এক জীবনের গল্পঅতিপ্রাকৃত

এক জীবনের গল্প — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম১৩ ডিসেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়া

জন্মের পর মা'কে হারিয়েছি। বাবা আমাকে কোলেপিঠে করে বড় করেছেন৷ কাপড় ধুয়ে দেওয়া, খাবার রান্না করা, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া সহ ঘরে-বাইরের সব কাজ বাবা একাই করতেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে যে টাকা বেতন পেতেন, তাতে কোনো মতে ঘরভাড়া আর খাওয়া খরচ চালিয়ে নিতে হত। তার উপর আমার পড়াশোনার খরচ তো আছেই। মাসের শেষে ধারদেনা করতে হত বাবাকে। আমি অত বুঝতাম না। হয়তো আজও বুঝতে পারতাম না, যদি বাবা মারা না যেতেন। তিনি মারা যাবার তিনদিন পেরোতেই বাড়িঅলা দরজায় কাড়া নাড়লেন। উদার মনের মানুষ তিনি। দু'কথায় দু'মাসের পাওনা ভাড়া মওকুফ করে দিলেন। এমন মানুষ পৃথিবীর বুকে খুব কম আছেন। খুবই অল্প। টাকার লোভ কেউ ছাড়তে পারে না। এ-তো পাওনা টাকা। বাড়িঅলার উদারতায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কিন্তু এই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ রইল না। কিছুটা সময় পরে এই মুগ্ধতাই স্তব্ধতার রূপ নিল, যখন বাড়িঅলা আমাকে বাড়ি ছাড়তে বললেন। মা নেই। বাবা নেই। ভাই নেই। বোন নেই। পৃথিবীতে আমি একা একটা মানুষ। বড় একা। যার কেউ নেই। ভাড়া বাড়িটাও হাতছাড়া হয়ে গেল! এখন কোথায় যাব?

ভাবনার তীর শেষমেশ মামার বাড়ি পৌঁছাল। আমি ব্যাগ গুছিয়ে ছুটে এলাম মামার বাড়িতে। দু'বছর আগের কথা। মামা তার আরাম কেদারায় গা ছেড়ে বসে আনমনে গুনগুন করছিলেন। আমি ধীর পায়ে এসে তার পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। চাইলাম একটু থাকার জায়গা। মামার দয়া হলো। তিনি আমাকে থাকতে দিলেন। যদিও মামী একটু রাগারাগি করেছিলেন মামার সাথে। তবে পুরোপুরি অমত করেননি। সেই থেকে ছোটো ছোটো মামাতো বোন দুটোকে পড়াই। বিনিময়ে একটু থাকার জায়গা আর তিনবেলা আধপেটা ভাত। যদিও মাঝে মাঝে মামী এটা-সেটা বলেন। ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে রাগারাগি করেন আমার সাথে। গালাগাল দেন৷ আমি কিছু মনে করি না। মা থাকলেও বোধহয় তাই করতেন...

এখন যদি বারিশকে বিয়ে করে নিয়ে আসি, মামী আমাকে ঘর থেকে বের করে দেবেন। আমি নাহয় খালি পেটে রাস্তায় শুয়ে থাকলাম। কিন্তু বারিশ? ওঁর কী হবে? কী খাওয়াব? রাখবই বা কোথায়?

এইসব চিন্তা মাথায় জট পেকে গেছে। ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলাম। হঠাৎ কেউ একজন আমার সামনে এসে দাঁড়াল। সড়ক বাতির আলোয় যতটা দেখা যায়, একটা অল্প বয়েসী মেয়ে। বয়স আঠারো-উনিশ হবে। পরনে গাঢ় হলুদ রঙের জামা। মেয়েটা ধবধবে ফরসা। গোলগাল চেহারা। একটু খাটো। একদম আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নড়ছে না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি একটু বাঁ দিকে সরে চলে যেতে চাচ্ছিলাম৷ মেয়েটা আবারো পথ আটকে দাঁড়াল। গম্ভীর ভাব নিয়ে বলল, 'ভাইয়া, আপনি কি খুব খারাপ মানুষ?'

আমি ডানে-বামে তাকিয়ে ইতস্তত করলাম। মেয়েটা বলে কীরে! চেনা নেই, জানা নেই, কথাবার্তার শুরুতেই খারাপ কীনা জিজ্ঞাসা! খারাপ লোক কখনো বলবে আমি খারাপ?

