নীরব ঘাতক — পর্ব ৯
ইয়াছিন নাইম১৭ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়াচেয়ারে বসে বসে টলছিল বারিশ। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। জাফরকে দেখে সোজা হয়ে বসে বলল, 'শুভ সকাল।'
সাদা শার্ট পরে কনুইয়ের ভাঁজে কালো কোট রেখে সোজা হয়ে হেঁটে আসছিল জাফর। হঠাৎ দাঁড়াল। একবার চেয়ে দেখল। তারপর ধীর গলায় বলল, 'আজ শাড়ি পরেছেন?'
বারিশ শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলল, 'জি।'
জাফর নিতান্ত সহজ গলায় বলল, 'না পরলেও পারতেন।'
বারিশ হকচকিয়ে উঠল। চেয়ার থেকে দড়বড় করে উঠে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। জাফর বলল, 'আপনাকে সালোয়ার কামিজে ভালো মানায়।' বলে নিজ কক্ষে চলে গেল। নিতু চেয়ারে টলে পড়ল। কিছুক্ষণের জন্য ভয় পাইয়ে দিয়েছিল লোকটা।
ঘরে ঢুকতেই সর্বপ্রথম নজরে পড়ল টেবিলের উপর কাটাঅলা গাছটা। গাছের গায়ে লম্বা লম্বা সুচালো কাটা। তবে দেখতে সুন্দর।
চেয়ারের হাতলে কোট ভাঁজ করে রাখল জাফর। জানালার পরদা সরিয়ে দিলো৷ এয়ার কন্ডিশন চালু করল। চেয়ারে বসে এক গেলাস পানি খেল। লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল। দরজা ঠেলে ধরে গলা বাড়িয়ে বলল, 'জি?'
'শাড়িতেও আপনাকে বেশ মানায়।'
'থ্যাংক য়্যু। আর কিছু?'
'না।'
বারিশ চলে গেল। জাফর টেলিফোন কানে লাগাল, 'হ্যালো,নিতু?'
'বলো।'
'মুসকান ঘুম থেকে উঠেছে?'
'হ্যাঁ।'
'খেয়েছো তোমরা?'
'খেয়েছি।'
'গুড। আমি এখনও খাইনি। পানি খেয়েছি এক গেলাস। আপাতত খিদে নেই। খিদে লাগলে ক্যান্টিন তো আছেই, হা-হা!'
'রাখি জাফর?'
'রাখো। আচ্ছা শুনো...'
'বলো।'
'বারিশ নামের একটা মেয়ের কথা বলেছিলাম না?'
'বলেছিলে।'
'আজ সে শাড়ি পরে এসেছে। গাড় নীল শাড়ি। অসম্ভব সুন্দর লাগছে দেখতে। আসার সময় একটা নীল শাড়ি নিয়ে আসব?'
'না, দরকার নেই।'
'তাহলে খয়েরী?'
'লাগবে না, জাফর। আমার যথেষ্ট আছে। রাখছি।'
'তোমার জ্বর কি কমেছে?'
'আমার জ্বর, তোমাকে কে বলল?'
'কাল রাতে যখন কপালে হাত রেখেছিলাম, তখন তোমার শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি ছিল। বাসায় তো থার্মোমিটার নেই। থাকলে তখনই মেপে দেখতাম।'
'মাপার দরকার নেই। আমার শরীরে জ্বরের ছিটেফোঁটা নেই। আমি একদম সুস্থ আছি। রাখি?'
'রাখো।'
নিতু ফোন রেখে দিলো। জাফর টেলিফোন কানের কাছে ধরে রাখল কিছুক্ষণ।
লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল। জাফরের মাঝে মাঝে মনে হয়, মেয়েটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বোতাম টিপতেই দরজা ঠেলে বলে, 'জি?'
'মিস বারিশ, আপনাকে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।'
বারিশ কোমল গলায় বলল, 'কোথায়?'
'সেটা পরে বলব।'
'দুঃখিত। আমি আপনার কথা রাখতে পারছি না। অফিসের কোনো কাজ থাকলে বলুন।'
জাফর করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, 'আপনাকে নিয়ে যাওয়া খুব দরকার। না করবেন না, প্লিজ।'
বারিশ সহজ ভঙ্গিতে বলল, 'আমি আপনার সাথে কোথাও যাচ্ছি না।'
জাফর অতিশয় নরম গলায় বলল, 'জোর করব না। শুধু এটুকুই বলব, আপনি না গেলে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।'
বারিশ শেষমেশ রাজি হলো। গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসল। জাফরকে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেখে বলল, 'আপনি চালান? ড্রাইভার নেই?'
