নীরব ঘাতক — পর্ব ৮
ইয়াছিন নাইম১৫ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়ানিতু আর জাফর সহপাঠী না হলেও ওঁদের মধ্যে খুব ভাব ছিল। ভার্সিটি ক্যাম্পাসে মাঝে মাঝে দেখা হলে নিতু মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করত, 'কেমন আছেন, ভূত ভাই?'
জাফর শুকনো হেসে বলত, 'ভালো।'
শুধু নিতু না, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই জাফরকে এক নামে চিনত। জুনিয়ররা ভূত ভাই বলে ডাকত। সহপাঠী আর সিনিয়ররা ভূত। এর একটা কারণ আছে। জাফর যখন-তখন, যেখানে-সেখানে ভূতের মতো বই খুলে বসে পড়ত। তখন ভূমিকম্প হয়ে গেলেও তার খবর হত না। যেন এক নির্লিপ্ত ভূত।
সেসময় জাফরের কাঁধে একটা ঝোলাব্যাগ থাকত৷ ব্যাগে কয়েকটি বই। বলপেন ও নোটপ্যাড। স্পেশালি এক প্যাকেট সিগারেট ও লাইটার। সিগারেট সে সবার সামনে খেত না৷ লুকিয়ে খেত। ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূরে। বস্তি এলাকার এক সরু গলিতে দাঁড়িয়ে নেশা মিটিয়ে চুইংগাম চাবাতে চাবাতে ভালো মানুষের মতো বেরিয়ে আসত।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্যারের বিবাহ বার্ষিকীতে সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হলো। শিক্ষার্থীদের সাথে নিতুও গেল। জাফরও ছিল সেখানে। তবে সবার থেকে একটু দূরে বাহারি রঙের আলোর নিচে বই খুলে বসে ছিল সে। হঠাৎ ভীড়ের মাঝখান থেকে নিতুর কান্নার আওয়াজ শুনা গেল। জাফর বইয়ে মনোযোগ দিলো। মূল ঘটনা নিতুর ভ্যানিটি ব্যাগ হারানো নিয়ে। ব্যাগে টাকা খুব একটা ছিল না। তবে নিতুর মায়ের দেওয়া সোনার চেন ছিল ওই ব্যাগে। কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নিতুর কান্নার আওয়াজ আরো বাড়ল। শুরু হলো শোরগোল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলেরা হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল নিতুর ভ্যানিটি ব্যাগ আর চেন। ওঁদের সবার নজর শুধু এক জায়গায় পড়েছিল তখন। জাফরের উপর। এমন হুলস্থুল পরিবেশে একটা মানুষ কীভাবে এতটা শান্ত হয়ে বসে বসে বই পড়তে পারে!
একজন এগিয়ে এসে বলল, 'ভূত!'
জাফর চশমার ফ্রেম আঙুলের খোঁচায় নাকের ডগা থেকে উপরে তুলে ভ্রু কুঁচকে বলল, 'জি?'
'তোমার ঝোলাব্যাগটা দাও, চেক করব।'
জাফর ঝোলাব্যাগ দেয়নি। কারণ সে জানত, ব্যাগে সিগারেটের প্যাকেট আছে। যা দেখলে তার মানহানি হবে। কিন্তু সে এটা জানত না, তার ঝোলাব্যাগে নিতুর সোনার চেন আছে।
কৌতূহলবশত জাফরের ঝোলাব্যাগ চেক করা হলো। সেখান থেকে নিতুর ভ্যানিটি ব্যাগ এবং চেন পাওয়া গেল। সবাই ওগুলোই দেখল কেবল। সিগারেট আর লাইটার দেখল না। জাফর মনে মনে হাসল, 'সবাই কী কানা রে বাবা!'
চুরির দায়ে জাফরকে পুলিশে দেওয়া হত। অনেকের দাবী ছিল, চোর ব্যাটাকে পুলিশে দেওয়া হোক। সেদিন নিতুর অনুরোধে জাফরকে পুলিশে দেওয়া হয়নি। দাঁড়োয়ান এসে জাফরের ফতুয়ার কলার ধরে টেনে বের করে দেয়। জাফর যেতে যেতে বই মেলে ধরে। পড়তে পড়তে হাঁটে। নিতু অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল সেদিন। লোকটা এত নির্লিপ্ত! কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত!
পরদিন নিতুর সাথে ক্যাম্পাসে দেখা হলো জাফরের। নিতু মুচকি হেসে বলল, 'কেমন আছেন, ভূত ভাই?'
জাফর ভ্রু কুঁচকে বলল, 'গতকাল লোকজন আমায় চোর বলল কেন? আমি কি চোর?'
'আমার জিনিস আপনার ব্যাগে পাওয়া গিয়েছে, তাই বলেছে।'
'ওগুলো তো তুমি রেখেছো। কেন রেখেছিলে আমার ব্যাগে?'
'এমনি রেখেছি। আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই রেখেছি। আপনার কোনো সমস্যা? মারবেন আমাকে?'