আমি বললাম, 'না।'

'আপনি কি নেশা করেন?'

'না-তো!'

'দেখতে কি খুব খারাপ?'

আমি নিজের দিকে তাকালাম। হাত-পা সবই তো ঠিক আছে। কী বলব!

মেয়েটা নিজে থেকে বলল, 'দেখতেও খারাপ না। তাহলে আপা আপনাকে ছেড়ে দিলো কেন?'

আপা! আমি কৌতূহলী ভঙ্গিতে বললাম, 'কে আপা? কাকে ছেড়েছে?'

'বারিশ আপা।'

'বারিশ? সে তো বলেছে ওঁর কোনো বোন নেই।'

'আছে আছে। এইযে আমি। আপার ফুপাতো বোন রাইসা।'

'ওঃ!' বলে পা বাড়াচ্ছিলাম। তখনই মেয়েটা আবার আমার পথ আটকে দাঁড়াল। বলল, 'আরে আরে, কোথায় যাচ্ছেন? একা একটা মেয়ে রাতের অন্ধকারে ভয় পাচ্ছে। আপনি তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন না?'

'তা দেব। কিন্তু তুমি বেরিয়েছিলে কেন?'

'কেন আবার! আপনার সাথে দেখা করার জন্য।'

'আমার সাথে?'

'জি আপনার সাথে। বারিশ আপার মুখে আপনার কথা শুনে নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। বিশ্বাস করুন, আজ আপনাকে সরাসরি দেখতে না পারলে আমার ঘুমই হত না। বারিশ আপা প্রেম করেছে, এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য। কত প্রপোজাল রিজেক্ট করেছে, আমি জানি। আপনাকে কীভাবে অ্যাকসেপ্ট করল সেটাই বুঝতে পারছি না! তবে আপনার জন্য খারাপও লাগছে। সম্পর্কটা বেশিদিন টিকেনি। আপনার কপাল খারাপ...'

আমি হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলাম, 'আমার ব্যাপারে বারিশ তোমাকে কী কী বলেছে?'

মেয়েটি আমার দিকে একবার চেয়ে বলল, 'আপনার ব্যাপারে? বলেছে আপনি ওঁর এক্স।'

এক্স! আমি এক্স! রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বিড়বিড় করে বললাম, 'তোমার এক্স, ওয়াই, জেড সব আমি। সব।'

'কিছু বললেন?'

'না।'

তারপর নীরবে হেঁটে এলাম অনেকটা পথ। মেয়েটিও আগ বাড়িয়ে কিছু বলেনি। একসময় কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে বলেই ফেললাম, 'বিয়েটা কবে?'

'পরশু।'

'আগামী পরশু?'

'জি।'

তার মানে আমার হাতে আর বেশিদিন সময় নেই। শুধু কালকের দিনটা হাতে আছে। যা করার আজ কিংবা কালকের মধ্যেই করতে হবে। কিন্তু কী করব? এ পৃথিবীতে আমি যে বড্ড অসহায়। আমার পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। এক বারিশ ছিল। সেও হয়তো আমার থেকে মুক্তি লাভের আশায় বসে আছে। কিংবা বাবার চাপে বিয়েতে রাজি হয়েছে। এমনও হতে পারে, ওঁর বাবা হুমকি দিয়েছেন বিয়েতে রাজি না হলে আমাকে মেরে ফেলবেন। তাই সে রাজি হয়েছে। আরো কত কী হতে পারে! আসল সত্যিটা এখনও আমার অজানা। অথচ হাতে আর মাত্র একটা দিন বাকি।

'কোথায় যাচ্ছিলেন?'

'টিউশানিতে।'

'আপনি শিক্ষক?'

'না। পড়াশোনার ফাঁকে ছাত্র পড়াই।'

'আমিওতো বললাম শিক্ষক। আচ্ছা, আমাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?'

'কোথায় আবার? বারিশের বাসায়। ওখানে তোমাকে দিয়ে আমি টিউশানিতে যাব।'

'কিন্তু আপাদের বাসা তো ফেলে এসেছি!'

সত্যিই তো! আমি বোকার মতো এদিক-ওদিক তাকালাম। বারিশের বাসা ফেলে আরো প্রায় দু'মিনিটের রাস্তা হেঁটে চলে এসেছি। আমি বললাম, 'তাইতো! তুমি আগে বলোনি কেন?'

মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে বলল, 'বাঃ রে! আপনি দেখেননি? কানা নাকি?'

মেয়েটিকে যতটা সহজ-সরল ভেবেছিলাম, ততটা না৷ সে আস্ত একটা ত্যাঁদড়। কিছুটা সময় লাগলেও এখন বুঝতে পেরেছি। ত্যাঁদড় মানুষদের সাথে কথা বাড়াতে নেই। মুখ বুজে সহ্য করে ফেলাই ভালো। কথা বাড়ালে এরা কোনো না কোনো ভাবে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ফাঁসিয়েই ছাড়বে। তাই বুদ্ধিমানের মতো চুপ করে শুধু একটি কথাই বললাম, 'এসো এগিয়ে দিই...'

মেয়েটি সাফ মানা করল। মনে হলো ধমক দিয়েছে, 'থাক, লাগবে না। আমি একাই যেতে পারব।'

পারবে! তাহলে এতক্ষণ ভয় পাবার নাটক করল কেন?

'সত্যিই পারবে তো?'

কথাটা শেষ করার আগেই মেয়েটা দৌড়ে চলে গেল। এ বয়সের মেয়েরা সহজে দৌড় দেয় না। শত ব্যস্ততা আর তাড়াহুড়ো থাকলেও হেঁটে হেঁটে যায়। বড়জোর দ্রুত পা চালায়। এর বেশি কিছু না। তবে এ মেয়েটা দৌড় দিয়েছে। তার মানে সত্যি সত্যিই অন্ধকারে ভয় পায়। হি হি!

টেবিলের ওপাশে আমার এগারো বছর বয়েসি ছাত্র বসে বসে কলম কামড়াচ্ছে। ইচ্ছে করছে, গাল বরাবর চড় বসিয়ে দেই। কিন্তু এ আর সম্ভব না। একটু দূরে সোফায় বসে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছেন ছাত্রের মা। প্রতিদিন পড়ানোর সময় ঠিক এভাবেই বসে থাকেন। নজর রাখেন, আমি কী করছি না করছি। এভাবে কি পড়ানো যায়? কখনোই পড়াতাম না। কিন্তু এছাড়া আর কোনো পথ খুলা ছিল না যে! একটাই টিউশানি। মাসে এক হাজার টাকা পাই। এই দিয়ে পুরো মাসের হাত খরচ চালিয়ে নিতে হয়। আগে আরো দু'টো টিউশানি ছিল। এখন নেই। তাই শেষ ভরসা হিসেবে এটাকে আঁকড়ে ধরে আছি।

পড়ানো শেষ করে উঠতে যাচ্ছিলাম, ছাত্রের মা বললেন, 'দাঁড়ান। চা খেয়ে যাবেন।'

কী ব্যাপার! প্রথম দিনের পর গত দু'মাসে আমাকে চা দেওয়ার কথা ভাবেননি। আজ হুট করে চা খেতে বলছেন! এনি গুড নিউজ? আমার প্রমোশান হচ্ছে তাহলে? টিউশানির প্রমোশান মানে বুঝেন তো? সব ঠিকঠাক শুধু বেতন একটু বাড়বে। খুব বেশি না। দু'-একশো টাকা। আমি আহ্লাদী গলায় বললাম, 'আচ্ছা।'

কিছুক্ষণ পর চা এল। ছাত্রের মা ভাঁজ করা দু'টো পাঁচশো টাকার নোট আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। মাস এখনও শেষ হয়নি। আজ তেইশ তারিখ। মাস শেষ হতে আরো সাত দিন বাকি। তাহলে..

কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, 'কীসের টাকা?'

ভদ্রমহিলা বিনয়ী কণ্ঠে বললেন, 'আপনাকে আর কষ্ট করে আসতে হবে না। কাল থেকে আমিই পড়াব ওঁকে।'

শুনেছিলাম, যখন বিপদ আসে, সব একসাথে আসে। আজ চোখের সামনে দেখছি। শেষমেশ টিউশানিটাও গেল হাত থেকে! এখন উপায়? গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। আমি অন্য দিনের মতো বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করলাম না। ভিজতে ভিজতে পথ চলতে শুরু করলাম। মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগলাম, 'আমারও সময় আসবে...'

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=215894676911445&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া