শুভাকাঙ্ক্ষীঅতিপ্রাকৃত

শুভাকাঙ্ক্ষী — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম১৩ নভেম্বর ২০২৪৪ মিনিট পড়া

এক্স মিনিস্টারের বাড়ির গেট দিয়ে পুলিশের গাড়ি ঢুকল। মিনিস্টার সাহেব বাইরে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। হঠাৎ আসিফকে দেখে দড়বড় করে উঠে দাঁড়ালেন। চেঁচিয়ে বললেন, 'তুমি, তুমি এখানে কী চাও!'

আসিফ বলল, 'আমি আপনার মেয়েকে খুঁজে পেতে সাহায্য করতে চাই।'

আফজাল সাহেব তাচ্ছিল্য করে বললেন, 'পুলিশ যেখানে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে তুমি! হ্যাহ!'

'পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে বলেই আমাকে ডাকা হয়েছে।'

'পুলিশ তোমাকে ডেকেছে?'

'জি।'

ততক্ষণে একজন বয়োবৃদ্ধ কাজের লোক দু'পেয়ালা চা নিয়ে হাজির হলো। আসিফ হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিচ্ছিল তখনই আফজাল সাহেব বললেন, 'চায়ে হাত দেবে না।' কাজের লোকটির দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, 'তোমাকে কে বলেছে চা নিয়ে আসতে? যাও, ভেতরে যাও ওগুলো নিয়ে।'

লোকটা ভয়ে ভয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভেতরে চলে গেল।

আফজাল সাহেব বললেন, 'আমার মেয়েকে খুঁজে পাব তো? দেখ, তোমাদের যত টাকা লাগে আমি দেব। তোমরা শুধু আমার মেয়েটাকে খুঁজে এনে দাও।'

'আপনি আবার ভুল করছেন।'

'ভুল! কীসের ভুল?'

'সবকিছু টাকা দিয়ে কেনা যায় না। এখন ধরুন আপনি যত টাকা আমাদের দিতে চাচ্ছেন তত টাকা যদি আমি আপনাকে দিয়ে বলি আপনার মেয়েকে এনে দিন। আপনি পারবেন? সবকিছু তো আর পণ্য না যে টাকা দিয়ে কিনে নেবেন!'

আফজাল সাহেব মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আসিফ বলল, 'বসতে বলবেন না?'

'হ্যাঁ, বোসো।'

আসিফ বসতে বসতে বলল, 'থ্যাংক য়্যু। আচ্ছা আপনার মেয়েকে আবিদের কাছে কেন বিয়ে দিয়েছিলেন?'

'এ কেমন প্রশ্ন! মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি যাতে সে সুখে থাকে, শান্তিতে থাকে।'

'কিন্তু আবিদের সাথেই কেন বিয়ে দিতে হলো? কী দেখে বিয়ে দিলেন তার কাছে?'

'কী দেখে আবার! ছেলেটা ভালো। একসময় আমার হয়ে অনেক কাজ করেছে। মিটিং-মিছিলে সব সময় দেখেছি তাকে। কেন জানি মনে হত, ছেলেটা ভালো। ছেলেটা সত্যিই ভালো। যদিও পয়সাকড়ি আমাদের তুলনায় কিছুই নেই তার...'

'আবিদের একজন গোপন প্রেমিকা আছে এ-ও কি জানতেন আপনি?'

'কী বলো! দেখো, আমি মানছি তোমার সাথে যা হয়েছে অন্যায় হয়েছে। কিন্তু তাই বলে তুমি...'

'আমি কারোর বিরুদ্ধে বলছি না। যা সত্যি তাই বলছি। আপনি কি সত্যিই জানেন না আবিদের গোপন প্রেমিকার কথা?'

'না। আবিদের যদি প্রেমিকাই থাকে তবে সে আমার মেয়েকে বিয়ে করবে কেন? আমি তো তাকে জোর করিনি!'

'হাসালেন আপনি। এক্স মিনিস্টারের মেয়ে, তার বিশাল সম্পত্তি সব হবে তার। সে কীভাবে মানা করত আপনাকে?'

'কিন্তু আমার তবুও বিশ্বাস হচ্ছে না।'

'অনেক সময় আমাদের খুব কাছের সত্যিটাও ধাঁধার মতো দ্বিধায় রাখে। আমরা বুঝতে পারি না।'

'কিন্তু আবিদ তো আমার মেয়েকে পেয়েই গিয়েছিল। গত ক'দিন আগে আমার পুরনো বাড়িটাও তার নামে লিখে দিলাম। তাছাড়া আমার মৃত্যুর পর সবই তো হবে তানিয়ার। সেক্ষেত্রে আবিদই হবে সবকিছুর মালিক। এখন সে তানিয়াকে কিডন্যাপ করবে কেন?'

'কারণ আলেয়া আবার ফিরে এসেছিল।'

'আলেয়া কে?'

'আবিদের গোপন প্রেমিকা।'

'ও। তুমি কি আমাকে বুঝিয়ে বলবে প্লিজ?'

