নীরব ঘাতক — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম৭ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়া'স্যার, একটা মেয়ে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।'
'কোন মেয়ে?'
'চিনি না, স্যার। শুধু বলল, আপনার সাথে দেখা করতে চায়।'
'বলো আমি বাসায় নেই। বিদেয় করে দাও।'
'মেয়েটা খুব সুন্দরী, স্যার। একদম পরীর মতো।'
'বেশি সুন্দর?'
'জি, স্যার। খুব বেশি সুন্দর।'
'বসতে বলো। আমি আসছি।'
'আচ্ছা, স্যার।'
রফিক চলে গেল। বাদল বিছানা ছেড়ে নামল। দাঁত ব্রাশ করে ঘরে আসতেই রফিক আবার এল। মুখ বেজার করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
বাদল বলল, 'কী হলো, এভাবে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছো যে!'
'মেয়েটা চলে গেছে, স্যার। কিছু না বলেই চলে গেছে।'
'মন খারাপ করো না। আবার আসবে।'
'আরো একজন এসেছে, স্যার।'
'সে-ও কি সুন্দরী?'
'পুরুষ মানুষ, স্যার। বলল, সম্পর্কে আপনার মামা হয়।'
বাদল কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'লোকটার মাথার চুল কি সব সাদা?'
'জি, স্যার।'
'গায়ের রং কালো? মুখে গোঁফ আছে?'
'জি, স্যার।'
'পরনে কি সাদা লুঙ্গি আর ফতুয়া?'
'জি, স্যার।'
'রফিক, জলদি যাও। গিয়ে বলো, আমি বাড়িতে নেই। ফিরতে ফিরতে রাত হবে।'
'বলেছি, স্যার। লোকটা বলেছে, আপনি কাল ফিরলেও সমস্যা নেই। সে নাকি অপেক্ষা করবে।'
বাদল অসহায় ভঙ্গিতে বলল, 'সোফায় আরাম করে বসে আছে কি?'
'জি, স্যার। বসে বসে টিভি দেখছে।'
'শুনো, একটু পরেই উনি চা খেতে চাইবে। তুমি বলবে, ঘরে চিনি নেই। বুঝেছো?'
'কেন, স্যার? চা না দিলে কী হবে?'
'চা না দিলে উনার দম বন্ধ হয়ে যাবে। উনি চায়ের পোকা। ঘন্টায় এক কাপ চা অন্তত খেতে হয়। চা না পেলে দ্রুত বিদেয় হবে।'
'কিন্তু স্যার, বাসায় তো চিনি আছে।'
'থাক। তবুও তুমি বলবে, বাসায় চিনি নেই।'
'তাহলে কি স্যার, দোকান থেকে চিনি কিনে এনে চা বানিয়ে দেব?'
বাদল দাঁত কটমট করে বলল, 'রফিক! তুমি চা দেবে না, মানে দেবে না। উনি যেভাবেই বলুক, তুমি বাহানা বানাবে, মিথ্যে বলবে। তবুও চা দেবে না। বুঝতে পেরেছো?'
রফিক বোকার মতো তাকিয়ে বলল, 'উনি তো স্যার, সকাল থেকে চার কাপ চা খেয়েছে।'
'সকাল থেকে মানে? কখন এসেছে উনি?'
'সকাল সাতটায় এসেছে, স্যার। এখন বাজে সাড়ে নয়টা। সকালে আপনাকে ডাকিনি। উনি চা খেতে চেয়েছিল, তাই দোকান থেকে চা এনে খাইয়েছি।'
বাদল প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'তোমাকে কে বলেছে, চা এনে খাওয়াতে?'
'আমি ভাবলাম স্যার, আপনার আত্মীয়। তাই... '
'হ্যাঁ, আমার আত্মীয়। তাই বলে তুমি আমাকে না জিজ্ঞেস করেই আপ্যায়ন শুরু করে দিলে? তুমি জানো, উনি কী পরিমাণ বাচাল? কথা বলতে বলতে আমার কান...'
আরব আলী দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, 'বেশি কথা বলব না, ভাগিনা। দরকারি কয়েকটা কথা বলতে তোমার মা আমাকে পাঠিয়েছে। বলেই চলে যাব।'
বাদল লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। আরব আলী হঠাৎ দরজার সামনে চলে আসবেন ভাবতে পারেনি সে।
সোফায় বসে বসে আঙুর খাচ্ছেন আরব আলী। একটি আঙুর মুখে দিয়ে আরো একটি আঙুর নিচ্ছেন। টেবিলের উপর একটি পাত্রে পানি রাখা। তিনি একটি একটি আঙুর পানিতে চুবিয়ে মুখে দিচ্ছেন। আঙুর খাওয়া শেষ করে বললেন, 'ভাগিনার চোখ দেখি লাল। রাতে ঘুম হয়নাই?'
