শুভাকাঙ্ক্ষী — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম৮ নভেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়াআকাশ চোখ মেলে যখন দেখল মিলি তার পাশে নেই তখন সে বিস্মিত হলো। ধড়ফড় করে শোয়া থেকে উঠে বসল। মিলি সাধারণত দশটার আগে ঘুম থেকে উঠে না। ঘড়িতে আটটা বেজে কুড়ি মিনিট। চোখ কচলে যখন আবার চোখ খুলল তখন বিছানার পাশের টেবিলে একটা চিরকুট দেখদে পেল। চিরকুটটা দ্রুত হাতে নিয়ে পড়তে লাগল সে। চিরকুটে লেখা, যাচ্ছি। থাকো তুমি তোমার গেম নিয়ে। যতদিন গেম খেলা বাদ দেবে না ততদিন আমি আর ফিরছি না।'
বালিশে ঘুষি মারতে মারতে আকাশ বলল, 'ও গড, ও গড!'
তারপর দুম করে শুয়ে পড়ল। কী যেন মনে করে আবার ধড়ফড় করে উঠে বসল। মিলির নাম্বার ডায়েল করল।
'হ্যালো, মিলি?'
ওপাশ থেকে মিষ্টি এক কণ্ঠ ভেসে এল, 'মিলি নেই। আমি তানিয়া।'
'তানিয়া! আম্মু কোথায় নিয়ে গেছে তোমাকে?'
'নানু বাড়িতে নিয়ে এসেছে, বাবা।'
'আম্মু এখন কী করছে?'
'এক আঙ্কেলের সাথে গল্প করছে।'
'কোন আঙ্কেল? কার সাথে গল্প করছে?'
'জানি না।'
'আঙ্কেলের নাম কী?'
'জানি না।'
'ডাকো, ডাকো তোমার আম্মুকে।'
'না না, আম্মুকে বিরক্ত করা যাবে না। আম্মু এখন গল্প করছে।'
'কার সাথে গল্প করছে?'
'এক আঙ্কেলের সাথে।'
'কে আঙ্কেল? নাম কী তার?'
'জানি না।'
'সত্যি করে বল মা। তোর আম্মু কি হেসে হেসে কথা বলছে কারো সাথে? লোকটা কে? কার সাথে এত সকাল সকাল গল্প করতে বসেছে?'
ওপাশ থেকে খিলখিল করে হাসির শব্দ এল, 'হি হি আব্বু, তুমি খুব বোকা। আম্মু তো ঘুমুচ্ছে। আমি বসে বসে তোমার সাথে কথা বলছি।'
'পাঁজি মেয়ে! বাসায় আসবি না? একবার হাতের কাছে পাই...'
'হি হি হি..'
ফোন রেখে লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বিছানায় টলে পড়ছিল আকাশ। তখনি ডোরবেল বাজল। আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'অবেলায় কে রে!'
ধীর পায়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজার ওপাশে হাসি হাসি মুখে একটি অল্পবয়েসি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশকে দেখতেই বলল, 'সকাল সকাল বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। আপনার সাথে কিছু কথা ছিল...'
'জি বলুন।'
'ভেতরে আসতে বলবেন না?'
'ওঃ, হ্যাঁ! আসুন।'
লিভিং রুমের সোফায় ঠাই পেল নতুন আগন্তুক। আকাশ অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে রইল, ছেলেটা কী বলে শোনার জন্য। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ ছেলেটা বলল, 'এক্স মিনিস্টারের মেয়ে তানিয়া কিডন্যাপ হয়েছে, জানেন তো?'
আকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। এরকম প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। কৌতূহল কাটিয়ে সে বলল, 'তা জানি। আপনি কি পুলিশের লোক?'
'জি, পুলিশের হয়ে কাজ করি। তবে পুলিশ নই।'
'আমার কাছে কেন এসেছেন?'
'কিছু প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরঘুর করছে। ওগুলোর জবাব খুঁজতে খুঁজতে আপনার দরজায় কাড়া নাড়লাম।'
'বলুন, কী জানতে চান?'
'তানিয়াকে আপনি কীভাবে চেনেন?'
'তানিয়ার বাবা আমার আপন চাচা। তানিয়া আমার চাচাতো বোন। সো...'
'তানিয়া আর আপনি কি একই বাড়িতে বড় হয়েছেন?'
'হ্যাঁ।'
'এখন আপনি ও বাড়ি অর্থাৎ আপনার দাদার বাড়িতে না থেকে ভাড়া বাসায় থাকছেন কেন?'
'কারণ আমার ওখানে ভালো লাগে না।'
'কোটি টাকার বাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না তাই পনেরো হাজার টাকা ভাড়ায় থাকছেন! সত্যিই ভালো লাগে না, না কি অন্য কোনো কারণ আছে?'
'আমার ভালো লাগে না।'
'আমার কাছে থাকা তথ্য কিন্তু অন্য কথা বলছে আকাশ সাহেব।'
আকাশ অসহায়ের মতো মুখ তুলে তাকাল। ধীর গলায় বলল, 'কী বলছে আপনার তথ্য?'
'আপনার বয়স যখন একুশ বছর, তখন আপনার চাচার রাজনীতির বলি হতে হয়েছিল আপনার বাবাকে। আপনার চাচার দিকে তাক করা দু'-দুটো বুলেট বিঁধল আপনার বাবার বুকে। আপনি হলেন পিতা হারা। আপনার মা হলেন বিধবা। আর তাই আপনার মা আপনাকে নিয়ে ও বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন চিরকালের জন্য।'
আকাশ অন্যমনস্ক হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
'এর প্রতিশোধ নিতেই কি আপনার চাচাতো বোন তানিয়াকে কিডন্যাপ করেছেন?'
