আকাশচুম্বী — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম১৯ অক্টোবর ২০২৪৪ মিনিট পড়াএকদিন রাতে বাসায় ফিরছিলাম। আঁখি মঞ্জিলের সামনে এসে চমকে উঠলাম। বাসার ভিতর থেকে চিৎকার, চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসছে। সেই মেয়েটির আর্তনাদ আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। তার ডুকরে কান্নার আওয়াজ শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। না, গেট খুলা ছিল না। আঁখি মঞ্জিলের সদর দরজা ভিতর থেকে তালাবদ্ধ। আমি বাধ্য হয়ে দেয়াল টপকে ভিতরে প্রবেশ করলাম। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। কলিংবেল চেপে ধরে রাখলাম। ভদ্রমিহলা দরজা খুলে ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'এ্যাই ছেলে, ভিতরে এলে কীভাবে? গেট তো তালাবদ্ধ!'
আমি এতটাই হাঁপিয়ে উঠেছিলাম, কথা বলতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ দম নিয়ে বললাম, 'দেয়াল টপকে এসেছি।'
'কেন এসেছো?'
'কেন এসেছি মানে! একটা মেয়ে এতটা চিৎকার দিচ্ছে...'
ভদ্রমহিলা নিতান্ত সহজ গলায় বললেন, 'কোথায় চিৎকার দিচ্ছে?'
তখন আমি স্তম্ভিত ফিরে পেলাম। পুরো বাড়ি নিঃস্তব্ধ। চিৎকার, চেঁচামেচি তো দূর, মশা উড়ে যাওয়ার শব্দ পর্যন্ত নেই। খেয়াল করলাম, সেই মেয়েটি ভেজা ভেজা চোখে ভিতরের ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে চোখের পলক ফেলছে। হাতে, পায়ে লোহার শিকল বাঁধা। তার সামনে ফ্লোরে পড়ে আছে ভাঙা কাচের টুকরো টুকরো অংশ।
সেদিন আমি ফিরে এসেছিলাম। রাতে ঘুম হয়নি। সারা রাত এপাশ-ওপাশ করতে করতে শেষরাতে ছাদে গেলাম। হঠাৎ আমার কাঁধে হাতের স্পর্শ পেলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বাবা দাঁড়িয়ে আছেন৷ তিনি নিচু গলায় বললেন, 'কীরে, এতদিন পর দেশে ফিরলাম, এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে গেলি না। বাসায় আসার পর কথাও বলিসনি। ব্যাপার কী? শরীর খারাপ নয়তো?'
আমি শুধু এটুকু বললাম, 'ও-বাসার মেয়েটিকে দেখেছো বাবা? সারাদিন শিকল বন্দি হয়ে থাকে...'
বাবা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'জানিস তো, নবনীর সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। সে ছাড়া আর কোনো মেয়ে তোর জীবনে ছিল না। আসবেও না। যা শুয়ে পড়।'
বলে চলে গেলেন। এর আগে কখনো তাকে এতটা রেগে যেতে দেখিনি৷ মায়ের মৃত্যুর পর বাবা কখনো আমার সাথে এতটা কড়া গলায় কথা বলেননি। হঠাৎ তার এমন পরিবর্তন আমাকে বিস্মিত করল। তবু আমি তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। স্তব্ধ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, দেখলাম আমার পাশে নবনী বসে আছে। গাঢ় নীল শাড়ি পরেছে মেয়েটা। হাতে কাচের চুড়ি। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। খুব বেশি সাজগোজ করেনি। আবার কমও বলা যায় না। আমি যখন ঘুমঘুম চোখে চেয়ে বললাম, 'কখন এলে?'
নবনী ইতস্তত করে উঠে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে বলল, 'কিছুক্ষণ আগে এসেছি। আঙ্কেল ফোন দিয়েছেন আসার জন্য...'
তাকে আমি ছোটোবেলা থেকে চিনি। সে আমার দু'বছরের ছোটো। আমাকে খুব ভয় পেত। ভাইয়া বলে ডাকত। আমাদের বিয়ের কথা হওয়ার পর আর ভাইয়া বলে ডাকে না। সে আমাকে এখনও ভয় পায়। হয়তো আগের থেকেও বেশি।
আমি উঠে বসতে বসতে বললাম, 'বাবা ডেকে পাঠিয়েছে? হঠাৎ জরুরি তলব! কোনো বিশেষ কারণ?'
নবনী বলল, 'জানি না।'
তখন বাবা এলেন। বললেন, 'অফিসে যাবার সময় ওঁকে সাথে নিয়ে যাস। বাসায় পৌঁছে দিয়ে তারপর অফিসে যাবি।'
'বাইক নিয়ে...'
