নীরব ঘাতকঅতিপ্রাকৃত

নীরব ঘাতক — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম১২ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়া

যে মেয়েটির সাথে জাফর সেদিন দেখা করেছিল, সে সাইক্রেটিস্ট না। জাফরের একটু একটু সন্দেহ হচ্ছিল। আজ যখন জাফর বারিশকে বলল, 'মিস বারিশ, আপনার কথায় ডা. আদুরীর সাথে দেখা করলাম। উনি আমার কোনো উপকার করলেন না। উল্টো আমাকে আজেবাজে কথা বলেছেন। আমার তো মনে হয়, উনাকে আগে সাইক্রেটিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার।'

জাফরের ঘরের সামনে চারকোণা ছাদের কাঠের টেবিল। একটি চেয়ার। বারিশ চেয়ারে বসে ছিল। জাফরের কথা শুনে উঠে দাঁড়াল। কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'আপনি কি ডা. আদুরীর কাছেই গিয়েছিলেন? উনি আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। আমি তাকে মামুনি বলে ডাকি। যতদূর চিনি, মামুনি খুব ভালো একজন সাইক্রেটিস্ট।'

জাফর বলল, 'মামুনি মানে?'

'চাচার ওয়াইফ। চাচী।'

জাফর অবাক হয়ে বলল, 'আপনার চাচী! আমি ভাবলাম উনি অবিবাহিত।'

'এজন্যই আপনাকে সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করতে বলেছি। উনি শুধু বিবাহিত নন, তিন সন্তানের জননী।'

জাফর ভড়কে গেল, 'একে তো আমার টাকা এবং সময় নষ্ট করেছেন, এখন আবার রসিকতা করছেন!'

বারিশ লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, 'দেখুন, আমি রসিকতা করছি না। আপনি হয়তো ভুল কারো সাথে দেখা করেছেন।'

জাফর পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। ডা. আদুরীর ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলল, 'দেখুন তো এই অ্যাড্রেস কিনা?'

বারিশ কার্ড হাতে নিয়ে বলল, 'হ্যাঁ। আচ্ছা, মামুনি কি আপনাকে কিছু দিয়েছে? চকোলেট, বল, কলম কিংবা অন্য কিছু?'

'না, কিছুই দেয়নি।'

'এবার আমি নিশ্চিত, আপনি ভুল কারো সাথে দেখা করেছেন। মামুনি তার সব পেশেন্টকে কিছু না কিছু উপহার দেয়। আপনি যদি উনার কাছে যেতেন, আপনাকেও দিত।'

জাফর উদভ্রান্তের মতো ঘরে গেল। ভারী কার্পেটের উপর পায়চারি করল কিছুক্ষণ। জানালার পরদা সরিয়ে দিলো। এয়ার কন্ডিশন বন্ধ করল। ঘরের এক কোণে পিতলের টবে লাগানো ছোট্ট গাছে গোলাপি রঙের ফুল ফুটেছে। সেটা খুব কাছ থেকে দেখল। রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটু পানি খেল। লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল।

'জি?'

'আপনার মামুনির বয়স কত হবে? চব্বিশ-পঁচিশ?'

বারিশ মৃদু হেসে বলল, 'আপনি ভুল মানুষের সাথে দেখা করেছেন। মামুনির বয়স কম করে হলেও পঞ্চান্ন হবে।'

জাফর আরো একটু পানি খেল। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'তাহলে এ মেয়ে নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দিলো কেন?'

'ওটা আপনি ভালো জানেন।' বলে বারিশ চলে গেল।

জাফর টেলিফোন কানে লাগাল। ওপাশ থেকে, 'স্লামালিকুম, স্যার।'

'হ্যালো, পাপন?'

'জি, স্যার।'

'গতকাল ডা. আদুরির টিকিট এনেছিলে, মনে আছে?'

'জি, স্যার।'

'আজকেও একটি টিকিট লাগবে।'

'আজকেই লাগবে?'

'হ্যাঁ।'

'কাল আনলে হয় না?'

'না। আজকেই লাগবে। ভেরি আর্জেন্ট। পারবে না?'

'পারব, স্যার।'

'গুড। অফিসে এসে টাকা নিয়ে যেও।'

'আচ্ছা, স্যার।'

'রাখি?'

