ইভাঅতিপ্রাকৃত

ইভা — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম২৯ নভেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়া

টিভিতে নিউজ দিচ্ছে, বিমান নিখোঁজের ঘটনায় হারিয়ে যাওয়া শেষ ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে তার পরিচয় জানা যায়নি।

ইভা চুপচাপ শোবার ঘরে চলে এসেছে। তার ধারণা সেই লাশ আর কারো নয়, স্বয়ং শিমুলের। শিমুল যে বেঁচে নেই এ কথা ইভা ব্যতীত কেউ জানে না। বাবাও না, মাও না। শিমুলের ভাই-ভাবী কেউ না। শুধু ইভা জানে। আর জানে সেই খুনি। যে শিমুলকে খুন করেছে।

ইভা মনে মনে ঠিক করল, শিমুলের খুনিকে যে কোনো উপায়ে খুঁজে বের করবে। কিন্তু কীভাবে?

ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুম লেগে গেল মনে নেই। চোখ যখন খুলল তখন ঘড়িতে ন'টা পঞ্চান্ন। ইভা বিছানা ছেড়ে নামল। হাত-মুখ ধুয়ে আসতেই মা ডাকলেন, 'ইভা, খেতে আয়।'

ইভা গেল না। শিমুলের কথা মনে পড়ছে। খুব বেশি মনে পড়ছে। ইভা স্মার্টফোন হাতে নিয়ে শিমুলের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, 'সত্যিই তুমি নেই? কেন নেই? অথচ, আমাকে কথা দিয়েছিলে সারা জীবন পাশে থাকবে। কখনো ছেড়ে যাবে না। তাহলে? আমাকে একা করে চলে গেলে কেন? কেন গেলে? তুমি তো কারো ক্ষতি করোনি। কারোর সাথে তোমার শত্রুতাও ছিল না। তবে তোমাকে খুন করল কারা? কেন করল?'

তখনই মা এলেন, 'কীরে, কার সাথে কথা বলছিস?'

ইভা তাৎক্ষণিক চোখের জল মুছে বলল, 'কেউ না, মা।'

খাবার টেবিলে বসে সবাই খেয়েছে। ইভা খায়নি। কিছুক্ষণ খাবার সামনে রেখে হাত ধুয়ে উঠে এসেছে। ছাদে উঠে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। একদিন রাতে ঠিক এই জায়গায় শিমুলের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল সে। শিমুলের হাতে লাল টকটকে গোলাপ। একদম চুপসে গেছে। তবুও ইভা সেই ফুল পেয়ে কী আনন্দ! আনন্দে কেঁদেই ফেলল। শিমুল তাকে আলতো করে বুকের সাথে জড়িয়ে রেখে বলল, 'আরে পাগলী...'

চোখ মুছে পিছন ফিরতেই দেখল পিছনে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, 'মন খারাপ?'

ইভা বলল, 'না না।'

বাবা ইভার মাথায় হাত রেখে বললেন, 'আমাদের জীবনে কত কিছুই তো আসে যায়। ওসব মনে রেখে ভেঙে পড়লে চলবে? ভুলে যা।'

ইভা বলল, 'কী ভুলে যাব?'

'আমি মানছি শিমুলের সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু ওঁর এখন যা অবস্থা... তোকে আমি ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে দেব। তুই ওঁকে ভুলে যা...'

বলে বাবা ধীর পায়ে প্রস্থান করলেন। ইভা বিড়বিড় করে বলল, 'ভুলে যাব! কীভাবে ভুলব? যাকে হৃদয়ে ধারণ করেছি তাকে ভুলব কীভাবে বাবা?'

ফোন বাজছে। একটা প্রাইভেট নাম্বার থেকে কল এসেছে। রিসিভ করতেই, 'কী মেডাম, নিষেধ করলাম শুনলেন না তো? পুলিশের কাছে গিয়ে লাভ কী হলো?'

ইভা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, 'শিমুলকে কেন মেরেছেন? কী দোষ ছিল ওঁর?'

