নীরব ঘাতক — পর্ব ৭
ইয়াছিন নাইম১৪ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়াজাফর কখনো রাত করে বাড়ি ফেরে না। সন্ধ্যার পর কফিশপে যায়৷ ওখানে আধঘন্টা কাটায়। তারপর বাসায় ফিরে আসে। আজ সে এখনও ফিরেনি। টেবিলে ভাত রেখে শুয়ে পড়েছিল নিতু। বারোটা বাজার সাথে সাথে ঘড়িতে ঘন্টা বাজল। সেই শব্দে ঘুম ভাঙল নিতুর। সে ঘুমঘুম চোখে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে দরজার ওপাশে দৃষ্টি রাখল। জাফর প্রতিদিন বাসায় এসে এক পলক নিতু আর মুসকানকে দেখে দরজা বন্ধ করে দেয়। আজ দরজা খোলা দেখে নিতু মনে মনে গালাগাল করল জাফরকে। হাই তুলতে তুলতে সতর্ক পা ফেলে বিছানা ছেড়ে নামল। দরজার সামনে গিয়ে অবাক হয়ে গেল। সোফা খালি পড়ে আছে। এখন জাফর সোফায় শুয়ে শুয়ে নাক ডেকে ঘুমানোর কথা। একবার ওয়াশরুমের দিকে চেয়ে দেখল নিতু। ওয়াশরুমের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। তার মানে জাফর এখনও আসেনি। নিতুর একবার মনে হলো, সে স্বপ্ন দেখছে। তারপর আবার ভাবল, না স্বপ্ন নয়। স্বপ্নে কখনো হাঁটা যায় না। সে হাঁটতে পারছে।
নিতুর বাঁ চোখের পাতা খুব দ্রুত গতিতে কাঁপছে। মা বলেছিলেন, বাঁ চোখ কাঁপলে বুঝতে হবে সামনে বিপদ।
নিতু চোখ বন্ধ করে রাখল কিছুক্ষন। তারপর আবার তাকাল। নাঃ, এখন আর কাঁপছে না। তবে চোখ দু'টো ঝাঁপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। ঘুমে চোখ লেগে আসছে। ঘুম তাড়ানোর জন্য চা খাওয়া যেতে পারে। নিতু রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। যেতে যেতে ভাবল, জাফর কোনো বিপদে পড়ল না তো!
দু'কাপ চা বানাল নিতু। এক কাপ নিজের জন্য, অন্যটা জাফরের জন্য। জাফরের চা টেবিলে রেখে সোফায় বসল নিতু। একটু একটু চুমুক দিয়ে চা খেল। ঘুম কাটল না। টি-টেবিল থেকে পত্রিকা হাতে নিল। স্বভাবত পত্রিকা পড়ে না সে। একসময় ভালো ভালো ম্যাগাজিন বেরোত। ওগুলো পড়তো। ইদানীং পড়া হয় না।
পত্রিকার প্রথম পাতায় নজরে পড়ল, 'রাজপথে মৃত্যুর হানা।' সারা দেশে সড়ক দূর্ঘটনায় এগারো জনের মৃত্যু।
নিতু পাতা ওল্টাল। পুরো পত্রিকায় শুধু খুন, রাহাজানি, ছিনতাইয়ের খবর চোখে পড়ল তার। এসব দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মৃদু ভয় হতে লাগল। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে। নিতু বিড়বিড় করে বলল, 'জাফরটা কোথায়!'
মুসকানের পাশে বসল নিতু। মুসকানের চুলে বিলি কেটে দিলো। হাত-পা টিপে দিলো। গালে-কপালে চুমু খেল। তবুও শান্তি লাগল না। অজানা এক অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে, কেউ একজন বুকের উপর বসে গলা চেপে ধরেছে। চাইলেও তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। চিৎকার দেওয়া যাচ্ছে না। নড়াচড়া অবধি করা যাচ্ছে না।
নিতু উঠে দাঁড়াল। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। বারোটা তেতাল্লিশ বাজে। স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে এগিয়ে গেল। স্লাইড উইন্ডো খুলল। আকাশটা আজ কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে। ঘন অন্ধকার। চাঁদ নেই, তারা নেই। আঁধার, আঁধার আর আঁধার। নিতু জানালা বন্ধ করল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বারান্দার দিকে পা বাড়াল।
এক চিলতে বাড়ান্দা। একটি ইজি চেয়ার। ছোট্ট একটি টেবিল। কয়েকটি ফুলের টব। বারান্দার কার্নিশে চড়ুই পাখি বেঁধেছে বাসা। নিতু ইজি চেয়ারে জড়োসড়ো হয়ে বসল। শীত লাগছে। মাথা ধরেছে। ঘুমে টলে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিচ্ছে সে। বাসার গেটে খচখচ শব্দ হলো। নিতু উঠে দাঁড়াল। গ্রিলের বাইরে দৃষ্টি রাখল। উপর তলার ভাড়াটিয়া মঈন উদ্দিন সাহেব এসেছেন। উপরতলার পুরো ফ্ল্যাটে তিনি একা থাকেন। ভোর সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে যান, গভীর রাতে ফেরেন। শুক্রবারেও একই রুটিন। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় বলেছেন, এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করেন তিনি। নিতুর তেমনটা মনে হয় না। একটু একটু সন্দেহ হয়। কোট-টাই পরে ব্রিফকেস হাতে নিয়ে বেরিয়ে যায় লোকটা। রাতে টলতে টলতে বাসায় ফেরে। দেখে মনে হয় নেশা করেছে। একবার নিতু দাঁড়োয়ানকে বলেছিল, 'উপরতলার মঈন উদ্দিন সাহেব বাসায় ফেরার সময় উনার মুখে কোনো গন্ধ পাও, মতি?'
