নীরব ঘাতক — পর্ব ১১
ইয়াছিন নাইম২১ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়াটেবিলের ওপাশে কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে আছেন এক ভদ্রলোক। পরনে সাদা ফুলহাতা শার্ট। গলায় মাফলার। জাফর চেয়ার টেনে বসতেই তিনি চেবিল থেকে চারকোনা ফ্রেমের চশমা নিলেন।
'তো আপনার নাম জাফর?'
'জি।'
'আপনার সমস্যাটা কীরকম? শারীরিক না মানসিক?'
'জানি না। শুধু জানি, আমি ভালো নেই।'
'জাফর সাহেব, আপনি-আমি কেউই ভালো নেই। আপাতত ভালো না থাকার একটি কারণ আমাকে বলুন।'
'আমার মনে হয়, আমি খুব দ্রুত মারা যাব। কিছুদিনের মধ্যেই।'
'কেন এমনটা মনে হয়?'
'কারণ মৃত্যুকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।'
ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকালেন, 'তাই নাকি! কীভাবে?'
'মাঝ রাতে আমি বিছানা ছেড়ে বেলকনিতে যাই। আমার মনে হয় কেউ আমাকে বেলকনি থেকে লাফিয়ে পড়তে বলছে। আমি লাফ দিতে গিয়ে ফিরে আসি।'
'ক'বার হয়েছে এমন?'
'দু'বার।'
'বাসায় কি আপনি একা থাকেন?'
'না। আমার স্ত্রী-কন্যাও থাকে।'
'আপনার স্ত্রী আপনাকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে কখনো?'
'না। ওঁরা আলাদা ঘরে থাকে। আমি আলাদা ঘরে।'
'আপনার স্ত্রী আর আপনি আলাদা আলাদা ঘরে থাকেন?'
'জি।'
'তাহলে... ফিজিক্যাল রিলেশন...'
'না।'
'একদমই না?'
'জি।'
'তাহলে কন্যা সন্তান?'
'ওঁর বয়স পাঁচ বছর। তখন আমাদের সম্পর্ক ভালো ছিল।'
'এখন কি সম্পর্ক ভালো নেই?'
'না।'
'ভালো না থাকার কারণ? আপনার কি অন্য কারোর সাথে অ্যাফেয়ার...'
'না, নেই।'
'তাহলে?'
'আমার স্ত্রীর।'
'ওঃ। আপনাদের তবে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছিল?'
'জি না। লাভ ম্যারেজ।'
'পিতা-মাতার অমতে নিশ্চয়ই?'
'বিয়েটা আমার মা-বাবা করিয়েছিলেন। এবং আমার থেকে উনারা বেশি চেয়েছিলেন নিতুকে আমার স্ত্রী হিসেবে।'
'খটকা লাগছে মি. জাফর। আপনি বলছেন আপনার স্ত্রীর অ্যাফেয়ার আছে?'
'জি।'
'আলাদা আলাদা ঘরে আপনার ইচ্ছেতে থাকছেন না কি আপনার স্ত্রীর ইচ্ছেতে?'
'আমি তো ওঁকে ভালোবাসি। সে-ই আমাকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। তার ঘরে প্রবেশ আমার জন্য নিষিদ্ধ।'
'আপনার স্ত্রী কি ফিজিক্যালি অসুখী আপনার থেকে?'
জাফর লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, 'আপনি আমার বাবার বয়েসি। নাহলে এতক্ষণে গাল বরাবর চড় বসিয়ে দিতাম।'
'বাঃ! রাগ তো যথেষ্ট আছে আপনার। নিজের স্ত্রীকে কন্ট্রোল করতে পারছেন না কেন?'
'সবকিছু রাগ-অভিমান দিয়ে হয় না।'
'কী দিয়ে হয়? ভালোবাসা দিয়ে?'
জাফর কিছু বলল না৷ মাথা নিচু করে বসে রইল। ভদ্রলোক চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন। হাত দিয়ে চোখ কচলালেন কিছুক্ষণ। তারপর মাথার পাকা চুল মুষ্টিবদ্ধ করলেন। তার মাথায় চুল খুব একটা নেই। যা আছে সব পাকা। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পিছনে হাত বেঁধে পায়চারি করলেন কিছুক্ষণ। তারপর আবার দুম করে চেয়ারে বসলেন। চশমা চোখে দিলেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'আপনি কী চান?'
'কিছুই চাই না।'
'তাহলে এখানে কেন এসেছেন?'
