নীরব ঘাতক — পর্ব ১০
ইয়াছিন নাইম১৮ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়াসন্ধ্যার পর নিতুর শরীরটা খারাপ করেছে। মাথা ভনভন করছে। বমি বমি ভাব। গায়ের তাপমাত্রা বেড়েছে খানিকটা। চোখদু'টো বন্ধ করা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে পুড়ে যাবে। নিতু কপালে হাত রাখল। কপালটা ব্যথায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এ সময় বাদলটা কোথায় গেল! কয়েকবার ফোন দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে নিতু। ফোন বাজছে ঠিকই, বাদল রিসিভ করছে না। সে ইদানীং ঘন ঘন বাড়ির বাইরে সময় কাটাচ্ছে। নিতু একবার জিজ্ঞেস করেছিল, 'বাড়ির বাইরে তোমার এত কী কাজ?'
বাদল সোজা জবাব দিলো, 'আমাকে জেরা করার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে? তুমি কি আমার বিয়ে করা বউ?'
নিতু আর কিছু বলতে পারল না। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শুধু। সে জানে, বাদল ইদানীং অতিরিক্ত নেশা করছে। বাজে ছেলেদের সাথে মিশছে। তবুও কিছু বলতে পারছে না। বললেই বাদল বলবে, 'তুমি কি আমার বিয়ে করা বউ?'
বিছানার পাশে টেবিলে এক গেলাস পানি রাখা। নিতু ঢুকঢুক করে পানি খেল। পানি এতটাই ঠান্ডা, মনে হয়েছে বরফ কুঁচি খাচ্ছে। পানি খাবার পর বমি ভাবটা আরো বাড়ল৷ নিতু দ্রুত বাথরুমে গেল। বমি করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। বমি হলো না। হয়ে গেলে ভালো হত। নিতু বিছানায় পা দুলিয়ে বসল। ঘড়ির দিকে তাকাল। দেয়াল ঘড়িতে নয়টা তেতাল্লিশ। হাতের চিকন বেল্টের ঘড়িতে নয়টা পয়তাল্লিশ বাজে। নিতু ভাবল, কোনটা সঠিক, দেয়াল ঘড়ি না কি হাতঘড়ি? প্রয়োজন ছাড়া অদ্ভুত কিছু ভাবলে বমি ভাব কেটে যায়। নিতু আরো কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিস ভাবল। জাফরের শরীর ইদানীং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। যদি জাফর মারা যায়, তবে জাফরকে তার মা-বাবার পাশে কবর দেবে। প্রতি শুক্রবার মুসকানকে নিয়ে যাবে জাফরের কবরে। জাফরের কবরটা পাকা করা হবে। যেখানে চারকোণা সাইজের একটি টাইলস লাগানো থাকবে। টাইলসে জাফরের নাম বাংলা বোল্ড অক্ষরে থাকবে।
বমি ভাবটা আর নেই। এখন একটু হালকা লাগছে। তবে মাথা ব্যথাটা কমেনি। বরং বেড়েছে। ব্যথা এতটাই তীব্র, ইচ্ছে করছে দেয়ালে মাথা ঠুকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে। নিতু ফোন কানে লাগালো, 'রফিক ভাই?'
'জি, ম্যাডাম।'
'বাদল কোথায়, বলতে পারেন?'
'জানি না, ম্যাডাম। স্যার তো বলে যায় না।'
'সে কখন আসবে, বলে গেছে?'
'না, ম্যাডাম।'
'আমার কথা কিছু বলেনি?'
'বলেছে, ম্যাডাম।'
'কী বলেছে?'
'বলেছে, উনি আসার আগে যেন আপনাকে যেতে না দেই। স্যার আসার পর যেতে বলেছে।'
নিতু ফোন রেখে বারান্দায় গেল। গ্রিল ধরে দাঁড়াল। আনমনে গুনগুন করল কিছুক্ষণ৷ তারপর বিছানায় ফিরে এল। বিছানায় বসতেই বাদল এল। নিতু বলল, 'কোথায় ছিলে, বাদল?'
'ছিলাম এক মজার জায়গায়। তোমাকে বলা যাবে না।'
'নেশা করোনি তো?'
বাদল মুখ চেপে বলল, 'মোটেও না।'
নিতু জানে বাদল নেশা করেছে। তবুও বলল, 'আচ্ছা।'
বাদল সিগারেট জ্বালাল। বিছানায় বসে নিতুর হাতে হাত রাখতেই নিতু উঠে দাঁড়াল। বলল, 'ছুঁবে না।'
বাদল ধোঁয়া টানতে লাগল। নিতু বাথরুমে গেল। হড়হড় করে বমি করল। হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এল। বাদল শান্ত গলায় বলল, 'কী হয়েছে?'