জাফর গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, 'ড্রাইভার আছে। ছুটিতে।'
'আপনি আর কী কী পারেন?'
জাফর মৃদু হেসে বলল, 'সবকিছু পারি এমন না। ড্রাইভিং শিখেছিলাম পেটের দায়ে। আজও কাজে লাগছে।'
'পেটের দায়ে? আপনার মতো একজন পেটের দায়ে গাড়ি চালাবে?'
জাফর শব্দ করে হাসল, 'আপনার কি মনে হয়, চাকরিটা হাতে নিয়ে জন্মেছিলাম?'
বারিশ মাথা নেড়ে বলল, 'তা-না। আচ্ছা, আমরা যাচ্ছি কোথায়?'
'একজনের সাথে দেখা করতে।'
'কার সাথে?'
'যার সাথে দেখা করার জন্য শাড়ি পরেছেন। হাতে পরেছেন কাচের চুড়ি। কানে ঝুমকো। কপালে টিপ...'
'এতকিছু লক্ষ করেছেন?'
'করেছি।'
'কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, বললেন না..'
'যার সাথে আজ আপনার দেখা করার কথা। তবে এখন নয়। আপনার দেখা করার কথা বিকেলে। আমরা সকালেই রওনা হয়েছি। আপনি দরকার পড়লে আবার যাবেন।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আপনি সোহানের কথা জানেন?'
'জানি। এবং এ-ও জানি, সোহানের সাথে আপনার কিছু একটা চলছে।'
বারিশ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, 'আপনি এসব বিষয় তদন্ত করতে যান কেন?'
'আমি তদন্ত করিনি। সে নিজেই আমাকে জানিয়ে গেছে।'
'কে? সোহান?'
'হ্যাঁ।'
'সোহান আপনার সাথে দেখা করেছিল?'
'হ্যাঁ।'
'কোথায়?'
'অফিসে।'
বারিশ প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'সোহান অফিসে এসেছিল!'
জাফর শান্ত গলায় বলল, 'এসেছিল।'
'কী বলেছে, আপনাকে?'
'বলেছে, আপনার দিকে যেন চোখ তুলে না তাকাই। তাকালে চোখ উপড়ে ফেলবে।'
বারিশ চোখ বড় বড় করে বলল, 'এসব বলেছে?'
'হ্যাঁ।'
'আর কী বলেছে?'
'বলেছে আমি নাকি খারাপ লোক।'
বারিশ ইতস্তত করল। লোকটা মিথ্যে বলছে নাতো! এমনওতো হতে পারে, লোকটা বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে।
বারিশ শান্ত হয়ে বসে বলল, 'সোহান আপনাকে বলেছে এসব?'
'বলেছে।'
'তাহলে আমরা কেন সোহানের কাছে যাচ্ছি?'
'কারণ, আপনি আমার সামনে সোহানকে বলবেন, আমি আপনার দিকে তাকাই না।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'তাকান তো মাঝেমধ্যে..'
জাফর বোকার মতো চেয়ে বলল, 'আপনি চান, আমার চোখ উপড়ে ফেলুক? চোখ উপড়ে ফেললে আমাকে ভালো দেখাবে, বলুন?'
বারিশ মৃদু হেসে বলল, 'মোটেও ভালো দেখাবে না।'
গাড়িটা পাকা রাস্তা পেরিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলো। এ-রাস্তাটা খুব বেশি ভাঙা৷ রাস্তার মাঝখানে ইয়া বড় বড় গর্ত। কিছুটা পথ পেরোলেই সোহানের এলাকা। সেখানে সোহান লোকাল ছাত্রনেতা। যদিও সে আর ছাত্র নেই। শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে চাকরি খুঁজছে।
'আপনি সোহানের বাসা চেনেন?'
'চিনি।'
'সোহান ঠিকানা দিয়েছে আপনাকে?'
'না। আমি খোঁজ নিয়েছি।'
'ও-বাবা, স্পাইং?'
জাফর জবাব দিলো না। রাস্তার বাঁ পাশে গাড়ি দাঁড় করাল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বলল, 'তিনতলা বাড়িটা দেখছেন? সোহান দোতলায় থাকে।'
বারিশ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, 'জানি, জানি।'
কষ্ট করে দোতলায় উঠতে হলো না৷ সোহান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। বারিশকে দেখে চমকে উঠল। খুশিতে গদগদ হয়ে যখনই কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখন জাফরকে চোখে পড়ল। মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। শুরু হলো ওঁদের কথোপকথন। জাফর গাড়িতে বসে নিতুর নাম্বার ডায়েল করল, 'হ্যালো, নিতু?'
ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসলো, 'নিতু নেই। কী চাই?'
'নেই মানে? এটা তো নিতুর নাম্বার...'
'নাম্বার ঠিকই আছে। কিন্তু এখন ওঁর কাছে দেওয়া যাবে না। যা বলার আমাকে বলুন।'
'নিতুর ফোন আপনার কাছে গেল কীভাবে? কে আপনি?'
'আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি বাদল।'
জাফর ফোন রেখে দিলো৷ একজন পুরুষের কাছে এরচে' ভারী বোঝা আর কিছু হতে পারে না। যদি সম্ভব হত, নিতুকে বুক পকেটে লুকিয়ে রাখত সে।
বারিশ গাড়িতে উঠে বসল। জাফর বলল, 'বলেছেন আমার কথা?'
'বলেছি।'
'আর কখনো আমাকে বকাঝকা করবে না তো?'
বারিশ শব্দ করে হাসল, 'হি-হি, করবে না।'
বাইরে রোদ পড়েছে। সূর্য মাথার উপর। বারিশ গাড়ির কাচ নামাতে যাচ্ছিল। জাফর বলল, 'কাচ নামাবেন না। বৃষ্টি নামবে।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কিন্তু আকাশ তো পরিষ্কার!'
'তবুও নামবে।'
বারিশ গাড়ির কাচ নামাল না। সিট বেল্ট বাঁধল। তারপর বলল, 'আপনার একটা ভালো দিক আছে।'
জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'কী সেটা?'
'আপনি সব সময় হাসিমুখে থাকেন। কথা বলার ভঙ্গিও হাসিমাখা। আমার মনে হয়, আপনি পৃথিবীর সবচে' সুখী মানুষ। কীভাবে পারেন সবসময় হাসিখুশি থাকতে?'
জাফর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'নিতু বলেছিল, সব পরিস্থিতিতে যেন মুখে হাসি থাকে। সেই থেকে অভ্যেস গড়েছি।'
'নিতু কে? আপনার ওয়াইফ?'
'হ্যাঁ। খুব ভালোবাসে আমাকে।'
'আপনি বাসেন না?'
জাফর চুপ করে গেল। অফিসের পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে গাড়ি থেকে নামল। নিজ কক্ষে গিয়ে চেয়ারে বসল। এক গেলাস পানি খেল। তৃষ্ণা মিটল না। গলাটা শুকিয়ে আছে। পেটে ভীষণ খিদে। তবে খেতে ইচ্ছে করছে না। ক্যান্টিনের খাবারের কথা মনে পড়লেই বমি চলে আসে। লোকাল রেস্তোরাঁগুলো থেকে খাবার খেলে পেটে গ্যাস হয়।
জাফর টেলিফোন কানে লাগাল। বলল, 'হ্যালো, নিতু?'
'হুঁ।'
'দুপুরের খাবার খেয়েছো?'
'না, খাইনি।'
'কী বলো, এখনও খাওনি! ক'টা বাজে দেখেছো?'
'একটা বাজে। আরো এক ঘন্টা পরে খাব।'
'তোমার শরীর এখন কেমন?'
'ভালো।'
'সোহান ছেলেটাকে যেমন মনে করেছিলাম, তেমন না৷ ছেলেটা খুবই শান্ত স্বভাবের। ভালোও।'
'সোহান কে?'
'ওমা! সোহানকে চেনো না? যে অফিসে এসে আমাকে থ্রেট দিয়েছিল।'
'তোমাকে তো অনেকেই থ্রেট করে। ক'জনকে মনে রাখব?'
'তা ঠিক। মুসকান কী করছে?'
'খেলছে।'
'ফোনটা ওঁর কানে দাও।'
'খেলছে খেলুক। অযথা বিরক্ত করে কী লাভ? রাখি জাফর?'
'আচ্ছা।'
টেলিফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাফর। তার হাতে একটি বলপেন। টেবিলে রাখা একটি এ-ফোর সাইজ কাগজ। কাগজের সাদা জমিনে আনমনে কী যেন লিখেছে জাফর। সামনে ঝুঁকে ভালোভাবে চেয়ে দেখল। সাদা কাগজে কালো কালিতে লেখা, "জীবন্মৃত"। জাফর ভ্রু কুঁচকাল। জীবন্মৃত! এর মানে কী? দ্রুত গুগলে সার্চ করল। জীবন্মৃত মানে বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়। জাফর সোজা হয়ে বসে বলল, 'সত্যিই তো!'
চলবে
~ মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=218577209976525&id=100054727422264