আকাশচুম্বী — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম২৬ অক্টোবর ২০২৪৪ মিনিট পড়াএকদিন ঠিক করলাম লুকিয়ে লুকিয়ে তার সাথে দেখা করব। হোক অপরাধ, তবুও দেখা করতে হবে। যত সময় যাচ্ছিল, মেয়েটির প্রতি আমার কৌতূহল ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, তার স্বচ্ছ টলটলে চক্ষু জোড়া কিছু একটা বলতে চায় আমাকে। কাটা ঠোঁট বলতে দেয় না।
একদিন রাতে ঠিক করলাম, দেয়াল টপকাবো। এ-ছাড়া আর কোনো পথ খুলা ছিল না। প্রতিদিন রাত দশটায় আঁখি মঞ্জিলের সদর দরজায় তালা দেওয়া হয়। চাবি ছাড়া তালা খুলতে পারা আমার সাধ্যের নয়। তাই উঁচু দেয়াল বেয়ে উঠলাম। দেয়াল থেকে মাটিতে লাফিয়ে পড়তেই মৃদু ভয় পেয়ে বসল আমায়। মনে হলো হাঁটু কাঁপছে। আমি পায়ে হাত রাখলাম। সত্যি বলতে হাঁটু কাঁপছিল না। কাঁপছিল আমার বুক। এতটাই ধড়ফড় করছিল, কয়েক মিনিট নড়তেই পারলাম না। শিশিরে আলতো ভেজা ঘাসের উপর স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। তখন রাতের সাড়ে বারো। আশপাশের বাড়িগুলোতে বাতি নিভতে শুরু করেছে। আঁখি মঞ্জিলের সব ক'টা ঘরে বাতি নিভানো হয়ে গিয়েছিল তখন। শুধু সেই মেয়েটির ঘরে আলো জ্বলছিল।
বেলকনির পাশে বিশাল কাঁঠাল গাছ। খুব একটা লম্বা না হলেও এর দেহ ইয়া বড়। দু'হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে নাগাল পাওয়া যায় না। পায়ের স্যান্ডেল খুলে রেখে আমি কাঁঠাল গাছ বেয়ে কোনোমতে দোতলার বেলকনিতে পা রাখলাম। দোতলায় উঠতে খুব একটা কষ্ট পোহাতে না হলেও মেয়েটিকে এক পলক দেখতে আমাকে অনেকটা বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বেলকনির কাঠের দরজা ভিতর থেকে লাগানো ছিল। তখন উপায় একটাই, জানালা দিয়ে ঘরের ভিতর দৃষ্টি রেখে পালিয়ে যাওয়া।
মুশকিল হলো জানালা পর্যন্ত যেতে পারা। কারণ জানালা বেলকনি থেকে হাত দু'-এক দূরে। যেই না বেলকনির দেয়ালে পা রেখে জানালা ছুঁয়ার জন্য হাত বাড়ালাম, অমনি পা'টা গেল ছুটে। কপাল ভালো কাঁঠাল গাছের বাকানো ডাল পাতা ছিল। নাহলে সেদিন হাত-পা ভেঙে ঘরে ফিরতাম।
তারপর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে জানালা ছুঁতে সক্ষম হলাম। কাচের জানালা দিয়ে ভিতরের ঘরটা পুরোপুরি দেখা যায় না। ঘরে আলো জ্বলছিল তাই আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছিলাম। ঘরের এক কোণে বিছানায় কাচুমাচু হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটি। এতদিন মনে হয়েছে মেয়েটির বয়স বাইশ-তেইশ বছর হবে। কিন্তু ঘুমন্ত মেয়েটিকে দেখে মনে হলো তার বয়স আঠারো-উনিশ হবে। বড়জোড় বিশ। এর বেশি হবে না। সেদিন বুঝতে পারলাম, মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে বয়স কমে যায়।
শীতকালে কাচ ঘেমে যায়। ঘোলাটে হয়ে যায়। জানালার কাচ-ও ঘেমে ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল। আমি হাত দিয়ে মুছে পরিষ্কার করলাম। চোখে পড়ল ঘুমন্ত এক মায়াবী মুখ। এর আগে এত সুন্দর কাউকে দেখিনি আমি। কী অপরূপ! কী অপরূপ! মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে কি তাদের সৌন্দর্য বেড়ে যায়? জানা নেই। তবে এই মেয়েটির ঘুমন্ত মুখ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমি মুগ্ধ নয়নে পুনঃপুন তাকাচ্ছিলাম তার দিকে। সেদিন দেখলাম মেয়েটির কপালের বাঁ পাশে একগোছা চুল নেই। আমার কিছুটা অবাক লাগলো। তার কপালের সেই অংশে চুল ছিল সেটা আমি জানলাম কীভাবে!