'গল্প করার জন্য।'
'শুধু গল্প করার জন্য?'
'জি।'
'পরামর্শ লাগবে না?'
'লাগবে।'
'আপনার স্ত্রী মুক্তি চায়নি আপনার থেকে?'
'চেয়েছে বহুবার। আমি দেইনি।'
'ডিভোর্স হয়ে গেলে মেয়েটার কী হবে?'
'ওঁ বলেছে মুসকানকেও ওঁর সাথে নিয়ে যাবে।'
'কোথায় নিয়ে যাবে?'
'বাদলের বাসায়?'
'বাদল কে? উনার প্রেমিক?'
'জি।'
'উনি বাদলের বাসা চেনে?'
'চেনে কী, প্রায়ই যায় ওখানে।'
'কী বলেন! আপনি বাঁধা দেন না?'
'দিয়েছি। লাভ হয়নি।'
'ওঁদের সম্পর্কটা ক'দিনের?'
'তিন বছরের।'
'এমন কেউ কি আছে, যাকে আপনার স্ত্রী ভীষণ ঘৃণা করে?'
'জি, আছে।'
'কে সে?'
'আমি।'
'আন্দাজ করেছিলাম। এবার বলুন, আপনাকে ঘৃণা করার কারণ কী?'
'কোনো কারণ নেই।'
'বিনা বাতাসে গাছের পাতাও নড়ে না, মি. জাফর৷ নিশ্চয়ই একটা না একটা কারণ আছে। ভেবে বলুন।'
'আমি ভেবে বলেছি, নিতু আমাকে কারণ ছাড়াই ঘৃণা করে৷ বাদলের সাথে ওঁর পরিচয় হবার পর থেকেই ওঁ বদলাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আমার প্রতি ওঁর ভালোবাসা ঘৃণায় পরিণত হয়।'
'আপনি কখনোই আপনার স্ত্রীকে আঘাত দেননি? উনার গায়ে হাত তুলেননি? কটু কথা বলেননি?'
'দিয়েছি।'
'কবে?'
'দু'বছর আগে। যখন নিতু প্রথমবার বাদলের বাসায় গিয়েছিল এবং ফিজিক্যাল... ওঁর গালে চড় মেরেছিলাম। নষ্টা মেয়ে বলে গালিও দিয়েছিলাম।'
'তারপর?'
'তারপর থেকে নিতু কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেল। একদিন আমার থেকে ডিভোর্স চাইল৷'
'ডিভোর্স দিলে কত খরচ করতে হবে?'
'কাগজে কলমে দশ লাখ।'
'দিতে পারবেন না?'
'পঞ্চাশ লাখ দিতে পারব।'
'তাহলে দিচ্ছেন না কেন?'
'ওঁকে হারাতে চাই না।'
ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আপনি মোহের জগতে বাস করছেন মি. জাফর। আমার মনে হয়, আপনি বেলকনি থেকে লাফিয়ে পড়লেই ভালো হত। বুঝতে পেরেছেন কী বলেছি?'
'না, বুঝিনি।'
'আজান শুনেছেন?'
'শুনেছি।'
'নামাজে যাচ্ছি। আপনি নামাজ পড়েন তো?'
'পড়ি।'
'গুড। পাঁচ ওয়াক্ত পড়বেন। এক ওয়াক্ত যেন মিস না হয়। পৃথিবীর সামান্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারি না আমরা। আখেরাতের কষ্ট কীভাবে সহ্য করব, বলুন? এই যে এত ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষ৷ সবাই মানসিক বিপর্যস্ত। এই সামান্য বিপর্যয় সহ্য হয় না। লোকজন আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে। অথচ মৃত্যুর পরে মানসিক আজাবও দেওয়া হবে। সেটা ক'জন মনে রাখে?' বলে টুপি মাথায় দিতে দিতে বেরিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
নিতু জাফরকে তার অসুখের কথা কখনো বলে না। জাফর নিজে থেকে জিজ্ঞেস করলেও না। আজ বলেছে। জাফর ডোরবেল বাজাতেই নিতু দরজা খুলল। জাফর বলল, 'শুভ সন্ধ্যা।'
'শুভ তোমার জন্য হবে। আমার জন্য না।'
'এমা! কী হয়েছে তোমার?'
'মাথা ধরেছে। শরীরের হাড়গোড় সব কামড়ে খাচ্ছে কে যেন।'
'কী বলো! চা করে দেই?'
'দাও।'
জাফর চা নিয়ে এল। নিতুকে এক কাপ দিলো। এক কাপ চা হাতে নিয়ে সোফায় বসল৷
'জ্বর আছে শরীরে?'
