এক জীবনের গল্প — পর্ব ৫
ইয়াছিন নাইম১৯ ডিসেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়াসন্ধ্যার পর খুলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। পিছনে বিদীর্ণ মাঠ। সামনে সরু রাস্তা। গাড়ি চলাচল নেই। সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে। এখন আকাশ পরিষ্কার। আমার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে মাইশা। রাইসার আপন বড়ো বোন। বারিশের চেয়েও দু'মাসের বড়। রাইসার মুখে আমার কথা শুনে চলে এসেছে দেখা করতে। আমার একটু একটু সন্দেহ হচ্ছে, সত্যি সত্যিই সে রাইসার আপন বোন তো? রাইসা মেয়েটা ধবধবে ফরসা। একটু খাটো। কিন্তু এ মেয়েটা লম্বা। কালো। পুরোপুরি কালো-ও বলা যায় না। শ্যামলা বর্ণের। অন্ধকারে কালো দেখাচ্ছে।
'তো আপনি বারিশকে ভালোবাসেন?'
'হ্যাঁ, বাসি।'
'কাল বারিশের বিয়ে, সেটা জানেন তো?'
'জানি।'
'বাঃ, বেশ তো! ভালোবাসেন আবার বলছেন কাল বারিশের বিয়ে এটাও জানেন। বিয়েটা যে আপনার সাথে হচ্ছে না এটা জানেন না?'
'হ্যাঁ, জানি।'
'সব জেনেও এরকম নিশ্চুপ, নির্লিপ্ত! কাল যখন বারিশ আপনার চোখের সামনে দিয়ে অন্য একজনের হাত ধরে চলে যাবে, সহ্য করতে পারবেন?'
'না, পারব না।'
'তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কিছু একটা তো করুন!'
'কী করব? কতবার চেষ্টা করেছি বারিশের সাথে দেখা করার। বারবার ব্যর্থ হয়েছি। ওঁর ফোনটাও বন্ধ...'
'বারিশের হবু বরের কাছে যান। গিয়ে বলুন, বিয়েটা ভেঙে দিতে।'
'গিয়েছিলাম। উনি সাফ মানা করে দিয়েছেন। হাতে-পায়েও ধরেছি। লাভ হয়নি।'
'বাঃ! আর তাই একজন সুপুরুষের মতো এখানে এসে চুপচাপ সময় গুণছেন। কখন কাল হবে, কখন বিয়েটা হবে। তাই না?'
'এছাড়া আর কী করব, বলুন?'
'কী করব মানে? বারিশের হবু বরের কাছে যান। যে করেই হোক রাজি করান। নাহলে তো কাল বারিশের বিয়ে হয়ে যাবে। তারপর আর কখনো তাকে ফিরে পাবেন না।'
বলে মেয়েটি চলে যাচ্ছিল। আমি গলা বাড়িয়ে বললাম, 'আপনি কাউকে ভালোবেসেছেন?'
মেয়েটি ফিরে তাকিয়ে কিছুটা সময় চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'বেসেছি।'
'এখনও বাসেন?'
'হ্যাঁ, বাসি।'
'আর সে? মানে যাকে আপনি ভালোবাসেন, সে-ও কি আপনাকে ভালোবাসে?'
'বাসত। এখন বাসে না।'
'মানে! এখন বাসে না কেন?'
মেয়েটি এক চিলতে হেসে দ্রুত পা ফেলে প্রস্থান করল।
রাস্তার পাশে সাদা বাড়িটা। দূর থেকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে, নতুন রং করা হয়েছেন। পুরো বাড়ি আলোকিত করে আছে বাহারি রঙের বৈদ্যুতিক বাতি। জ্বলছে নিভছে। লোহার গেটের সামনে আরো একটি গেট বানানো হয়েছে। ফুল দিয়ে সাজানো। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বিয়ে বাড়ি। ভেতরে নিশ্চয়ই মেহমানরা আছেন। তাই আমার ফোন পেয়েই ডা. আনোয়ার বাড়ির বাইরে এসে আমাকে টেনে এনেছে খানিকটা দূরে। অনেকটা বিরক্ত হয়ে বলল, 'কেন এসেছেন?'
সময় অপচয় না করে দ্রুত তার হাত চেপে ধরলাম। আকুতির সুরে কাঁপা গলায় বললাম, 'বিয়েটা ভেঙে দিন প্লিজ। বারিশকে ছাড়া আমি বাঁচব না।'
ডা. আনোয়ার নিচু গলায় বলল, 'শুনুন, আপনাকে একটি ঘটনা বলি। আমার জীবনেরই এক অংশ...'