'না, রিকশা নিয়ে যাবি।'
আমি আর নবনী রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন চোখ পড়ল আঁখি মঞ্জিলের দোতলায়। সেই মেয়েটি বেলকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছে। চিৎকার, টানা-হেঁচড়া কিছুই করছে না। তবে তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমি তার দিকে তাকাতেই সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল৷ আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো। এবার আমি নিশ্চিত হলাম, সে আমার উপর রেগে আছে। কিন্তু কেন রেগে আছে, তা জানা হলো না।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছিলাম। মেয়েটি তখনও বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে৷ আমি স্থির হয়ে দাঁড়ালাম। মনে হলো মেয়েটি আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকছে। আমি একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালাম। সত্যিই ডাকছে। আজ সন্ধ্যের পরেই হয়তো আঁখি মঞ্জিলের গেটে তালা দেওয়া হয়েছে। আমাকে দেয়াল টপকে ভিতরে যেতে হলো। কাঁঠাল গাছ বেয়ে মেয়েটির একদম কাছে চলে গেলাম। এতটা কাছাকাছি হব, ভাবিনি কখনো৷ মেয়েটি শান্ত গলায় বলল, 'আপনিও আমায় পাগল ভাবেন?'
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এতদিন আমার ধারণা ছিল, মেয়েটি কথা বলতে পারে না। সে এবার বলল, 'শক্ত করে ধরুন, পড়ে যাবেন তো!'
আমি বললাম, 'আপনি কথা বলতে পারেন?'
মেয়েটি খিলখিল করে হাসল। সে হাসলে তার গালে টোল পড়ে, তা এতদিন খেয়াল করিনি। ফরশা গালের গভীর টোল একবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল। আমি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বললাম, 'নাম কী আপনার?'
মেয়েটি বলল, 'আমি নিতু। আপনি?'
'আমি জাফর।'
সেদিন আমাদের কথোপকথন এতটুকুতেই থেমে গেল। কারণ, ততক্ষণে আঁখি মঞ্জিলের সেই ভদ্র মহিলা বাসায় ফিরে এসেছিলেন। আমি কাঁঠাল গাছ বেয়ে নিচে নেমে দেয়াল টপকে দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেলাম।
এরপর যখন দেখা হলো, মেয়েটি বেলকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আমি রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আবার সেই উদাসীন ভাব। চোখে-মুখে ভয়। সে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল৷ ভদ্রমহিলা ছুটে এলেন। তাকে টেনে ভিতরে নিয়ে গেলেন। আমি তখনও বিশ্বাস করিনি তার নাম নিতু। মনে হলো, মেয়েটা মিথ্যে বলেছে। হয়তো রসিকতা করেছিল।
একদিন সেই কালো ভদ্রলোকের দেখা পেলাম। গলির রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকছিলেন। আমাকে দেখে হনহন করে চলে যাচ্ছিলেন। আমি ডাকলাম। তিনি দাঁড়ালেন না। উপায় না পেয়ে দৌড়ে গিয়ে খপ করে উনার হাত ধরে ফেললাম। তিনি বিরক্ত নিয়ে বললেন, 'কী চাই?'
আমি বললাম, 'সেই মেয়েটির ব্যাপারে জানতে চাই।'
'কোন মেয়ে, নিতু?'
আমি তখন বুঝতে পারলাম, মেয়েটি রসিকতা করেনি। সত্যি বলেছিল। আমি বললাম, 'হ্যাঁ, নিতুর ব্যাপারে জানতে চাই। ওঁকে কেন নির্যাতন করা হয়, কেন বেঁধে রাখা হয়, আপনি তার কী হন ইত্যাদি।'
তিনি বললেন, 'আমি তার বাবা।'
আমি বিস্মিত চোখে চেয়ে বললাম, 'বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে নির্যাতন করেন? কেমন বাবা আপনি?'
তিনি গম্ভীর ভাব নিয়ে বললেন, 'নির্যাতন আমি করি না তুমি? নিজের দোষ আমার উপর চাপাচ্ছো? মনে রেখো, তুমি আজ অন্যের সাথে যা করবে, একদিন অন্য একজন তোমার সাথে ঠিক তেমনটা করবে।'
বলে হনহন করে চলে গেলেন তিনি। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম৷ তখন পৃথিবীর সবচে' অসহায় মানুষ মনে হচ্ছিল নিজেকে। চোখের জল টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছিল। আমি শুধু বিড়বিড় করে বললাম, 'আমি নির্যাতন করি! আমি!'
চলবে
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :https://www.facebook.com/107969461087579/posts/170460961505095/?app=fbl