ওপাশ থেকে বিকট শব্দে হাসির আওআজ ভেসে এল, 'হা হা হা হা! ভয় পেয়েছেন মেডাম? মারিনি। আপনার শিমুল এখনও বেঁচে আছে। দাঁড়ান, ছবি পাঠাচ্ছি।'

হুয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এল। ওপেন করতেই শিমুলের ছবি ভেসে এল। একটা চেয়ারের সাথে শিমুলের রক্তাক্ত শরীর বেঁধে রাখা হয়েছে। তার মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। দেখে মনে হচ্ছে দূর্বল শরীর নিয়ে বসে থাকতে পারছে না সে।

আবার ফোন এল, 'দেখেছেন মেডাম?'

ইভা কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, 'কেন বেঁধে রেখেছেন ওঁকে? কী দোষ তার?'

'আহাহা শান্ত হোন। কাঁদবেন না। রক্তারক্তি আমারও পছন্দ না। আমি চাই না পৃথিবীর বুক থেকে একটা মানুষ হারিয়ে যাক...'

'তাহলে ছেড়ে দিন ওঁকে।'

'ছড়ব মেডাম ছাড়ব। তার আগে একটি কাজ করে দিতে হবে।'

'কী কাজ?'

'শিমুলের ক্যামেরাটা আমার চাই। ওটা আমাকে এনে দেবেন।'

ইভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

'কী মেডাম, পারবেন না?'

'পারব।'

'এইতো লক্ষী মেয়ের মতো কথা। কাল সন্ধ্যা সাতটায় রেডি থাকবেন।'

একদিন চলে গেল। এই একটা দিন এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে বসতে পারেনি ইভা। সব সময় শুধু একটাই ভাবনা, শিমুল বেঁচে আছে তো?

সাতটা বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি। আজ সকালেই শিমুলের বাসা থেকে ক্যামেরা নিয়ে এসেছে ইভা। ক্যামেরা হাতে নিয়ে শোবার ঘরে বসে বসে অপেক্ষা করছে। সাতটা বাজলে সেই লোকটার কাছে ক্যামেরা ফিরিয়ে দিতে হবে।

ঘড়িতে যখন সাতটা বাজল তখনই ফোন এল। সেই প্রাইভেট নাম্বার। ইভা রিসিভ করল।

'বাসার সামনে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ক্যামেরা সহ ওটাতে গিয়ে বসুন৷ একদম চালাকি করবেন না।'

ফোন কেটে যেতেই ইভা দ্রুত জানালায় উঁকি দিলো। গেটের সামনে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ইভা চুপচাপ বেরিয়ে গেল। গাড়িতে বসতেই একজন ইভার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে একটা কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে ফেলল। গাড়ি চলল আনুমানিক বিশ মিনিট। গাড়ি থেকে নামিয়ে হাত ধরে নিয়ে যাওয়া হলো ইভাকে। যখন চোখ খুলা হলো, তার সামনে যিনি বসে আছেন তিনি আর কেউ না স্বয়ং বাবার অফিসের সেই জুনিয়র অফিসার।

ইভা চেঁচিয়ে বলল, 'আপনি!'

লোকটি তাচ্ছিল্য করে বলল, 'এমপির ছেলে, এমপির ছেলে হয়ে ব্যাংকে চাকরি করেছি, তোমার মতো সামান্য এক মেয়ের পিছন পিছন ঘুরেছি। কেন জানো? এই ক্যামেরার জন্য। আর এই সব কিছুর জন্য দায়ী...'

বলেই দ্রুত এগিয়ে গিয়ে চেয়ারে বেঁধে রাখা শিমুলের বুকে লাথি মারল লোকটি। ইভা দৌড়ে শিমুলের কাছে যেতে চাচ্ছিল, তখনই পিছন থেকে দু'জন লোক তাকে ধরে ফেলল।

ইভা বলল, 'আপনি বলেছেন ক্যামেরা নিয়ে এলে ওঁকে ছেড়ে দেবেন। এই নিন ক্যামেরা। ওঁকে ছেড়ে দিন, প্লিজ।'

লোকটি ইভার হাত থেকে ক্যামেরা নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, 'আমি তোমাদের ছেড়ে দেই আর তোমরা পুলিশকে গিয়ে গড়গড় করে সব বলে দাও, হা হা হা!'

