নীরব ঘাতকঅতিপ্রাকৃত

নীরব ঘাতক — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম৮ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়া

যে মেয়েটিকে জাফরের পি.এস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার অদ্ভুত এক স্বভাব আছে। সেই অদ্ভুত স্বভাবটা কী তা বুঝে উঠতে পারছে না জাফর। শুধু মনে হচ্ছে, মেয়েটির একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে।

জানালার পরদা সরিয়ে বাইরে দৃষ্টি রাখল জাফর। ওপাশে সরু রাস্তার পরিসর। তারপর উঁচু দালান।

'শুভ সকাল।'

জাফর ফিরে তাকাল। কাচের দরজা একটু ঠেলে ধরে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হবে। পরনে গাঢ় সবুজ রঙের জামা। সাদা ওড়না। বুকে ছোট্ট একটি নাম ফলক। সেখানে লেখা, "বারিশ"। মেয়েটিকে গতকাল জাফরের পারসোন্যাল সেক্রেটারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জাফর অতিশয় কোমল গলায় বলল, 'আপরার ভালো নাম কী?'

মেয়েটি হকচকিয়ে উঠল। জাফরের এমন প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। বিনীত ভঙ্গিতে শান্ত গলায় বলল, 'আমার একটাই নাম, বারিশ। আর কোনো নাম নেই।'

জাফরের বিশ্বাস হলো না। তার ধারণা, মেয়েটি মিথ্যে বলছে। বাঙালী মেয়েদের নাম কখনো এক শব্দে শেষ হয় না। তিন-চারটি নাম একত্র করে এদেশের মেয়েদের নাম রাখা হয়।

'আমি তবে আপনাকে মিসেস বারিশ বলেই ডাকব।'

'মিসেস নয়, মিস।'

জাফর ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আমি শুনেছিলাম, আপনি বিবাহিত।'

'বিয়ে হয়েছিল, ডিভোর্স হয়ে গেছে।'

জাফর কাতর গলায় বলল, 'অ্যারেঞ্জ মেরেজে হয় এরকম। অচেনা একজনের সাথে হুট করে মানিয়ে নেওয়াটা সত্যিই কঠিন।'

মেয়েটি ধরা গলায় বলল, 'অ্যারেঞ্জ মেরেজ না। লাভ মেরেজ হয়েছিল আমাদের।'

জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'তাহলে ডিভোর্স?'

মেয়েটি কুৎসিত ভঙ্গিতে বলল, 'পুরুষ মানেই পশু, জঘন্য জানোয়ার।' বলে কাচের দরজা ছেড়ে চলে গেল। যেতে যেতে বিড়বিড় করে কী যেন বলে গেল। জাফর ঠিক শুনতে পারল না।

এ ঘরটা বিশাল বড়। পুরো ঘরে মেরুন রঙের কার্পেট বিছানো। ঘরের মাঝখানে চারকোনা ছাদের কাচের টেবিল। টেবিলের সামনে একটি রিভলভিং চেয়ার। টেবিলের উপর একটি মনিটর। একটি মাউস। কি-বোর্ড। একটি সুচালো কাটাঅলা গাছ। গাছটার নাম এখন মনে পড়ছে না। টেবিলের এক পাশে ছোট্ট একটি লাল রঙের বোতাম। বোতাম টিপতেই বারিশ এল। কোমল গলায় বলল, 'ডেকেছেন?'

জাফর রিভলভিং চেয়ারে বসে বলল, 'বারিশ নামের অর্থ আছে?'

'জি, আছে।'

'বারিশ অর্থ কী?'

'বৃষ্টি।'

'বাঃ, সুন্দর নাম তো! আমি তবে আপনাকে বৃষ্টি বলেই ডাকব।'

'না, বৃষ্টি আমার নাম না। আপনি আমাকে বারিশ বলে ডাকবেন।'

'আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। বারিশ বলেই ডাকব।'

'আর কিছু বলবেন?'

'আপাতত বলার মতো কিছু নেই।'

বারিশ চলে গেল। জাফর একবার হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়িতে দশটা বেজে তিন মিনিট। ঘুম পাচ্ছে। ঘুম তাড়ানোর জন্য কী করা যায়? চা? চা খেলে সবার ঘুম চলে যায়। জাফরের তেমন হয় না। হয় উল্টো। চা খেলে ঘুমে চোখ লেগে আসে। টেলিফোন করা যায়। অবেলায় টেলিফোন করলে নিতু গম্ভীর গলায় কথা বলবে। মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠবে। এতে ঘুম কাটার সম্ভাবনা আছে।

জাফর টেলিফোন কানে লাগাল। ওপাশ থেকে গম্ভীর গলার আওয়াজ আসলো, 'হ্যালো?'