'কিছু হয়নি।'
'সত্যি করে বলো।'
'বললাম তো কিছু হয়নি।'
বাদল শক্ত করে টেনে ধরল। নিতু আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বিছানায় বাদলের পাশে বসল। বাদল বলল, 'কী হয়েছে?'
নিতু বাদলের হাত টেনে নিয়ে তার পেটে রাখল। বাদলের চোখের দিকে চেয়ে বলল, 'টের পাও?'
বাদল শান্ত গলায় বলল, 'পাই।'
'কী টের পাও?'
'তোমার শরীরে আমার খুব আপনজনের বসবাস।'
নিতু অবাক হয়ে বলল, 'তুমি জানো!'
'যেদিন তুমি জেনেছো, সেদিন আমিও জেনেছি।'
'কীভাবে জেনেছো?'
'সেটা নাহয় অজানা থাক।'
দেখে কেউ বলবে না, এই মেয়েটা সাইক্রেটিস্টের রোজকার পেশেন্ট। রেস্তোরাঁর চেয়ারে ঝুঁকে বসে নিঃশব্দে কফি খাচ্ছে। চোখের পলক অবধি সাবধানে ফেলছে, যাতে শব্দ না হয়৷ জাফর চুপচাপ বসে আছে। টেবিলে মগ থেকে গরম কফির ধোঁয়া উড়ছে। সে আবার গরম কিছু খেতে পারে না। খেলেই জিহ্বা পুড়ে যায়। টানা তিন-চারদিন কিছু খেতে পারে না। আদুরী কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল, 'কফি শীতল হয়ে যাচ্ছে তো!'
জাফর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'শীতল হবার জন্যই রেখেছি।'
একজন ওয়েটার এল। বিনীত গলায় বলল, 'আরকিছু লাগবে, স্যার? আরকিছু লাগবে, ম্যাম?'
আদুরী বলল, 'লাগবে না।'
জাফর বলল, 'জি, স্যার। লাগবে।'
ওয়েটার বিস্মিত চোখে তাকাল। এর আগে কেউ বোধহয় স্যার বলে ডাকেনি তাকে। সে একটু ইতস্তত করে বলল, 'কী লাগবে, স্যার?'
'টিস্যু পেপার।'
ওয়েটার তার পকেট থেকে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিলো। জাফর টিস্যু পেপার দিয়ে টেবিল মুছতে শুরু করেছে মাত্র, ওয়েটার বলল, 'স্যার, স্যার আপনি কেন করছেন! আমি করছি স্যার, দাঁড়ান।' বলে দ্রুত চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে রোগা টাইপের সতেরো-আঠারো বছরের একটা ছেলে এল। টেবিল ভালো করে পরিষ্কার করে গেল। আদুরী হাই তুলতে তুলতে বলল, 'এবার বলুন, কী এমন কাজ, যার জন্য ডেকে এনেছেন?'
'আপনি ক'দিন ধরে সাইক্রেটিস্টদের সাথে দেখা করছেন?'
'হবে চার বছর। কিন্তু কেন?'
'চার বছরে ক'জন সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করেছেন?'
'বহু। হিসেব নেই।'
জাফর টেবিলে আস্তে করে থাবা বসিয়ে বলল, 'এজন্যই আপনাকে ডেকেছি। আপনিই বলতে পারবেন, কোন সাইক্রেটিস্ট আমার সমস্যার সমাধান দিতে পারবে।'
'কিন্তু আপনার সমস্যা কী, তা-ই তো জানি না! আগে সমস্যার ব্যাপারে বলুন।'
'সেটা আমি ডাক্তারকে বলব। আপনি শুধু এমন একজন ডাক্তারের নাম বলুন, যাকে চোখ বুজে ভরসা করা যায়।'
'দেখুন, পৃথিবীর কোনো ডাক্তার চাইবে না, তার পেশেন্ট সুস্থ না হোক। কিন্তু তাই বলে যে সবার পেশেন্ট সুস্থ হয়ে যায়, এমন তো না।'
'তা বলিনি। আমার সমস্যাটা একটু জটিল। আমি চাচ্ছিলাম, এক্সপার্ট কারোর সাথে দেখা করতে। কিংবা পুরনো কেউ। যে কিনা মানুষ দেখতে দেখতে চামড়ায় ভাঁজ ফেলেছেন।'
আদুরী ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আপনার প্রভলেমটা কি খুব সিরিয়াস?'
'জি।'
'তাহলে এক কাজ করুন।'
'কী কাজ?'
'মহসিন সাহেবের সাথে দেখা করুন।'
'মহসিন সাহেব? কে উনি?'
