আকাশচুম্বীঅতিপ্রাকৃত

আকাশচুম্বী — পর্ব ৫

ইয়াছিন নাইম২৫ অক্টোবর ২০২৪৪ মিনিট পড়া

একদিন রাতে বিছানায় বসে ডায়েরিতে কিছু একটা লিখার চেষ্টা করছিলাম। তখন ধীর পায়ে বাবা এলেন। চেয়ার টেনে আমার সামনে বসলেন। আমার হাত ধরে বললেন, 'তোর সাথে বড়ো অন্যায় করে ফেলেছি রে বাবা। বড়ো অন্যায় করে ফেলেছি।'

আমি কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে, বাবা?'

তিনি শান্তনা দেবার ছলে বললেন, 'নবনীকে তুই ভুলে যা বাবা।'

আমি বললাম, 'কেন, কী হয়েছে?'

বাবা অসামির মতো মাথা নিচু করে বললেন, 'নবনী তার প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছে। খলিল ফোন দিয়েছিল। খুব কান্নাকাটি করছে। তোর কাছে ক্ষমাও চেয়েছে। আমাকে তুই মাফ করে দিস বাবা। না বুঝে মেয়েটার সঙ্গে তোর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মোটেও উচিত হয়নি।'

আমি মৃদু হেসে বললাম, 'কী বলছো বাবা! এতে তোমার কী দোষ! যা হবার, তা তো হবেই। বাদ দাও।'

বাবা আমার হাত আরো শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বললেন, 'আরো একটা পাপ করেছি বাবা...'

আমি বললাম, 'কী সেটা?'

বাবা তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। বুক পকেট থেকে লাইটার বের করলেন। একটা সিগারেট জ্বালালেন। বাবা এখনও শক্ত মানুষ। এক নিঃশ্বাসে অনেকটা পথ দৌড়ে পাড়ি দিতে পারেন। যতটা আমিও পারি না। তবে আজ তাকে দূর্বল দেখাচ্ছে। একটু বেশিই দূর্বল। হাত কাঁপছে। তিনি বাঁ হাতে এস্ট্রে নিয়ে চেয়ারে বসলেন। কিছুক্ষণ একটানা সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকলেন। উচ্ছিষ্ট অংশ এস্ট্রেতে রেখে আরো একটি সিগারেট জ্বালালেন। একের পর এক কয়েক টান দিয়ে বললেন, 'একটা মেয়ে তোকে ভীষণ ভালোবাসতো। তুই যখন বাসা থেকে বেরিয়ে যেতিস, মেয়েটি তোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। আবার রাতে তোর ফিরে আসার অপেক্ষায় রাস্তার দিকে চেয়ে থাকতো অপলক নয়নে। সে ছিল আমার দু'চোখের বিষ। আমি কখনোই তাকে তোর পাশে চাইতাম না। কারণ আমি আগে থেকেই তোর সাথে আমার বন্ধু খলিলের মেয়ে নবনীর বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলাম।'

আমি কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে প্রশ্ন করে বসলাম, 'আমি কি মেয়েটাকে চিনতাম, বাবা?'

বাবা আরো একটি সিগারেট জ্বালালেন। এত ঘন ঘন সিগারেট খাওয়া তার অভ্যাস না। দিন-রাতে বড়জোর চার-পাঁচটা সিগারেট খান তিনি। অথচ গত দশ মিনিটে তিনটি সিগারেট শেষ করতে চলেছেন। কথা বলছেন ধোঁয়া ফুঁকতে ফুঁকতে।

বাবা উদাসীন ভাবে বললেন, 'তুই খেয়াল করিসনি কখনো। মেয়েটা প্রতিদিন তোকে দেখত। প্রতিদিন তোর জন্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। এমনও হয়েছে, তুই রাস্তার এক পাশ দিয়ে হেঁটেছিস, মেয়েটা রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে তোর সাথে তাল মিলিয়ে হেঁটেছে। হয়তো খেয়াল করিসনি।'