দাঁড়োয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কীরকম গন্ধ, আপা?'
'মদ-গাঁজা এসব?'
দাঁড়োয়ান ভড়কে গেল। প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'আপনে বহুত খারাপ লোক, আপা। মঈন স্যারের মতো ভালা মাইনষের নামে এইসব বলতেছেন। আপনে বহুত খারাপ লোক, বহুত।'
নিতু তৎক্ষণাৎ ফিরে এল। আর কখনো কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
ইজি চেয়ারে দুম করে বসল নিতু। একবার ভাবল, জাফরকে ফোন দেবে। আবার ভাবল, কী দরকার!
ডায়নিং টেবিলের উপর এক কাপ চা রাখা ছিল জাফরের জন্য। নিতু চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সোফায় বসল। আপাতত চা'টা নিতুর দরকার। জাফর এলে রেঁধে দেওয়া যাবে।
ঠান্ডা চায়ে ঘুম কাটল না নিতুর। সে বাদলকে ফোন করল।
'হ্যালো, বাদল?'
'হুঁ।'
'ঘুমাচ্ছিলে?'
'হুঁ।'
'সিগারেট জ্বালিয়েছো?'
'না, লাইটার খুঁজে পাচ্ছি না। পেলেই জ্বালাব।'
'খবরদার, সিগারেটে হাত দেবে না বলে দিলাম।'
'আচ্ছা।'
'বাদল!'
'হুঁ?'
'জাফর এখনও ফেরেনি।'
'ক'টা বাজে?'
'বারোটা পঞ্চান্ন।'
'কোথাও আড্ডা দিচ্ছে বোধহয়। চিন্তা করো না, চলে আসবে।'
'জাফর এত রাত পর্যন্ত আড্ডা দেবার মতো মানুষ না।'
'তাহলে হয়তো কোনো মেয়ে ফ্রেন্ডের বাসায়...'
'ওঁর কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড নেই। এটা তুমি নিজেও জানো, বাদল।'
'জাফর কয়টায় বাসায় ফিরে?'
'আট-ন'টার মধ্যেই ফিরে। কফিশপ থেকে সোজা বাসায় আসে।'
'কীভাবে আসে? বাইক?'
'না, রিকশা করে আসতো। এখন তো ওঁকে গাড়ি দিয়েছে অফিস থেকে। গাড়িতে করেই আসে।'
'গাড়ি সে নিজেই চালায়?'
'না, ড্রাইভার আছে।'
'নিতু!'
'বলো।'
'তুমি কি কাঁদছো?'
'কই, না-তো!'
'চিন্তা করো না। জাফর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরবে। দেখে নিও।'
ফোন কেটে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নিতু। সে বাদলের কাছ থেকে শান্তনা চায়নি। ভেবেছিল বাদল কিছু একটা বলবে, যাতে নিতুর মন ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু বাদল তেমন কিছু বলল না। উল্টো বাদলের সাথে কথা বলে নিতুর মন আরো খারাপ হয়ে গেল।
ডায়নিং টেবিলে মাছ, মাংস, ডাল, সবজি সব আছে। এসবের কিছুই জাফরের প্রিয় না। জাফরের প্রিয় খাবার গরম ভাতের সাথে সরষে তেল দিয়ে আলু ভর্তা আর ডিম ভাজা। নিতু ভাবল, আজ জাফরের প্রিয় খাবার রাঁধা যাক। এ বাহানায় সময় কাটানো যাবে।
নিতু ডিম ভাজল। সরষে তেল দিয়ে আলু ভর্তা করে টেবিলে এনে রাখল। চা রাঁধল দু'কাপ। এক কাপ চা ঢেকে রাখল জাফরের জন্য। বাকি এক কাপ চা হাতে নিয়ে বারান্দায় এল সে। রাত বাড়ার সাথে সাথে শীত বাড়ছে৷ অস্বস্তি বাড়ছে।
নিতুর একটু একটু বমি বমি ভাব করছে। পেটে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে। মাথা ধরা বেড়েছে একটুখানি। বারান্দায় বসে থাকা আর সম্ভব হলো না। ওয়াশরুমে গেল। কুলকুচি করল। মুখে এক ঝাপটা ঠান্ডা পানি মারল। তারপর আয়নায় তাকাল সে। চোখ দু'টো ফুলে আছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে কত রাত ঘুমায়নি!
