নীরব ঘাতকঅতিপ্রাকৃত

নীরব ঘাতক — পর্ব ৫

ইয়াছিন নাইম১০ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়া

বাদলের পাশে শুয়ে ছিল নিতু। হঠাৎ ডোরবেল বাজল। নিতু বিছানা ছেড়ে নামল। দরজা খুলতেই বাইশ-তেইশ বছর বয়েসী একটি মেয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, 'ম্যাম, আপনি! আমাকে চিনতে পেরেছেন?'

নিতু কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'কোথায় যেন দেখেছি মনে হয়...'

মেয়েটি আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, 'আমি আরফা। আপনার কাছে দু'বছর পড়াশোনা করেছি।'

নিতু মেয়েটিকে ভালোভাবে চিনল না। হাতে গুণা কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়িয়েছে সে। তন্মধ্যে এই মেয়েটি ছিল বলে মনে পড়ছে না। তবুও বিনীত কণ্ঠে বলল, 'ওঃ, আচ্ছা।'

'আপনি দেখছি ম্যাম, এখনও আগের মতোই আছেন। রাগী রাগী ভাব, গলায় গাম্ভীর্য, চোখে-মুখে বিনীত হাসি...'

নিতু সহজ ভঙ্গিতে হাসল।

'এটা বাদল ভাইয়ার বাসা না, ম্যাম?'

নিতু হকচকিয়ে উঠল। বাদল বলেছিল, আরফা নামের একটি মেয়ে তাকে প্রপোজ করেছে। এই কি সেই মেয়ে?

নিতু ধীর গলায় বলল, 'হ্যাঁ, এটা বাদলের বাসা।'

'বাদল ভাইয়াকে একটু ডেকে দেবেন, প্লিজ?'

'সে বাইরে গেছে। তোমার কী দরকার, আমাকে বলো। সে এলে আমি তাকে বলে দেব।'

আরফা ইতস্তত করে বলল, 'কিছু বলতে হবে না, ম্যাম। আমি এসেছি শুনলে উনি রাগ করতে পারে।'

'আচ্ছা, তাহলে বলব না।'

আরফা চলে গেল। নিতু দরজা বন্ধ করে ফিরে এল। বাদলের পাশে শুয়ে পড়ল। ঘরে কম আলোর বাতি জ্বলছে। বাদল বিছানায় হেলান দিয়ে বসে সিগারেট টানতে টানতে বলল, 'কে এসেছিল?'

'আরফা নামের একটা মেয়ে।'

'আরফা? মেয়েটা বাসা পর্যন্ত চলে এসেছে!'

নিতু মৃদু হেসে বলল, 'বাদ দাও। বেচারি সহজ-সরল মানুষ।'

বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল, 'সহজ-সরল?'

'নয়তো কী?'

বাদল কিছু বলল না। নিতু বাদলের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর ধীর গলায় বলল, 'বিছানা থেকে নামো তো, বাদল।'

বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কেন?'

'নামোই না!'

বাদল অগত্যা বিছানা ছেড়ে নামল।

'টি-শার্ট খুলো।'

বাদল কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'কেন?'

'এত কেন, কেন করছো কেন? খুলতে বলেছি খুলো।'

বাদল গায়ের টি-শার্ট খুলে বিছানায় রাখল। নিতু বাদলের পিঠে হাত রেখে বলল, 'এই দাগটা কীসের?'

'কোন দাগ?'

'এইযে এটা।'

বাদল তার পিঠের কাটা দাগে হাত রেখে বলল, 'এটা?'

'হ্যাঁ, এটা।'

'এ-এক বিশাল কাহিনি। শুনবে তুমি?'

'অবশ্যই শুনব।'

বাদল টি-শার্ট পরে বিছানায় বসল। একটি সিগারেট জ্বালাল। নিতুর হাত ধরে তার পাশে বসাল। কিছুক্ষণ সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকল। নিতু বিরক্ত হয়ে বলল, 'বলবে না কি সিগারেট টানবে?'

'বলছি, শুনো।'

'বলো।'

'আমার বয়স তখন দশ বছর। ক্লাস ফাইভে পড়ি। একদিন মাঝ রাতে আমাদের বাসায় ডাকাত এল।'

নিতু অবাক হয়ে বলল, 'ডাকাত!'

'হ্যাঁ। বাসার সবাইকে এক ঘরে বন্দি করল। ওদের সাথে ছুরি, চাকু সব ছিল। আমি ভয়ে কেঁদেই ফেললাম। বৃষ্টি কাঁদেনি। ঘুমঘুম চোখে দাঁড়িয়ে ছিল।'

নিতু কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'বৃষ্টি কে?'

'আমার জমজ বোন।'

'তোমার বোন আছে! আগে বলোনি তো!'

