ইভাঅতিপ্রাকৃত

ইভা — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম২ ডিসেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়া

টিক টিক টিক...

রাত একটা।

ইভা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। ঘন অন্ধকার। সবাই বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমানোর আগে মা একটা শাড়ি দিয়েছেন। গাঢ় নীল রঙের শাড়ি। বলেছেন শিমুলের সাথে দেখা করতে গেলে যেন শাড়িটা পরে যায়। কিন্তু মা তো জানেন না, বিমান সহ শিমুল নিখোঁজ।

ইভা স্মার্টফোনের পাওয়ার বাটন চাপতেই তার হাসিমাখা মুখখানা স্ক্রিনে ভেসে এল। সময় একটা তিন মিনিট। বাইরে কুয়াশা পড়েছে। শীত লাগছে। ইভা গায়ের চাদরটা আরো জড়িয়ে নিয়ে একবার নিজের দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় নীল শাড়িটা ঝলমল করছে। দূর থেকে কেউ তাকে দেখলে নির্ঘাত ভয় পেয়ে যাবে। এটা কী?

এক জোড়া চোখ।

'এ্যাই বিল্লি, কোত্থেকে এলি রে তুই?'

বিড়ালটা নড়ানড়া করছে না। ঘাপটি মেরে তাকিয়ে আছে ইভার দিকে। ইভা দু'পা এগিয়ে যেতেই ছুটে গেল। ইভা ফিসফিস করে বলল, 'এ্যাই বিল্লি, দাঁড়া! যাস না। মিয়াঁও!'

বিড়ালটা ফিরেও তাকাল না। অন্ধকারে হারিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে।

ইভা স্মার্টফোনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরে আঙুল রাখতেই টুং শব্দ করে আনলক হয়ে গেল। গ্যালারির প্রথম ছবিটা শিমুলের। ইভা মনুযোগ দিয়ে ছবির দিকে তাকাল। শিমুল তখন প্রথমবার ইভাদের বাসায় এসেছিল। চুপচাপ মাথা নিচু করে সোফায় বসে ছিল। ইভা তখন আড়াল থেকে একটি ছবি তুলে নেয়। যদিও এরপর বহুবার দেখা হয়েছে। ছবি তোলা হয়নি।

ঘুমানোর আগে একবার স্মার্টফোনের স্ক্রিনে তাকাল ইভা। শিমুলের লজ্জা, ভয়, সংশয় মাখা মুখটা দেখতে ভালোই লাগছে। বুকে চিনচিনে অদ্ভুত এক ব্যথা করছে শিমুলের জন্য। আচ্ছা, মানুষটা বেঁচে আছো তো?

ঘুম ভাঙতেই ইভা দেখল তার সামনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত উঠে বসে চশমা চোখে দিলো সে। বাবা সংবাদপত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি সংবাদপত্র গুটিয়ে বিছানায় বসে বললেন, 'খবর কিছু জানিস?'

ইভা বলল, 'কী খবর?'

'শিমুল যে ফ্লাইটে সিলেটে আসার কথা ছিল সেটা নাকি হাইজ্যাক করা হয়েছে। কী ভয়াবহ ব্যাপার বল তো!'

ইভা আশ্চর্য হবার ভান করে বসে রইল।

'শিমুলের বাসায় ফোন দিয়েছিলাম। বলেছে, কাল থেকে তার ফোন বন্ধ। এবার কী হবে!'

ইভার মা দরজায় উঁকি দিয়ে বললেন, 'আমি আগেই বলেছিলাম, কবিরাজ দেখাও। এবার বুঝলে তো?'

বাবা ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'এর সাথে কবিরাজ দেখানোর কী সম্পর্ক?'

'সম্পর্ক নেই? এতদিন কিছু হয়নি। ইভার সাথে বিয়ে ঠিক হবার পরেই কেন তাকে নিখোঁজ হতে হবে? আমি তো আগেই বলেছিলাম, ইভার সাথে কিছু একটা আছে। যে চায় না ইভার বিয়ে হোক। এবার বিশ্বাস হলো তো?'

