ উনারা আসতেই সব থেমে গেল।
আব্বার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।
"আপনারা এতদিন আসেননি যে?"
"আমার বড়ো ছেলেটা হঠাৎ হারিয়ে গেছে। তাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।"
"পেয়েছেন?"
"না।"
"দোয়া করি। আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা পথ দেখাবেন।"
পরদিন সকালে নূর ইসলামের কাছে গেলাম। একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো তার কাছে কোনো আতর দেখি না। কিন্তু সব সময় কেমন যেন একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়া যায়। প্রথম প্রথম ভাবতাম হয়তো কোনো ছাত্র তাকে আতর মাখিয়েছে।
কিন্তু প্রতিদিন একই আতর কে দিবে? তাছাড়া সে তো কারো সাথে কথাই বলে না। মেলামেশা তো দূর। তবে ঘ্রাণ আসে কোত্থেকে?
যাইহোক, সবার আগে সুখবরটা বললাম।
"আজ থেকে তোমাকে ছারপোকার কামড় খেতে হবে না।"
নূর ইসলাম কৌতূহলী ভঙ্গিতে তাকালো আমার দিকে। বললাম,
"আম্মা অনুমতি নিয়েছেন আব্বার কাছ থেকে। তুমি চাইলে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারবে।"
সঙ্গেসঙ্গে নূর ইসলামের চেহারায় অদ্ভুত হাসি খেলে গেল৷ যেন খবরটা সে আগে থেকেই জানত। এই প্রথম তাকে হাসতে দেখলাম। আর তাতেই আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মানুষের হাসি এত ভয়ঙ্কর হতে পারে?
চলবে।