বলে টেবিলে এস্ট্রে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। জুতা খুলে খালি পায়ে ঘরের মেঝেতে কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন। তারপর দুম করে চেয়ারে বসলেন। উদাসীন ভাবে বললেন, 'একদিন মেয়েটাকে সামনাসামনি পেয়ে গেলাম। পেয়েছি বললে ভুল হবে। তার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যেই বেরিয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম, তখন সে ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরোবে। যেই না গেট দিয়ে বেরোল, আমি তার পথ আটকালাম। গম্ভীর গলায় বললাম, এই মেয়ে, কী চাই তোমার? মেয়েটি ভয়ার্ত গলায় বলল, কিছু চাই না। আমি হুংকার দিলাম। বললাম, কিছু না চাইলে আমার ছেলের পিছু নিয়েছো কেন? কী চাও তুমি? মেয়েটা চোখের জল ছেড়ে কাঁদতে লাগল। আমি চেঁচালাম। আশপাশে লোকজন জড়ো হলো। মেয়েটি তখনও কাঁদছিল। একসময় তার মা এলেন। আমার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন। আমি ইচ্ছেমতো অপমান করলাম। যা খুশি গালাগাল করলাম। মেয়েটির মা কিছুই বলল না। আসামির মতো দাঁড়িয়ে রইল।'

আমি বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, 'তুমি এসব করেছো বাবা?'

বাবা ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বড়ো অন্যায় করে ফেলেছি রে বাপ। আমি জানতাম না, মেয়েটা তোকে এতটা ভালোবাসে। শুনেছি মেয়েটা নাকি পাগল হয়ে গেছে। তবে মাঝে মাঝে ভালো হয়ে যায়।'

'মেয়েটার নাম কী, বাবা?'

বাবা আর্তনাদের স্বরে বললেন, 'নিতু।'

নাম শুনতেই আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম না। দৌড়ে ছুটে গেলাম আঁখি মঞ্জিলে। দোতলায় গিয়ে ডোরবেল বাজালাম। ভদ্রমহিলা দরজা খুললেন। আমি বললাম, 'নিতুর সাথে কথা বলতে চাই। প্লিজ দরজা বন্ধ করবেন না।'

ভদ্রমহিলা বললেন, 'আমার ভালো মেয়েটাকে আধপাগল বানিয়ে রেখেছো। এবার কি পুরোপুরি পাগল বানাতে চাও?'

আমি হাত জোড় করলাম, 'একবার শুধু যেতে দিন। এটুকু দয়া করুন। শুধু একবার ওঁর সাথে কথা বলব...'

ভদ্রমহিলার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। তিনি কান্না কণ্ঠে বললেন, 'আমার একটাই মেয়ে। খুব লক্ষী। শুধু তোমার জন্য আজ আমার মেয়েটার এ অবস্থা। ভালো মেয়েটাকে শিকল বন্দি করে রাখতে হয়। ওঁর হাত পায়ের কাটা দাগগুলো দেখেছো? সে নিজে নিজে পাগলামো করে। এমন তো সে ছিল না। কেন সে এমন করবে?'

বলে তিনি ভিতরে চলে গেলেন। আমি গেলাম তার পিছু পিছু। নিতুর শোবার ঘরে গিয়ে দেখলাম, সে বিছানায় কাঁচুমাচু হয়ে শুয়ে আছে। আমি তার পাশে বসতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। সে ঘুমঘুম চোখে তাকাল আমার দিকে। চোখ কচলে আবার তাকাল। আমাকে বারবার ছুঁয়ে দেখল। ভদ্রমহিলা চাবি এনে দিলেন। আমি লোহার শিকল খুলে দিলাম। নিতুকে ছাদে নিয়ে গেলাম। অবাক করার মতো বিষয়, গত ক'দিনে তার বয়স আরো কমে গেছে। দেখতে অনেকটা বাচ্চা বাচ্চা মনে হচ্ছে। ছাদে গিয়েও সে আমাকে কয়েকবার ছুঁয়ে দেখল। আমি তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে বললাম, 'তুমি কি আমার শেষ বয়সের সঙ্গী হবে?'

নিতু আরো একবার আমাকে ছুঁয়ে দেখল। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, 'আমার আকাশচুম্বী স্বপ্ন আজ সামনে দাঁড়িয়ে আমায় চাইছে। এটা কি আদৌ বাস্তব না কি সেই আগেকার স্বপ্ন?'

আমি বললাম, 'বাস্তব। বিশ্বাস না হয় ছুঁয়ে দেখ।'

'যদি কখনো হারিয়ে যাও?'

'হারাব না। একবার শুধু হাতটা ধরো। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আগলে রাখব।'

'আর যদি আমি হারিয়ে যাই?'

'খুঁজে নেব। যেখানেই যাবে, ছায়া হয়ে থাকব পাশে।'

সমাপ্ত

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :https://www.facebook.com/107969461087579/posts/172357971315394/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া