এক জীবনের গল্প — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম৯ ডিসেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়াঅনেকটা সময় বারিশকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করে কোনো জবাব না পেয়ে এখন ওঁদের বাসার লিভিং রুমে বসে আছি। আমার মাথায় ভারী বোঝার মতো কৌতূহল চেপে আছে। সেই সাথে রাগ। বারিশ চাইলেই আমাকে সবকিছু খুলে বলতে পারত। যা কিছুই হোক না কেন, আমি হয়তো সমস্যার সমাধান দিতে পারতাম না। কিন্তু একটু স্বস্তি তো পেতাম। তাই না? এরকম মুখ ভার করে বসে থাকার মানে হয়!
আমার উল্টোপাশে সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকা ভদ্রলোক নিঃশব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম উনি হয়তো বারিশের আত্মীয় কেউ হবেন। কিন্তু এখন আর তেমন মনে হচ্ছে না। আত্মীয় কেউ হলে এতক্ষণে বিচলিত হত। বারিশের বাবাকে ফোন দিয়ে বলত, বারিশ অদ্ভুত আচরণ করছে।
আমি বললাম, 'বারিশের বাবা নাকি পুলিশ অফিসার? বাসায় আসেন না কি দিনরাত ডিউটিতেই কাটিয়ে দেন? উনার মেয়ে হুট করে এমন উদাসীন হয়ে গেল, এটা উনি জানেন না নাকি?'
ভদ্রলোক খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললেন, 'ডিউটির সময় শেষ হলেই আমি বাসায় চলে আসি। চেষ্টা করি সবটুকু সময় বারিশের সাথে কাটাতে।'
'আপনার কথা বলিনি। আমি বলেছি বারিশের বাবার কথা।'
'আমিই বারিশের বাবা।' ভদ্রলোক চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন।
আমি দড়বড় করে উঠে দাঁড়ালাম। মাই গড! এতক্ষণ বারিশের বাবার সামনে...
'আমার মনে হয়, তুমি আর বারিশকে বিরক্ত না করাই ভালো।'
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'দেখো, আমার মেয়েটা না চাইতেও তুমি তাকে বিরক্ত করছো। আমি চাইলে তোমাকে মেরে এখানেই পুঁতে ফেলতে পারি। তোমার লাশটাও কেউ খুঁজে পাবে না। আমি আপাতত এসব চাচ্ছি না। চা শেষ করে আসতে পারো।'
আমি আর চায়ের কাপে হাত না দিয়ে সোজা বেরোতে যাচ্ছিলাম। তখনই ভদ্রলোক আমাকে ডাকলেন, 'হেই, তুমি তো খুব বাধ্য ছেলে দেখছি! এত সহজে মেনে নেবে ভাবিনি। বাই দি বাই, এই কার্ডটা রাখো। এর মালিকের সঙ্গে বারিশের বিয়ে ঠিক হয়েছে।' বলে একটা ভিজিটিং কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন।
আমি অবাক হয়ে কার্ড হাতে নিলাম। বারিশের বিয়ে!
কিছু বলার আগেই ভদ্রলোক দরজার দিকে ইশার করে বললেন, 'ওদিকে..'
একটা প্রাইভেট মেডিক্যালের উল্টো পাশে ফুটপাতে বসে চা খাচ্ছি। কারণ বারিশের সাথে যার বিয়ে ঠিক হয়েছে, সে এমবিবিএস ডাক্তার। সূর্য একদম মাথার উপর। দুপুরের কড়া রোদ সোজা গায়ে এসে পড়েছে। এই ভর দুপুরে চা খেতে ভালো লাগছে না৷ তবুও খাচ্ছি৷ সত্যি বলতে, আমার একটা বসার জায়গার দরকার ছিল। এখানে-ওখানে বসে পড়ার অভ্যেস আমার নেই। তাই চা খাওয়ার বাহানায় চাঅলার চেয়ারে বসে আছি। বসে থাকতে হবে আরো কিছুটা সময়। কারণ ডা. আনোয়ার অর্থাৎ বারিশের সাথে যার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তিনি ফোন রিসিভ করে বলেছেন, কিছুক্ষণ পর বেরোবেন। ততটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তাই নিরুপায় হয়ে বসে আছি। বসে বসে ভাবছি, ছেলে মানুষের কণ্ঠ এতটা মিহি হয় কীভাবে! ছেলেদের কণ্ঠ হবে গম্ভীর, কর্কষ, মজবুত। কিন্তু এ বেচারার কণ্ঠ অন্যরকম। মনে হয় ম্যাজিক মেশানো তাতে। কণ্ঠটা খুব টানে। শুনলে শুধু শুনতে মন চায়।
ছিঃ ছিঃ! কী ভাবছি! ছেলে মানুষ হয়ে অন্য একটা ছেলে কণ্ঠের তারিফ! কিন্তু এ ছাড়া আর উপায় নেই। ছেলেটার কণ্ঠ সত্যিই সুন্দর। আমি কি মনে মনে জেলাস ফিল করছি? করতেই পারি। স্বাভাবিক। কিন্তু যে করেই হোক, বারিশের পিছু ব্যাটাকে ছাড়াতেই হবে। ব্যাটা পেয়েছে কী, আমার বারিশকে ছিনিয়ে নেয়া!