জাফর জবাব দেয়নি। হাঁটু গেঁড়ে বই খুলে বসে পড়ে।
জাফর তখন লোকাল কোচিং সেন্টারে পড়াত। একদিন বিকেলে নিতু গেল তার কোচিং সেন্টারে। জাফর ওখানে নেই। ছোট্ট একটি পাকা ঘর। কয়েকটি টেবিল-চেয়ার। চেয়ারে বসে আছে দশ-বারো বছর বয়েসী ছেলে-মেয়ে। নিতু বলল, 'তোমাদের ভূত স্যার কোথায়?'
নিতু ভেবেছিল ভূত স্যার শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়বে। কিন্তু তেমনটা হলো না। কেউ হাসল না। কয়েকজন একসাথে বলল, 'স্যারের শরীর খারাপ। আজ পড়াবে না।'
ছোট্ট একটি ঘরে থাকত জাফর৷ স্টিলের নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল নিতু। কাঠের দরজায় কাড়া নাড়তেই জাফর দরজা খুলে দিলো। নিতুকে দেখে ইতস্তত করে বলল, 'আপনি!'
'হ্যাঁ, আমি। ভয় পেয়েছেন বুঝি?'
'না।'
'বসতে বলবেন না?'
জাফর ইতস্তত করে বলল, 'বসুন।'
ঘরে চেয়ার নেই। বিছানায় বসতে দিলো নিতুকে। নিতু বসল। জাফর হাতে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল।
নিতু বলল, 'মেহমান এসেছে, কিছু খেতে দেবেন না?'
জাফর বেরোতে যাচ্ছিল। নিতু জাফরকে টেনে ধরে বলল, 'থাক, লাগবে না।' বলে ফিকফিক করে হাসল।
জাফর বোকার মতো চেয়ে বলল, 'রাগ করেছেন?'
'না, রাগ করিনি। শুনলাম, আপনার নাকি শরীর খারাপ?'
জাফর হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলল, 'মাথা ধরেছে।'
নিতু ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কোচিং-এ না যাওয়ার ধান্দা, হুঁ?'
জাফর ভয়ে ভয়ে বলল, 'সত্যি বলছি, মাথাটা খুব ধরেছে।'
নিতু শব্দ করে হেসে বলল, 'ভয় পাচ্ছেন কেন, আমি তো মজা করলাম!'
নিতু মাঝে মাঝে ভেবে পায় না, সেই ভীতু লোকটা, যাকে পুরো ক্যাম্পাস রসিকতা করে ভূত বলে ডাকত, সে আজ তার মেয়ের বাবা! বিছানা ছেড়ে জানালার সামনে দাঁড়াল নিতু। স্লাইড উইন্ডো খুলল...
দরজায় খটখট শব্দ হলো। নিতু ঘড়ির দিকে তাকাল। তিনটা এগারো মিনিট। একবার মনে মনে ভাবল, মনের ভুল নাতো! আবার ভাবল, দরজা খুলেই দেখা যাক।
এবার আর গম্ভীর ভাব নিল না সে। খুব স্বাভাবিক ভাবে দরজা খুলে দিলো। জাফর কিছু না বলে সোজা ওয়াশরুমে গেল। নিতুর দিকে তাকাল না। নিতু দরজা বন্ধ করতে করতে জাফর ওয়াশরুমে থেকে বেরিয়ে টাওয়াল হাতে নিল। হাত-মুখ মুছে খাবার টেবিলে বসল। নিতু ভাত বেড়ে দিলো। ডিম ভাজা, আলু ভর্তা এগিয়ে দিলো। জাফর এসবের কিছুই ছুঁয়ে দেখল না। ঢুকঢুক করে এক গেলাস পানি খেল। তারপর শান্ত হয়ে বসল কিছুক্ষণ। নিতু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তার পাশে। ওঘর থেকে ঘড়ির টিকটিক আওয়ার স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে। হঠাৎ জাফর বলল, 'পুড়া মানুষ দেখেছো নিতু?'
নিতু হকচকিয়ে উঠল। এতটাই অবাক হলো, তার মুখে দিয়ে টু-শব্দ বেরোল না।
জাফর বলল, 'আমার ড্রাইভারকে চেনো তো? ওঁর নাম রাজিব।'
নিতু কিছু বলল না।
'রাজিবের ছোট্ট একটি মেয়ে ছিল, আমাদের মুসকানের মতো।'
নিতু ধরা গলায় বলল, 'ছিল বলছো কেন? এখন কোথায়, সে?'
জাফর কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, 'পাঁচ বছরের ফুটফুটে মেয়েটা আগুনে পুড়ে ঝলসে গেল...' বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল।
নিতু জাফরের কাঁধে হাত রেখে বলল, 'কীভাবে হলো এসব?'