বিকেলে মাঠে ক্রিকেট খেলছে একদল ছেলেরা। ইভা ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল। তখনই নিভা দৌড়ে এল। বলল, 'আপা, শিমুল ভাইয়াকে নাকি খুঁজে পাওয়া গেছে।'

ইভা কেঁপে উঠল। জড়ালো কণ্ঠে বলল, 'কোথায় পাওয়া গেছে? এখন সে কোথায় আছে?'

'কোথায় পাওয়া গেছে জানি না। তবে এখন ওসামানী মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছে।'

ইভা ছুটে এল শোবার ঘরে। জামা পাল্টাল। ভ্যানিটি ব্যাগ হাতে নিয়েই বেরিয়ে পড়ল। একটা রিকশা নিয়ে সোজা ওসমানী মেডিক্যাল। মানুষে মানুষে একাকার। এত মানুষ অসুস্থ! শিমুলকে খুঁজে পেতে অনেকটা সময় লেগে গেল। শিমুল চুপচাপ শুয়ে আছে। তার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার ভাবী, বড়ো ভাই। ইভাকে দেখে তারা একটু দূরে সরে গেলেন। ইভা বসল শিমুলের পাশে। জ্ঞান ফিরেছে। স্যালাইন চলছে। ইভা পাশে বসেছে, তা সে চোখ মেলে দেখেছে। তবে কথা বলছে না। মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। পুরো শরীর একটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। শুধু গলা আর মুখ দেখা যাচ্ছে। চোখে চোখ পড়তেই শিমুল দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ইভা তার গালে আলতো করে হাত রেখে বলল, 'তাকাও। এদিকে তাকাও। আমার দিকে তাকাও।'

শিমুল তাকাল ঠিকই। তার চোখ বেয়ে একফোঁটা অশ্রুজল বালিশে পড়ল। ইভার চোখ ছলছল। মনে হচ্ছে এক্ষুণি কান্না চলে আসবে। ইভা বলল, 'তোমার বুকে একটু মাথা রাখি? ব্যথা দেব না। আলতো করে রাখব শুধু। রাখি?'

শিমুল ঘার ঘুরিয়ে অন্য দিকে ফিরে তাকাল। ইভা চুপচাপ শিমুলের বুকে মাথা রাখল। হৃদপিণ্ডের ধুকধুক শব্দ স্পষ্ট কানে বাজছে। তখনই নার্স এসে বলল, 'কী করছেন? উঠুন। উনি অসুস্থ জানেন না?'

ইভা উঠে দাঁড়াল। শিমুলের বড়ো ভাই ইভাকে হাতের ইশারায় ডেকে নিয়ে গেলেন। গম্ভীর ভাব নিয়ে হাঁটছেন তিনি। ইভা তার পিছু পিছু। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। ইভার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'শিমুল আর আগের মতো নেই...'

ইভা ইতস্তত করল। এইতো এখনি দেখে এল তাকে। বিছানায় শুয়ে আছে মানুষটা। ইভা বিস্ময়ের স্বরে বলল, 'কী হয়েছে ওঁর?'

'শিমুল দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আজ থেকে সে অন্ধ।'

বলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে হেঁটে গেলেন তিনি। ইভার পুরো শরীর স্তব্ধ পাথরের মতো হয়ে গেল। চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রুজল ঝড়ে পড়তে লাগল। বুকটা হাহাকার করে উঠল৷ শিমুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তার নেই৷ তাই চুপচাপ মেডিক্যাল থেকে বেরিয়ে এল সে।

বাসায় প্রবেশ করতেই হাসির শব্দ শুনা গেল। ইভা দেখল, লিভিং রুমে বসে বসে বাবা জোরে জোরে হাসছেন। তার সামনে যে ছেলেটি বসে আছে সে গতকাল হাত বাড়িয়ে ইভাকে মাটি থেকে তুলেছিল। লোকটির কি লজ্জা শরম কিছু নেই? এটুকু উপকার করে সোজা বাসায় চলে এসেছে!

ইভা চেঁচিয়ে বলল, 'আপনি! আপনি এখানে কেন এসেছেন?'

বাবা শব্দ করে হাসছিলেন। ইভার কণ্ঠস্বর শুনে বললেন, 'হেই, মিট মাই ফ্রেন্ড অনিক।'

এমা! বাবা ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করলেন কবে থেকে! তা-ও আবার হাঁটুর বয়েসী ছেলেকে নিজের বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। মাথা-টাথা গেল নাকি অ্যা!