'এখন বলছি, শুনো। ডাকাতের একজন বাবাকে বলল আলমারির চাবি দেওয়ার জন্য। আলমারিতে তখন মোটা অঙ্কের নগদ টাকা আর গহনা ছিল। বাবা আলমারির চাবি দিলো না। ডাকাত গেল রেগে। চেঁচিয়ে বলল, চাবি দে। নাহয় সব ক'টা মারা পড়বি। বাবা তবুও চাবি দিলো না। ডাকাতের হাত-পা ধরল।'

নিতু কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'তারপর, ডাকাত কী করল?'

'বৃষ্টির গলায় ছুরি চালিয়ে দিলো। বাবার হাতে কোপ দিলো। বাবার এক হাত গেল কেটে। আর আমার পিঠে একটু খোঁচা লাগল।'

নিতু শান্ত হয়ে বলল, 'এজন্যই তোমার বাবার এক হাত নেই?'

বাদল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল।

'আর বৃষ্টি? বৃষ্টির কী হলো?'

বাদল ধরা গলায় বলল, 'বৃষ্টি আমাদের ছেড়ে চলে গেল।'

নিতু চুপ করে গেল। বাদল একটি সিগারেট শেষ করে আরো একটি সিগারেট জ্বালাল। তার চোখ টলমল করছে।

'ক'টা বাজে, নিতু?'

'সাড়ে এগারো।'

'বাসায় যাবে না?'

'যাব।'

'কখন?'

'এক্ষুণি।'

বিছানা ছেড়ে নামল নিতু। সুইচ টিপে বাতি জ্বালাল। ওয়াড্রোব খুলল। টাওয়াল ও কাপড় নিয়ে বাথরুমে গেল। শোবার ঘরের সাথে অ্যাটাচ বাথরুম। বাদল গলা বাড়িয়ে বলল, 'দরজা বন্ধ করে দিও।'

নিতু দরজা পুরোপুরি বন্ধ করল না। বাথরুমে গিয়েই শাওয়ার ছেড়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল। হিমশীতল পানি মাথার উপর ঝড়ে পড়ছে। নিতু হাঁটু ভাঁজ করে হাঁটুর আড়ালে মুখ ঢাকলো। শাওয়ার থেকে পড়ন্ত ঠান্ডা জলের সাথে যুক্ত হয়েছে নিতুর চোখের জল।

আচ্ছা, চোখের জল দেখতে হুবহু স্বচ্ছ পানির মতো কেন? চোখের জল দু'ভাগে ভাগ করে দু'টো আলাদা আলাদা রঙ করে ফেলতে পারলে ভালো হত। একটা আনন্দের অশ্রু। যার রং থাকবে গোলাপি। অন্যটা বিষাদ, বেদনা, যন্ত্রণার। যার রং থাকবে লাল। গাঢ় লাল। যদি সত্যিই এমন হত, তবে নিতুর চোখ বেয়ে টপটপ করে পড়ন্ত অশ্রুজল হত টকটকে লাল। সেই লাল অশ্রুজল ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে।

নিতু উঠে দাঁড়াল। বাথরুমের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করল। তারপর দেয়ালে আটকে রাখা চারকোণা আয়নায় তাকাল। আজ তাকে একটু বেশিই সুন্দর দেখাচ্ছে। মুসকানকে যখন গর্ভে ধারণ করে, তখন প্রথমবার এতটা সুন্দর রূপে দেখেছিল সে নিজেকে। আজ আবার দেখল। মেয়েরা যখন মা হতে চলে, তখন হঠাৎ করেই তাদের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। এটা হচ্ছে মা হবার পূর্বাভাস। সবার চোখে এ-সৌন্দর্য ধরা দেয় না। শুধু যিনি মা হতে চলেছেন, তিনিই বুঝতে পারেন।

নিতু ট্যাপ ছেড়ে একটু পানি খেল। গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল। পানি খাওয়ার পর একটু ভালো লাগছে।

বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচাল বাদল, 'নিতু, এ্যাই নিতু, আর কত? ঠান্ডা লেগে যাবে তো!'

নিতু স্পষ্ট শুনতে পেল বাদলের গলা। তবুও জবাব দিলো না। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শান্ত হয়ে বসে রইল। সে জানে, তার দেহে যার বসবাস সে বাদলের অংশ। তবুও বাদলকে বলতে ভয় লাগছে।

বাদল আবারো বলল, 'নিতু, কী হলো!'

নিতু কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। টাওয়াল দিয়ে গা মুছে কাপড় পাল্টাল। আয়নার দিকে তাকাল একবার। চোখ দু'টো লাল হয়ে আছে।

'শীতের রাতে এত সময় নিয়ে কেউ গোসল করে? ঠান্ডা লাগলে কী হবে, বলতে পারো?'