একটি বই খুলে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল নিতু। বিদেশী বই। বাংলায় অনুবাদ করা। শুরুর কিছুটা অংশ আগে পড়ে রেখেছে সে। এখন যে অংশে আছে সেখানে গল্পের নায়ক একটি ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল নদীর বুকে চারকোনা পিলারের উপর দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজটা। দুঃখজনকভাবে ব্রিজের কিনারা নেই। একটাই রাস্তা, ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে নদী পার হওয়া। ভাঙা ব্রিজে গল্পের নায়ক কীভাবে উপস্থিত হয়েছে সেটা আগে পড়ে রেখেছিল নিতু। এখন সেটা মনে পড়ছে না। গল্পের নায়ক ব্রিজের নিচে তাকাল। ঘন অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখতে পেল না সে। কারণ গল্পটা মাঝ রাতে এসে থেমেছে। আকাশে গুরুগুরু মেঘ। একটুও আলো নেই। নায়ক পকেট থেকে লাইটার বের করল। নিতু ভ্রু কুঁচকাল। সিগারেট খাওয়ার প্লাস-পয়েন্ট আছে তবে!
হাই তুলে আবার বইয়ে মনুযোগ দিলো নিতু। গল্পের নায়ক লাইটারের আলো জ্বলে এক মনে বলতে লাগল, 'সময় আমায় রাস্তা দেখাও, সময় আমায় রাস্তা দেখাও...' অমনি বৃষ্টি পড়তে শুরু হলো। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সাধারণের তুলনায় একটু বড় বড়। একটু ভারী, শীতল। নায়কের গায়ে পড়তেই সে চিৎকার দিয়ে উঠছে। একসময় নায়ক ব্রিজের উপর লম্বালম্বিভাবে শুয়ে পড়ল। বৃষ্টি থেমে গেল। নায়ক কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসল। বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাওয়া লাইটার জ্বালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু লাইটার জ্বলল না।
বই রেখে উঠে দাঁড়াল নিতু। এসব বইয়ে রস থাকে না। মন ভালো হওয়া তো দূর, উল্টো মন খারাপ হয়ে যায়।
'হ্যালো, বাদল।'
'হুঁ।'
'ঘুমাচ্ছিলে?'
'ঘুম আসছিল না। আলো নিভিয়ে শুয়ে ছিলাম। জাফর ফিরেছে?'
'না।'
'ক'টা বাজে?'
'একটা উনপঞ্চাশ।'
'মাই গড, এত রাত পর্যন্ত বাইরে!'
'এখন কী করব, বাদল?'
'শুয়ে পড়ো। কাল সকালে থানায় জিডি করব।'
নিতুর বুক কেঁপে উঠল। চোখে এক ফোঁটা জল জমে গেল। শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। সে কাঁপা গলায় বলল, 'জিডি করব কেন? জিডি করার মতো কিছু হয়েছে নাকি!'
'একটা মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হলো। জিডি করবে না? তুমি কি খুঁজে বের করতে পারবে তাকে?'
'তুমি কি বলছো, জাফর বিপদে পড়েছে?'
'বিপদে না পড়লে তো এতক্ষণে চলে আসত। এখনও যেহেতু আসেনি...'
'আমার কী মনে হয়, জানো?'
'কী?'
'আমার মনে হয় জাফর যেখানে আছে, সুস্থ আছে। এবং সে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফিরবে।'
'এলেই ভালো। যা ভীতু, বেচারা।' বলে ফিকফিক করে হাসল বাদল।
নিতু ফোন রেখে বারান্দায় গেল। ইজি চেয়ারে বসতেই দরজায় খটখট আওয়াজ এল। নিতু দ্রুত পায়ে ছুটে গেল। একটু গম্ভীর ভাব নিল। তারপর দরজা খুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে ভেবেছিল, জাফর ভয়ে ভয়ে বলবে, 'শুভ সন্ধ্যা।' তারপর সোজা ওয়াশরুমে চলে যাবে। হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসবে। কিন্তু এমন কিছুই হলো না। জাফর আসেনি। দরজার বাইরে এক জোড়া স্যান্ডেল ব্যতিত আর কিছুই দেখতে পেল না সে।
চলবে
~ মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=217271653440414&id=100054727422264