'জাফর সাহেব!'
মনে মনে বিড়বিড় করছিলাম। কেউ একজনের কণ্ঠে আমার নাম শুনে চুপ করে গেলাম। মাথা সোজা করে তাকাতেই, 'আমি ডা. আনোয়ার।'
সাদা শার্ট আর জিন্স পরিহিত একজন আমার দিকে হাত বাড়িয়ে কথাটা বলল। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি। এ লোকটা ডা. আনোয়ার, যার সাথে বারিশের বিয়ে ঠিক হয়েছে! সিরিয়াসলি? এ ব্যাটা তো খুব হ্যান্ডসাম। লম্বা, ফরসা৷ দেখতে একদম ইনোসেন্ট। চোখে গোল ফ্রেমের চশমাও আছে। কণ্ঠের কথা তো আগেই বলেছি। সব মিলিয়ে একশো-তে একশো। ভাবতেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠে। যত সুদর্শন, ভদ্র, ভালো মানুষ হোক, বারিশের পাশে আমি ওঁকে মেনে নিতে পারব না। ওঁকে কেন, কাউকেই মেনে নিতে পারব না।
'আসুন, বসে কথা বলি।' খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বলল। আমিও তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম। লোকটাকে দেখার পর থেকে শরীর কাঁপছে। হার্টবিট বেড়ে গেছে। কেন জানি খুব ভয় হচ্ছে। কৌতূহলও হচ্ছে, লোকটা প্রথমেই বসতে বলল কেন? তার সাথে যারা যারা দেখা করতে আসে সবাইকেই কি বসতে বলে? আমাকেই বা চিনল কীভাবে? এর আগে কখনো দেখা হয়নি আমাদের। তবুও হসপিটাল থেকে বেরিয়ে জোরে আমার নাম ধরে ডাকল। মনে হলো, আমরা কত পরিচিত। বড় অদ্ভুত!
কফিশপের রাউন্ড ছাদের টেবিলের এক পাশে চেয়ারে বসে আছি। ওপাশের চেয়ারটায় বসেছে ডা. আনোয়ার। লোকটার দিকে তাকাতেই রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে, শক্ত করে কলার চেপে ধরি। চেঁচিয়ে গালি দেই। ধাক্কা দিয়ে বের করে দেই বারিশের জীবন থেকে।
'বলুন কী বলতে চান।'
এইতো। এই কথাটা শোনার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম, কী জবাব দেব। কোনো কিছু না ভেবেই বললাম, 'আমি বারিশকে ভালোবাসি।'
লোকটা শুকনো গলায় বলল, 'জানি।'
জানে! কীভাবে জানে! জেনেশুনে কেন আমার থেকে বারিশকে আলাদা করছে চাইছে? ব্যাটার মতলবটা কী অ্যা?
'বারিশও আমাকে ভালোবাসে।'
লোকটি হাসি হাসি মুখ করে বলল, 'এখানে একটু কারেকশন হবে।'
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, 'কীরকম কারেকশান?'
'কালের কারেকশন। বারিশ আপনাকে ভালোবাসে, এটা অতীতকাল। আপনি বলুন, বারিশ আপনাকে ভালোবাসত।'
'বাসত মানে? এখনও বাসে। আজীবন বাসবে।' আমি এক নিঃস্বাসে বললাম।
'আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন কেন?'
'বারিশ আর আমি দুজন দুজনকে ভালোবাসি। আপনি আমাদের জীবন থেকে সরে যাওয়াই ভালো। এ কথাটা বলতে এসেছি।'
লোকটি তাচ্ছিল্য করে বলল, 'কিন্তু আমি জানি বারিশ আপনাকে ভুল করে ভালোবেসে ফেলেছিল। এখন সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। তাই আপনার সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। তাছাড়া ক'দিন পরেই তো আমাদের বিয়ে...'
বিয়ের কথাটা শুনেই চোখের সামনে একটা ছবি ভাসতে লাগল, বারিশ বউ সেজে অন্য একজনের সাথে চলে যাচ্ছে। আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। চোখের জল টপটপ করে পড়ছে৷ ইচ্ছে করছে, তাকে ছিনিয়ে আনি। কিন্তু পারছি না। আমার হাত পা বাঁধা।
না না! এ হয় না৷ আমি দ্রুত লোকটার হাত ধরে ফেললাম। মিনতির স্বরে বললাম, 'বারিশকে আমি খুব ভালোবাসি। ওঁকে ছাড়া নিজেকে কল্পনা অবধি করতে পারি না। একটা দিন ওঁর সাথে কথা না বললে দম বন্ধ হয়ে যায়। আপনি প্লিজ, কিছু একটা করে বিয়েটা ভেঙে দিন...'
লোকটা বাঁ হাত উঁচিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'ওসব ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। বিয়েতে আসবেন কিন্তু। আপনি আমাদের স্পেশাল গেস্ট।'
'দাঁড়ান। শুনুন, একটু দাঁড়ান...'
লোকটি দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে ছুটে গেল। আমি নির্বিকার হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তবে কি বারিশ আমার হবে না? কিন্তু বারিশ হারিয়ে গেলে আমি মরে যাব যে!
(চলবে)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=214344947066418&id=100054727422264