শুভাকাঙ্ক্ষীঅতিপ্রাকৃত

শুভাকাঙ্ক্ষী — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম১২ নভেম্বর ২০২৪৪ মিনিট পড়া

'আপনার নাম মিনু?'

'জি।'

'কতদিন যাবৎ কাজ করছেন এখানে?'

'পাঁচ-ছয় মাস হবে।'

'এ বাড়িতে আর কাজের লোক নেই?'

'না।'

'কেন নেই?'

'বেশি মানুষ আপার পছন্দ না।'

'আপা কে, তানিয়া?'

'জি।'

'তানিয়ার সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক?'

'ভালো। উনিই তো আমাকে এখানে কাজ দিয়েছেন। উনার ব্যবহারে মনেই হয় না, আমি এ বাড়ির কাজের মেয়ে। উনি খুব ভালো মনের মানুষ...'

'ব্যাস। তানিয়ার বিষয়ে এতকিছু বলতে হবে না। ওঁকে আমি ভালো করেই চিনি।'

মিনু অবাক হয়ে বলল, 'আপনি চেনেন তাকে! কীভাবে চেনেন?'

'ওসব আপনার না জানলেও চলবে। আপনি আপনার কথা বলুন।'

'হুঁ।'

'আপনার স্বামীর তো নিজের বাড়ি আছে। আপনি এখানে থাকছেন কেন?'

'ও বাড়িতে এখন আমার ঠাই নেই। মানুষটা আমার সতিন এনেছে ঘরে। তাই আমি চলে এসেছি।'

'আপনি চলে এসেছেন না কি আপনার স্বামী আপনাকে বের করে দিয়েছে?'

মিনু কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, 'আমাকে মেরে বের করে দিয়েছে। এই দেখুন, মেরে কী হাল করেছে। এখনও দাগ আছে শরীরে...'

'থাক থাক, দেখাতে হবে না। আচ্ছা আবিদ সাহেবের সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক?'

'ভালো।'

'ভালো? আর কিছু বললেন না?'

'আর কী বলব, স্যার?'

'আমি শুনেছি আবিদ সাহেব খুব একটা ভালো লোক না।'

'মানুষ হিসেবে তো ভালোই। চুপচাপ থাকে সারাদিন। প্রয়োজন ব্যতীত একটি কথাও বলে না। চিৎকার-চেঁচামেচি তো দূরে থাক। তানিয়া আপা মাঝে মাঝে চেঁচাতেন। আবিদ ভাই চুপ করে থাকতেন। কোনোদিন জবাব দিতে দেখিনি। শুধু একটা বদঅভ্যেস...'

'বদঅভ্যেস? কী সেটা?'

'খুব নেশা করে।'

'নেশা? মদ্যপান?'

'জি।'

'প্রতিদিন করে?'

'জি। তবে আপা কিডন্যাপ হবার পর থেকে করে না।'

'তাহলে বুঝা গেল, কারোর সাথেই তানিয়ার শত্রুতা ছিল না?'

'জি। আপা তো ভালো মানুষ। তার সাথে শত্রুতা থাকবে কার?'

'আপনার।'

'জি?'

'আমার জানামতে তানিয়ার সাথে আপনার অনেক বড় শত্রুতা আছে। যদিও সেটা বেচারি তানিয়া ভুলে গিয়ে আপনাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়নি। তবে আপনি সেই শত্রুতা ভুলতে পারেননি। বসে রইলেন সময় ও সুযোগের অপেক্ষায়। সুযোগ পেতেই তানিয়াকে কিডন্যাপ করে ফেললেন...'

মিনু প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'আমার আবার কীসের শত্রুতা আপার সাথে? সে তো আমার কোনো ক্ষতি করেনি!'

'কিন্তু আমার তথ্য অন্য কথা বলছে। তানিয়া একদিন আবিদের সামনে আপনাকে চড় মারে। আপনি ব্যালেন্স করতে না পেরে ছিঁটকে পড়ে যান। তখন ধাক্কা লেগে চুলায় বসানো কড়াইয়ের গরম তেল আপনার হাতে লেগে হাতের অনেকটা জায়গা পুড়ে যায়। এটা কি ঠিক?'

মিনু শাড়ির আঁচলে বাঁ হাত লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল।

'কেন চড় মেরেছিল তানিয়া আপনাকে?'

'কারণ আমি আবিদ ভাইকে ধরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলাম।'

'কেন? আবিদ সাহেবের কি তখন হুঁশ ছিল না?'

'না। তিনি তখন পুরোপুরি মাতাল। তানিয়া আপা গেছেন বাইরে। আবিদ ভাই বাথরুমে বসে হড়হড় করে বমি করছিলেন। আমি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে গিয়ে তার হাত-মুখ ধুয়ে দিয়ে আমার কাঁধে ভর করিয়ে বিছানায় নিয়ে যাই। তখন তানিয়া আপু এসে দেখে ফেলেন। তাই...'

'আঃ, কী মর্মান্তিক! আপনি উপকার করলেন আর তানিয়া ভুল বুঝে এত বড় কান্ড করে বসল! এজন্যই আপনি নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি। রাগে, ক্ষোভে, ঘৃণায় তানিয়াকে সরিয়ে দিয়েছেন।'

'না না, আমি কেন কিডন্যাপ করব? পরের দিন নিজের ভুল বুঝতে পেরে আপা ক্ষমা চেয়েছিলেন আমার কাছে। আমি তো তখনি সবকিছু ভুলে যাই।'

'কিডন্যাপিংয়ের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?'