জাফর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'মশারী টানিয়ে ঘুমিয়েছিল মেয়েটা। ওঁর মা কয়েল জ্বালিয়ে বিছানার পাশে রাখল, যাতে মশা কোনো মতে তার ধারেকাছে না যায়। অথচ, সেই কয়েলের আগুনে পুড়ে মরল মেয়েটা। কয়েল থেকে কীভাবে যে মশারীতে লেগে গেল! ইশ, ইশ!'
'লাশ দাফন করে এসেছো?'
জাফর চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। শোবার ঘরে চেয়ে দেখল মুসকান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে ফিরে এসে আবার খাবার টেবিলের সামনে এসে বসল। এক গেলাস পানি খেল। নিচু স্বরে বলল, 'কাল হবে জানাজা। রাজিবকে যদি একবার দেখতে! কম করে হলেও পাঁচবার অজ্ঞান হয়েছে। এত যন্ত্রণা...'
নিতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'খাবে না?'
'খিদে নেই।'
'তাহলে শুয়ে পড়ো।'
'ঘুম-ও নেই। মেয়েটার মায়াময় চেহারাটা এখনও চোখে ভাসছে...'
নিতু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
'আমার গায়ে একটু হাত রাখো না, নিতু। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। তুমি ছুঁলে কমবে বোধহয়।'
'অনেক রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ো, জাফর।' বলে শোবার ঘরে চলে গেল নিতু। জাফর বসে রইল খাবার টেবিলের সামনে। ঘুমন্ত মুসকানের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছে সে। নিতু শোবার ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, 'গুড নাইট।'
কিছুক্ষণ পর শোবার ঘরে গেল জাফর। ঘুমন্ত মা মেয়েকে চেয়ে দেখল। মুসকানটা দেখতে হুবহু তার মা'র মতো হয়েছে। চোখ, নাক, ঠোঁট, কপাল সব। নিতুর কপালের বাঁ পাশে ছোট্ট একটি তিল আছে। মুসকানেরও আছে। জাফর নিতুর পাশে বসল। নিতু গভীর ঘুমে টলে পড়েছে। জাফর সেই সুযোগে নিতুর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। বিয়ের পর নিতু নিজেই বলতো, তার চুলে বিলি কেটে দেওয়ার জন্য। মুসকানের জন্মের পর সে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে। এখন নিতুর চুলে বিলি কাটা তো দূর, তার সামনে দাঁড়িয়ে দু'টো কথা বলা যায় না। সে রেগে যায়।
হঠাৎ জাফরের মনে হলো, সে ঘুমে টলে পড়ছে। এমনি হবার কথা। নিতুর চুলে বিলি কাটলে আপনাআপনি ঘুম চলে আসে। এটা তার পুরনো অভ্যেস।
কখন শুয়ে পড়েছিল, মনে নেই৷ হঠাৎ যখন চোখ খুলল, তখন ঘড়িতে তিনটা উনষাট মিনিট। জাফর খেয়াল করল, তার পাশে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে নিতু। জাফর একবার ডাকল, 'এ্যাই নিতু, এ্যাই।'
নিতু গোঙানির মতো শব্দ করে আবার শুয়ে পড়ল। জাফর বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গেল। কিছুক্ষণ পায়চারি করে ইজি চেয়ারে বসল৷ সিগারেট জ্বালাল। এতক্ষণ সে রাজিবের মেয়ের মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়েছিল। এখন আবার মনে পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাফর। সিগারেটে লম্বা লম্বা টান দিয়ে উচ্ছিষ্ট অংশ বারান্দা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। চুইংগাম মুখে দিলো। কিছুক্ষণ চিবিয়ে ডায়নিং রুমে গেল। খাবার টেবিলে বসে এক গেলাস পানি খেল। তারপর শোবার ঘরে আসতেই চমকে উঠল। নিতু ঘুম থেকে উঠে চোখ বড় বড় করে বসে আছে। জাফর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলল, 'তুমি কি আমার পাশে শুয়ে ছিলে এতক্ষণ?'
জাফর আমতা আমতা করে বলল, 'তোমার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে কখন যে শুয়ে পড়েছিলাম...'
নিতু ভারী গলায় বলল, 'তোমাকে কে বলেছে আমার চুলে বিলি কেটে দিতে?'
জাফর হাতে হাত বেঁধে আসামির মতো দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বিনয়ী কণ্ঠে বলল, 'মুসকানের পাশে শুয়ে পড়ি?'
নিতু কড়া গলায় বলল, 'না। দরকার নেই।'
'তাহলে মুসকানকে আমার কাছে দাও। আমার আজকে ঘুম আসছে না। মুসকানকে কোলে নিয়ে শুয়ে থাকব।'
নিতু দ্রুত এগিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলো। জাফর নিচু স্বরে বলল, 'মেয়েটা বুঝি তোমার একার? আমার একটুও অধিকার নেই? তুমিওতো আমার, তাই না? এমন করো কেন? মেয়েটাকে ছুঁতে পর্যন্ত দাও না। আমি কী করেছি, বলো?'
চলবে
~ মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=217918220042424&id=100054727422264