মিশন ফেয়ার প্লেঅতিপ্রাকৃত

মিশন ফেয়ার প্লে — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম২৮ জানুয়ারি ২০২৫৬ মিনিট পড়া

ঘরে এসে বাবা অনেক্ষণ কাঁদলেন। তার চোখের জল দেখে মা-ও কেঁদে ফেললেন। আব্দুর রহিমও।

একসময় বাবা আব্দুর রহিমের সারা গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, 'এই কয়টা দিন আগে রিতা মরল। এখন যদি তোর কিছু হয়ে যায়... তুই ছাড়া আমাদের আর কে আছে, বল? তোকেও হারিয়ে ফেললে আমাদের কী হবে?'

আব্দুর রহিম তখনও চুপ করে রইল। বাবা তার হাত-পায়ের আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে মলম লাগিয়ে দিলেন।

রাতে বাবা আব্দুর রহিমের বিছানায় ঘুমালেন। তার পাশেই। পরদিনও একই কাজ। বাবা নিজের ঘর ছেড়ে আব্দুর রহিমের ঘরে। কিন্তু তার যে দু'টো কাজ বাকি। আরু মহল থেকে একবার ঘুরে আসা। আর দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে রিতার খুনিকে শাস্তি দেওয়া। যার নাম দিয়েছে মিশন ফেয়ার প্লে।

এই দু'টো কাজ করা হয়ে গেলেই সে বাবার কথামতো চলবে। ঠিকমতো পড়াশোনা করবে। খেলার মাঠ থেকে সন্ধ্যা নামার আগেই ঘরে ফিরবে। এ ছাড়াও বাবা যা করতে বলবেন তা-ই সে করবে। শুধু এই দু'টো কাজ করা হয়ে যাক।

এগারোটা বাজতেই বাবা নাক ডাকতে শুরু করেছেন। আব্দুর রহিম উঠে যাওয়ার সাহস পায়নি। কালকের মতো আজও যদি বাবা উঠে যান! না না, রিক্স নেওয়া যাবে না। এরচে' চুপচাপ শুয়ে থাকা ভালো।

রাত তিনটের সময় সে একটু ভরসা পেল। বাবা বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন। এই সময়টা সবাই গভীর ঘুমে থাকে। বাবাও। একসময় নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। তবে আজ আর জানালা দিয়ে নয়। সোজা দরজা দিয়ে। রাতের তিনটে। ভয় লাগার কথা। কিন্তু তার ভয় লাগছে না।

আরু মহলের গেটে একটা বুনো শেয়াল বসে ছিল। আব্দুর রহিমকে দেখে উঠে দাঁড়াল। কয়েকবার হুঁশ হুঁশ করার পরেও শেয়ালটা নড়ল না। যেন সে পুরো বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। তবে কয়েক পা এগিয়ে যাবার পর শেয়ালটা আর সাহস দেখাতে পারেনি। মুখ ফিরিয়ে ওদিকের অন্ধকারে চলে গেছে।

সেদিন রাতে রিতার স্যান্ডেল যেখানে রেখে গিয়েছিল, আজও সেখানেই পড়ে আছে। আব্দুর রহিম সেটা চোখে দেখলেও হাতে তুলে নিল না। রনি বারবার বলেছিল, স্যান্ডেলটা এখানে রেখে দিতে। হয়তো কোনো বিশেষ কারণ আছে। না হলে তো...

সাপের মতো কিছু একটা আজও সেদিনের মতো ভাঙা দেয়ালে ঝুলছে। সেটার গায়ে আলো জ্বলছে। তবে যেহেতু নড়ছে না, ধরাই যায় সাপটা মৃত। কিংবা ঘুমন্ত। ঘুমন্ত বিষাক্ত সাপের গায়ে হাত দিয়ে সেটাকে হিংস্র করে তুললে খুব বড়ো ভুল হবে কি? হলে হোক। আব্দুর রহিম নির্ভয়ে সেটাকে স্পর্শ করল।

সাপ নয়; তসবি। একটি রেডিয়াম তসবি। সেটা থেকে আলো ছড়াচ্ছিল। হতাশ হয়ে পিছন ফিরতেই কিছু একটায় পা ঠেকল। পায়ের কাছে মাটিতেই কেউ একজন পড়ে আছে। কারোর লাশ কি?

লোকটার বুকের উঠানামা দেখে আন্দাজ করা গেল, সে জীবিত। তাছাড়া তার গায়ে কোনো রকম আঘাতের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। শুধু কপাল থেকে গাল বরাবর একটি আঘাতের চিহ্ন। সেটাও বহু পুরনো। রনি তাহলে এই লোকটাকেই খুঁজছিল?

