নীরব ঘাতকঅতিপ্রাকৃত

নীরব ঘাতক — পর্ব ১২

ইয়াছিন নাইম২২ ডিসেম্বর ২০২৪৬ মিনিট পড়া

'নিতু!'

'বলো।'

'মনে আছে, বিয়ের দিন তোমার বাবা আমাকে কী বলেছিলেন?'

'কী?'

'বলেছিলেন, বাবা জাফর, আমার একটাই মেয়ে। নওরিন আকতার নাফিসা। আদর করে নিতু বলে ডাকি। মেয়েটা আমার ঘরের লক্ষী। আমার কলিজা। আমার সব। এই কলিজাটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। কথা দাও, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আগলে রাখবে। কখনো কষ্ট দেবে না।'

'ওঃ।'

'জবাবে আমি কী বলেছিলাম, মনে আছে?'

'কী বলেছিলে?'

'বলেছিলাম, নিতুকে আমি মরার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আগলে রাখব। একটি দিনের জন্যও চোখের সামনে থেকে সরে যেতে দেব না। কষ্ট দেব না। কথা দিলাম।'

'একটু একটু মনে আছে।'

'এবার তুমিই বলো, তোমাকে আমি ডিভোর্স দেই কীভাবে?'

'যেভাবে অন্য সব স্বামী দেয়, সেভাবে দেবে।'

'কিন্তু আমি তো বলেছিলাম, মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমাকে আগলে রাখব!'

'মরতে হলে মরো। আমার কিছু যায় আসে না।'

'একটা জ্যান্ত মানুষকে মরে যেতে বলছো?'

'বলছি।'

'কীভাবে মরব, বলো?'

'যেভাবে খুশি সেভাবে মরো।' বলে বেলকনিতে চলে গেল নিতু। চেয়ারে বসল। জাফর গেল তার পিছু পিছু।

'নিতু!'

'হুঁ।'

'তোমার হাতটা ছুঁই?'

'না, ছুঁবে না।'

'একবার, প্লিজ। আর কখনো ছুঁবো না।'

'আচ্ছা।'

জাফর হাঁটু ভাঁজ করে বেলকনির টাইলসে বসল। নিতুর হাতে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল, 'নিতু!'

'কী?'

'তোমার পাশে বসি?'

'কী করছো, জাফর? এখন বললে হাত ছুঁবে এখন আবার পাশে বসবে, একটু পরে কি...'

'এই শেষবার। আর কখনো বলব না।'

'আচ্ছা, বসো।'

জাফর নিতুর পাশে বসল। নিতুর দু'হাত আলতো করে চেপে ধরল।

'নিতু?'

'আবার কী হলো!'

'চলো ছাদে যাই।'

'মাথা খারাপ? তোমার হয়েছে কী, বলো তো? আর একটি কথাও শুনব না।'

'বলছি তো, এই শেষবার। আর কখনো বলব না। প্লিজ এসো।'

জাফর নিতুর হাত ধরে ছাদে নিয়ে এল। স্টেইনলেস স্টিলের রেলিং লাগানো ছাদ। চারদিকে বাহারি রঙের ফুলের টব। ছাদের বাতিটা নষ্ট হয়ে গেছে। চাঁদের আলোয় ঝাপসা অন্ধকারে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে জাফর ও নিতু।

'নিতু!'

'এত নিতু নিতু করছো কেন? আর একবারও ডাকবে না। যা বলার সরাসরি বলো।'

'মনে আছে বিয়ের রাতের কথা?'

'হুঁ।'

'তখন মহসিন সাহেবের দোতলা বাসায় থাকতাম৷ এক চিলতে বারান্দা তোমার পছন্দ হয়নি। তাই ছাদে চলে এলাম। রেলিং নেই। আমি বললাম, আর যেও না, পড়ে যাবে। তুমি মুচকি হেসে বললে, পড়ে গেলে তুমি কীসের জন্য?'

নিতু আকাশের দিকে চেয়ে থেকে বলল, 'মনে আছে।'

'সেদিনের রাতটা খুব সুন্দর ছিল। আকাশে জোছনার চাঁদ। ছাদে আবছা আলোর বাতির নিচে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে তুমি-আমি। সারাটা রাত কাটল এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে। শেষরাতে তুমি আমার কপালে চুমু এঁকে দিলে। এ-ই প্রথম স্পর্শ।'

নিতু হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একটু দূরে গেল। ছাদের এক কোণে গোলাপ ফুলের গাছ স্পর্শ করে বলল, 'সেদিন ছাদে এরকম একটা গাছ ছিল।'

জাফর বিস্মিত চোখে চেয়ে বলল, 'তোমার মনে আছে!'

