এক জীবনের গল্পঅতিপ্রাকৃত

এক জীবনের গল্প — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম৬ ডিসেম্বর ২০২৪৪ মিনিট পড়া

বারিশ আজও শাড়ি পরেছে। টকটকে গাঢ় লাল শাড়ি। টকটকে লাল শাড়িতে মেয়েদের ভালো দেখায় না। বিচ্ছিরি লাগে। কিন্তু বারিশকে দেখতে ভালোই লাগছে। ওঁর আশপাশে এতসব মেয়ে। অথচ, ওদিকে তাকালে শুধু তাকেই চোখে পড়ে। শুধু ওঁর দিকে নজর যায়। কেক সামনে নিয়ে সবার সাথে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সে ভার্সিটিতে আসেনি। ফোনটাও সারাদিন বন্ধ ছিল। তাই মন খারাপ করে বসে ছিলাম। তখনই এক বন্ধু বলল তাড়াতাড়ি করে চলে আসতে। আজ আমাদের এক ক্লাসমেটের জন্মদিন। আমি আসতে চাইনি। জোর করে নিয়ে এসেছে। মনমরা হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ বারিশকে দেখে মন ভালো হয়ে গেল। মেয়েটা সত্যিই এমন। তাকে এক পলক দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। ইচ্ছে হয় তাকিয়েই থাকি ওঁর দিকে।

হঠাৎ কারোর স্পর্শে স্তম্ভিত ফিরে পেলাম। আজ নীরার জন্মদিন। নীরা স্বয়ং আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এক টুকরো কেক আমার গালে, কপালে মাখিয়ে দিয়ে বলল, 'কীরে, ওদিকে কী দেখিস?'

আমি ইতস্তত করলাম। বারিশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন তারা কেক কেটে ফেলল বুঝতেই পারিনি। বারিশও এখন আগের জায়গায় নেই। সবকিছু কেমন যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মানুষজনও আর আগের মতো নেই। আমি শুধু একটি কথাই বললাম, 'বারিশ কোথায়?'

নীরা বলল, 'বারিশ? বারিশ তো চলে গেছে।'

আবার মন খারাপ হয়ে গেল। মাথা নিচু করে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করেছি মাত্র। তখনই পার্কিং লট থেকে সাঁই করে একটা সিলভার কালার গাড়ি বেরিয়ে এল। দ্রুত বেগে এসে একদম আমার সামনে ব্রেক কষল। আমি চেয়ে দেখলাম। গাড়ির ভেতরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। আবার হাঁটার জন্য পা বাড়াচ্ছিলাম, তখনই কেউ একজন বেরোল গাড়ি থেকে। আর কেউ না, স্বয়ং বারিশ। দূর থেকে যতটা সুন্দর লাগছিল কাছ থেকে এরচে' বহুগুণ সুন্দর লাগছে তাকে। যদি সে পুতুল হত, খুব যত্ন করে রেখে দিতাম শোবার ঘরে। খুব করে আগলে রাখতাম।

বারিশ চেঁচিয়ে বলল, 'দাঁড়িয়ে আছো কেন, ওঠো!'

আমি বললাম, 'গাড়িতে উঠলে দম বন্ধ হয়ে আসে। তুমি যাও। আমি হেঁটে হেঁটে আসছি।'

'আর ইউ শিয়োর?'

'হ্যাঁ।'

বারিশ আর কথা বাড়াল না। দ্রুত বেগে ছুটে গেল গাড়িটা। আমি আবার একা হয়ে গেলাম। নির্জন রাস্তা। সড়ক বাতির আলোয় হাঁটছি। মনে মনে খুব মিস করছি বারিশকে। পস্তাচ্ছি, দূর কেন যে গেলাম না ওঁর সাথে! হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার পাশাপাশি হাঁটছে। আমি ফিরে তাকালাম। একি! বারিশ আমার সামনে দাঁড়িয়ে। স্বপ্ন নয় তো? তাহলে গাড়ি করে কে গেল?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি যাওনি?'

'চলে গেলে খুশি হতে?'

'তা না...'

'তোমাকে খুব মনে পড়ছিল। তাই গাড়িটা ড্রাইভারের হাতে তুলে দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তুমি আসতেই চুপচাপ ফলো করতে লাগলাম। হি হি হি!'

'এত রাতে ফলো করা! ভয় লাগে না তোমার?'

বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'ভয় লাগবে কেন? তুমি আছো তো!'

আমি আর কথা বাড়ালাম না। নির্জন রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটছি দু'জন। আকাশের গুরুগম্ভীর মেঘ চাঁদ ঢেকে রেখেছে। মেঘের গর্জনে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে। বারিশ হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, 'আঁউ, জুতো ছিঁড়ে গেল তো! তোমার জুতোটা দাও।'

আমি জুতো খুলে দিলাম। সে দু'হাতে দু'জোড়া জুতো নিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে লাগল। আমি বললাম, 'হাতে নিয়েছো কেন? পায়ে দাও!'