'ঘুম হয়েছে, মামা। আমার চোখ এমনিতেই লাল দেখায়।'
'নেশা-টেশা করো নাতো আবার?'
'না, না, মামা। নেশা করি না।'
'ভালো। শুনো, তোমার মা আমাকে যে কারণে পাঠিয়েছেন...'
'বলুন।'
'আপা-দুলাভাইয়ের তুমি একমাত্র সন্তান। এক্ষেত্রে তোমার থেকে উনাদের চাওয়া-পাওয়া থাকতেই পারে। তাই না, বলো?'
'হুঁ।'
'আমি শুনেছি, তুমি নাকি ইদানীং একটি মেয়ের সাথে মেলামেশা করছো। মেয়েটির নাকি একটি কন্যা সন্তানও আছে?'
বাদল দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচু গলায় বলল, 'ওসব বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।'
'আপার এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এখন তোমার উচিত ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করা। আপার খেদমতের জন্য অন্তত...'
'কিছু খাবেন, মামা?'
'না, ভাগিনা। কিছু খাব না। এই কথাগুলো বলতে এসেছিলাম। আজ আবার গ্রামে চলে যাব।'
'আমাদের বাসায় ক'দিন থেকেছেন, মামা?'
'দু'দিন। আসি তাহলে?'
'জি আচ্ছা।'
মুচকি হেসে বিদায় নিলেন আরব আলী। রফিক দ্রুত এসে নিচু গলায় বলল, 'আপনি তো বললেন, লোকটা খুব বাচাল। সারাদিন কথা বলবে। কিন্তু উনি তো কয়েকটা কথা বলে চলে গেল!'
বাদল উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, 'মানুষ খুব দ্রুত বদলে যায়, রফিক।'
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বেরোতে যাচ্ছিল নিতু। তখনই জাফর এল। হাতে মিষ্টির ব্যাগ। চোখে-মুখে হাসির ছাপ। নিতু বলল, 'ভালো হয়েছে, তুমি এসে গেছ। মুসকানকে একা রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছিল না।'
জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'কেন, আলেয়া আসেনি?'
'না। আলেয়ার ছেলে এসে বলে গেছে, ওর নাকি খুব জ্বর। কালকেও আসবে না।'
জাফর মিষ্টির প্যাকেট খুলে একটি মিষ্টি নিতুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, 'ধরো, মিষ্টি খাউ।'
নিতু ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কীসের মিষ্টি?'
'প্রমোশান।'
নিতু চমকে উঠার মতো ভাব করে বলল, 'আবার প্রমোশান!'
'লোকজন ঘুষ দিয়ে প্রমোশান পায় আর আমি বিনে পয়সায়। তাও আবার ঘন ঘন। কপাল, সবই কপাল। হাহ্-হা!'
নিতু মিষ্টি খেল না। নিচু গলায় বলল, 'ভালো।'
'এবার প্রতিষ্ঠান আমাকে গাড়ি দেবে। ডিজেল খরচ, ড্রাইভারের বেতন সব প্রতিষ্ঠান বহন করবে। গাড়ি কেনার টেনশান আর রইল না। কী বলো?'
'হুঁ।'
'তোমাকে একটা স্কুটি কিনে দেব, ভেবেছি। এমনিতে পার্লারে, শপিংয়ে আরো কত জায়গায় যেতে হয়। স্কুটি থাকলে আর রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। তুমি তো সাইকেল চালাতে পারো, তাই না?'
'পারি।'
'তাহলে তো হলোই। আমার অফিসের উল্টো পাশে একটি ড্রাইভিং স্কুল আছে। ওখান থেকে ড্রাইভিং শিখে ফেলবে। তারপর একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স করে ফেলব। কী, পারবে না?'
'পারব।'
'নিতু!'
'হুঁ।'
'আজ একসাথে ডিনার করলে হয় না?'
নিতু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, 'আমি আসছি, জাফর। তুমি খেয়ে নিও।'
জাফর অসহায় ভঙ্গিতে বলল, 'রাতে ফিরবে না?'