কোমর থেকে পিস্তল বের করতে যাচ্ছিল তখনই একদল পুলিশ অস্ত্র সহ ঝাপিয়ে পড়ল। শুরু হলো বন্দুকযুদ্ধ। সন্ত্রাসীদের কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হলো। বাকিরা আত্মসমর্পন করার পর পুলিশ অফিসার ইভার সামনে এসে বললেন, 'আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি আমাদের বিষয়টা না জানালে হয়তো আজ এতজন আসামিকে ধরতে পারতাম না।'

পরদিন রাতে ঘুম ভাঙতেই ইভা দেখল, হাসপাতালের বিছানায় শিমুলের বুকের সাথে মিশে আছে সে। লজ্জায় তাড়াহুড়ো করে উঠে বসতেই শিমুল বলল, 'উঠে পড়লে যে?'

ইভা ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল, 'ইচ্ছে করে ঘুমাইনি। বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ লেগে গেছে...'

শিমুল বলল, 'এ বাবা! সারা রাত জেগে থাকার ইচ্ছে ছিল নাকি?'

ইভা প্রশ্ন এড়িয়ে বলল, 'কী এমন ছিল ক্যামেরায় যার কারণে তোমাকে খুন করতে চেয়েছিল ওরা?'

শিমুল ইভার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'জানতে চাও?'

'চাই তো!'

'তাহলে এসো।'

'কোথায়?'

'রাস্তায়। হাঁটতে হাঁটতে বলল।'

'কিন্তু তুমি তো অসুস্থ!'

'তাতে কী, তুমি আছো না?'

ইভার হাত ধরে পা টেনে টেনে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে শিমুল। নিঝুম রাত। রাস্তার দু'পাশে উঁচু উঁচু দালান। ইভা হাঁটতে হাঁটতে বলল, 'বলো?'

শিমুল থমকে দাঁড়িয়ে ইভার দিকে চেয়ে বলল, 'একটা ভিডিয়োর জন্য।'

'ভিডিয়ো? সামান্য একটা ভিডিয়োর জন্য?'

'চুপ। তোমাকে কে বলেছে সামান্য?'

ইভা একটু ভয় পেয়ে বলল, 'সামান্য না?'

'জি না। রাতে একা একা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। তখনই একটু দূরে একটি গাড়ি থামল। একটি লোককে হাত-পা বেঁধে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে একের পর এক গুলি করা হলো।'

'খুন! তুমি সেই দৃশ্য ক্যামেরায় রেকর্ড করেছিলে?'

'এক্সাক্টলি। যাকে খুন করা হয়েছে সে কে জানো?'

'কে?'

'এক্স মিনিস্টার।'

'এক্স মিনিস্টার! নিউজে এল না যে!'

শিমুল হাসতে হাসতে বলল, 'এটাই তো টেকনিক। নিউজে ঠিকই এসেছে, কেউ খেয়াল করেনি। আস্ত একটা বিমান নিখোঁজ হয়েছে। এত বড় খবর ফেলে রেখে বুড়ো একটা মানুষের মৃত্যুর কথা কে মনে রাখতে যাবে বলো?'

ইভা বিস্ময়ের স্বরে বলল, 'তার মানে ওঁরা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল... বিমান ছিনতাই করে এক্স মিনিস্টারের খুনের ঘটনা চাপা দেওয়া আর তোমাকে কিডন্যাপ করা!'

শিমুল বলল, 'এই সহজ বিষয়টা বুঝতে এত সময় লাগল আমার বোকা বউ, হি হি হি!

ইভা শিমুলের হাত ছাড়িয়ে একটু দূরে চলে গেল। শিমুল হাসতে হাসতে বলল, 'লজ্জা পেয়েছো বুঝি? হি হি হি!'

সমাপ্ত

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=209177657583147&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া