'আচ্ছা, স্যার।'

টেলিফোন রেখে লাল বোতাম টিপল জাফর। বারিশ এল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার টিপল। এবারও এল না। বাইরে থেকে কোনো সাড়া-শব্দও পাওয়া গেল না। তৃতীয়বার বোতাম টিপতেই বারিশ এসে বলল, 'বারবার বোতাম টিপছেন কেন? জরুরি কাজ থাকলে বোতাম টিপবেন। অযথা বিরক্ত করবেন না।'

জাফর এতটাই অবাক হল, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। শুধু মনে মনে বলল, 'ম্যান ইজ মরট্যাল, ম্যান ইজ মরট্যাল।' কিন্তু বারিশের রাগ দেখানোর সাথে মানুষের মৃত্যুর কী সম্পর্ক সেটা ভেবে পেল না সে।

বারিশ আবার এল। দরজা ঠেলে ধরে যথেষ্ট শান্ত গলায় বলল, 'স্যরি।'

জাফর এখনও কিছু বলতে পারল না। পাথুরে মূর্তির মতো বসে রইল শুধু।

টেবিলের ওপাশে উঁচু চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রমহিলার নাম আদুরী রয়। তিনি একজন সাইক্রেটিস্ট। তার চোখে গোলাকার ফ্রেমের চশমা। মাথায় ওড়না। মুখে বিনীত হাসি।

জাফর বলল, 'আপনি ডা. আদুরী রয়?'

'জি।'

'গতকাল যিনি এখানে বসে ছিলেন, তিনি কে?'

ভদ্রমহিলা কোমল গলায় বললেন, 'উনার নামও আদুরী রয়। আমার নিয়মিত পেশেন্ট।'

জাফর চোখ বড় বড় করে বলল, 'পেশেন্ট?'

'জি।'

'পেশেন্টকে নিজের চেয়ারে বসিয়ে রেখে আপনি চলে যান। সেই পেশেন্ট বাকিদের ট্রিটমেন্ট করে। কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত!'

ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন, 'না, না। কাল ওঁকে এখানে বসিয়ে ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম।'

'উনি ক'দিন যাবৎ আপনার পেশেন্ট?'

'ছ'মাস।'

'ছয় মাস?'

'জি।'

'তাহলে তো উনার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা হয়ে গেছে আপনার?'

'তা বলতে পারেন।'

'উনাকে কোথায় পাওয়া যাবে, বলতে পারেন?'

'দুঃখিত। পেশেন্টের প্রাইভেসি দেওয়া আমার দায়িত্ব এবং কর্তব্য। আমি আমার পেশেন্টের অ্যাড্রেস কোনো মতে আপনাকে দিতে পারি না।'

'আচ্ছা, ঠিক আছে। শুধু এটা বলুন, আজ উনি কি আপনার সাথে দেখা করতে আসবে?'

'আসবে।'

'কখন?'

'সাড়ে সাতটা নাগাদ।'

জাফর ঘড়ির দিকে তাকাল। সাতটা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি। হাতে আছে চল্লিশ মিনিট। এতক্ষণ কী করা যায়? সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলার সাথে গল্প? উনি হয়তো এত লম্বা সময় গল্প করে ব্যায় করতে রাজি হবেন না। সবাই এখন সময়ের মূল্য বুঝে। রিকশাঅলা-ও বলে, টাইমের ভ্যালু আছে ভাইজান, পাঁচ মিনিট জ্যামে আটকায়া আছিলাম। দশ টাকা বাড়ায়া দেন। শিক্ষিত সমাজ বলে, টাইম ইজ মানি।

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল জাফর। রাস্তার উল্টো পাশে একটি কফিশপ। কফিশপের সামনে ফুটপাতে ভ্যানগাড়ি দিয়ে ফুচকা-চটপটি বিক্রি করছে দু'জন। ফুটপাতে চারটি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। জাফর আরাম করে চেয়ারে বসল। একজন জিজ্ঞেস করল, 'কী দিমু, মামা?'

'ফুচকা দাও। ঝাল কম দিও।'

লোকটি ফুচকা দিলো ঠিকই। কিন্তু ঝাল কম দিলো না। উল্টো বেশি দিয়েছে। ইচ্ছে করেই হয়তো দিয়েছে। ফুচকা-চটপটিঅলাদের ঝাল কমিয়ে দেওয়ার জন্য বলতে নেই। ঝাল কম দেওয়ার কথা বললে ওঁরা ঝাল বাড়িয়ে দেয়।

জাফর ফুচকার প্লেট রেখে উঠে দাঁড়াল। ঝালে চোখ-নাক বেয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে। জিহ্বা পুড়ে ছাই হওয়ার উপক্রম। ভ্যানগাড়ি থেকে পানির জগ নিয়ে হা করে মুখে পানি ঢালল জাফর। একটু পানি খেল। ঠান্ডা পানি দিয়ে কুলকুচি করল। ঝাল কমেনি। জিহ্বা বের করে বসে রইল জাফর। কিছুক্ষণ পরে আরো একটু পানি খেল। ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই দেখল, সেদিনের সেই মেয়েটি তার পাশে বসে আপনমনে ফুচকা খাচ্ছে। জাফরের দিকে তাকাচ্ছে। শব্দ না করে দাঁতে দাঁত চেপে হাসছে। জাফর তাকাতেই বলল, 'সহ্য না করতে পারলে খান কেন এত ঝাল?'