'গ্রাম্য চিকিৎসক। হোমিওপ্যাথিক।'
'আমি সাইক্রেটিস্টের কথা বলেছি, মিস আদুরী!'
'আপনি মানুষ চেনার কথা বলেছেন না? এ বিষয়ে উনি এক্সপার্ট।'
'বলছেন?'
'বলছি।'
'কোথায় পাব উনাকে?'
'ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত পাবেন।'
'আচ্ছা।'
'উনাকে একই প্রশ্ন দু'বার জিজ্ঞেস করবেন না। যা যা জানতে চায়, সোজা সাপটা উত্তর দেবেন।'
'একই প্রশ্ন দু'বার জিজ্ঞেস করলে কী হবে?'
'উনি রাগ করবে। আপনার সাথে আর কথা বলবে না।'
'কিন্তু আমি তো টাকা দেব।'
'উনি টাকা নেবে না, জাফর সাহেব।'
'তাহলে কী নেবে?'
'রক্ত নেবে।'
জাফর চমকে উঠল। দ্রুত চোখের পলক ফেলে বলল, 'রক্ত নিয়ে কী করবে!'
আদুরী একটু হেসে বলল, 'ভয় পাবেন না। এক ফোঁটা রক্ত নেবে ব্লাড টেস্টের জন্য। যদি আপনার রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ হয়, তবে উনি আপনার সাথে একটি কথাও বলবে না। আপনাকে ফিরে আসতে হবে।'
জাফর ভ্রু কুঁচকে বলল, 'এ পজিটিভ রক্ত হলে কথা বলবে না কেন?'
'কারণ উনার ছেলের ব্লাড গ্রুপ এ পজিটিভ।'
'ছেলের সাথেও কি কথা বলে না?'
'না। ছেলে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই ছেলের সাথে কথা বলে না। ছেলের রক্তের গ্রুপ যাদের সাথে মিলে, তাদের সাথেও কথা বলে না।'
'অদ্ভুত তো!'
'জি, অদ্ভুত। তবে আপনার কাজে আসবে।'
জাফর উঠতে উঠতে বলল, 'উঠি তাহলে। বৃষ্টি নামার আগে বাড়ি যাই।'
আদুরী উঠল না। কৌতূহলী ভঙ্গিতে চেয়ে বলল, 'শীতের মৌসুমে বৃষ্টি নামবে কীভাবে!'
'নামবে, নামবে। আসুন আপনাকে পৌঁছে দেই।'
'লাগবে না। হেঁটে যেতে পারব। আপনি আসুন, মি. জাফর।'
জাফর বেরিয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিলো। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর সত্যি সত্যি বৃষ্টি নামল। ঝুম বৃষ্টি। আকাশ পরিষ্কার। একটুও মেঘ নেই। খোলা আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। অথচ বৃষ্টি পড়ছে। বাদলের বাসার সামনে গাড়ি থামল। নিতু বৃষ্টিতে ভিজছিল। জাফর গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিলো। বলল, 'তাড়াতাড়ি এসো, ঠান্ডা লেগে যাবে তো!'
নিতু ভেজা শরীর নিয়ে গাড়িতে বসে কাঁপতে লাগল৷ জাফর তার গায়ের জ্যাকেট খুলে নিতুর গায়ে জড়িয়ে দিলো। নিতু তবুও কাঁপছে৷ জাফর বলল, 'বেশি শীত লাগছে?'
'না। তুমি হঠাৎ এদিকে?'
'কেন জানি মনে হয়েছে, তুমি আজ আমার জন্য অপেক্ষা করবে। অথচ দেখো, সত্যি সত্যি অপেক্ষা করছিলে।'
'তোমার অপেক্ষা করছিলাম না। রিকশার অপেক্ষা করছিলাম।'
'সে যাই হোক, পেয়ে গেলাম তো?'
'হুঁ।'
'তোমার জ্বর কমেছে?'
'হুঁ।'
জাফর নিতুর কপালে হাত রেখে বলল, 'কই কমেছে? এত জ্বর নিয়ে তুমি বৃষ্টিতে ভিজছিলে? আমাকে জানালে না কেন? আমি আগেভাগে চলে আসতাম।'
নিতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'জাফর!'
'বলো।'
'তুমি কি সত্যিই এমন না কি সবই তোমার অভিনয়?'
জাফর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'অভিনয় বলো আর সত্যি বলো আমি এমনি।'
'আর তোমার ভিতরের সত্তা?'
'সে-ও আমার মতোই।'
ধীর গতিতে ছুটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল গাড়িটা। রয়ে গেল দীর্ঘশ্বাসের প্রবল ঢেউ।
চলবে
~ মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=219409563226623&id=100054727422264