'নিতু, আমি জাফর। অফিসের টেলিফোন থেকে ফোন দিয়েছি। আমার ফোনটা হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক করতে পারছি না। তুমি ফোন দিয়ে না পেলে অযথা ট্যানশান করবে, তাই...'

'আচ্ছা।'

'মুসকান ঘুম থেকে উঠেছে?'

'হুঁ।'

'তোমরা খাওয়া-দাওয়া করেছো তো?'

'খেয়েছি।'

'বেশ। আমিও খেয়েছি। ইদানীং ক্যান্টিনের খাবার খুব একটা ভালো হচ্ছে না। খিচুড়ি থেকে কেমন যেন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ বেরোচ্ছিল।'

'আচ্ছা।'

'জানো, আমার পি.এস হিসেবে যে মেয়েটিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার একটা সুন্দর নাম আছে।'

'কী নাম?'

'বারিশ। বারিশ নামের অর্থ জানো তো?'

'না।'

'বারিশ অর্থ হচ্ছে বৃষ্টি। নামটা সুন্দর না?'

'হুঁ।'

'মেয়েটির একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে।'

'কী সেটা?'

'এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝতে পারলে তোমাকে জানাব।'

'আচ্ছা। রাখছি, জাফর।'

'আসল কথাটাই তো বলা হয়নি!'

'কী কথা?'

'মেয়েটির ডিভোর্স হয়ে গেছে। লাভ মেরেজ হয়েছিল। তবুও ডিভোর্স হয়ে গেছে। তার খুব মন খারাপ। পুরুষদেরকে গালিগালাজ করেছে সে।'

'করবেই তো।'

'তা করুক। আমি তো জানি, সবাই তোমার মতো না। তুমি হলে গালি দিতে না।'

'আমি হলেও গালি দিতাম।'

'দেবেই তো। ভুল করলে গালি দেবে না?'

'রাখি জাফর?'

জাফর টেলিফোন রেখে উঠে দাঁড়াল। ভারী কার্পেটের উপর খালি পায়ে পায়চারি করল কিছুক্ষণ। রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বোতাম টিপতেই বারিশ এল। ধীর গলায় বলল, 'জি?'

'মিস বারিশ, আপনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন?'

'স্বপ্ন? ইউ মিন, ড্রিম?'

'হ্যাঁ।'

'না। আপনি বরং বই কিনে ফেলুন। বাজারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা অসংখ্য বই আছে।'

'বই থেকে খোঁজে বের করতে অনেক সময় লাগবে। কোনো সহজ সমাধান নেই কি?'

'আপনি কি খুব বেশি স্বপ্ন দেখেন?'

'আগে দেখতাম না। ইদানীং খুব বেশি দেখছি।'

'কীরকম স্বপ্ন দেখেন, আপনি?'

জাফর টেবিলের সামনে ঝুঁকে বসে বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখি, বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি। বাতাস আমাকে কানে কানে বলছে, দাঁড়িয়ে থেকো না, লাফিয়ে পড়ো। দেখিয়ে দাও, তুমি ভীতু না। আমি লাফ দিতে যাই। কী যেন একটা ভেবে লাফ দেই না। ফিরে আসি।'

'এসব স্বপ্ন নয়। বাস্তব।'

জাফর চোখ বড় বড় করে বলল, 'কী বলেন!'

'ঠিকই বলছি। আমাদের চারপাশ যখন বিষাদের দেয়ালে ঢেকে যায়, তখন বাতাস কানে কানে অনেক কিছুই বলে বেড়ায়।'

'বলছেন?'

'বলছি।'

'কিন্তু, আমি তো রোজ দেখি।'

'একই স্বপ্ন কেউ বারবার দেখে না। ওটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব।'

'আমার এখন কী করা উচিত?'

'আপনার উচিত, একজন সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করা।'

'তাহলেই হবে?'

'হ্যাঁ।'

অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাড়তি টাকা খরচ করে শহরের নামকরা সাইক্রেটিস্টের টিকিট হাতে পেয়েছে জাফর। ডাক্তারের নাম আদুরী রয়। জাফর ভেবেছিল, বৃদ্ধা কেউ হবে। কিন্তু চেম্বারে এসে পুরো ধারণা পাল্টে গেল। চেয়ারে বসা মেয়েটি যুবতী বয়েসী। টেবিলের চার বাই দশ ইঞ্চি সাইজের নাম ফলকে ইংরেজি বোল্ড অক্ষরে লেখা, ডা. আদুরী রয়। মেয়েটি মুচকি হেসে বলল, 'বসুন।'

ডাক্তার মেয়েরা সাধারণত গম্ভীর স্বভাবের হয়। অন্তত পুরুষদের সামনে। এই মেয়েটি এরকম না। চোখ-মুখে বিনীত হাসি লেপ্টে আছে।

জাফর চেয়ারে বসল।

'আপনার নাম?'