'হুঁ।'

'শেষরাতে তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সকালে সূর্য উঠা পর্যন্ত।'

'ঘুমাইনি। জেগে ছিলাম এবং বিছানায় বসে ছিলাম।'

'তাই?'

'হ্যাঁ।'

'আচ্ছা নিতু, তোমার জ্বর কমেছে?'

'আবার জ্বর! এ্যাই, তুমি শুধু জ্বর-জ্বর করো কেন?'

'এক রাতে মা'র জ্বর হলো। খুব বেশি না, নামমাত্র জ্বর। বাবা ওষুধ নিয়ে এলেন। মা খেলেন না। বললেন, অল্প একটু জ্বর। সেরে যাবে। জ্বর নিয়ে ঘুমালেন। পরদিন বাবা উঠলেন ঘুম থেকে। মা উঠলেন না।'

'জানি।'

'জেনেও হেলাফেলা করো কেন?'

'আমি অত সহজে মরব না।'

'তা ঠিক। তুমি অনেক বছর বাঁচবে। অল্প বয়সে মরব তো আমি।'

'ভুল। তুমি আরো দেড়িতে মরবে।'

'এ বাবা! কে বলল?'

'কেউ বলতে হবে না। আমি জানি, বোকারা বহুদিন বাঁচে। তুমি শুধু বোকা নও, বোকার চেয়েও বড় বোকা।'

জাফর চুপ করে গেল। এভাবে সামনাসামনি কেউ কাউকে বোকা বলে? গাধাকে গাধা বললেও সে পা দিয়ে লাথি মারে। জাফর তো মানুষ। অপমানবোধে তার গা ঘিনঘিন করতে লাগল। তবুও শান্ত গলায় বলল, 'এজন্যই তো আমার বাবা-মা তোমার মতো বুদ্ধিমতী একটা বউ আমাকে দিয়ে গেছেন। যাতে তুমি আমাকে সামলে নিতে পারো।'

'তুমি ওতোটাও বোকা নও, জাফর।'

জাফর মৃদু হাসল।

'এবার কি আমি যেতে পারি?'

'থাকো না আরো কিছুক্ষণ। প্লিজ।'

'এরপর কী বলবে? চুমু খেতে বলবে না তো?'

জাফর লজ্জা পেয়ে বলল, 'না, তা বলব না। তবে...'

'তবে কী?'

'তোমার ইচ্ছে করলে খেতে পারো।'

নিতু শব্দ করে হেসে উঠল। জাফর বোকার মতো তাকিয়ে থাকল।

'হাসছো যে?'

'এই জিনিসটা তুমি খুব ভালো পারো।'

'কী?'

'হুট করে মন ভালো করে দিতে।'

'এতক্ষণ মন খারাপ ছিল বুঝি?'

'হ্যাঁ।'

'যখনই মন খারাপ হবে, আমাকে বলবে। আমি মন ভালো করে দেব।'

'আর যদি না বলি?'

'তাহলেও দেব। কারণ তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারি।'

'একটা কথা বলবে, জাফর?'

'কী কথা?'

'তুমি কি আর কাউকে ভালোবাসো?'

'বাসি তো।'

'কাকে?'

'তোমাকে।'

নিতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চলে গেল। শোবার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। তারপর মুসকানের পাশে শুয়ে পড়ল। ঘুম যখন ভাঙল, তখন ঘড়িতে একটা বেজে তেতাল্লিশ মিনিট। গলাটা শুকিয়ে গেছে। টেবিলে রাখা পানির গ্লাস খালি পড়ে আছে। নিতু ডায়নিং রুমের দিকে পা বাড়ল। এক গেলাস পানি খেল। ফিরে আসার সময় খেয়াল করল, জাফর নেই। বাথরুমে দেখল। সেখানেও নেই। নিতু তাচ্ছিল্য করে হাসল। মনে মনে ভাবল, শেষরাতে কাঁপতে কাঁপতে সোফায় শুয়ে পড়বে। কিন্তু শেষরাতে জাফর এল না। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিতু যখন দেখল জাফর নেই, তখন সে একটু অবাক হলো। ছাদে গেল। সেখানে পাথরচাপা দিয়ে একটি চিরকুট রাখা। সাদা চিরকুট। উল্টো করে দেখল নিতু। কোথাও কিছু লেখা নেই। শুধু কাগজের একপাশে কালো কালির ছোট্ট একটি বিন্দু আঁকা। এর মানে বুঝল না নিতু। বাদলকে ফোন করল। বাদল বলল, ফিরে আসবে রাতের মধ্যে। সন্ধ্যা কাটল রাত হতে হতে মাঝরাতে নিতু বাদলকে ফোন দিলো। বাদল বলল, কাল সকালে দেখা যাবে। সকাল হলো, নিতু জাফরের অফিসে ফোন করল। অফিস থেকে জানাল, জাফর গতদিন অফিসে যায়নি। থানায় জিডি করা হলো। পুলিশ খুঁজল। পত্রিকায় ছবি সহ নিখোঁজ সংবাদ ছাপা হলো।

