আকাশচুম্বীঅতিপ্রাকৃত

আকাশচুম্বী — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম২১ অক্টোবর ২০২৪৫ মিনিট পড়া

একদিন আঁখি মঞ্জিলে মেহমান এলো। এক গাড়ি মেহমান। সকালে এসেছে ওঁরা। দিনটা শুক্রবার। অফিস নেই। আমি সুযোগের অপেক্ষা করছিলাম। কখন কেউ একজন বেরোবে। কখন আমি একটু ভাব জমিয়ে কথা আদায় করব। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, কেউ বেরোল না। একটা কুকুর পর্যন্ত না। শুধু রাস্তার ওপাশে নোহা গাড়িটা দাঁড় করা দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভার গাড়িতে বসে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে।

বিকেল হয়ে এলো, কারোর দেখা পেলাম না। হঠাৎ আঁখি মঞ্জিলের দরজায় শব্দ হলো। একটা মেয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়াল। আমি ছুটে গেলাম তার কাছে। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বললাম, 'এই মেয়ে, নাম কী তোমার?'

মেয়েটা আমার দিকে তাকাল। ষোলো-সতেরো বছর হবে বয়স। গোলগাল চেহারা। চোখে-মুখে চঞ্চলতা। সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, মনে হচ্ছিল সে আমাকে অনেক আগে থেকে চেনে। হাসি হাসি মুখে বলল, 'আমি নওরিন। তুমি?'

'আমি জাফর।'

'জাফর তুমি কীসে পড়ো?'

'পড়াশোনা তো শেষ।'

নওরিন চিন্তিত ভাব নিয়ে বলল, 'তাহলে তো তুমি অনেক বড়!'

আমি একটু হাসলাম। বললাম, 'এখানে কার বাসায় এসেছো?'

'খালা মনির বাসায়।'

তারপর অনেক কথা হলো। কথা বলতে বলতে আমি অনেকগুলো চকোলেট দিলাম তার হাতে। যখন ভাব হয়ে গেল, তখনই জিজ্ঞেস করলাম, 'নিতু তোমার কী হয়?'

'নিতু আপু আমার আপু হয়।'

'ওঁর এই অবস্থা কি ছোটোবেলা থেকেই? মানে শিকল বন্দি...'

মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে করুণ গলায় বলল, 'না, না। আপু খুব লক্ষী একটা মেয়ে। খুব বুদ্ধীমতী। দেখতেও সুন্দর। পড়াশোনায় টপার ছিল। গত এক বছরে আপু এমন হয়ে গেছে।'

আমি আর কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, 'কেন হয়েছে এমনটা?'

'আপু একটা ছেলেকে ভালোবাসতো। ভীষণ ভালোবাসতো। শুনেছি ছেলেটাকে এক নজর দেখার জন্য আপু ঘন্টার পর ঘন্টা বেলকনিতে, রাস্তায় রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকত। বৃষ্টিতে ভিজত। একদিন ছেলেটাকে দেখতে না পেলে সে খাবার খেত না। কিন্তু ছেলেটা...'

বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নওরিন। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আমি বুঝতে পারলাম নিতুকে কোনো এক ছেলে আঘাত দিয়েছে। যার ক্ষত এখনও শুকায়নি। হয়তো শুকাবেও না।

'ছেলেটা কে, জানো তুমি? দেখেছো তাকে কখনো?'

নওরিন বলল, 'চিনি না। দেখিনি কখনো। তবে নাম শুনেছি।'

'কী নাম তার?'

'জাফর।' বলেই হনহন করে চলে গেল সে। আমি আরো একবার ধাক্কা খেলাম। জানি না কী ঘটছে আমার সাথে। তবে যা-ই ঘটছে, খুব বাজে ঘটছে। এর পরিণাম হয়তো খুব একটা ভালো হবে না।

সেদিন রাতেও আমার ঘুম হয়নি। সারা রাত এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছি। আর ভেবেছি, সবার আঙুল ঘুরেফিরে আমার দিকেই আসে কেন? কেনই বা আঁখি মঞ্জিলের লোকগুলো আমাকে এতটা ঘৃণা করে? কেন নিতু মেয়েটাকে আমার এত আপন মনে হয়? কেন বাবা নিতুর কথা শুনে রেগে গেলেন? কেন নওরিন নিতুকে আঘাত দেওয়া ছেলেটার নাম বলতে গিয়ে আমার নাম বলল? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরছিল আমার মাথায়। ঘুমে চোখ লেগে এলো ভোরবেলায়। তখন মসজিদ থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। বাবা দরজায় টুকা দিলেন, 'জাফর, এ্যাই জাফর। ওঠ। আজান দিচ্ছে। নামাজ পড়বি না?