'জাফর।'

'বয়স?'

'সত্যিকারের বয়স বলব না কি সার্টিফিকেটে যা আছে তাই বলব?'

'সত্যিটা বলুন।'

'পয়ত্রিশ।'

'কী সমস্যা, আপনার?'

'আমার কোনো সমস্যা ছিল না। তবে, ইদানীং খুব বেশি স্বপ্ন দেখছি।'

'কীরকম স্বপ্ন দেখছেন?'

'দেখছি, আমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি। বাতাস আমাকে কানে কানে বলছে, বেলকনি থেকে নিচে লাফ দিতে। আমি লাফিয়ে পড়তে গিয়ে ফিরে আসি। সারা রাত ঘুম হয় না।'

'এটুকুই?'

'জি।'

'আমার মনে হচ্ছে, আপনার কোনো সমস্যা নেই। আপনি এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছেন।' গলাটা ভারী।

'বানিয়ে বলব কেন?'

'সেটা আপনি ভালো জানেন।'

'আমি কি তবে আসব?'

'জি, আসুন।'

জাফর উঠতে উঠতে বলল, 'আপনি কি বিবাহিত?'

অচেনা একজনকে কেউ হঠাৎ এমন প্রশ্ন করে না। জাফর জানে, প্রশ্ন করাটা ঠিক হয়নি। তবুও করেছে। তার উদ্দেশ্য মেয়েটাকে চমকে দেওয়া। বাঙালী মেয়েরা চমকে উঠলে ভালো দেখায়।

মেয়েটি চমকে উঠল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'বসুন।'

জাফর হাত-পা ছেড়ে চেয়ারে বসল।

'মি. জাফর, একজন পাগলের ভাষা অন্য একজন পাগল বুঝতে পারে। আর, একজন পাগলের চিকিৎসা একজন পাগলই করতে পারে।'

জাফর ধীর গলায় বলল, 'আপনি কি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন?'

'যদি বলি হ্যাঁ?'

জাফর বোকার মতো তাকিয়ে থাকল।

'এখন আমি যদি আপনার চিকিৎসা করার জন্য নিজেকে পাগল মনে করি, তবে বলব আমি বিবাহিত। আমার স্বামী শহরের ছোট্ট একটি রেস্তোরাঁর ওয়েটার। এবং আমি আমার স্বামীকে নিয়ে বেশ সুখেই আছি।'

'প্রবাসী?'

'না।'

জাফর ভ্রু কুঁচকাল। কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'এদেশের রেস্তোরাঁয় ওয়েটার! শহরের নামকরা সাইক্রেটিস্টের স্বামী রেস্তোরাঁর ওয়েটার! এ-ও কি হয়?'

'অপ্রত্যাশিত অনেক কিছুই হয়, মি. জাফর। এই ধরুন, গতকাল পর্যন্ত আমি আপনাকে চিনতাম না। অথচ, আজ আপনি আমার পেশেন্ট। এটা কি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল?'

জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর ধীর গলায় বলল, 'আমাকে সবাই ভীতু, কাপুরুষ এসব বলে। আপনার কী ধারণা, আমি ভীতু, কাপুরুষ?'

'কারা বলে এসব?'

জাফর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'আমার স্ত্রী এবং তার প্রেমিক।'

'আপনার স্ত্রীর প্রেমিক!'

'জি।'

'বড় অদ্ভুত লোক তো আপনি!'

'অদ্ভুত-ও বলে মাঝেমধ্যে।'

'আপনি কি রসিকতা করছেন, মি. জাফর?'

'রসিকতা নয়, সত্যি বলছি।'

'আমার মনে হয়, আপনি আমাকে বহুদিন যাবত ফলো করছেন। আমাকে ভালো করে চেনেন, জানেন। ইচ্ছে করেই নতুন নতুন গল্প পাকাচ্ছেন। আমার এটাও মনে হচ্ছে, আপনি অবিবাহিত এবং আপনার বয়স আঠাশ।'

জাফর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, 'এবার মনে হচ্ছে, আপনি পেশেন্ট আর আমি ডাক্তার। হা-হা-হা!'

চলবে

~ মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=215188953648684&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া