লোকটার মুখের বিবরণ শুনে পুলিশ অফিসার কিছুক্ষণ চুপ মেরে বসে রইলেন। তারপর একটা পুরনো ফাইল খুঁজে আনলেন। পাসপোর্ট সাইজের একটি ছবি দেখিয়ে বললেন, 'এই লোকটা?'

আব্দুর রহিম বিস্ময়ের স্বরে বলল, 'হ্যাঁ, এই লোকটা। এই লোকটাই তো...'

'দেখ, তুমি এখনো বাচ্চা মানুষ। এত রাতে বাসা থেকে বেরোনো ঠিক না। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। বড়ো হয়ে আমার মতো পুলিশ হয়ো। আপাতত ঘরে যাও। আর যা দেখেছো, ভুলে যাও। ওসব তোমার মনের ভুল ছিল৷'

'আমি বাচ্চা? আমার বয়স কত জানেন? পনেরো। পনেরো বছর বয়সে কেউ বাচ্চা হয়?'

অফিসার হাসলেন, 'হা হা হা! পনেরো বছর? বাচ্চাই তো! যাও, বাড়ি যাও।'

'কিন্তু তদন্ত?'

'কীসের তদন্ত, এই লোকটার?'

'হ্যাঁ।'

'সে তো মরে ভূত হয়ে গেছে। এখন তার তদন্ত করতে হলে কবর খুুঁড়তে হবে। একটা বাচ্চা ছেলের কথায় আমরা তো আর একজনের কবর খুঁড়তে পারি না। কী বলো?'

'মরে গেছে! কখন মরল?'

'দু'বছর আগে।' বলে এক টুকরো পত্রিকার কাটা অংশ এগিয়ে দিলেন। বললেন, 'আস্ত একটা ক্রিমিন্যাল ছিল। রাতের অন্ধকারে তার বাড়িতেই কারা যেন পুড়িয়ে মেরেছে।'

'কিন্তু আমি তো গতকাল রাতেও তাকে দেখলাম!' আব্দুর রহিম বলল।

অফিসার কিছু না বলে চেয়ার ছেড়ে চলে গেলেন। তার এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। অন্য হাতে ফাইল।

এক সপ্তাহ পর রনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। এখন সুস্থ। তবে নামমাত্র। হাঁটতে দেখলে মনে হয়, এখনি হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে। শরীর বেশ দুর্বল। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে। দুর্বল শরীর নিয়ে লাঠিতে ভর করে খেলার মাঠে চলে এসেছে। ছেলেরা মাঠে ছোটাছু্টি করছে। রনি দূরে বসে এক মনে মাঠের উপর দৃষ্টি রেখেছে।

রনিকে দেখেই আব্দুর রহিম খেলার মাঠ ছেড়ে ছুঁটে এল। পাশে বসে নানা ভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। রনি একটি বারের জন্য তাকিয়ে দেখেনি। আব্দুর রহিম বলল, 'কী অসুখ হয়েছিল তোর?'

রনি উদাসীন ভাবে বলল, 'জেনে কী করবি?'

'না এমনি। আচ্ছা, তুই এখন সুস্থ তো?'

'দেখতে পাচ্ছিস না?'

'তা তো পাচ্ছি। কিন্তু... লুৎফর লোকটাকে খুঁজতে আরু মহলে গিয়েছিলি, তাই না?'

কথাটা শুনতেই রনি শক খাওয়ার মতো দ্রুত ফিরে তাকাল। চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, 'তুই কীভাবে জানিস?'

আব্দুর রহিম প্রশ্ন এড়িয়ে বলল, 'ভেবেছিলি, আমার বোনের খুনিকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলে আমাকে তোর কাজে ব্যবহার করবি। অথচ আমি জানব না?'

'তুই ভুল বুঝছিস, রহিম।'

'ভুল? ভাগ্যিস একা একা আরু মহলে গিয়েছিলাম। না হলে তো তুই আমাকে ব্যবহার করছিস সেটা জানতেই পারতাম না। ওখানে লুৎফর লোকটাকে দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি, কিছু একটা গন্ডগোল আছে। থানায় গিয়ে বুঝলাম, সত্যিই গন্ডগোল। অফিসার বলে কিনা, লুৎফর দু'বছর আগে মারা গিয়েছে। যাকে আমি নিজ চোখে দেখেছি...'

রনি প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'থানায়ও গিয়েছিলি!'

'গিয়েছিলাম তো। আর যাব না। পুলিশ আমাকে সাহায্য করবে না, এটা আমার বোঝা হয়ে গেছে।'

'তুই কত বড়ো ভুল করেছিস, জানিস? চিনিস ওই লুৎফর কে?' বলেই রনি কলার চেপে ধরল।

আব্দুর রহিম নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, 'রাগ হচ্ছে? সত্যিটা জেনে গেছি বলে খুব রাগ হচ্ছে, তাই না?'