সব ভাবনা ভুলে গিয়ে আবারো দৃষ্টি রাখলাম ঘুমন্ত মেয়েটির উপর। দেখে মনে হচ্ছিল, কাপড়ের পুটলিতে কাচুমাচু হয়ে শুয়ে পড়া বিড়ালছানা। ইচ্ছে করছিল তার কাছে যাই। খুব কাছে। গিয়ে পাশে বসি। মুখের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দেই। কপাল স্পর্শ করে দেখি শরীরে জ্বর আছে কিনা।
দেখতে দেখতে দু'টো বেজে গেল। চোখের পলকে কেটে গেল দেড় ঘন্টা। খেয়াল করলাম আমার পা দু'টো অবশ হয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেও নাড়াতে পারছি না। শীতের রাতে বাইরে একটানা এতটা সময় দাঁড়িয়ে থাকলে এমন হবারই কথা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কাঁঠাল গাছ বেয়ে নিচে নামলাম। দেয়াল টপকে বেড়িয়ে গেলাম আঁখি মঞ্জিল থেকে। যেতে যেতে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। কেন জানি মনে হচ্ছিল, মেয়েটি বিছানা থেকে উঠে এসে জানালার সামনে দাঁড়াবে। আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফাঁক না করে শুকনো হাসবে।
পরদিন সকালে আর দেখা পেলাম না তার। রাতে যখন বাসায় ফিরছিলাম, তখন দেখলাম আঁখি মঞ্জিলের দোতলার বেলকনিতে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে। আমি একটু ইতস্তত করলাম। এ লোকটিকে দেখিনি কখনও। তাও আবার সেই মেয়েটির বেলকনিতে!
গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল লোকটি। হাতে সিগারেট। মাঝে মাঝে ধোঁয়া টানছিল। লোকটির গায়ের রং কালো। শুধু কালো বললে ভুল হবে, কুচকুচে কালো। মুখে খোঁচা খোঁচা পাকা আধা পাকা দাড়ি। মাথায় এক ঝাকড়া কালো চুল। এ ধরণের লোকেরা চুল কালো করে। এ লোকটাও করেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু কালো চুলে লোকটাকে মানাচ্ছে না। পাকা চুলে মানাতো হয়তো। সে যাই হোক, লোকটা একবার আমার দিকে তাকাল। আমি তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। লোকটি আমার দিকে তাকাতেই হাতের সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে হাঁটতে শুরু করলাম। ডান পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আবারো সেই বেলকনিতে দৃষ্টি রাখলাম। লোকটা গ্রিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ফুঁকছে।
সকালে যখন বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, ঘড়িতে নয়টা বেজে একুশ মিনিট। প্রতিদিনের মতো রিকশার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। শত ইচ্ছে থাকার পরেও বেলকনির দিকে তাকাচ্ছিলাম না। মনে একটা ভয় কাজ করছিল, যদি গতরাতের সেই লোকটাকে আবারও সেখানে দেখে ফেলি!
দুশ্চিন্তা কম করার জন্য একটা সিগারেট জ্বালালাম। শুনেছিলাম সিগারেটের ধোঁয়া দুশ্চিন্তা দূর করে দেয়। আমার ক্ষেত্রে হলো উল্টো, দুশ্চিন্তা বরং বাড়ছিল। একসময় আমার সামনে একটি রিকশা এসে থামল। আমি রিকশায় চড়ে বসলাম। দেখব না, দেখব না করেও একবার বেলকনিতে দৃষ্টি রাখলাম। সেই মেয়েটা গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে উদাসীন ভাবে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। হয়তো সে জানে, আমি তার সামনে দিয়ে যাচ্ছি। হয়তো সে রেগে আছে। কিংবা অভিমান করেছে। কিন্তু আমার মতে একটা অচেনা, অজানা লোকের সাথে অভিমান করে থাকাটা তার ঠিক হয়নি।
যেতে যেতে আরো একবার ফিরে তাকালাম। মেয়েটির পাশে কালো লোকটা এসে দাঁড়িয়েছে। খালি গা। হাতে সিগারেট। লোকটাকে তার পাশে দেখে আমার গা জ্বলে উঠল। শরীর ঘামতে শুরু করল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। আমি কেবল অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার দিকে। একসময় রিকশাঅলার প্যাডেলে আমার দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল সে।
চলবে
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/107969461087579/posts/169564208261437/?app=fbl