'বাসায় ছিলাম এবং ঘুমিয়ে ছিলাম।'

'ক'টা নাগাদ কাজটা করা হয়েছে বলতে পারেন?'

'না। সেদিন আপা খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল। আবিদ ভাই ও। তাই আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে আবিদ ভাইয়ের মুখ থেকে শুনলাম আপাকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।'

'আবিদ আপনার আগে ঘুম থেকে উঠে?'

'জি। তিনি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে। খুব সম্ভবত আজানের সাথে সাথেই। উঠে চুপচাপ বেরিয়ে যায়। এক ঘন্টা হাঁটাহাঁটি করে আবার ফিরে আসে। তারপর টানা দশটা পর্যন্ত ঘুমায়,।'

'কিডন্যাপিংয়ের দিনেও কি তিনি সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন?'

'না। সেদিন তিনি একটু দেড়িতে ঘুম থেকে উঠেছিলেন। আটটা নাগাদ। উঠেই চেঁচামেচি শুরু করলেন, তানিয়া, এ্যাই তানিয়া! এই মিনু, তানিয়া কোথায় দেখো তো!'

'তারপর আপনি তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে উঠলেন?'

'জি।'

'উঠে কী দেখলেন?'

মিনু কিছু একটা বলতে গিয়ে ফিকফিক করে হেসে ফেলল। কোনো মতে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।

'হাসছেন কেন? কী দেখেছিলেন সেদিন?'

'কী বলব স্যার লজ্জার কথা!' বলে আবারো ফিকফিক করে হাসতে লাগল সে।

'লজ্জা!'

'জি। দেখলাম আবিদ ভাই একটা হাফপ্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছেন। প্যান্টটা হাঁটু পর্যন্ত উঠে এসেছে। আর পুরো গা খালি।'

'ওঃ, তাই বলুন! আপনি তখন কী করলেন?'

'কী করব! হাসলে বিপদ। তাই তাড়াতাড়ি তার সামনে থেকে সরে গেলাম৷ পুরো বাড়ি খুঁজলাম। কোথাও পেলাম না। তারপর জানলাম আপাকে নাকি কিডন্যাপ করা হয়েছে।'

'আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?'

'এমনিতে কাউকে সন্দেহ হয় না। তবে একটা লোকের প্রতি যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ আমার মনে হয় ওই লোকটাই আপাকে কিডন্যাপ করেছে।'

'কে সেই লোক?'

'চিনি না। একসময় আপার প্রেমিক ছিল। ব্যাটা ফকির হয়ে আপার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। শুনেছি আসিফ মাহবুব না কী যেন নাম। বসতিতে থাকে। এসএসসি পাশ। আপনিই বলেন, ওই ব্যাটার সাথে কি আপাকে মানায়? আপা কই আর ওই ব্যাটা কই? আপা যদি আকাশের চাঁদ হয়, ওই ব্যাটা হবে নর্দমার ময়লা। চাঁদের দিকে হাত বাড়াইছিল। তাই আপার আব্বা লোক পাঠিয়ে এমন ঠ্যাঙানি দিলো, ব্যাটার হাত ভেঙে গেল একেবারে। সেই যে গেল আর দেখা মিলেনি তার। এক মাইরে শিক্ষা হয়ে গেছে। আমার মনে হয় এসব ওই ব্যাটারই কাজ।'

'এত জোর দিয়ে কীভাবে বলতে পারেন, যে ওই ছেলেটাই তানিয়াকে কিডন্যাপ করেছে?'

'জোর না দেয়ার কী আছে, স্যার? ওই ব্যাটা ছাড়া আর কারোর সাথে আপার কোনো রকম শত্রুতা ছিল না।'

'কিন্তু ছেলেটা তো তানিয়াকে ভালোবাসতো! ভালোবাসার মানুষকে কেউ কখনো কষ্ট দিতে চাইবে?'

'কেন চাইবে না, স্যার? সে তো আর আপনাদের মতো ভালো মানুষ না!'

'আজ উঠি তাহলে। দেখি সেই ছেলেটার সন্ধান পাই কিনা। নাম কী বললেন ছেলেটার?'

'আসিফ মাহবুব।'

'ওঃ, হ্যাঁ। মনে পড়েছে।'

'চলে যাচ্ছেন? চা খেয়ে যাবেন না, স্যার?'

'না। আপনার আপাকে খুঁজে বের না করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে পারছি না।'

'আচ্ছা। কিন্তু আপনার নামটা বলে যান স্যার।'

'নাম? নাম দিয়ে কী হবে?'

'আবিদ ভাই বাসায় এসে জিজ্ঞেস করবে, কেউ এসেছিল কিনা। তখন তো নাম বলতে হবে।'

'তিনি জিজ্ঞেস করলে বলবেন আসিফ মাহবুব এসেছিল।'

'ইন্না-লিল্লাহ! আসিফ মাহবুব! আপনি সেই আসিফ মাহবুব নাতো!'

চলবে

মো. ইয়াছিন

(আসিফ মাহবুব সিরিজ)

[এতটুকু পড়ে কী মনে হচ্ছে? কে হতে পারে তানিয়ার কিডন্যাপার?]

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/107969461087579/posts/181813877036470/

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া