ইভাঅতিপ্রাকৃত

ইভা — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম২৮ নভেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়া

মাসের বিশেষ দিন শুরু হয়েছে গত দু'দিন আগে। এই দু'দিন ধরে ইভা এঘর-ওঘর, বারান্দা আর ছাদে কাটিয়েছে। তবে আজ একবার থানায় গিয়েছিল। চেয়ারে গা এলিয়ে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকছিলেন এক অফিসার। ইউনিফর্মের উপর নাম ফলকে লেখা, মনির। ইভাকে দেখে তিনি বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন, 'আপনি মডেলিং করেন?'

ইভা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝল কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে। খানিকটা ইতস্তত করে বলল, 'না।'

'অভিনয়?'

'না।'

অফিসার হতাশ হয়ে বললেন, 'করেন না? আমার কিন্তু বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আপনি মডেলিং, অভিনয় কিছুই করেন না। আমার জানামতে এদেশের সব সুন্দরী মেয়েরা হয়তো মডেলিং করে নাহলে অভিনয়। আপনি কিছুই করছেন না কেন?'

ইভা প্রশ্ন এড়িয়ে বলল, 'আমার এক বন্ধু হারিয়ে গেছে। আমি তাকে খুঁজে পেতে চাই...'

অফিসার উঠে দাঁড়িয়ে দু'দিকে দু'হাত ছড়িয়ে লম্বা হাই তুলে বললেন, 'বন্ধু? ছেলে বন্ধু না মেয়ে?'

'ছেলে।'

'কীভাবে হারিয়েছে?'

'বিমান ছিনতাই হয়েছে শুনেছেন নিশ্চয়ই?'

'ছিনতাই করা হয়েছে তা এখনও প্রমাণ হয়নি।'

'সে যাই হোক। আমার বন্ধু সেই বিমানের যাত্রী ছিল। আমি তাকে খুঁজে পেতে চাই।'

কথাটুকু শুনে অফিসার বিড়বিড় করে বেরিয়ে গেলেন। ইভা যতটুকু শুনতে পেল, 'ওই কেসটা আমাদের হাতে নেই।'

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। পেটে অসহ্য যন্ত্রণা৷ অস্বস্তি লাগছে। ইভা ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল। একটা উনত্রিশ। দূর! শুয়ে থাকতে থাকতে একটু আগে ঘুম লাগল। এখনই ঘুম ভেঙে গেল কেন! হঠাৎ মনে হলো, একবার ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার।

ঠান্ডা পানি ঢেলে ইচ্ছেমতো গোসল করল ইভা। একটা হলুদ রঙের জামা পরে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এল। ঘড়িতে দুইটা এগারো মিনিট। বিছানার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। সারা রাত পড়ে থাকলেও ঘুম আসবে না। ইভা একটা ভারী চাদর গায়ে দিয়ে ধীর পায়ে ছাদে উঠে এল। দূর থেকে বুনো শেয়াল গলা ছেড়ে ডাকছে। মনে হচ্ছে ব্যথা পেয়ে বিলাপ করে কাঁদছে। এই যা! বিদ্যুৎ চলে গেল৷ ধুর, ধুর! মুখ কালো করে ছাদের এক কোণে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল, অন্ধকারে কুয়াশার আঙাল থেকে জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া। মনে হচ্ছে কেউ নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ফুঁকছে। কিন্তু এত রাতে!

ইভা গলা বাড়িয়ে বলল, 'কে ওখানে?'

চোখে চোখ পড়তেই লোকটা সিগারেট ফেলে দিলো। শুধু চোখগুলো দেখা যাচ্ছে। মুখটা অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে। কুয়াশা আর অন্ধকারের জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না৷ শুধু মনে হচ্ছে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হাত নেড়ে ডাকছে।

ইভা বলল, 'শিমুল?'

লোকটি মুখে কিছু বলেনি। শুধু হাতের ইশারা দেখে বুঝা গেল সে শিমুল না। কারণ সে ডানে-বাঁয়ে হাত নাড়ছে।

ইভা আবার বলল, 'তাহলে কে আপনি?'

লোকটি যথারীতি মুখ বন্ধ রেখে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকল। দোতলার সিঁড়িতে রেলিং নেই। অন্ধাকারে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই পা টিপে টিপে নিচে নেমে এল। গেট খুলতেই দেখল, বাইরে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে বাবার অফিসের সেই জুনিয়র অফিসার। যে কিনা তাকে হাত বাড়িয়ে টেনে তুলেছিল।

ইভা বলল, 'আপনি! এত রাতে এখানে কী করছেন?'

লোকটি আমতা আমতা করে বলল, 'বিরক্ত করার মতো ইচ্ছে আমার ছিল না। আমি শুধু হাঁটছিলাম এদিকটায়।'

ইভা ভ্রু কুঁচকে বলল, 'এত রাতে হাঁটছিলেন? মশকরা হচ্ছে আমার সাথে?'

'সত্যি বলছি...'

'আপনার ঘুম পায় না? ঘুমাবেন কখন?'

'ঘুম পেয়েছে। আমি প্রতিদিন রাত এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর ছ'টায় ঘুম থেকে উঠি। সবকিছু হয় টাইম টু টাইম।'

'তাহলে আজ অনিয়ম কেন?'