'লাগুক ঠান্ডা। কী হবে? বড়জোর মরে যাব, তাইতো? ঠিক আছে। মরলে মরব।'

'এ কেমন কথা, নিতু?'

নিতু বিছানায় পা দুলিয়ে বসল। বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করে ব্যাগে ভরল। দ্রুত পায়ে বাথরুমে গেল। বাথরুমের টাইলসে পড়ে থাকা ভেজা কাপড় ব্যাগে ভরল।

বাদল চেঁচিয়ে বলল, 'কী করছো, নিতু! ভেজা কাপড় ব্যাগে ভারছো কেন? ব্যাগের সব জিনিসপত্র ভিজে যাবে তো!'

ব্যাগে কাপড় জায়গা হচ্ছিল না। নিতু জোরজবস্তি করে কোনো রকম ব্যাগের চেন আটকাল। তারপর ধীর গলায় বলল, 'আসছি, বাদল।'

বাদল নিতুর হাত ধরে ফেলল।

'দাঁড়াও। কী হয়েছে তোমার?'

'কিছু হয়নি।' বলে হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল নিতু।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আরফা। নিতুকে দেখে মৃদু হেসে বলল, 'ম্যাম, বাসায় যাবেন?'

'হুঁ।'

'আমি ওদিকেই যাব। দেখুন না, সেই তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। রিকশা নেই।'

রফিক নিতুর সামনে এসে হাতে হাত বেধে দাঁড়িয়ে বলল, 'ম্যাডাম, রিকশা নিয়ে আসব?'

'হ্যাঁ।'

রফিক রিকশা আনতে গেল। কিছুক্ষণ পর একটি রিকশা নিয়ে এল। নিতু রিকশায় উঠতেই আরফা বলল, 'ম্যাম, আমাকে একটু নিয়ে গেলে ভালো হয়। অনেক রাত হয়েছে। ফোনটাও বন্ধ হয়ে গেছে। মা বোধহয় এতক্ষণে হাঁসফাঁস করতে শুরু করেছে।'

নিতু ধীর গলায় বলল, 'রফিক ভাইকে বলে রিকশা আনিয়ে দেব?'

'না, ম্যাম। একা যেতে ভরসা পাচ্ছি না। আসলে এখানে আমার এক ফ্রেন্ড থাকে, আনিশা। আজকে ওঁর জন্মদিন। আড্ডা দিতে দিতে কখন যে রাত বেড়ে গেল, টেরই পাইনি।'

'আচ্ছা, এসো আমার সাথে।'

আরফা রিকশায় চড়ে বসল। আজ একটু বেশিই ঠান্ডা পড়েছে। কিছুক্ষণ আগে গোসল করায় নিতুর শরীরটা এখনও শীতল হয়ে আছে। এছাড়াও খোলা রিকশার চারদিক দিয়ে ধু ধু বাতাস বইছে। নিতু জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।

'ম্যাম, জাফর স্যার কেমন আছেন?'

নিতু একটু অবাক হলো। এ মেয়ে জাফরকেও চেনে!

'ভালো আছে।'

'আপনাদের বিয়ের দিন স্যারকে দেখেছিলাম। স্যার কিন্তু দেখতে অনেক হ্যান্ডসাম। হি-হি।' মৃদু হাসল আরফা।

'আপনাদের একটি মেয়ে আছে। কী যেন নাম?'

'মুসকান।'

'বাব্বাঃ, বেশ সুন্দর নাম তো! কে রেখেছে নামটা?'

'জাফর রেখেছে।'

'প্রথমেই ভেবেছিলাম, এত সুন্দর নাম একমাত্র জাফর স্যার-ই রাখতে পারেন।'

নিতু একটু বিরক্ত হলো। আরফা মেয়েটা দেখতে সুন্দর। তবে কথা বেশি বলে। যারা বেশি কথা বলে, তারা বাচাল। কিন্তু আরফা তার থেকেও বেশি কথা বলছে। বাচালের চেয়ে বেশি কথা বললে তাকে কী বলে?

'ম্যাম!'

'বলো।'

'শুনেছি, বাদল ভাইয়ার সাথে আপনি ইমুশন্যালি ইনভলভ। এটা কি সত্যি?'

'আমাকে নামিয়ে দিন।'

রিকশাঅলা রিকশা থামাল। নিতু নামতে যাচ্ছিল। আরফা বলল, 'ম্যাম, আপনার বাসা তো এখান থেকে অনেকটা দূরে!'

'এখানে আমার একটা কাজ আছে।' বলে নেমে গেল নিতু। রিকশাঅলাকে ভাড়া দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

চলবে

~ মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=215861443581435&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া