'বলুন।'
'আমিও একসময় আপনার মতো করে একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম। মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছি সবে। মেয়েটি তখন ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। প্রথম দেখাতেই প্রেম। আমিও দেখতে খারাপ না। তাই খুব সহজেই সে রাজি হয়ে গেল। খুব সুন্দর ছিল তার সাথে কাটানো দিনগুলো৷ কিন্তু সুখের দিন যে বেশিদিন স্থায়ী হয় না! হঠাৎ শুনলাম, তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তা-ও আবার এক বিসিএস ক্যাডারের সাথে। ভালোবাসার খাতিরে ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম সেই বিসিএস ক্যাডারের দরজায়। বুঝিয়ে বললাম, যেন সে বিয়েটা ভেঙে দেয়। লোকটা আমার কথা তো শুনলই না, উল্টো বাসার দাঁড়োয়ান ডেকে অপমান করে বের করে দিলো। দাঁড়োয়ান আমার কলার ধরে টেনে টেনে গেটের বাইরে নিয়ে আসে। সেদিন কী রাগ হচ্ছিল আমার! গায়ের চামড়া শরীর থেকে খসে পড়ছিল যেন৷ তবুও কিছু বলতে পারিনি। কিছু করতে পারিনি। কারণ, তখন আমার কিছুই ছিল না৷ কিন্তু আজ আছে। আজ আমার সব আছে সব।'
'আর তাই জেনেশুনে অন্য একজনের ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে তার প্রেমিককে কষ্ট দিয়ে প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছেন?'
'যদি বলি তাই করতে যাচ্ছি?'
'কিন্তু তাই বলে বারিশ কেন? আরও তো কত মেয়ে আছে, তাই না?'
'ওসব আমি জানি না।'
গাঢ় লাল লেহেঙ্গা পরেছে বারিশ। তার হাসি হাসি মুখখানা দেখতে ভারী সুন্দর লাগছে। খারাপ লাগছে এই ভেবে, এই মুহূর্তে সে কান্নায় ভেঙে পড়ার কথা। ব্যাকুল হয়ে আমার পথ চেয়ে থাকার কথা। কখন আমি আসব। কখন তার হাত ধরে নিয়ে যাব দূরে কোথাও। যেখানে কেউ আমাদের আলাদা করতে আসবে না। অথচ, বারিশ হাসছে। জোর করে বিয়ে দিলে এতটা হাসিখুশি থাকত না নিশ্চয়ই? আমি দূরে দাঁড়িয়ে স্টেজে বসে থাকা বারিশের দিকে চেয়ে আছি। ক্যামেরাম্যান একের পর এক ছবি তুলছে। চারপাশে মানুষ গমগম করছে। এত মানুষের সামনে বারিশের কাছে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে দূরেই দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর বারিশ চলে যাবে। চিরদিনের জন্য চলে যাবে ডা. আনোয়ারের ঘরে। হবে তার ঘরনি। আর আমি হব একা। ভীষণ একা। আমার মনে হচ্ছে, বারিশ চলে যাবার পরেই আমি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব।
বিয়েটা হয়ে গেছে। বারিশ গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে। দূরে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি। চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি বুঝি আর নেই। বুকের গভীরে তীব্র হাহাকার করছে। খুব আপন কেউ ছেড়ে গেলে এমনই বুঝি হয়?
চলে গেছে গাড়িটা। বারিশকে নিয়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাঁ দিকে তাকাতেই দেখলাম, মাইশা দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে হাসছে। অথচ, তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। এরকম দৃশ্যও দেখার ছিল!
'আপনি কি কাঁদছেন?'
মাইশা ইতস্তত করে বলল, 'না না, কাঁদব কেন?'
'আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আপনি কাঁদছেন।'
'আপনি হয়তো ভুল দেখছেন।'
আমি কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইলাম।
'আচ্ছা, মানুষ যাকে মন থেকে ভালোবাসে, তাকে পায় না কেন বলতে পারেন?'
'কাকে ভালোবাসেন আপনি?'
মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'একটু আগে যার বিয়ে হলো।'
'ডা. আনোয়ার?'
মেয়েটি মাথা নিচু করে রাখল।
'কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন, সে আপনাকে ভালোবাসত। এখন বাসে না কেন?'
'আমি ভুল ছিলাম। সে আমাকে কখনোই ভালোবাসেনি।'
'মিথ্যে কেন বলছেন?'
'মিথ্যে নয়। যা সত্যি তাই বলছি। একটা কালো, কুৎসিত মেয়েকে কে ভালোবাসবে বলুন?'
'কিন্তু আপনি তো তাকে ভালোবাসেন।'
'তা বাসি।'
'তাহলে বাধা দেননি কেন?'
মেয়েটি উদাসীন ভাবে বলল, 'কারণ আমি জানি বিয়েটা হলে সে সুখী হবে। তার সুখ মানেই আমার সুখ।'
বলে চোখ মুছে চলে যাচ্ছিল। আমি বললাম, 'কোথায় যাচ্ছেন?'
'মরতে।'
আমাকে আশ্চর্য হতে দেখে খিলখিল করে হেসে বলল, 'মজা করেছি। মরা অতো সহজ নাকি! শুনুন, জীবন কারো জন্য থেমে যায় না। হয়তো একটু কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে ব্যথার ঢেউ উঠে। তবে কেউ মরে যায় না। বুঝলেন?'
বলে চলে গেল। যেতে যেতে একটি কথা শিখিয়ে গেল আমায়, "জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না।"
(সমাপ্ত)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=217295493438030&id=100054727422264