সেদিনের পর নিতুর দেখা পাইনি। দিনের পর দিন গেল। তারপর সপ্তাহ। মনে হলো এই বুঝি দম আটকে গেল। তবু বেঁচে রইলাম। তৃষ্ণা রয়ে গেল। তৃষ্ণার্ত চোখ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতাম আঁখি মঞ্জিলের সামনে। দেখতে দেখতে দু'সপ্তাহ। তারপর তিন। এত দিনে মেয়েটাকে একটি বার দেখিনি। তার গলার আওয়াজ শুনতে পাইনি। সাড়া-শব্দ কিছুই না। এক মাসের মাথায় হঠাৎ একদিন দেখলাম সে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। ততদিনে মেয়েটা আরো শুকিয়ে গেছে। কপালের হাড় পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। চোখের নিচে এতটাই কালো হয়েছে, মনে হচ্ছিল কেউ কালি লেপ্টে দিয়েছে তার চোখের নিচে। চোখগুলো যেন হাড়ের ভিতর চলে গেছে। তবে তার শুকনো হাসিটা আগের মতোই। আমার দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসল সে। আমার এতদিনের অপেক্ষা, এতদিনের দুশ্চিন্তা, ভয়-ভীতি সবকিছুর অবসান হয়ে গেল এক মুহূর্তে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। তখন চোখে পড়ল শিকলে বাঁধা হাত। মনে মনে ভাবলাম, সব মেয়ের জীবনেই কি এমন একটা অদৃশ্য শিকল থাকে? সেটা কি লোহার, তামার, না রূপার? মেয়েরা কি জন্মগতভাবেই এরকম? চার দেয়ালে বন্দিদশা, এ-ও কি কম? সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, রাত আবার ভোর। নতুন সকাল। সবটুকুই কাটে চার দেয়ালে। দেখতে হয় সেই একই মানুষ, একই দেয়াল, একই ছাদ। পুরুষেরা বাসা, কর্মস্থল, বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা ইত্যাদি, ইত্যাদি। দিনশেষে যখন ঘরে ফিরে, সাথে থাকে শুধু ক্লান্তি, গ্লানি, অবসাদ। অতিরিক্ত একটা চকোলেট-ও না। অথচ, অতিরিক্ত একটি চকোলেট নিয়ে এলে হয়তো নতুন মোড়ক দেখতে পেত। তবুওতো তারা কিছু বলে না। হাসিমুখে সব বরণ করে। তবু কেন এত এত কথা শুনতে হয় তাদের? কেন সব গালি মেয়েদের জন্যই বরাদ্দ? কেন আজ মেয়েরাই আমাদের চোখে দূর্বল? সেই দূর্বল মেয়েটাই "মা"। আর যিনি মা হবার যোগ্যতা রাখেন, তিনি কখনো দূর্বল হতে পারেন না।

সে যাই হোক। কিছু পাঠকেরা আমার লেখায় নাকি রস খুঁজে পান না। লেখায় নাকি জানার বা বুঝার কিছু থাকে না। আমি নাকি গল্পে পাঠকদের জন্য কোনো মেসেজ রাখি না। সেসব পাঠকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। আমি ভাই ছোটো মানুষ। ওসব আঙুল-ফাঙুল তুলার সাধ্য আমার নেই। ছোট্ট জীবনের ক্ষুদ্র সময় থেকে কিছুটা সময় আলাদা করে রেখেছি লেখালিখির জন্য। সেই সময়টা পাঠকদের উপহার দেই। বিনিময়ে নাহয় দু'কথা শুনলাম। তাতে আমার আফসোস নেই।

তারপর আমি আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। কোনো এক অজানা ভয় কাজ করতে লাগল। নিতু তখনও বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে বাসায় চলে এলাম। মা আমার খুব আপন ছিলেন। যখন মন খারাপ হতো, মা'র কাছে গিয়ে বলতাম। কিন্তু এখন তো মা নেই। মা মারা যাবার পর একটি ডায়েরি কিনেছি। এখনও একটি শব্দ লিখিনি। তবে আজ হয়তো ডায়েরিটা কাজে আসবে।

অনেক্ষণ ডায়েরি সামনে নিয়ে বসে রইলাম। শেষমেশ কিছুই লিখতে পারলাম না। তবে এতক্ষণে ফোঁটা ফোঁটা জল আমার ডায়েরির পাতা স্পর্শ করেছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার দিয়ে মা'কে ডাকি। আচ্ছা, চিৎকার দিয়ে ডাকলে মা আসবে তো? আগের মতো আমাকে শান্তনা দেবে তো?

একদিন রাতে আঁখি মঞ্জিল থেকে চিৎকার দেওয়ার শব্দ আসছিল। আমি দৌড়ে গেলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেয়াল করলাম, নিতু চিৎকার দিয়ে কাঁদছে। মনে হচ্ছে কেউ ওঁকে মারধর করছে। মাঝে মাঝে কাচের জিনিসপত্র ভাঙার আওয়াজ আসছিল। নিতুর ঘরে তখন অন্ধকার। আমি ভেবে পেলাম না অন্ধকার ঘরে মেয়েটা এমন করছে কেন। দেয়াল টপকে ভিতরে গেলাম। ভয়ে ভয়ে ডোরবেল বাজালাম। সেই ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিলেন। কিছু বললেন না। কৌতূহলী ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। খেয়াল করলাম, নিতু তার শোবার ঘর থেকে উঁকি দিয়ে আমাকে দেখছে। তার মুখ দেখে মনে হলো, সে কিছুটা লজ্জা পেয়েছে।

তখন ভদ্রলোক দ্রুত পায়ে এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। আমি ছিটকে পড়লাম। দেয়ালে ধাক্কা লেগে কপালের কিছুটা অংশ কেটে গেল। কপালে হাত লাগাতেই টলটলে লাল রক্তে ভিজে গেল হাত।

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/107969461087579/posts/171756414708883/

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া