সে চোখ টিপ দিয়ে বলল, 'জুতো কি এমনি এমনি চেয়েছি? খালি পায়ে হাঁটব আজ। তুমিও আমিও।'

'কিন্তু ঠান্ডা লাগবে তো!'

'লাগুক।'

হাঁটতে হাঁটতে বারিশের বাসার পিছন দিকটায় চলে এসেছি। বারিশ আমার জুতোজোড়া ফিরিয়ে দিয়ে নীরবে দেয়াল টপকে ওপাড়ে চলে গেছে। আজও যাওয়ার আগে ফিরে তাকায়নি। একবার মুচকি হাসেনি। বাই বলেনি। সে আর আগের মতো নেই। অনেকটা বদলে গেছে৷ আমাকে আগের মতো গুরুত্ব দেয় না। সবকিছু বুঝেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারি না। শত হোক, ভালোবাসি তো!

এরপর দুটো দিন চলে গেল বারিশের দেখা নেই। ওঁর বন্ধুবান্ধব কেউ কিছু বলতে পারে না৷ ফোনটাও বন্ধ। এদিকে দু'দিন কথা বলতে না পেরে আমি তৃষ্ণার্ত কাকের ন্যায় ছটফট করছি। মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছি, বারিশের কোনো বিপদ হয়নি তো?

বারিশের সাথে কথা হয় না আজ তিনদিন হলো। আজও সে ভার্সিটিতে আসেনি৷ ফোন বন্ধ। উপায় না পেয়ে সোজা ওঁর বাসায় চলে এসেছি। গেটের সামনে আসতেই দাঁড়োয়ান গেট খুলে দিলো। খুব স্বাভাবিক ভাবভঙ্গি। মনে হচ্ছে সে আগে থেকে আমাকে চেনে। অথচ এর আগে তার সাথে দেখা হয়নি কখনো।

আমি ধীর পায়ে এগোতে লাগলাম। বাহারি ফুল গাছের মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়ে দোতলা বাড়ির বারান্দায় গিয়ে লেগেছে রাস্তাটা। বারান্দায় পা রাখতেই দরজা খুলে গেল। দরজার ওপাশে একজন মাঝ বয়েসী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমাকে দেখেই বললেন, 'ভেতরে এসো।'

কী আশ্চর্য! উনাকেও আমি চিনি না৷ অথচ উনার ব্যবহারে মনে হচ্ছে আমি উনাদের বহু পরিচিত। মনে হচ্ছে, আমি আজ আসব এটা বাড়ির লোকেরা জানত। কিংবা আমি এখানে এসব এটা অনেক আগে থেকেই ফিক্সড করা ছিল।

আমি ঠাই পেলাম বিলাসবহুল লিভিং রুমে। বিলাসবহুল বলার কারণও আছে। এই রুমে টি-টেবিল ঘিরে তিনদিকে তিনটি সোফা৷ সামনের দেয়ালে বিশাল স্মার্ট টিভি। বাঁ দিকে বুক শেলফ৷ ডান দিকে ভারী মেরুন কালার কার্পেট বিছানো ফাঁকা পরিসর। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন কাজের লোক এসে দু'কাপ চা দিয়ে গেল। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে৷ ভদ্রলোক আমার সামনের সোফায় বসে গম্ভীর ভাব নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বললাম, 'বারিশকে কয়েকদিন ধরে দেখছি না। ওঁর ফোনটাও বন্ধ। তাই...'

ভদ্রলোক চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'চা নাও। বারিশ উপরে শোবার ঘরে আছে।'

আমি আর এক মিনিট স্থির না থেকে ছুটে এলাম দোতলায়। বিশাল বেডরুমের একপাশে কাচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বারিশ। জানালার ওপাশে দেখার মতো কিছুই নেই ফাঁকা জায়গা আর ঝোপঝাড় ছাড়া। আমি বারিশের কাঁধে হাত রাখতেই সে ফিরে তাকাল। এলোমেলো চুলগুলো চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে তার গালে হাত রেখে বললাম, 'কোথায় ছিলে তিনটা দিন? কী হয়েছে তোমার?'

বারিশ ধীর গলায় বলল, 'তুমি আমার কে হও?'

আমি বললাম, 'বয়ফ্রেন্ড।'

'আজকের পর তুমি আমার কেউ না।' বলে জানালার কাছে চলে গেল সে।

'কিন্তু কেন বারিশ? আমি কী দোষ করেছি? কী হয়েছে তোমার?'

বারিশ আমার কথা শুনতে পেয়েছে বলে মনে হলো না৷ সে আগের মতোই জানালার ওপাশে দৃষ্টি রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে আমার থেকে কিছু একটা আড়াল করছে সে। কিন্তু কী সেটা?

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=212056150628631&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া