লোকটি অসহায়ের মতো বলল, 'আজ ভূতুরে স্বপ্ন দেখেছি। খুব ভয়াবহ৷ ঘুম আসছে না কিছুতেই। তাই হাঁটাহাঁটি করছি।'

'ভূতুরে স্বপ্ন দেখে অন্ধকারে একা একা হাঁটছেন! অদ্ভুত মানুষ তো আপনি! ভয় করে না?'

'ভয় করে বলেই তো ঘুম আসছে না৷ বিছানায় শুতে গেলেই মনে হয় কেউ একজন মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে চেয়ে দেখছে... '

'আচ্ছা, আচ্ছা। কিন্তু কতক্ষণ এভাবে হাঁটবেন?'

'সারা রাত।'

ইভা চেঁচিয়ে বলল, 'সারা রাত! মাই গড! আপনি সত্যিই অদ্ভুত।'

বলে উঠে এল ছাদে। বিদ্যুৎ চলে এসেছে। বাবার অফিসের লোকটাকে এখনও দেখা যাচ্ছে। এক পা এক পা ফেলে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যাচ্ছে। ইভা আকাশের দিকে তাকাল। ফোন বাজছে। প্রাইভেট নাম্বার। ইভা রিসিভ করে বলল, 'আসসালামু আলাইকুম।'

ওপাশ থেকে গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এল। গলার স্বর ভারী, বিচ্ছিরি শোনাল, 'হ্যালো, কী অবস্থা মেডাম?'

ইভা হকচকিয়ে উঠল। মেডাম! গলার স্বরটাও অচেনা। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এখন রাতের আড়াইটা। এমন সময় কে ফোন দিতে পারে?

ইভা বলল, 'কে আপনি?'

'চিনবেন না, ম্যাডাম। আমি দূর দেশে থাকি। সম্পুর্ণ অচেনা-অজানা এক শহরে। শুনলাম আপনার নাকি খুব পাখা গজিয়েছে?'

'কী বলছেন? আপনি হয়তো ভুল নাম্বার ডায়েল করেছেন।'

'ভুল না, ম্যাডাম। আপনাকেই ফোন দিয়েছি। আপনি ইভা। আপাতত বাসার ছাদে একা একা দাঁড়িয়ে আছেন...'

'এতসব আপনি জানলেন কীভাবে? কে আপনি?'

'ওসব ছাড়ুন। আসল কথায় আসি। শুনেছি আপনি নাকি স্পাইং করছেন বিমান নিঁখোজের ব্যাপারে?'

'হ্যাঁ, করছি। শিমুলকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমি সব করব।'

'কিন্তু শিমুলকে তো ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে আছে। আপনি তার সঙ্গে দেখাও করেছেন।'

'সে শিমুল না। শিমুলের মতো দেখতে অন্য একজন।'

'ওঃ! আপনি দেখছি সব খবরই রাখেন। বলছি মেডাম, এই ঘটনার পেছনে যে বা যারা আছে তারা ভালো মানুষ নয়। আপনি মেয়ে মানুষ। আমার মতে, আপনি স্পাইং না করাই ভালো।'

'আপনি কি আমাকে থ্রেট করছেন?'

'যদি বলি তাই করছি?'

'শিমুল কোথায়?'

'মেরে ফেলেছি। শালা বেশি বকবক করছিল। মাথাটা একদম গলা থেকে আলাদা করে ফেলেছি-হা হা হা!'

'শিমুলের কিছু হলে আমি কাউকে ছেড়ে দেব না...'

'আহা, রাগবেন না মেডাম। ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। আপনি মেয়ে মানুষ। যদি আপনাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রাখা হয়? যদি ভিডিয়ো ক্যামেরার সামনে আপনার গায়ের ওড়না ছিনিয়ে নেওয়া হয়? যদি আপনার জামা টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়...'

ইভা দ্রুত ফোন কেটে সুইচড অফ করে দিলো। তার চোখ বেয়ে জল নেমে এল। হাত পা ছেড়ে বসে পড়ল সে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকু তার নেই।

সকাল এগারোটা।

থানায় প্রবেশ করতেই অফিসার মনির ধড়ফড় করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ইভা বলল, 'অফিসার সাহেব, আমার হেল্প লাগবে। গতকাল রাতে একটা প্রাইভেট নাম্বার থেকে আমাকে থ্রেট করা হয়েছে।'

অফিসার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, 'আমার মনে হয় আপনার স্পাইং না করাই ভালো। পুলিশ তো ইনভেস্টিগেশন করছেই। তাই না?'

'ওদের হয়ে কথা বলছেন? আপনিও ওদের লোক নন তো?'

'দেখুন, টিকে থাকার জন্য ছোটোখাটো এটা-সেটা করতে হয়। তাবে উপর মহলের রাঘব বোয়ালদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি আপনাকে হেল্প করতে পারছি না। দুঃখিত।'

'কিন্তু ওরা শিমুলকে খুন করেছে। খুনিদের গ্রেফতার করাই তো আপনার ডিউটি, তাই না?'

'হা হা হা, হাসালেন।'

ইভা ভ্রু কুঁচকে বলল, 'একটা মানুষকে খুন করা হয়েছে আর আপনি হাসছেন!'

'হাসব না? কাকে খুন করেছে বললেন? শিমুলকে? অথচ, একটু আগে সে ফোন দিয়েছিল।'

'শিমুল ফোন দিয়েছিল?'

অফিসার চেয়ারে গা ছেড়ে বসে সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে বললেন, 'হুঁ।'

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=207929184374661&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া