'এরপর তোর বাবা আর ফিরে আসেনি।' বলে চশমা খুলে কাচের ছাদের টেবিলে রাখল নিতু। চোখ মুছে চশমা পরল।

মুসকান কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'ক'বছর আগে বাবা নিখোঁজ হয়েছিল, মা?'

'প্রায় বারো বছর।'

'বাবা কখনো ফোন দেয়নি? একটা চিঠিও না?'

নিতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'না।'

'জাহেদ তাহলে আমার আপন ভাই না?'

'কে বলেছে তোর আপন ভাই না? জাফরের ছেলে না হলেও আমার ছেলে। তোর আপন ভাই।'

'কিন্তু বাবার পরিচয়ে বড় করছো কেন? ওঁ তো বাদলের ছেলে।'

'তোর বাবার ইচ্ছে ছিল, ওঁকে তার পরিচয়ে বড় করি।'

'তুমি কি বাদলকে বিয়ে করেছিলে, মা?'

'না।'

'কেন? বাদলকে বিয়ে করার জন্যই তো বাবার কাছ থেকে ডিভোর্স চেয়েছিলে, তাই না?'

'চেয়েছিলাম হয়তো, কিন্তু তখন তো জানতাম না ওটা ভালোবাসা না। প্রকৃত ভালোবাসা তোর বাবার প্রতি ছিল।'

'তার মানে বাবা বোকা ছিল না। সত্যিকারের বোকা ছিলে তুমি।'

নিতু আসামীর মতো মাথা নিচু করে বসে রইল।

'বাবা কি আর ফিরে আসবে না?'

'আসবে, আসবে। আমার কী মনে হয়, জানিস?'

'কী?'

'আমার মনে হয়, আমার যেদিন মৃত্যু হবে, সেদিন তোর বাবা আসবে। হুট করে চলে আসবে মানুষটা। আমার লাশ পড়ে থাকতে দেখে দু'হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলবে।'

'এমনওতো হতে পারে, বাবা মারা গেছে।'

'চুপ। এমন কথা বলিস না। আমি জানি মানুষটা বেঁচে আছে। মরে গেলে লাশটা অন্তত দেখতে পেতাম...'

স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে জাহেদ এল৷ ব্যাগ সোফার উপর ছুঁড়ে ফেলে বলল, 'আজ একটা লোক আমাকে অনেকগুলো চকোলেট দিয়েছে, মা।'

'কে দিয়েছে?'

'চিনি না। লোকটা দেখতে কেমন যেন অদ্ভুত। শীতের মৌসুমে পাতলা ফতুয়া আর পাজামা পরেছে। আর সবচে' অদ্ভুত তার ব্যাগ। একটা কাপড়ের ঝোলাব্যাগ।'

নিতু চমকে উঠে বলল, 'লোকটা মুখে কি খোঁচা খোঁচা দাড়ি? চোখে গোল ফ্রেমের চশমা?'

'গোল ফ্রেমের চশমা আছে, মা। তবে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নেই। লোকটার মুখ ভর্তি লম্বা লম্বা দাঁড়ি। মাথার চুলও অনেক লম্বা লম্বা।'

'তোকে কিছু বলেনি?'

'বলেছে।'

'কী বলেছে?'

'বলেছে, সে আমাকে চকোলেট দিয়েছে এটা যেন তোমাকে না বলি।'

নিতুর চোখ ছলছল করতে লাগল। গাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়তে লাগল। এ অশ্রু আনন্দের না কষ্টের তা সে জানে না।

(সমাপ্ত)

~ মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=220772366423676&id=100054727422264

["ভালোবাসা" বিষাদের অপর নাম। ভালোবেসে কেউ সুখী হতে পারে না।]

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া