'জানি না।' বলে বেরিয়ে গেল নিতু। জাফর মিষ্টির প্যাকেট টেবিলের উপর রাখল। শোবার ঘরে চেয়ে দেখল। বিছানার মাঝখানে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে মুসকান। জাফর মুচকি হাসলো। মেয়েটার একটা বিশেষ গুণ আছে। একবার তার দিকে তাকালে পৃথিবীর সব বিষাদ-বেদনা দূর হয়ে যায়। দেহে সজীব প্রাণের সঞ্চার হয়। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আবার জেগে উঠে।
রিকশায় চড়ে রওনা হলো নিতু। বাদলের বাসা থেকে খানিকটা দূরে রিকশা থেকে নামল। তারপর ধীর গতিতে হাঁটতে লাগল। ঘন কুয়াশা পড়েছে চারদিকে। শীতে জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। গায়ের চাদর আঁটোসাঁটো করে জড়িয়ে ধরে হাঁটছে সে।
বাড়িটা শহর থেকে খানিকটা দূরে। সরু রাস্তায় যানবাহন চলাচল নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে একটি-দু'টি রিকশা ধীর গতিতে ছুটে যাচ্ছে।
শোবার ঘরে মেঝেতে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকছিল বাদল। নিতুকে দেখে অপ্রস্তত ভঙ্গিতে বলল, 'এসেছো। আমি ভাবলাম, আসবে না।'
বাদলের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল নিতু। ধীর গলায় বলল, 'তুমি জাফরের কফিশপে গিয়েছিলে?'
বাদল নিতান্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'গিয়েছিলাম।'
নিতু সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'কেন গিয়েছিলে? কী বলেছ, ওঁকে?'
বাদল সিগারেটের উচ্ছিষ্ট অংশ এস্ট্রেতে রেখে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের উপর থেকে সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে একটি সিগারেট জ্বালাল। বিছানায় পা দুলিয়ে বসে বলল, 'বলেছি ভীতু, কাপুরুষ।'
'কীঃ! এগুলো বলতে একটুও ভয় হয়নি তোমার? একটুও না?'
বাদল তাচ্ছিল্য করে বলল, 'ভয় হবে কেন, আমি জাফরকে সরাসরি বলেছি নাকি!'
'নয়তো কী'
'ওয়েটারকে বলেছি। জাফর তখন শপে ছিল না।'
'ওটা ওয়েটার ছিল না।'
'কে ছিল তবে?'
'জাফর।'
বাদল বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। স্তিমিত গলায় বলল, 'কী ভীতু পুরুষ রে বাবা! মুখের উপর এতকিছু বলে ফেললাম। অথচ, শুধু জি স্যার, জি স্যার করল!'
নিতু উঠে দাঁড়াল। নাকের সামনে হাত নাড়াল কয়েকবার।
'তুমি জানো, আমি সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে পারি না। তবুও আমার সামনে ধোঁয়া ফুঁকো। কেন এমন করো, বাদল?'
বাদল ঠোঁট গোল করে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, 'অভ্যেস হয়ে গেছে। সিগারেট না খেয়ে থাকতে পারি না।'
'তাই বলে আমার সামনে! জাফর ওতো সিগারেট খায়। একবার শুধু বলেছিলাম, সিগারেটের গন্ধ আমার সহ্য হয় না। তারপর থেকে বাইরে খেয়ে আসে। আসার আগে ভালো করে মুখ পরিষ্কার করে আসে, যাতে গন্ধ না পাই।'
বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল, 'এত ভীতু! ও গড, ও গড!'
'ভীতু নয়। আমার যাতে কষ্ট না হয় তাই...'
বাদল উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে গেল। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়াল। বাইরে দৃষ্টি রেখে বলল, 'মা, বারবার খবর পাঠাচ্ছে। মেয়েও দেখছে। তোমার কথা জেনে গেছে। আমার মনে হয়, তোমার কথা জানতে পেরে আরো তাড়াহুড়ো করেছে। তুমি তো জানো, মায়ের অবস্থা খুব একটা ভালো না। কখন কী হয়...'
নিতু শান্ত গলায় বলল, 'খু্ব শীঘ্রই বিয়ে করতে যাচ্ছো?'
বাদল দ্রুত পায়ে ফিরে এল। ধীর গলায় বলল, 'তুমি জাফরকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। মুসকানকে আমরা বড় করব। তোমার মেয়ে মানে তো আমারও মেয়ে। তুমি শুধু ওই কাপুরুষকে ডিভোর্স দাও।'
নিতু উদাসীন ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাঝে মাঝে মনে হয়, সে এখনও জাফরকে ভালোবাসে।
চলবে
~ মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=214268867074026&id=100054727422264