জাফর কিছু বলতে পারল না। ঝালটা এখনও কেটে উঠেনি। জিহ্বাটা জ্বলে যাচ্ছে।

মেয়েটি আবার বলল, 'কী হলো, ঝাল কাটেনি?'

'কেটেছে।'

'আর কখনো খাবেন না।' বলে আবারো একটু হাসলো সে।

'আপনি সেদিন মিথ্যে বললেন কেন আমাকে?'

আদুরী কোমল স্বরে বলল, 'আপনি খু্ব সহজে আমার মিথ্যে কথাগুলো মেনে নিচ্ছিলেন, তাই।'

'আপনি কি সব সময় মিথ্যে বলেন?'

'সব সময় না। মাঝে মাঝে বলি। আপনার মতো কাউকে পেলে সবচে' বেশি মিথ্যে বলি।'

'আমার মতো মানে?'

'উমম, আপনার মতো মানে বোকাসোকা মানুষ।' বলে আবারও হাসল সে।

'সাইক্রেটিস্টের কাছে কেন যান, আপনি?'

আদুরী এক প্লেট ফুচকা খেয়ে আরো এক প্লেট ফুচকার অর্ডার দিলো। একটু পানি খেয়ে বলল, 'আপনি কেন যান?'

'আমি যাই না। কাল প্রথম গিয়েছিলাম।'

'ওঃ, তাই?'

'জি।'

'সাইক্রেটিস্টের কাছে যাওয়ার স্পেসিফিক কোনো কারণ নেই। তবে আমার খুব ভালো লাগে সাইক্রেটিস্টদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে। আমার মনে হয় পুরো পৃথিবীর মানুষ এক রকম আর সাইক্রেটিস্টরা অন্যরকম।'

জাফর ভ্রু কুঁচকাল, 'আপনার বাবা-মা কিছু বলে না, এ ব্যাপারে?'

ফুচকাঅলা এক প্লেট ফুচকা নিয়ে এল। আদুরীর দিকে এগিয়ে দিলো। আদুরী বলল, 'ঢেকে রাখুন। একজন মেহমান আসছে। সে খাবে।'

ফুচকাঅলা প্লেট ঢেকে রাখল।

'কে আসবে?'

আদুরী প্রশ্ন এড়িয়ে বলল, 'আমার বাবা আমাকে প্রথমবার বলেছিলেন সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করতে।'

'আর কেউ বলেছে কি?'

আদুরী তাচ্ছিল্য করে বলল, 'বাবা, স্কুল শিক্ষক, কলেজ শিক্ষক, সহপাঠী, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই বলেছেন। ক'জনের নাম বলব?'

'আপনার মা বলেনি?'

'না। মা বলেনি। মা জানে, আমি পাগল নই।'

'আপনি হয়তো জানেন না, অনেক ভালো মানুষও সাইক্রেটিস্টদের সাথে দেখা করে।'

'জানি।' বলে উঠে দাঁড়াল আদুরী। দু'প্লেট ফুচকার দাম দিয়ে পা বাড়াল ডা. আদুরীর চেম্বারের দিকে।

জাফর পকেট থেকে ফোন বের করল। নিতুর নাম্বার ডায়েল করে ফোন কানের কাছে ধরে রাখল।

'হ্যালো, নিতু?'

'হুঁ।'

'একটু আগে অদ্ভুত এক মেয়ের সাথে দেখা হলো। মেয়েটার নাম আদুরী রয়...'

'কোথায় তুমি, জাফর?'

'রাস্তায়।'

'বাসায় আসবে কখন?'

'কিছুক্ষণ পর।'

'একটু তাড়াতাড়ি এসো। অস্থির লাগছে। রাখি?'

'মেয়েটার কথা শুনবে না?'

'বলো।'

'মেয়েটির নাম আদুরী রয়। খুব সুন্দর একটি মেয়ে। কাল সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করতে গিয়ে ওঁকে ওখানে দেখে ভাবলাম সে-ই বুঝি সাইক্রেটিস্ট।'

'তুমি সাইক্রেটিস্টের কাছে কেন গিয়েছিলে?' গলাটা ভারী।

জাফর ফোন রেখে দিলো। সে ভেবেছিল, সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করার কথা কাউকে বলবে না। নিতুকেও না। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। নিতু জেনে গেল। জাফর নিতুর কাছ থেকে কিছু লুকাতে পারে না। শত চেষ্টা করলেও না।

চলবে

~ মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=216549113512668&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া