আকাশ প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'না না, আমি কিডন্যাপ করিনি। প্রতিশোধ কেন বলছেন! চাচার জীবন বাঁচাতে বাবা স্বেচ্ছায় বুক পেতে দিয়েছিল।'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, শুনেছি ওখানকার মানুষের মুখ থেকে। আপনার বাবা খুব সাহসী ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তবে আপনি মোটেও ভালো মানুষ নন। অল্প বয়সে বাবা হারানোর প্রতিশোধ নিয়েই নিলেন।'
'বললাম তো আমি কিডন্যাপ করিনি।'
'আহাহা, উত্তেজিত হবেন না আকাশ সাহেব। শান্ত হোন। এখনও আপনার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করতে পারিনি। যতক্ষণ না প্রমাণ জোগাড় করতে পারছি ততক্ষণ আপনি মুক্ত।'
আকাশ আরো একবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
'তা কী করেন আপনি?'
'ব্যাবসা।'
'কীসের ব্যাবসা?'
'এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট।'
'শুধুই এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট? আর কিছু করছেন না?'
'না।'
'হাসালেন আকাশ সাহেব। এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যাবসা করে রাতারাতি এত উন্নতি করে ফেলছেন! ওয়েল। আমাদের কিন্তু সব খবর রাখতে হয়... আপনি দেখছি ঘেমে যাচ্ছেন। পানি খান।'
আকাশ ঢুকঢুক করে পানি খেল।
'এবার বলুন, তানিয়াকে কিডন্যাপ করে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?'
'আমি কিডন্যাপ করিনি। কিডন্যাপ করতে হলে তো কারণ থাকা চাই। তাই না?'
'আপনি বলছেন তানিয়াকে কিডন্যাপ করার কোনো কারণ আপনাে হাতে নেই?'
'না, নেই।'
'আপনার মেয়ের নাম কী?'
'তানিয়া।'
'আপনি ইচ্ছে করেই রেখেছেন না কি কাকতালীয়?'
'নামটা আমার স্ত্রী'র ইচ্ছেতে রাখা হয়েছে। এর বেশি কিছু না।'
'যদি বলি আপনি আপনার চাচাতো বোন তানিয়াকে ভালোবাসেন। এতটাই ভালোবাসেন, আপনার মেয়ে হবার পর প্রথমেই আপনি বলেছেন, তার নাম হবে তানিয়া। এবং এ নিয়ে আপনারা স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া কয়েকদিন লেগেই ছিল। শেষমেশ তানিয়া নামটা রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন আপনার স্ত্রী। তবে কী বলবেন?'
আকাশ চুপচাপ আসামীর মতো মাথা নিচু করে বসে রইল।
'আহা আকাশ সাহেব, শুধু শুধু সময় নষ্ট করছেন কেন? বলেই ফেলুন না পুরো ব্যাপারটা!'
আকাশ ধীর গলায় বলল, 'হ্যাঁ, তানিয়াকে আমি ভালোবাসতাম।'
ছেলেটি বলল, 'বাসতেন না কি এখনও বাসেন?'
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'বাসি, এখনও বাসি। তবে কী হবে বলুন, সে তো আর আমার হবে না...'
'ভেঙে পড়বেন না আকাশ সাহেব। জীবনের অনেকটা পথ এখনও বাকি। মিনিস্টারের মেয়েকে কিডন্যাপ করেছেন। জেল হবে। ক'বছর হবে কে জানে! ফাঁসিও হতে পারে।'
'কিন্তু আমি তো কিডন্যাপ করিনি!'
'না করলেও আমার চোখে আপনি কিডন্যাপার। কী করি বলুন, সন্দেহ করাই যে আমার কাজ! আচ্ছা, আপনার ওয়াইফ আর মেয়ে কোথায়? এতক্ষণ ধরে বসে আছি কাউকেই দেখছি না!'
'মিলি বাপের বাড়ি চলে গেছে। সঙ্গে তানিয়াকে নিয়ে গেছে।'
'চলে গেছে বলছেন কেন?'
'চলে গেছে বলেই বলছি।'
'এ বাবা! কেন, চলে গেল কেন?'
'আমার নতুন বদ অভ্যেসের কারণে।'
'তাই নাকি! তা কী বদ অভ্যেস, শুনি?'
'গেম। আমি গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছি। রাত জেগে গেম না খেললে আমার ঘুম আসে না। তাই মিলি রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেছে। শর্ত দিয়ে গেছে, যতদিন গেম ছাড়ব না ততদিন সে বাপের বাড়ি থেকে ফিরবে না।'
'সো স্যাড! দুঃসময়ে এসে আপনাকে বিরক্ত করলাম। আমি দুঃখিত আকাশ সাহেব। আজ আসছি তবে।'
'আপনি কি আবার আসবেন?'
ছেলেটা চলে যাচ্ছিল। আকাশের কথা শুনে থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, 'প্রয়োজন হলে আসব। আবার না-ও আসতে পারি। পুলিশের হয়ে কাজ করি। বলা তো যায় না কখন, কে, কোথায় মেরে ফেলে রেখে যায়!'
'কিন্তু আপনার নাম... আপনার নামটা জানতে পারি?'
'আমি আসিফ মাহবুব।'
'কীঃ! আসিফ মাহবুব! এ নাম তো তানিয়ার মুখে বহুবার শুনেছি। এই যে দাঁড়ান। শুনছেন? এই যে, আপনার কথাই কি তানিয়া বলত?'
মো. ইয়াছিন
(আসিফ মাহবুব সিরিজ)
[এই পর্বে "গেমার" পাঠকদের জন্য একটি বিশেষ মেসেজ আছে। সেটা কী? পাঠকদের কাছে প্রশ্ন।]