'তুমি শুধু জ্বর-জ্বর করো কেন? জ্বর ব্যতীত আর কোনো অসুখ হয় না মানুষের?'
'তা হয়। আচ্ছা, একটা ঘটনা শুনবে?'
'ইচ্ছে করছে না।'
'শুনোই না। তুমি তো জানো, ইদানীং রাতে ঘুম হয় না৷ উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখি।'
'জানি, জানি।'
'একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের কাছে বলেছিলাম এসব...'
নিতু ভ্রু কুঁচকে বলল, 'হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের কাছে এসব বলেছো? হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক তোমাকে ঘুমের ওষুধ দেবে?'
'আরে শুনোই না কী বলেছে...'
'কী বলেছে?'
'বলেছে আমি নাকি বেলকনি থেকে ঝাঁপ দিলে ভালো হত।'
নিতু তাচ্ছিল্য করে বলল, 'তুমি দেবে বেলকনি থেকে ঝাঁপ! হা-হা-হা! তুমি যে কী পরিমাণ ভীতু, সেটা বলোনি ডাক্তারকে?'
জাফর ধীর গলায় বলল, 'যদি কখনো হারিয়ে যাই, মনে রাখবে না আমাকে? খুঁজতে বেরোবে না?'
চায়ের কাপ টেবিলে রেখে ধীর পায়ে শোবার ঘরে গেল নিতু। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এল। গম্ভীর ভাব নিয়ে সোফায় বসল। ধীর গলায় বলল, 'একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব।'
'বলো।'
'আমি অসুস্থ জানো তো?'
'জানি।'
'অসুখটা সাধারণ না।'
'কী বলো! জ্বর বাড়েনি তো? ইদানীং মশারা যা বাড় বেড়েছে! দেখি দেখি।' বলে জাফর নিতুর কপালে হাত রাখতে যাচ্ছিল। নিতু জাফরকে দু'হাতে দূরে ঠেলে দিয়ে বলল, 'ছুঁবে না। দূরে যাও। দূরে।'
জাফর সরে বসল।
'কতবার বলেছি জ্বর সামান্য অসুক নয়। হেলা করো না। এবার বুঝেছো তো?'
'আমি মা হতে চলেছি, জাফর।'
মুহূর্তেই জাফরের মুখ চুপসে গেল। সে একবার নিতুর দিকে তাকাল। শুকনো হেসে লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল।
'যত দ্রুত সম্ভব আমাকে ডিভোর্স দাও। আমি মুক্তি চাই।'
জাফর ধরা গলায় বলল, 'মেয়ে হলে আমার সাথে শুবে। ছেলে হলে তোমার সাথে।'
'জাফর, আমি চাই না বাদলের সন্তান তোমার পরিচয়ে বড় হোক।'
'এমন করে বলছো কেন? তোমার সন্তান মানে তো আমারও সন্তান। আমাদের সন্তান।'
'না, কখনোই না। যে আসতে চলেছে, সে তোমার কেউ না। তুমি তার কেউ নও।'
'নিতু!'
'বলো।'
'ডিভোর্স দিয়ে দিলে তুমি খুশি হবে তো?'
'খুব খুশি হব। খুব।'
'আর যদি না দেই?'
'দেবে না?'
জাফর মৃদু হেসে বলল, 'না।'
'তুমি দেবে, তোমার বাপ দেবে।'
'এ বাবা! বিয়ে করেছি আমি। ডিভোর্স দেবে আমার বাবা? বাবা কি কবর থেকে উঠে আসবে ডিভোর্স পাইয়ে দেবার জন্য? হি হি হি।'
'এ্যাই, হাসবে না। চুপ করো, চুপ। আমি উকিল সাহেবের সাথে কথা বলেছি। কাল উনি আসবেন বলেছেন।'
'তুমি সত্যিই ডিভোর্স চাও?'
'হ্যাঁ, চাই।'
'আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?'
'পারব।'
'আমি কিন্তু আর কখনো তোমার সামনে আসব না।'
'এসো না। চলে যাও। শুধু যাবার আগে ডিভোর্সটা দিয়ে যাও।'
জাফর নিতুর হাতে আলতো করে হাত রাখতেই নিতু দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে শোবার ঘরে চলে গেল।
চলবে
~ মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=220088373158742&id=100054727422264
[আগামী পর্বে একটা সুন্দর মুহূর্ত উপহার দেব।]