'বলছি। আপনি যখন আবিদকে প্রস্তাব দিলেন তানিয়াকে বিয়ে করার জন্য, আবিদ তখন আলেয়ার সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে। আবিদ সেদিনই আলেয়াকে সব বলে দেয়। তারা দুজনে মিলে প্ল্যান করে। প্ল্যানমাফিক বিয়েটা হয়। কথা ছিল বিয়ের পর আবিদ যেকোনো ভাবে আপনার থেকে ওই পুরনো বাড়িটা লিখিয়ে নেবে। যার বর্তমান বাজার দর কমসে কম আড়াই কোটি টাকা। সেটা পাওয়ার পর আবিদ নানান কৌশলে তানিয়ার সাথে ঝামেলা করে তানিয়াকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য করবে।'

'তাহলে তো তানিয়ার সাথে ঝগড়া করবে। কিডন্যাপ করল কেন?'

'কিডন্যাপ করেছে এজন্য যে, এতদিনে আবিদের লোভ আরো বেড়ে গিয়েছে। আবিদ এখন আপনার পুরো সম্পত্তি ভোগ করতে চাইছে। কিন্তু যখনই আপনি আবিদকে আপনার পুরনো বাড়িটা লিখে দিলেন, আলেয়া তাকে প্রেসার দিতে শুরু করল। তবে আবিদ তানিয়াকে ছাড়তে চাচ্ছিল না। আর তাই সে আলেয়াকে সাফ মানা করেছিল যোগাযোগ করার জন্য।'

'এখানে কিডন্যাপিংয়ের বিষয়টা তো খুঁজে পাচ্ছি না!'

'আপনি বড় অধৈর্য হয়ে পড়ছেন। সবুরে মেওয়া ফলে, জানেন তো? শুনুন বলছি, আলেয়া একদিন রাতে আবিদকে ফোন করে বলল আবিদ যেন তানিয়াকে কিডন্যাপ করে কোথাও লুকিয়ে রাখে। তারপর মুক্তিপণ হিসেবে কয়েক কোটি টাকা আপনার থেকে আদায় করে তানিয়াকে মেরে ফেলবে। এতে টাকাও পাবে আর আবিদের উপর কেউ সন্দেহ করবে না।'

আফজাল সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'ও মাই গড! দুধ-কলা দিয়ে এতদিন কালসাপ পুষেছি! আমার মেয়েকে কোথায় রেখেছে বলতে পারো?'

'আলবাত পারি।'

'আমায় নিয়ে চলো সেখানে।'

'আসুন।'

পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে আফজাল সাহেব অবাক হয়ে বললেন, 'এটা তো আমার পুরনো বাড়ি! আমি আবিদের নামে লিখে দিয়েছি।'

আসিফ বলল, 'জি। এ বাড়িতেই তানিয়াকে রাখা হয়েছে।'

বাড়ির দোতলায় একদল পুলিশ অস্ত্র সহ প্রবেশ করল। কিছুক্ষণ পর দু'জন লোককে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে বেরিয়ে এল তারা। আফজাল সাহেব আর আসিফ ভিতরে গেল। একটা কাঠের চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে তানিয়াকে। আসিফ গিয়ে তানিয়ার হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিলো। তানিয়া আসিফকে ধাক্কা দিয়ে বলল, 'ভীতু, কাপুরুষ তুমি এখানে কেন এসেছো! সেদিন তো খুব কাপুরুষের মতো চলে গিয়েছিলে। আমি পাগলের মতো একতরফা খুঁজে গেলাম। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে শুধু তোমাকেই খুঁজলাম। আর তুমি! কাপুরুষের মতো ভেগে গেলে, ছিঃ ছিঃ!'

আসিফ করুণ গলায় বলল, 'তুমিই তো বলেছিলে আমার এই মুখ যেন তোমাকে না দেখাই।'

তানিয়া চেঁচিয়ে বলল, 'আমি বলেছিলাম? আমি?'

'সেদিন তোমার বাবার লোকজন আমাকে পিটিয়ে আমার হাত ভেঙে ফেলল। তারপর ভাঙা হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলো। আমি রক্তাক্ত শরীর নিয়ে চিরকুট খুলে পড়লাম। সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল আমি যেন আমার মুখ কখনো তোমাকে না দেখাই।'

'তাই বলে একবারও ভাবলে না? একবারও মনে হলো না চিরকুটটা আমি লিখিনি? আমি তো মরে গেলেও ওসব লিখতাম না!'

'আমি তো খুব বোকা। এটা যে তোমার বাবার চাল ছিল, বুঝতেই পারিনি। সেদিন যদি বুদ্ধি করে একবার তোমার সাথে দেখা করতাম তাহলে হয়তো আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম না...'

আফজাল সাহেব ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। আসিফের কাঁধে হাত রেখে আসামির মতো মাথা নিচু করে বললেন, 'যা হবার হয়েছে, আবার নতুন করে সব শুরু করা যায় না বাবা?'

আসিফ একবার তানিয়ার দিকে তাকাল। তানিয়া নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। তার গাল বেয়ে টপটপ করে অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে একটুখানি সায় দিলে সে আসিফকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলবে।

আসিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আফজাল সাহেবের দিকে চেয়ে বলল, 'আপনার মেয়ে আমার কাছে স্বপ্নের মতো। আমি চাই সে স্বপ্ন হয়েই থাকুক।'

বলে হনহন করে বেরিয়ে গেল। তানিয়া আফজাল সাহেবকে জড়িয়ে ধরে ঢুকরে কেঁদে উঠল।

সমাপ্ত

মো. ইয়াছিন

(আসিফ মাহবুব সিরিজ)

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/107969461087579/posts/182404686977389/

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া