'কী জেনেছিস? কিছুই জানিসনি। শোন, ওই লুৎফর একটা লম্পট, ক্রিমিন্যাল। একটা সাইকো। একটা সিরিয়াল রেপিস্ট।' কথাটুকু বলে রনি একটু দম নিল। আব্দুর রহিম অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকল তার দিকে।

রনি আবার বলতে শুরু করল, 'লম্পটটার বিরুদ্ধে কয়টি কেস ফাইল হয়েছে, জানিস? নয়টি। নয়টি রেপ কেস। আরো অসংখ্য কুকর্ম করেছে সে। লোকলজ্জা আর সমাজের ভয়ে চাপা পড়ে গেছে সেসব। একটি মেয়েকেও সে বাঁচতে দেয়নি। প্রথমে শারীরিক অত্যাচার করেছে। তারপর খুন। যেমনটা তোর বোনের ক্ষেত্রে হয়েছে।'

আব্দুর রহিম ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলল, 'আমার বোনকেও...'

'ইয়েস, ইয়েস। ব্যাটা খুব ভালো প্ল্যান করেছিল। ভেবেছিল নিজ বাড়িতে অন্য একজনকে পুড়িয়ে সেটাকে নিজের ডেডবডি হিসেবে চালিয়ে দেবে। পেপার পত্রিকায় সেরকমই লেখা হলো, যেরকম সে চেয়েছিল। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, সে এই গ্রামে চলে এসেছে। প্রথমবার দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তারপর আমি তাকে ফলো করতে শুরু করি। যখন কনফার্ম হই সে-ই লুৎফর, তখন আমার টিমকে খবর দেই...'

'তোর টিম?'

'হুঁ। তুই কি ভেবেছিস, মিশন ফেয়ার প্লে নামক যে মিশনে যুক্ত হয়েছিস সেটা তোর? ওটা আমার মিশন। গত দু'বছর ধরে সেই মিশন সাকসেসফুল করার জন্য কাজ করছি আমি এবং আমার টিম। যদিও আমি সিক্রেট মিশনে আছি তবুও বলি, আমি গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করি।'

আব্দুর রহিম চমকে উঠে বলল, 'এই বয়সে গোয়েন্দা বিভাগে?'

'বয়স দিয়ে কী হবে? কাজটাই বড়ো। আজকাল বয়স লাগে না। লাগে কনফিডেন্স আর দক্ষতা।'

'এতকিছু জেনেও লুৎফরকে অ্যারেস্ট করা হলো না কেন? কেন আমার বোনটাকে খুন করার সুযোগ পেল সে?'

রনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'ওই যে, প্রমাণের অভাব। প্রমাণ ছাড়া আমরা তার কিছুই করতে পারব না।'

'কিন্তু আমি তো পারব! আমিই কুকুরটাকে খুন করব। আজকেই করব।'

'এত সহজ? উল্টো নিজের প্রাণ বাঁচা। তুই যে তার সম্পর্কে জেনে গিয়েছিস, সেটা বুঝতে পারলে এতক্ষণে একদল প্রফোশন্যাল কিলার পাঠিয়ে দেবে।'

'প্রফেশন্যাল কিলার? তা-ও একদল? মগের মুল্লুক নাকি?'

'রহিম, তুই তাকে চিনিস না। সে যখন যা খুশি তা-ই করতে পারে। আমি তাকে ফলো করছি, তার বিরুদ্ধে প্রমাণ যোগাড় করার চেষ্টা করছি, সেটা লুৎফর এখনও জানে না। তবুও সব সময় আমার সেইফটির জন্য অস্ত্রসহ দু'জন মজুদ থাকে। দেখবি?'

বলেই রনি হাত দিয়ে ইশারা করল। মুহূর্তের মধ্যে কোত্থেকে যেন বিশালদেহী দু'টো লোক ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রনির পাশে দাঁড়াল। একজন ডান পাশে অপরজন বাঁ পাশে।

কিছু বুঝে উঠার আগেই একজন আব্দুর রহিমের পিঠ বরাবর পিস্তল ঠেকিয়ে বলল, 'চলো আমাদের সাথে।'

আব্দুর রহিম রনিকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'এই ছিল তোমাদের প্ল্যান?'

রনি সাড়া দিলো না। নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে রইল খেলার মাঠের দিকে। যেন সে কিছুই শুনতে পায়নি। কী ঘটছে কিছুই জানে না।

[রহিমের নাম পরিবর্তন করে আব্দুর রহিম রাখা হয়েছে।]

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=270843011416611&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া