ইভা শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিল। তখনই মাকে দেখতে পেয়ে বলল, 'মা, কে এসেছে বাসায়?'

'একটা ছেলে। নাম অনিক। তোর বাবার অফিসে চাকরি করে। জুনিয়র অফিসার।'

'তাই বলে বাসায় নিয়ে আসতে হবে! যাকে-তাকে বাসায় নিয়ে আসার অভ্যেসটা কি বাবার যাবে না?'

মা আমতা আমতা করছেন। ইভা দ্রুত শোবার ঘরে চলে এসেছে। টেবিলের উপর থেকে ল্যাপটপ নিয়ে দুম করে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ইভা উপুড় হয়ে বুকের উপর ভর করে শুয়ে আছে। মাথার কাছে ল্যাপটপ। সে গুগল ক্রোম ওপেন করে কয়েকটি অনলাইন পত্রিকার ওয়েবসাইট সার্চ করল৷ তাকে জানতে হবে, কী এমন হয়েছিল যে কারণে শিমুল অন্ধ হয়ে গেল? কিংবা বিমানটাই বা কোথায়?

সব অনলাইন পত্রিকা একই কথা বলছে, হারিয়ে যাওয়া বিমানের যাত্রীদের আহত অবস্থায় চোখ বেঁধে সিলেটের চা বাগানে রেখে যাওয়া হয়েছে। তবে একজন যাত্রী এখনও মিসিং। তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। হারিয়ে যাওয়া বিমানের হদিস এখনও মিলেনি।

ল্যাপটপ গুটিয়ে উঠতে যাচ্ছিল ইভা। তখনই খটকা লাগল। আজ যখন শিমুলের হাত ধরেছিল, তার হাতের আঙুলে কোনো দাগ ছিল না। অথচ এর আগেরবার যখন দেখা হয়েছিল, শিমুল ডান হাতের আঙুলের কাটা দাগ দেখিয়ে বলেছিল, ছোটোবেলা কেটে গিয়েছিল। যার দাগ এখনও আছে। তিনটি সেলাই করতে হয়েছিল। এত বড় দাগ এই ক'দিনে মিলিয়ে গেল!

ইভা দ্রুত স্মার্টফোন হাতে নিল। গ্যালারিতে থাকা শিমুলের ছবি ওপেন করে জুম করে দেখল। ছবিতেও তার হাতের কাটা দাগ দেখা যাচ্ছে। তাহলে আজ যাকে হাসপাতালে দেখেছে সে কে?

ভ্যানিটিব্যাগ নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরোল ইভা। বেরোবার আগে ঘড়ির দিকে তাকাল একবার। ন'টা একান্ন মিনিট। একটু পর খাবার টেবিলে ডাকা হবে। এই সময়ে বাসা থেকে বেরোনো সাফ মানা৷ তাই কাউকে না জানিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়েছে সে। একটা রিকশা নিয়ে সোজা ওসমানী মেডিক্যাল। রিকশা থেকে নেমে ছুটে এল চারতলায়। শিমুল চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। তার পাশে বসে আছেন তার বড়ো ভাই। ইভা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে শিমুলের ডান হাত ভালো করে দেখল। একবার নয় বহুবার ঘুরে ঘুরে দেখল। কাটা দাগটা সত্যিই নেই। এখন আর তাকে শিমুল বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, অন্য একজন শিমুলের মুখোশ পরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে।

ইভা ধরা গলায় বলল, 'শুনছো? ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?'

শিমুলের বড়ো ভাই ইভাকে একটু দূরে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, 'চোখদু'টোর সাথে সাথে জবান-ও গেছে ওঁর। এখন সে কথাও বলতে পারে না। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না এটা শিমুল।'

বলে চোখের জল মুছতে লাগলেন তিনি। ইভা শিমুলের পাশে বসে ধীর গলায় বলল, 'তুমি শিমুল হলে চুপচাপ শুয়ে থাকো। আর যদি তুমি শিমুল না হও তবে চোখ মেলে তাকাও।'

বিছানায় শুয়ে থাকা লোকটি তখনই চোখ মেলে তাকাল৷ ইভা দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'তাহলে আপনি কে? শিমুল কোথায়?'

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=205934534574126&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া